শিক্ষায় গুণগত মানের সমতা প্রতিষ্ঠা জটিল, তবে অবহেলার উপায় নেই

আগের সংবাদ

এবার করোনায় আক্রান্ত রোনালদো

পরের সংবাদ

বছরজুড়ে নৈরাজ্যে আলোচিত সড়ক

প্রকাশিত: জানুয়ারি ৪, ২০২২ , ৮:২৩ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ৪, ২০২২ , ৮:২৩ পূর্বাহ্ণ

→ কোম্পানিভিত্তিক বাস সার্ভিস চালু করাটাই একমাত্র অর্জন

দিন যত যাচ্ছে সড়কে শৃঙ্খলার পরিবর্তে অব্যবস্থাপনা ততই প্রকট আকার ধারণ করছে। গত ১ বছরে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর কোনো উদ্যোগই কাজে আসেনি। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো, গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ানোর দাবিতে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের দফায় দফায় ধর্মঘট এবং হাফভাড়ার দাবিতে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধ করে আন্দোলনের বিষয়টি ছিল সবচেয়ে বেশি আলোচিত। এছাড়া যানজট নিরসনে ইউলুপ নির্মাণ করা হলেও তার সুফল তেমন মেলেনি। নিরাপদ সড়কের দাবিতে বছর জুড়ে আন্দোলন হলেও ‘সড়কে নিরাপত্তা’ নিশ্চিত হয়নি। ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন-২০১৮’ এখনো শতভাগ বাস্তবায়ন হয়নি। সংশোধিত আইনটি চলতি বছরেও সংসদে পাস হয়নি। ‘গেটলক’ ‘সিটিং সার্ভিস’ বন্ধ করা হলেও ‘ওয়েবিলের’ নামে ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য এখনো চলছে। সব মিলিয়ে ২০২১ সালের পুরো বছরটিই সড়কে অব্যবস্থাপনায় ভরপুর ছিল।

সারাদেশের পরিবহন খাতে এখনো জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। সড়ক নিরাপত্তা আইন-২০১৮ পাস হওয়ার পর সড়কে কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরেছিল। কিন্তু দুই বছর পর আবার তা বিশৃঙ্খলায় পরিণত হয়। চলতি বছর তিনটি কারণে দফায় দফায় সড়কে বিশৃঙ্খলা ও অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। প্রথমত, কোনো ধরনের পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই সরকার ১ নভেম্বর জ্বালানি তেলের দাম ২৩ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। এতে পরিবহন সেক্টরে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সাধারণ মানুষের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশসহ (ক্যাব) বিভিন্ন সংগঠন সরকারের এই সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিক এবং সিদ্ধান্ত বাতিলের আহ্বান জানালেও তা সরকার মেনে নেয়নি। পরিবহনগুলো তখন অঘোষিতভাবে নিজেদের উচ্ছেমতো যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করতে থাকে। এতে সড়কে পরিস্থিতি বেশ খারাপ অবস্থায় চলে যায়। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা সব ধরনের গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ানোর দাবিতে হঠাৎ করেই অঘোষিতভাবে লাগাতার ধর্মঘট শুরু করে। নগর পরিবহন ও দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। চরম ভোগান্তিতে পড়ে সারাদেশের মানুষ। অচলাবস্থা নিরসনে অবশেষে ৭ নভেম্বর বিআরটিএ পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসে এবং বাস ভাড়া ২৭ শতাংশ ভাড়া বাড়াতে বাধ্য হয়। তৃতীয়ত, বাস ভাড়া বাড়ানোর পর বাসগুলো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাফ ভাড়া নেয়া বন্ধ করে দিলে নতুন এক সমস্যার সৃষ্টি হয়। হাফ ভাড়া কার্যকরের দাবিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে। অবশেষে আন্দোলনের মুখে হাফ ভাড়ার কার্যকর হয়। বছরের শেষ দিকে এই তিন কারণে সড়কে চরম অব্যবস্থাপনার খেসারত দিতে হয় সাধারণ মানুষকে।

