কেমন আছে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী

আগের সংবাদ

‘ওমিক্রন’ এখন দোরগোড়ায় ঝুঁকি বিবেচনা করেই ব্যবস্থা

পরের সংবাদ

ডিসেম্বর ১৯৭১ বিবিসি ডেসপাচ

ড. এম এ মোমেন

সাবেক সরকারি চাকুরে, নন-ফিকশন ও কলাম লেখক

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৪, ২০২১ , ১:৩০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ডিসেম্বর ৪, ২০২১ , ১:৩০ পূর্বাহ্ণ

শহীদ নিজামুদ্দিন আহমেদের বিবিসি প্রতিবেদন
নিজামুদ্দিন আহমেদ; বিদেশি গণমাধ্যম বিবিসির সাংবাদিক। সানডে টাইমসের বাংলাদেশ দরদি সাংবাদিক নিকোলাস টোমালিনের ভাষায়- পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দেশীয় দোসররা যে ‘এলিটোসাইড’- এলিটদের বাছাই করে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে, তা গণহত্যার চেয়েও ভয়াবহ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যখন অনিবার্য ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে, রাষ্ট্রকে অকার্যকর করার জন্য বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গনের প্রগতিশীল শ্রেষ্ঠ সন্তানদেরই নির্মূল করার তালিকা প্রণয়ন করা হয়। বিবিসির ঢাকা প্রতিনিধি নিজামুদ্দিন আহমেদ সেই তালিকাভুক্তদের অন্যতম। ১২ ডিসেম্বর, ১৯৭১, তিনি যখন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে বসেছেন, তখন তাকে তুলে নেয়া হয়। আর খোঁজ মেলেনি। তার ১ ডিসেম্বর ১৯৭১ প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হলো। অন্যান্য প্রতিবেদন বিবিসির অবাঙালি প্রতিনিধিদের পাঠানো।

