রেমিট্যান্সে থাবা : হুন্ডিতে বাহবা

আগের সংবাদ

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আবারো আগুন : সংকট সমাধানে উদ্যোগী হতে হবে

পরের সংবাদ

অগ্নিপরীক্ষায় নাসিক নির্বাচন ও দেশের রাজনীতি

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১১, ২০২২ , ১:১৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ১১, ২০২২ , ১:১৯ পূর্বাহ্ণ

আগামী ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নৌকা প্রতীকে সেলিনা হায়াৎ আইভীকে আবারো মনোনয়ন দিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির নেতা তৈমূর আলম খন্দকার হাতি মার্কা নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী পরিচয়ে নিজেকে জনগণের প্রার্থী দাবি করছেন। বিএনপি বর্তমান নির্বাচন কমিশন এবং সরকারের অধীন কোনো নির্বাচনে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও ইউপি, সিটি ও পৌর নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দলের কাউকে বহিষ্কার কিংবা বাধা দিচ্ছে না। তবে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ব্যাপারে বিএনপি অভিনব কৌশল নিয়েছে। তৈমূর আলম খন্দকার যেহেতু নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির আহ্বায়ক এবং দলীয় চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা তাই তাকে ওই দুই পদ থেকে ‘অব্যাহতি’ দিয়েছে। কিন্তু এই অব্যাহতির কারণ সম্পর্কে শুধু জানানো হয়েছে যে দলের ওপরের নির্দেশে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। দল থেকে সাধারণত বহিষ্কার না করে কাউকে অব্যাহতি দেয়া হয় না। বিএনপি এখানে তৈমূর আলমকে বহিষ্কার করেছে এমন কোনো সিদ্ধান্তও জানানো হয়নি। তৈমূর আলম বিষয়টি নিয়ে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। এক. তিনি বিএনপির ছিলেন এবং আছেন, দলের নেতাকর্মীরাও তার সঙ্গেই আছেন। সুতরাং তিনি নাসিক নির্বাচনে দলীয় মনোনীত প্রার্থী নন, স্বতন্ত্র এবং সব দলের ও মতের সমর্থিত প্রার্থী। দুই. তিনি বিএনপির সিদ্ধান্তের ব্যাপারে বলেছেন, ‘বিএনপির অবস্থান বিএনপি ভালো জানে। বিএনপি কি নৌকার পক্ষে ভোট চায়? স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা সবাই সরকারের হাতে নির্যাতিত। তারা সবাই মাঠে আছেন। এর আগেও আমাকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।’ কিন্তু দিন যত গড়িয়ে যাচ্ছে তৈমূর আলম খন্দকারের কথাতেও নানা রকম পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এখন তিনি শুধুই সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিপক্ষে প্রচারণা করছেন। সরকার কিংবা অন্য কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করছেন না। এমনকি তিনি দাবি করছেন যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তার প্রশংসা করেছেন। সুতরাং নারায়ণগঞ্জের ভোটার হলে প্রধানমন্ত্রী তাকে ভোট দিতেন বলেও তিনি দাবি করছেন। তিনি নিজেকে নারায়ণগঞ্জের সব দল ও মতাদর্শে বিশ্বাসীদের প্রার্থী বলে দাবি করছেন। তার নির্বাচনী প্রচারণায় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের কেউ অংশ নিচ্ছেন না সত্য, তবে দলের স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন অঙ্গ-সংগঠনের পরিচয়ে অনেকে অংশ নিচ্ছে। কিন্তু প্রকাশ্যে অন্য কোনো দলের নেতাকর্মীরা প্রচারণা ও মিছিলে অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে না। নারায়ণগঞ্জে তৈমূর আলম খন্দকার এবং সেলিনা হায়াৎ আইভীর প্রতিদ্ব›িদ্বতা নিয়ে বাহাস চলছে। আইভী দাবি করছেন যে তৈমূর আলম আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টির ওসমান পরিবারের দুই সংসদ সদস্যের সমর্থিত প্রার্থী। নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে সেলিম ওসমান ও শামীম ওসমান দুই ভাই হলেও শামীম আওয়ামী লীগ এবং সেলিম জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য। দুজনে দুই পার্টি করলেও তাদের দুজনের প্রভাব প্রায় অভিন্ন। ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে দুজনেরই মনোনীত ও সমর্থিত প্রার্থী রয়েছে। পত্রপত্রিকায় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে যে দুজনের সমর্থিত প্রার্থীরা আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর পক্ষে কাজ করছে না। জাতীয় পার্টি মহাজোটের অন্যতম শরিক দল। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে নামে জাতীয় পার্টি হলেও সিদ্ধান্ত সেলিম ওসমানের নামে প্রচারিত হয়। একইভাবে শামীম ওসমান আওয়ামী লীগের এমপি হলেও অতীত থেকে এখন পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে শামীম ওসমানকে আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলতে দেখা যায় না। এবারো তিনি মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীর বিপক্ষে সেটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট। তার ভাই সেলিম ওসমানও মহাজোটের অন্যতম প্রধান দল আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে নেই। কাউন্সিলর পদেও দুই ভাই-ই নিজেদের বলয়ের প্রার্থীদের সমর্থন করে যাচ্ছেন। তৈমূর আলম খন্দকার এই সুযোগটি কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। তিনি শামীম ওসমান এবং সেলিম ওসমানের প্রকাশ্যে না হলেও অপ্রকাশ্যে সমর্থন পাচ্ছেন বলে গণমাধ্যম এবং আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় প্রচার প্রচারণা কমিটির সদস্যরাও মনে করছেন বলে তাদের বক্তব্য থেকে জানা যাচ্ছে।
সেলিনা হায়াৎ আইভী মনোনয়ন লাভের পর দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সবার সমর্থন পাবেন বলে আশা করেছিলেন। কিন্তু সেই আশার কোনো লক্ষণ না দেখে তিনি প্রকাশ্যেই সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তৈমূর আলম খন্দকারকে ওসমান পরিবারের সমর্থিত প্রার্থী বলে দাবি করেছেন। ওসমান পরিবারের কেউ এর প্রতিবাদ করেননি। আবার তৈমূর আলমও এ ব্যাপারে তীব্র কোনো প্রতিবাদ না করে বলেছেন যে, তিনি কেন শামীম ওসমানের পায়ে হাঁটবেন? দিন যত এগিয়ে যাচ্ছে নাসিক নির্বাচন নিয়ে দুই প্রার্থীর অবস্থান এবং তাদের পেছনের রাজনৈতিক সমর্থনের বিষয়টিও তত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তৈমূর আলমকে নিয়ে যে যত সন্দেহ প্রকাশই করুক না কেন তিনি বিএনপির নেতা, বিএনপি তাকে দল থেকে বহিষ্কারও করেনি। দলীয়ভাবে এবং স্থানীয়ভাবে বিএনপি কৌশলের খেলা খেলছে। তারা কৌশলে জিতে আসতে চায়। সে কারণে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির ওসমান পরিবারের প্রভাব-প্রতিপত্তি আগে সমালোচক হলেও এখন বিএনপি ভোটের হিসাব কষতে গিয়ে প্রকাশ্যে নীরবতা, ভেতরে সমর্থন লাভের চেষ্টা করছে সেটি পরিষ্কার। ওসমান পরিবার এবং তাদের সমর্থিত গোষ্ঠীরা যদি নৌকায় ভোট না দিয়ে তৈমূর আলমের হাতির পেট ভরতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন সেই দোষ তো বিএনপিকে দেয়া যাবে না, দুর্বলতাটি আওয়ামী লীগেরই।
নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবার একসময় আওয়ামী লীগের বন্ধু ছিল। বঙ্গবন্ধু এই পরিবারের প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতিশীল ছিলেন। শেখ হাসিনা সেই সহানুভূতি বজায় রেখেছেন। কিন্তু রাজনীতি বড়ই জটিল বিষয়। এখানে পারিবারিক ঐতিহ্য সমানভাবে বিবেচনা পাওয়ার যোগ্য কিনা সেটি অগ্নিপরীক্ষার ভেতর দিয়েই যাচাই করতে হয়। শামীম ওসমান ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি নারায়ণগঞ্জে দলের প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে নিজের ক্ষমতাই প্রদর্শন করেছিলেন। বিএনপির লংমার্চ কর্মসূচিতে তিনি এবং তার সমর্থকরা বাধা দিয়ে তার ‘প্রভাব’ ও ‘ক্ষমতা’ প্রদর্শন করেছিলেন। সেটি আওয়ামী লীগের অনেকে বাহবা দিয়েছিলেন। সে কারণে তখন নানা মহল তখন তাকে গডফাদার হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। বিস্ময়কর হলেও সত্য এই গডফাদারের খুঁটি কেবল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় শক্ত থাকে, এটি তিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর পরই তিনি দেশ ছেড়ে চলে যান। ফিরে এসেছেন জোট সরকার ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার পর। তার ক্ষমতা ও খুঁটি যে নড়বড়ে সেটি বুঝতে কারো বাকি নেই। