দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দের করোনা শনাক্ত

আগের সংবাদ

সমুদ্র পথে স্পেন যেতে নিখোঁজ ৪,৪০০ অভিবাসন প্রত্যাশী

পরের সংবাদ

অর্থনীতির তিন সূচকে আশার আলো

প্রকাশিত: জানুয়ারি ৪, ২০২২ , ১০:১৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ৪, ২০২২ , ১০:২১ পূর্বাহ্ণ

রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্সে রেকর্ড, রাজস্বে প্রবৃদ্ধি ১৫%

গত বছরের শেষ কয়েক মাসে ব্যাংকিং চ্যানেলে বা বৈধ পথে প্রবাসীদের পাঠানো আয় কম ছিল। সেখান থেকে বছরের একেবারে শেষ ভাগে এসে ঘুরে দাঁড়িয়েছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স আয়। শুধু ঘুরে দাঁড়ানোই নয়, গত বছর রীতিমতো রেকর্ড ২২ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স আসে দেশে। বছরজুড়ে রপ্তানি আয়ও ছিল ঊর্ধ্বমুখী। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ডিসেম্বরে রপ্তানি আয় গিয়ে ঠেকেছে প্রায় ৫ বিলিয়ন (৫০০ কোটি) ডলারে। অন্যদিকে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি চোখ রাঙালেও এখনো সহনীয় পর্যায়েই আছে। এখন ভয় শুধু করোনার নতুন ধরন ওমিক্রনে। এটাকে সামাল দেয়া গেলে আর পেছনে তাকাতে হবে না; দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

মহামারির খাদ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর আশায় শুরু হয়েছিল ২০২১ সাল। কিন্তু শুরুতেই হোঁচট; করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউকে সঙ্গী করে ২০২১ সালে প্রবেশ করে বাংলাদেশ। তবে বছরের শেষ দিকে এসে করোনার ধকল কাটিয়ে স্বাভাবিক গতিতে ফিরে বেশ মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। আর এ কারণেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির (জিডিপি প্রবৃদ্ধি) পূর্ভাবাস নিয়ে সব সময় ‘রক্ষণশীল’ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) আগের হিসাব থেকে সরে এসে বলেছে, চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, পণ্য রপ্তানি, প্রবাসী আয় ও রাজস্ব বাড়ায় সরকারি-বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান, সরকারি ব্যয় ও মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থায় একটি স্বস্তির জায়গা তৈরি হবে। তবে মূল্যস্ফীতি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে।

রপ্তানিতে রেকর্ড : অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে সদ্য সমাপ্ত ডিসেম্বরে রপ্তানি আয় গিয়ে ঠেকেছে প্রায় ৫ বিলিয়ন (৫০০ কোটি) ডলারে। বর্তমান বিনিময় হার (৮৫ টাকা ৮০ পয়সা) টাকার অঙ্কে এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা। ডিসেম্বরে গত বছরের ডিসেম্বরের চেয়ে আয় বেশি এসেছে ৪৮ দশমিক ২৭ শতাংশ। লক্ষ্যের চেয়ে বেশি এসেছে ২৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনো এক মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে এত বেশি বিদেশি মুদ্রা দেশে আসেনি। এর আগে একক মাসে সর্বোচ্চ আয় এসেছিল গত অক্টোবরে, ৪৭২ কোটি ৭৫ লাখ ডলার। আর চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) হিসাবে প্রায় ২৪ দশমিক ৭০ বিলিয়ন (২ হাজার ৪৬৯ কোটি ৮৫ কোটি) ডলার রপ্তানি আয় দেশে এসেছে।

এ অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৮ দশমিক ৪১ শতাংশ বেশি। রেকর্ড এই রপ্তানির পেছনে বড় ভ‚মিকা রেখেছে তৈরি পোশাক খাত। গত মাসে ৪০৪ কোটি ডলারের বা ৩৪ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকার পোশাক রপ্তানি করা হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৫২ দশমিক ৫৭ শতাংশ বেশি। পোশাক রপ্তানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান রপ্তানি আয়ের এই উল্লম্ফনে উচ্ছ¡াস প্রকাশ করে বলেন, সত্যিই আমরা খুশি। এত দ্রুত করোনা মহামারির ধাক্কা সামলে আমরা ঘুরে দাঁড়াব, ভাবতে পারিনি। তবে, করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন আমাদের নতুন চিন্তার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। জানি না, কী হবে। যদি ওমিক্রন সারা বিশে^ ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে আমাদের রপ্তানি আবার থমকে যাবে। আর যদি তেমনটা না হয়, তাহলে এই ইতিবাচক ধারা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।