২০২১ সালে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে নানান উদ্যোগ নেয়া হয়। অতিরিক্ত বাস ভাড়া আদায় বন্ধে বিআরটিএ, ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি সম্মিলিকভাবে সড়কে অভিযানে নামলে সমস্যা অনেটাই সহনশীল পর্যায়ে পৌঁছে। কিন্তু দেশের পরিবহন সেক্টরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও ব্যক্তিদের অদক্ষতা, পদ্ধতিগত ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া, অপরিকল্পিতভাবে যানবাহনের পারমিট দেয়া, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল ও অদক্ষ চালকদের কারণেই বিগত বছরগুলোর মতো এই বছরও সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে। ২০১৮ সালে সড়ক আইন পাস হয়, কিন্তু নতুন আইন পাস হওয়ার পর তা শতভাগ বাস্তবায়ন হয়নি। পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের দাবির মুখে তা সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু সংশোধিত আইনটিও গত এক বছরে সংসদে পাস হয়নি। ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিটের দেয়া ৯টি নির্দেশনাও এখন উপেক্ষিত। সড়ক আইনের যেসব ধারা বাস্তবায়নের নির্দেশনা ছিল, গত এক বছরে বাস চালকরা তা না মেনেই চলাচল করেছে। ইচ্ছেমতো যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা না করানো, চলন্ত অবস্থায় গেট বন্ধ রাখা, বাসের সামনে চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্সের ফটোকপি ও পরিচয়পত্র ঝুলিয়ে রাখা বাধ্যতামূলক করা হলেও কোথাও কেউ মানছে না। সরকারি পরিবহন সংস্থা বিআরটিসির গণপরিবহনগুলোও আইন মানার প্রয়োজন মনে করেনি। গাড়ির চালকদের সিটবেল্ট বাঁধার নিময় থাকলেও সরকারি-বেসরকারি সব যানবাহনেই উপেক্ষিত দেখা গেছে। সব সড়কে চালকরা এখনো বেপরোয়া।

তবে সবকিছুর পরেও বছরের একেবারে শেষ সময়ে স্বল্প পরিসরে হলেও বহুল প্রতিক্ষিত ‘কোম্পানিভিত্তিক বাস সার্ভিস’ চালু করাই ছিল একমাত্র সফলতা। গত ২৬ ডিসেম্বর ৫০টি বাস নিয়ে মোহাম্মদুপুর বাস টার্মিনাল থেকে ঝিগাতলা, শাহবাগ, গুলিস্তান হয়ে চিটাগং রোড পর্যন্ত সার্ভিসটি চালু হয়। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়রদ্বয় এই সার্ভিসের উদ্বোধন করেন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে পুলিশ নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে। এখন পুলিশ পুরোপুরি সক্রিয়। বিশৃঙ্খলা নজরে আসামাত্রই জরিমানা আদায়সহ আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। পুলিশ, বিআরটিএ, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, পথচারী ও যাত্রীসহ সবাইকে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সহযোগিতা দিয়ে কাজ করতে হবে। বুয়েটের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, সড়কে অব্যবস্থাপনা দূর করে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন। এ পর্যন্ত আমরা অনেক অনেক ধরনের সুপারিশ করেছি। কিন্তু সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি একেবারেই সন্তোষজনক না হওয়ায় অব্যবস্থাপনা রয়েই গেছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্ল্যাহ বলেন, নতুন সড়ক আইন অনুযায়ী চলার জন্য পরিবহন কোম্পানি ও চালকদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। যারা নির্দেশনা মানছে না তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ ব্যবস্থা নিচ্ছে। সংশোধিত আইন দ্রুত পাস করে আইনটি পুরোপুরি কার্যকর হলে শৃঙ্খলা ফিরবে। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, শুধু আইন পাস করে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো যাবে না। আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। চালক, যাত্রী, পথচারী সবাইকে সচেতন করতে জোরালো প্রচারণা চালাতে হবে। গাড়ির ফিটনেস ও চালকদের লাইসেন্স পাওয়ার পদ্ধতি উন্নত বিশ্বের মতো আধুনিকায়ন করতে হবে। তাহলেই অব্যবস্থা দূর হবে।

আর- ডিডিএম / ডি- এইচএ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়