১ ডিসেম্বর ১৯৭১
ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র জানিয়েছেন, ভারতীয় বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের উত্তর-পূর্বাংশের জেলা সিলেটের শমসেরনগর এয়ারপোর্ট এবং পশ্চিম সীমান্তের দর্শনা রেলওয়ে স্টেশনের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেছে। মুখপাত্র বলেন, এগোতে গিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী ধোঁকা খেয়েছে। অপর একটি উৎস থেকে জানা গেছে, গুরুতর লড়াই এড়ানো সম্ভব হয়েছে। কিন্তু ঢাকায় পাওয়া খবরে জানা গেছে, ভারতীয় বাহিনী এখনো লড়াই করে যাচ্ছে।
ইতোমধ্যে বিদ্রোহীরা, সরকারিভাবে যারা দুষ্কৃতকারী হিসেবে পরিচিত, গত ২৪ ঘণ্টায় পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী শহরের বিভিন্ন অংশে বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। বামপন্থিদের একটি রাজনৈতিক কার্যালয়েও একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে; ডানপন্থি নেতা অধ্যাপক গোলাম আযম বলেছেন, অদূর ভবিষ্যতে পাকিস্তানে একটি জাতীয় সরকার গঠিত হতে পারে। জুলফিকার আলী ভুট্টোকে এই সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। অধ্যাপক আযম দাবি জানিয়েছেন, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য জাতীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী পূর্ব পাকিস্তান থেকে নিয়োগ করতে হবে।
রামপুরা ও মালিবাগে বোমা বিস্ফোরণে বৈদ্যুতিক খুঁটি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আরমানিটোলা সরকারি বিদ্যালয় ও রহমতউল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ে দুটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটেছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এতে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঢাকার এয়ারপোর্ট রোডে পাকিস্তানি মোটর্সের কাছে একটি পেট্রোল পাম্পে বোমা বিস্ফোরিত হওয়ায় পাম্পটির অনেক ক্ষতি হওয়াসহ দুজন মানুষও জখম হয়েছে। একজনের জখম গুরুতর। মিটফোর্ড হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, কেরানীগঞ্জের কাছে গুলিবিদ্ধ দুজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ নিয়ে গুলিতে জখম ব্যক্তির সংখ্যা দাঁড়াল ৩৫-এ। এদিকে পাকিস্তান সরকারের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার এখনো শেষ হয়নি।
ঢাকা শহরে সরকার রেশন কার্ডের মাধ্যমে কেরোসিন তেল বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমি এখন একটি ন্যায্যমূল্যের দোকান দেখতে গেলাম, দেখলাম শত শত লোক দিনের কাজ ফেলে সেই ভোর থেকে মাথাপিছু এক গ্যালন কেরোসিন তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। ভোক্তাদের মতে, গ্রামাঞ্চলে বস্তুত কেরোসিন তেল পাওয়াই যাচ্ছে না। স্থানীয় পত্রিকাগুলো সম্পাদকীয়তে এই কেরোসিন সমস্যার সমাধানে সরকারের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। বাঙালি বিদ্রোহীরা চট্টগ্রামে তেলের ট্যাংকারে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তা ডুবিয়ে দেয়ার পর থেকে কেরোসিনের সংকট দেখা দিয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের ৮০ শতাংশ মানুষ সন্ধ্যার পর বাতি জ্বালাতে কেরোসিন তেল ব্যবহার করে, শহরাঞ্চলে রান্নার চুলা জ্বালাতেও কেরোসিন তেলের ব্যবহার হয়ে থাকে।
৪ ডিসেম্বর ১৯৭১
পাকিস্তান দাবি করেছে, তারা ৪৬টি ভারতীয় ফাইটার এবং বোম্বার উড়োজাহাজ ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। রেডিও পাকিস্তান বলেছে, পাঁচজন ভারতীয় পাইলট তাদের হাতে আটক হয়েছে। অন্যদিকে ভারত জানিয়েছে, তাদের ১১টি উড়োজাহাজ ধ্বংস হয়েছে এবং তারা পাকিস্তানের ৩৩টি উড়োজাহাজ ধ্বংস করেছে। এর মধ্যে করাচির একটি বিমানঘাঁটিতে অবস্থানরত নয়টি উড়োজাহাজও রয়েছে। বাকি প্রায় সব ধ্বংস হয়েছে পূর্ব পাকিস্তানে।
বিবিসির বিশেষ সংবাদদাতা বলেছেন, ঢাকা শহরের কাছের বিমানঘাঁটিতে প্রায় অবিরাম ভারতীয় আক্রমণ পরিচালিত হচ্ছে- কামানের গোলা ও রকেট বর্ষিত হচ্ছে। তিনি নিজে আকাশে গোলার আগুনে অবস্থায় থাকা দুটো উড়োজাহাজ ধ্বংস হতে দেখেছেন।
বুশ হাউস কূটনৈতিক ইউনিটের ডেসপাচ ৪ ডিসেম্বর ১৯৭১
পাকিস্তানের অবস্থা খারাপ হয়ে আসতে থাকায় যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক ডাকিয়েছে।
সারাদিনই ব্যাপক আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা চলছিল, যার ফলে নিরাপত্তা পরিষদের একটি বৈঠক আহ্বান করা সম্ভব হয়েছে। দিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ খবর হচ্ছে- জাপান, ভারত ও পাকিস্তান উভয়কেই অস্ত্র সংবরণের আহ্বান জানিয়েছে। এর আগে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে যে বার্তা পাঠিয়েছেন, এটিতে তাই প্রতিধ্বনিত হয়েছে। ব্রিটেন সংকটের সূচনালগ্ন থেকেই উভয় পক্ষের সঙ্গে প্রায়ই যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে।
যুগোসøাভিয়ার প্রেসিডেন্ট টিটো এই যুদ্ধাবস্থার কথা জানাতে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছেন এবং বিবদমান দেশ দুটোর জন্য সমাধানের পথ খোঁজার আহ্বান জানিয়েছেন। সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী আলেক্সি কোসিগিন তার উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তবে তিনি সে ধরনের মধ্যস্থতার দায়িত্ব নেয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন- ১৯৬৫ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে তাসখন্দে সমঝোতা যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছে। বলা হয়েছে, সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এবার তার পক্ষে একা উদ্যোগ নেয়া সম্ভব নয়। তার মন্তব্য অনিবার্যভাবে জাতিসংঘের সম্পৃক্ততার দাবি জানায় এবং নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকের সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত দেয়। ভারত বা পাকিস্তান কেউই এ ধরনের উদ্যোগে আগ্রহী নয়। তবে বৃহৎ শক্তির মধ্যে মনে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিকভাবে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেট রজার্স তার আইসল্যান্ড সফর বাতিল করেছেন। জানা গেছে, অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন এবং জাপান ও আরো কয়েকটি দেশকে সঙ্গে নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। এর পেছনে অবশ্যই ব্রিটেনের সমর্থন রয়েছে, তাদের কূটনীতিকরা পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠানের তাগিদ দিয়ে যাচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রী কোসিগিনের মন্তব্য থেকে আভাস পাওয়া যায়, সোভিয়েত ইউনিয়নও নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক চাচ্ছে। প্রশ্নবোধক একটি বিষয় থেকে যাচ্ছে- বৈঠকে রুশদের মতের সঙ্গে চীনাদের সংঘর্ষের ঝুঁকি। ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার মৈত্রী চুক্তি রয়েছে। অন্যদিকে চীন সম্প্রতি জাতিসংঘকে জানিয়ে দিয়েছে, নিরাপত্তা পরিষদে তাদের অবস্থানে থেকে তারা পাকিস্তানকে সমর্থন করতে প্রতিশ্রæতিবদ্ধ।
(বিবিসির এই ডেসপাচটি লিখেছেন টনি পেইন্টিং)

