শিক্ষায় গতি ফেরার আগেই ওমিক্রনের আতঙ্ক

আগের সংবাদ

পুঁজিবাজার অস্থিতিশীল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অযাচিত হস্তক্ষেপে

পরের সংবাদ

জামায়াতের বিচারে ‘ধীরে চলো নীতি’!

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৭, ২০২১ , ৮:২২ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ডিসেম্বর ৭, ২০২১ , ৮:২২ পূর্বাহ্ণ

জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির (বর্তমানে প্রয়াত) গোলাম আযমের মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার দলকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে উল্লেখ করে। ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই ঐতিহাসিক এ রায়ে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের বিচারের পথ উন্মুক্ত হয়। এরপর বিভিন্ন মহল থেকে বিচারের দাবি জোরালো হয়। কিন্তু দীর্ঘ ৮ বছরেও এ-সংক্রান্ত আইন সংশোধন না হওয়ায় ঝুলে আছে বিচারপ্রক্রিয়া। এ বিষয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপি ও নেতারা এক সময় জোরালো প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন তারা নীরব। কেউ কেউ বলছেন, সরকারের ‘ধীরে চলো’ নীতির কারণেই জামায়াতের বিচারের বিষয়টি ঝুলে আছে। এ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন শহীদদের পরিবার ও বিশিষ্টজনরা। তারা বলছেন, বিচারের মাধ্যমে জামায়াত নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির যে আস্ফালন এখন চলছে, তা দেখতে হতো না।

এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমকে বলেছেন, জামায়াতের বিচারের উদ্যোগ সরকারের রয়েছে। আইনের খসড়া সংশোধনী মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেলেই বিচারের উদ্যোগ নেয়া হবে। কিন্তু এ বিষয়ে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেয়া যাবে না। বিচার হবে এটুকু বলতে পারি। আমরা চেষ্টা করব। এ বিষয়ে জানতে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের মোবাইল ফোনে বেশ কয়েকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। এছাড়া মন্ত্রীর হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারে বিষয় উল্লেখ করে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জাতিকে মেধাশূন্য করতে ১৯৭১ সালের ১০ থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে অপহরণ ও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় আলবদরের নেতৃত্বে, যে সংগঠনটি তৎকালীন ইসলামী ছাত্রসংঘের (বর্তমানে ছাত্রশিবির) নেতাকর্মীদের নিয়ে তৈরি। দীর্ঘদিন পর হলেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় কয়েক নেতার বিচারের রায় ও তা কার্যকর হয়েছে। অনেকের বিচারকাজ চলছে। কিন্তু আইন সংশোধন না হওয়ায় মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় বিরোধিতাকারী এবং গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের নির্দেশক জামায়াত, তাদের সহযোগী ‘আল বদর’, ‘আল শামসের’ মতো সংগঠনের বিচার শুরুর উদ্যোগ নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। কারণ ২০১৩ সালে এ নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনে সংশোধনী আনার কথা থাকলেও এখনো তা হয়নি।

অথচ ২০১৩ সালের আগস্টে জামায়াতের বিষয়ে তদন্ত শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। ২০১৪ সালের ২৭ মার্চ তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনে জমা দেয়া হয়। এতে জামায়াতের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের সুনির্দিষ্ট সাতটি অভিযোগ আনে তদন্ত সংস্থা। এরপর ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরদের সমন্বয়ে একটি আইনজীবী প্যানেলও গঠন করা হয়। তারা প্রতিবেদন পরীক্ষা করে অভিযোগ আকারে ট্রাইব্যুনালে দাখিলের প্রস্তুতি নিলে সরকারের তরফে জানানো হয়, বিদ্যমান আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনে সংগঠনের বিচার ও শাস্তির বিধান নেই। পরে ওই বছরই মানবতাবিরোধী অপরাধী সংগঠনের শাস্তির বিধান যুক্ত করে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয় আইন মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবিত খসড়া সংশোধনীতে এ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় ‘ব্যক্তি’ শব্দটির পরে ‘অথবা সংগঠন’, ‘দায়’ শব্দের পরে ‘অথবা সাংগঠনিক দায়’, ‘অভিযুক্ত ব্যক্তির’ পরে ‘অভিযুক্ত ব্যক্তি বা সংগঠন’ যুক্ত করা হয়। এছাড়া বিচারে সংগঠনের দোষ প্রমাণিত হলে ওই সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার বিধান রাখা হয়।

এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক এম সানাউল হক বলেন, সংগঠনের শাস্তি কী হবে, সেটা আইনে স্পষ্ট না থাকায় রিপোর্টটিকে চার্জ গঠনের জন্য ট্রাইব্যুনালে উত্থাপন করা হয়নি বলে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আমাদের জানানো হয়েছে। ব্যক্তির দায় সংগঠন এড়াতে পারে না বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এই সংগঠনের সেই সময়ে যে সব অঙ্গসংগঠন বা যে সব ব্যক্তি জড়িত ছিলেন, তাদের সবারই বিচার হয়। তাদের সবার ওপরই এ অপরাধের দায় চলে আসে। জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতাকে সমূলে উৎপাটন ও দলটির স্বরূপ উদ্ঘাটনের জন্য রিপোর্টটির অবিলম্বে যথাযথ নিরীক্ষণপূর্বক এই বিচারটি প্রকাশ্য আদালতে করার দাবি জানান সানাউল হক। চলতি বছরের ২৫ অক্টোবর ধানমন্ডিতে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন সানাউল হক।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর রানা দাশগুপ্ত বলেন, তদন্তের পর জামায়াতের বিচারের বিষয়টি অনেক দূর এগিয়েছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় সংকেত না পাওয়ায় এটি মামলা হিসেবে উপস্থাপন করা যায়নি। একপর্যায়ে আমাদের বলা হলো, ধীরে চলো (গো স্লো)। এরপরই মূলত প্রক্রিয়াটি থমকে যায়। এরপর আইনমন্ত্রী (আনিসুল হক) আইনে কিছু পরিবর্তন ও সংশোধনী আনতে চান বলে জানান। কিন্তু এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। এ আইনটি সংশোধন করা হলে যুদ্ধাপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের বিষয়ও এর মধ্যে চলে আসত।

তিনি আরও বলেন, আমরা মনে করি, এখানে রাজনৈতিক কৌশল অথবা কোনো চিন্তাভাবনা রয়েছে। এমন না হলে বিষয়টি নিয়ে এত বিলম্বের কারণ ছিল না।

এদিকে একটি রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে ২০১৩ সালের ১ আগস্ট হাইকোর্টের তিন সদস্যের বৃহত্তর বেঞ্চ রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ও বেআইনি ঘোষণা করে। এ রায়ের বিরুদ্ধে জামায়াতের আপিল আট বছরের বেশি আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে। তবে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলছেন, সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে চাইলে হাইকোর্টের ওই রায়, গোলাম আযমের রায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ ও সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদই যথেষ্ট।

এ বিষয়ে ১৯৭১ সালের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী সংগঠনের বিচার আমরা অনেক আগে থেকে চেয়ে আসছি। সুযোগ আসার পরও সরকার কেন তা করছে না, তা তারাই ভালো বলতে পারবে। আমরা মনে করি, এটা না হলে বিচারটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। বিচারপ্রত্যাশী পরিবারগুলোর প্রতি অবিচার করা হবে। ৯৯ ভাগ শহীদ পরিবারই বলবে একাত্তরে তাদের স্বজনদের আলবদর, জামায়াত ও পাকিস্তানি হানাদাররা ধরে নিয়ে গেছে। ফলে কোনো বাহিনীর বিচার না করে, গুটিকয়েক ব্যক্তির বিচার করে দায়িত্ব শেষ- এটা হতে পারে না।

তিনি আরও বলেন, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে আমরা হাজারটা যুক্তি দিতে পারব। বঙ্গবন্ধু কেন জামায়াতকে নিষিদ্ধ করেছিলেন, তিনি কিন্তু তার ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন। এখন সরকার কারো কথা শুনবে না। তারা বঙ্গবন্ধুকে মানবে না, আমাদের কথা শুনবে না। হেফাজতের সঙ্গে বৈঠক করবে, তাতে কার কী করার আছে?

আর- এসএমএম / ডি- এইচএ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়