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা সরকার গঠন করার পর আবার নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে ‘প্রভাবশালী’ হয়ে ওঠেন তিনি। তার অন্য ভাইয়েরাও সেখানে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির পরিচয়কে কাজে লাগান। একই পরিবার থেকে দুই দলের দুই সংসদ সদস্য হিসেবে তারা নির্বাচিত হন। এই পরিবারের প্রতি নারায়ণগঞ্জের অনেক সুধী মানুষের ক্ষোভ, বিক্ষোভ, অভিযোগ দীর্ঘদিন থেকে জমা হয়ে আছে। কিন্তু সেই সবের কোনো প্রতিকার হয়নি বরং ওসমান পরিবারের কোনো সদস্যের কর্মকাণ্ডে অনেক বিবেকবান মানুষই ক্ষুব্ধ এবং লজ্জিত হয়েছে। অনেকের কাছেই অসহায়ত্ব বরণ করতে বাধ্য হয়েছে। ওসমান পরিবার এখন যা করছে তাতে মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি নারায়ণগঞ্জে ‘অসহায়’। শামীম ওসমান কিংবা সেলিম ওসমান কেউই রাজনৈতিক মতাদর্শের গুরুত্বকে প্রাধান্য দেয়ার অবস্থানে নেই। তাদের এখন বিশাল সমর্থক কর্মী বাহিনী রয়েছে যারা আওয়ামী লীগ কিংবা জাতীয় পার্টির পরিচয় প্রদান করলেও তারা কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত পালনে খুব একটা তোয়াক্কা করে না। গণমাধ্যমে নারায়ণগঞ্জের যে কোনো নির্বাচনে ওসমান পরিবারের প্রভাবের বিষয়টি প্রধান হয়ে ওঠে। এখন নাসিক নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি প্রার্থী কিংবা দুই দলের জয়-পরাজয়ের বিষয়টি মুখ্য না হয়ে ওসমান পরিবারের ভূমিকাই সবার কাছে প্রধান হয়ে উঠেছে। অথচ ওসমান পরিবারের কেউ মেয়র কিংবা কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করছেন না। তাদের তো গণমাধ্যমের আলোচনায় আসার কথাই ছিল না। এই পরিবারের দূরসম্পর্কীয় কোনো কোনো আত্মীয় কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করছেন। তবে কলকাঠি নাড়াতে ওসমান পরিবারের বর্তমান সদস্যরা কত বেশি ক্ষমতাধর, প্রভাবশালী এবং পারদর্শী সেটি বিএনপির ‘নীরবতা’ এবং আওয়ামী লীগের ‘প্রতিক্রিয়া’ থেকে অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিএনপি এখন ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে কিছু বলছে না। ভবিষ্যতে যদি কোনো দিন ক্ষমতায় আসতে পারে তাহলে ওসমান পরিবারকে কতটা প্রতিদান দেবে সেটি ভবিষ্যৎই বলতে পারে। তবে জামায়াত, হেফাজতসহ আওয়ামীবিরোধী সব শক্তি নীরবে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীকে পরাজিত করতে তৈমূর আলমের পক্ষে রয়েছে এটি খুবই পরিষ্কার। ওসমান পরিবারও যদি এমন সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানে নারায়ণগঞ্জে ভূমিকা রাখে তাহলে বিস্মিত হওয়ার খুব বেশি কিছু নেই। শামীম ওসমান এবং সেলিম ওসমান নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে নিজস্ব শক্তি, বলয়, প্রভাব এবং পরিকল্পনা মোতাবেক চলেন। এটি ১৬ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য নাসিক নির্বাচন নিয়েও আবার প্রমাণিত হতে যাচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জের ভোটাররা নারায়ণগঞ্জের পরিস্থিতি শুধু বিবেচনায় রাখবেন তা নয়, জাতীয় রাজনীতিকেও অনেকেই বিবেচনায় রাখবেন সেটিই সবাই ধারণা করছে। তবে আওয়ামী লীগ দলগতভাবে নিকট ভবিষ্যতে দলের এসব ক্ষমতাধরের প্রভাব থেকে দলকে মুক্ত করতে কতটা দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করবে সেটি দেখার বিষয়। তেমনটি না ঘটলে আওয়ামী লীগই শুধু দেশব্যাপী চরম ক্ষমতাধরদের কবল থেকে মুক্তি পাবে না, গোটা দেশও আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে সেটি নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়