অস্ত্রের ঝনঝনানি আজো বন্ধ হয়নি পাহাড়ে

আগের সংবাদ

ব্যালন ডি'অর জয়ের পরেই ব্যর্থ মেসি, জয়হীন পিএসজি

পরের সংবাদ

পার্বত্য শান্তিচুক্তির ২ যুগ পূর্তি: শান্তি প্রতিষ্ঠা কত দূর?

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২, ২০২১ , ৯:৪১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ডিসেম্বর ২, ২০২১ , ১১:৩৪ পূর্বাহ্ণ

এ কথা অনস্বীকার্য যে, শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর পাল্টে গেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি। দুই যুগ আগে অর্থাৎ ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম-সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি ও পাবর্ত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার ২৪ বছর পর পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন অন্য রকম এলাকা। মানুষের জনজীবনে ফিরে এসেছে স্বাভাবিক অবস্থা, পাল্টে গেছে জীবনধারা। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এসেছে প্রাণচাঞ্চল্য, পাহাড়ি-বাঙালির জীবনে লেগেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া।

এসব ইতিবাচক দিকের মধ্যেও যে প্রশ্নটি সবার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে, তা হলো চুক্তির দুই যুগ পরেও পুরোপুরি শান্তি প্রতিষ্ঠা কেন হলো না, কেন এখনো সংঘাতের ঘটনা ঘটছে? চাঁদাবাজি কী কারণে বন্ধ করা গেল না? শান্তি প্রতিষ্ঠায় অন্তরায়গুলো কী? কারা শান্তি চায় না? কারা এ ধরনের পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে। চুক্তি স্বাক্ষরের দুই যুগ পর এমন একটি মূল্যায়নের বোধহয় সময় এসেছে।

কিছু নিতান্তই দুর্গম এলাকা বাদ দিলে ছোট ছোট বাড়ির ছাদে দেখা যাবে ‘আকাশ’, ডিশ এন্টেনা, টেলিভিশনের রঙিন বাক্স কিংবা মোবাইল ফোনে পরিবর্তিত জীবন। রঙিন পোশাকে লাইন ধরে স্কুলে যাচ্ছে ছোট্ট শিশুরা। বাজার-ঘাটে ঘুরলেই দেখা যায়, নগরজীবনের ছোঁয়া এসেছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। অথচ এমন একটা সময় ছিল- বিকাল ৪টায় নেমে আসত মধ্যরাতের অন্ধকার। চলাচল বন্ধ, শঙ্কা আর আতঙ্ক চারদিকে। গুলি আর পাল্টা গুলির শব্দ রাতভর। ২ যুগে সময়টা পাল্টেছে। অন্ধকারে এখন আলোর ছোঁয়া। উন্নয়নের আলোকস্পর্শ পাল্টে দিয়েছে সব কিছু।

এত কিছুর পরও পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি চায় না, এমন গোষ্ঠীর অভাব নেই। চাঁদাবাজি, অপহরণ, অস্ত্র, মাদক চোরাচালানে লিপ্ত আছে একটি গোষ্ঠী। কর্তৃপক্ষের মতে, প্রতি বছর প্রায় ৪০০ কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয় পার্বত্য এলাকায়। ব্যবসা চালাতে গেলেই চাঁদা দিতে হয় সবাইকে। এই চাঁদাবাজি এতটাই নীরবে চলে যে, কেউ স্বীকার করতে চায় না। অনেকটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে গেছে। ক্ষুদ্র দোকানদার থেকে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী বা সাধারণ চাকরিজীবী, কেউ রেহাই নেই। কিন্তু প্রকাশ্যে কেউ স্বীকার করে না। পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর এই চুক্তির বিরোধিতাকারী বিভিন্ন গোষ্ঠী এখন চাঁদাবাজিতে লিপ্ত। চুক্তি স্বাক্ষরকারী জনসংহতি সমিতি এখন ভেঙে দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে। জনসংহতি সমিতি (সংস্কার) নামে নতুন একটি সংগঠনের জন্ম হয়েছে। তাদের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে প্রতিনিয়তই প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। অন্যদিকে চুক্তির বিরোধিতাকারী ইউপিডিএফও ভেঙে দুই টুকরো। এই চার গ্রুপের সংঘাত ছড়িয়েছে একেবারে দুর্গম এলাকা পর্যন্ত। সংঘাতে প্রাণ যাচ্ছে অনেক মানুষের, যারা যুক্ত বিভিন্ন গ্রুপে।