৬ ডিসেম্বর ১৯৭১
ভারত পূর্ব পাকিস্তানের গভীরে একচেটিয়া সাফল্যের দাবি জানিয়েছে। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে। ভারতীয় সামরিক মুখপাত্র জানিয়েছেন, তাদের বাহিনী ১৫টি অবস্থান থেকে চাপ প্রয়োগ করে চলেছে। পশ্চিম রণাঙ্গনেও তারা বিজয় দাবি করেছেন। অবশ্য পাকিস্তান উভয় রণাঙ্গনেই তাদের বিশেষ করে বিমানবাহিনীর সাফল্যের কথা বলেছে। আরো জানিয়েছে, তাদের বাহিনীর পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ভারত বলেছে, বিভিন্ন রণাঙ্গনে তীব্র লড়াই চলছে এবং সৈন্যরা ঢাকার দিকে এগোচ্ছে। একজন সামরিক মুখপাত্র বলেছেন, ঢাকা ও যশোরের মধ্যকার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। বোমাবাহী উড়োজাহাজ ঢাকায় সৈন্যঘন অঞ্চলগুলোতে আক্রমণ করে যাচ্ছে। ঢাকার বিমানঘাঁটিও অচল করার দাবি তিনি জানিয়েছেন। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও চালনা বন্দরের স্থাপনাও আক্রান্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন।

৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১
ঢাকার আকাশে একদিনের বিমানযুদ্ধ ও ডগ ফাইটের পর গতকাল বিকেল থেকে আজানের সময় পর্যন্ত বিমানবন্দরে আর কোনো আক্রমণের খবর পাওয়া যায়নি। গত রাতে স্থানীয় সময় আড়াইটায় ভারতীয় বিমানবাহিনী ঢাকা শহরের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। ঢাকার শহরতলি থেকে আমিও বোমার শব্দ শুনতে পেয়েছি। তবে কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সূত্রেও জানা গেছে, ভারতীয় বাহিনীর রণাঙ্গন এখন কুমিল্লার আখাউড়া, ময়মনসিংহের কামালপুর এবং উত্তরাঞ্চলে দিনাজপুর পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। সূত্র জানাচ্ছে, পাকিস্তানি বাহিনী ভারতের সৈন্যদের আক্রমণ প্রতিহত করেছে।
ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ এবং পূর্ব পাকিস্তানের বন্দরনগরী চট্টগ্রামে সকাল-সন্ধ্যা কারফিউ জারি রয়েছে এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউট পালন অব্যাহত রাখা হয়েছে। ঢাকার সঙ্গে বাইরের এলাকাগুলোর সব ধরনের যোগাযোগ রহিত হয়েছে, স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্পূর্ণভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ভারতীয় বাহিনীর আকাশপথ ও স্থলপথে আক্রমণ অব্যাহত থাকায় দোকানপাট, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক এবং অন্যান্য দপ্তর বন্ধ রাখা হয়েছে। ঢাকা টেলিভিশন গত রাতের সংবাদে ঢাকা বিমানঘাঁটিতে ভারতীয় আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত বিমানবাহিনীর উড়োজাহাজ এবং আটক পাইলটকে দেখানো হয়েছে। যুদ্ধের বড় খবরসহ যথারীতি সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছে।

৮ ডিসেম্বর ১৯৭১
ভারতীয় সামরিক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ভারতীয় বাহিনী ঢাকা থেকে প্রায় ৩০ মাইল দূরে কুমিল্লা বিমানঘাঁটি দখল করে নিয়েছে। তারা কুমিল্লা শহরসহ অন্যান্য দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ঢাকা রেডিও পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন অংশে তীব্র লড়াইয়ের কথা স্বীকার করেছে। রেডিও বলেছে, প্রচণ্ড ভারতীয় চাপ সত্ত্বেও পাকিস্তান সেনাবাহিনী লাকসাম ধরে রেখেছে, রংপুর ও দিনাজপুরে ভারতীয় বাহিনীর অগ্রগতির প্রচেষ্টা অবিরাম ঠেকিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা রেডিও বলেছে, সিলেটে হেলিকপ্টারবাহিত ছত্রীসেনাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে।
অল ইন্ডিয়া রেডিও বলেছে, পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ভারতীয়রা চারশ পাকিস্তানি সৈন্যকে হত্যা করেছে এবং আঠারোশ পাকিস্তানি সৈন্য কারারুদ্ধ করেছে।