রেমিট্যান্স আয়ে রেকর্ড: মহামারি করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় ধাক্কা ও নানা সংকটের কারণে টানা ছয় মাস কমেছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। তারপরও সদ্য সমাপ্ত বছরে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে বাংলাদেশে। ২০২১ সালে রেকর্ড দুই হাজার ২০৭ কোটি মার্কিন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। এর আগে কোনো বছর এত বেশি রেমিট্যান্স দেশে আসেনি। তবে একক বছরে রেমিট্যান্স বাড়লেও চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে প্রায় ২১ শতাংশ। এদিকে বৈধ পথে প্রবাসী আয় বাড়াতে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা ঘোষণা করে সরকার। কিন্তু গত বছরের শেষ দিকে টানা ছয় মাস রেমিট্যান্স প্রবাহ কমায় নতুন বছর থেকে এটি আরো বাড়ানো হয়েছে। প্রণোদনা ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। নতুন বছরের প্রথম দিন থেকেই এটি কার্যকর করা হয়েছে।

রাজস্ব আদায়ে বড় প্রবৃদ্ধি : জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এই সময় শুল্ক-কর আদায় হয়েছে ১ লাখ ৫৭৩ কোটি টাকা। গত বছর একই সময়ে আদায় হয়েছিল ৮৭ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে। পরের মাসে তা ১৯ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। আর সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে। এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসায় রাজস্ব আদায় বেড়েছে। তবে ওমিক্রন দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে। জুলাই-নভেম্বর সময়ে স্থানীয় পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি শুল্ক-কর আদায় হয়েছে। এ খাতে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক আদায়ের পরিমাণ ছিল ৩৮ হাজার ১০ কোটি টাকা। এরপর আমদানি পর্যায়ে আমদানি শুল্ক, ভ্যাটসহ অন্যান্য কর আদায় হয়েছে ৩২ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। আর আয়কর আদায় হয়েছে ২৯ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা।

অর্থনীতির প্রধান এ ৩টি সূচক ছাড়াও পণ্য আমদানি, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ও বিদেশি ঋণে স্বস্তিতে রয়েছে সরকার। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, করোনা ভাইরাসের প্রকোপ কমার পর দেশে পণ্য আমদানির ঋণপত্র বা এলসি খোলার বন্যা বইতে শুরু করেছে। প্রতি মাসেই রেকর্ড হচ্ছে। সর্বশেষ নভেম্বর মাসে ৮১০ কোটি ৭০ লাখ (৮ দশমিক ১০ বিলিয়ন) ডলারের এলসি খুলেছেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা। বর্তমান বিনিময় হার হিসাবে (প্রতি ডলার ৮৫ টাকা ৮০ পয়সা) টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনোই এক মাসে পণ্য আমদানির জন্য এলসি খুলতে এত বিপুল অঙ্কের বিদেশি মুদ্রা খরচ হতে দেখা যায়নি।

এদিকে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি তলানিতে নামার পর বেশ ভালোই গতিতে ফিরেছে। টানা ছয় মাস ধরে বাড়তে বাড়তে দুই বছর পর নভেম্বরে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচক দুই অঙ্কের (ডাবল ডিজিট বা ১০ শতাংশের ওপরে) ঘরে পৌঁছে করোনা মহামারির আগের অবস্থায় ফিরেছে। নভেম্বর মাসে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি অক্টোবরের চেয়ে দশমিক ৬৭ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে ১০ দশমিক ১১ শতাংশে উঠেছে। তবে এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক নিচে রয়ে গেছে এ সূচক।

বিদেশি ঋণেও স্বস্তিতে রয়েছে সরকার। গত দুই অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থবছরেও বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঋণসহায়তা পাচ্ছে সরকার। এতে করোনা মহামারিকালেও সরকারকে অর্থসংকটে পড়তে হয়নি। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) বাংলাদেশের অনুক‚লে ৩০৮ কোটি ৯৫ লাখ (৩ দশমিক ০৯ বিলিয়ন) ডলার ছাড় করেছে দাতারা। বর্তমান বিনিময় হার হিসাবে টাকার অঙ্কে (প্রতি ডলার ৮৫ টাকা ৮০ পয়সা) এই অর্থের পরিমাণ ২৬ হাজার ৫১২ কোটি টাকা।

নানা সুখবরের মধ্যেও মূল্যস্ফীতি নিয়েই সরকারের বড় উদ্বেগ রয়েছে। গত বছরের জানুয়ারিতে ৫ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ মূল্যস্ফীতি নিয়ে বছর শুরু হয়। সর্বশেষ নভেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ। তবে বিশ^জুড়েই মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়