চুক্তি স্বাক্ষরের দুই যুগ পরও কেন শান্তি প্রতিষ্ঠা হলো না, তা নিয়ে কোনো সমাজতাত্ত্বিক গবেষণা পাওয়া না গেলেও এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, শান্তি প্রতিষ্ঠা হলে একটি পক্ষের চাঁদাবাজি বন্ধ হয়ে যাবে। তারা চায় না শান্তি প্রতিষ্ঠা হোক। তাই সংঘাত অব্যাহত রাখছে নানা অজুহাতে। পার্বত্য এলাকা ভূমি হিসেবে দেশের এক-দশমাংশ হলেও ২০১১ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, এই এলাকার জনসংখ্যা মাত্র ১৬ লাখের কিছু বেশি। পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর সংখ্যানুপাত প্রায় সমান। বিগত ২৪ বছরে সরকার বিপুল অঙ্কের টাকা খরচ করেছে এই এলাকায় জীবনমান উন্নয়নে। কর্মকর্তারা বলছেন, পার্বত্য অঞ্চলে শিক্ষার হার সমতলের চেয়ে বেশি। সমতলে যেখানে এনরোলমেন্ট ৭৬ শতাংশ, পাহাড়ে সেটা ৯৪ শতাংশের বেশি। টিকাদান কর্মসূচিসহ নানা সামাজিক কর্মসূচিতে এগিয়ে আছে পার্বত্য এলাকা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন সড়ক নির্মাণসহ নানা উন্নয়ন প্রকল্প বদলে দিয়েছে পাহাড়ের দৃশ্যপট। একটি সড়ক পাল্টে দিয়েছে পুরো সাজেক এলাকা। তৈরি হয়েছে দার্জিলিংয়ের মতো একটি পর্যটন এলাকা। সেখানে আছে ২০০টির বেশি ছোট ছোট হোটেল, যাতে কর্মসংস্থান হয়েছে হাজার হাজার পাহাড়ি-বাঙালির। যোগাযোগ ব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন জীবন পাল্টে দিচ্ছে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর।

রাঙ্গামাটির নানিয়াচরে একটি নবনির্মিত সেতু স্থানীয় জনগণের ভোগান্তি কমিয়েছে অনেক। কয়েক হাজার কোটি টাকা খরচ করে নির্মিত হচ্ছে সীমান্ত সড়ক, যা পাল্টে দেবে পুরো সীমান্ত এলাকার অন্ধকার দুর্গম অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জীবন। অপূর্ব সৌন্দর্যের লীলাভূমি পার্বত্য অঞ্চলে তৈরি হবে পর্যটনের সম্ভাবনা, যেভাবে তৈরি হয়েছে মেঘ আর পাহাড়ের অপূর্ব সৌন্দর্যের নীলগিরি কিংবা সাজেক, বগা লেক আর শুভলংয়ে জলের প্রপাত।

এত পরিবর্তন সত্ত্বেও চাঁদাবাজি ও অস্ত্রের ঝনঝনানি বাধা সৃষ্টি করছে একটি পরিকল্পিত উন্নয়নের। প্রশাসনের অভিযোগ, শান্তিচুক্তির ৭২টি ধারার ৪৮টি পূর্ণাঙ্গ ও ১৫টির আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে। ৯টি ধারা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন আছে। অন্যদিকে চুক্তি অনুযায়ী সব সশস্ত্র গোষ্ঠীর অস্ত্র সমর্পণ করার কথা থাকলেও তা কার্যত বাস্তবায়ন হয়নি। এখনো এসব সশস্ত্র গোষ্ঠী ব্যবহার করছে স্বয়ংক্রিয় অত্যাধুনিক অস্ত্র। বরং চুক্তি সম্পাদনকারী জনসংহতি সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠন দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে সশস্ত্র সংঘাত ও চাঁদাবাজিতে লিপ্ত। পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। শিক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রেখে পাহাড়ের সব জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নত করতে হবে।

ভূমি সংকট অন্যতম একটি সমস্যা পার্বত্য অঞ্চলের। দীর্ঘ ২ যুগেও এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হয়নি। ফলে সংকট থেকে গেছে। জটিল থেকে জটিলতর এই সংকট। ভূমির মালিকানার জটিলতায় বিভিন্ন সংঘাত ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু কোনো পক্ষ একটি কার্যকর সমাধান তৈরি করতে পারেনি। ৫০ বছর বয়সী বাংলাদেশে শান্তিচুক্তির বয়স প্রায় অর্ধেক। সবাইকে বাস্তবতা মেনে নিয়ে সংকট সমাধানে উদ্যোগী হতে হবে- এমন মতামত সবার। পাহাড়ের সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য যেমন রক্ষা করা দরকার, তেমনি পাহাড়ে বাঙালির অস্তিত্ব এখন অনিবার্য সত্য। এটা মেনে নিয়েই সংকট সমাধানে উদ্যোগ নিলে সমাধানের সূত্র খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়।

ডি-এফবি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়