ঢাকা থেকে ডেসপাচ ৮ ডিসেম্বর ১৯৭১
পাকিস্তানে যে একটি জাতীয় সরকার গঠন করা হয়েছে, পূর্ব পাকিস্তানে তা তেমন প্রচারিত না হওয়ায় সেখানকার প্রতিক্রিয়া তেমন জানা সম্ভব হয়নি।
একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, দ্বৈত ভূমিকা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপ-প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী জুলফিকার আলী ভুট্টোই হবেন সরকারের নির্ভরযোগ্য নেতা। যদিও নুরুল আমিনকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়েছে, তার বয়স ৭৮ বছর, যদিও তিনি বয়সের তুলনায় দুর্বল নন, স্পষ্টত ভুট্টো সাহেবের শক্তি ও কর্মক্ষমতা বেশি।
ভারতের ব্যাপারে ভুট্টো সাহেব বরাবরই সমঝোতাহীন অনমনীয় ভূমিকা পালন করে এসেছেন। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে তিনি নিঃসন্দেহে উৎসাহিত হবেন যে, পাকিস্তান কাশ্মিরের অনেকটাই অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েছে। সন্দেহ নেই, পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রকৃত অবস্থা তাকে অবহিত করা হয়েছে। নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকরা এখন গত মাস তিনেক ধরে পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো নির্দিষ্ট আলোচনাবৃত্তের সার কথাটিই বিবেচনা করছেন- যুদ্ধে এখান থেকে হাজার মাইল দূরের পূর্ব পাকিস্তানকে যুদ্ধের সময় ভারতের হাত থেকে রক্ষার কঠিন চেষ্টা না করে এবং পশ্চিমাংশে সমপরিমাণ সীমান্ত বৃদ্ধির দর-কষাকষি করা উত্তম- এটিরই তাত্ত্বিক রূপ দিতে চেষ্টা করা হচ্ছে।
এই যুক্তিটি কার্যকর হতে পারে যদি বিশ্বের চাপে বৈরিতার অবসান ঘটে, যেমনটি ঘটেছিল ১৯৬৫-এর যুদ্ধে। কিন্তু এবার এ পর্যন্ত অস্ত্রবিরতি নিশ্চিত করার পর উদ্বেগ ব্যর্থ হয়েছে।
কিন্তু এখনো পূর্ব পাকিস্তানের ভোগান্তি অব্যাহত রয়েছে। এটা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আজ শনিবার ভোরে আদমজী পাটকলের শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকায় ভারতীয় বোমারু বিমান থেকে চারটি বোমা বর্ষিত হয়, একটির বিস্ফোরণ ঘটেনি। অপর তিনটি ৬০০ বর্গ গজেরও বেশি এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটিয়েছে। শ্রমিকদের নিতান্ত সাধারণ বাসস্থান উড়িয়ে দেয়াসহ বোমাবর্ষণে আনুমানিক ৫০০ মানুষ নিহত হয়েছে এবং ধ্বংসাবশেষের নিচে পড়ে আছে আরো প্রায় আড়াইশ জন। ধ্বংসাবশেষ খালি হাতে সরিয়ে শ্রমিকরা তাদের উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

১০ ডিসেম্বর ১৯৭১
আমাদের সংবাদদাতা জানিয়েছেন, চাম্ব রণাঙ্গনে ভারতীয় রাষ্ট্র সীমানার প্রায় ৫০ বর্গমাইল জায়গা পাকিস্তানি দখলে চলে গেলে ভারত একে একটি সাময়িক অবস্থা বলে বিবেচনা করছে। তারা বলেছে, চাম্ব সেক্টরের উত্তরদিকে তারা পাকিস্তানিদের ঠেলে অনেক ভেতরে পুরনো অস্ত্রবিরতি রেখা পর্যন্ত নিয়ে গেছে।
পূর্ব পাকিস্তানে কোথাও কোথাও ভারতীয় বাহিনী তীব্র প্রতিরোধের মুখোমুখি হচ্ছে। তবে তারা দাবি করেছে, হেলিকপ্টার এবং স্টিমার ব্যবহার করে ভারতীয় সৈন্যদের মেঘনা নদী পার হয়ে ঢাকা থেকে উত্তর-পূর্বে ৪৫ মাইল দূরে ঢাকা আক্রমণের জন্য তৈরি হয়েছে। এখান থেকে তাদের মতে ঢাকা যথেষ্ট হুমকির মুখোমুখি, কারণ মাঝখানে তাদের অগ্রগতিতে আর কোনো প্রাকৃতিক বাধা নেই। দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্বদিক থেকে রাজধানীমুখী ভারতীয় বাহিনী কয়েকটি নদী পেরোতে হবে বলে তাদের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষার মোকাবিলা করতে হবে। রাজধানীতে ঢাকা রেডিও স্টেশনের প্রচারণা কিছু সময় বন্ধ ছিল। ভারতীয়রা বলছে, রেডিও ট্রান্সমিটারের ওপর ভারতীয় উড়োজাহাজের আক্রমণের কারণে এটা ঘটেছে।

ড. এম এ মোমেন : সাবেক সরকারি চাকুরে, নন-ফিকশন ও কলাম লেখক।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়