কুমিল্লায় কাউন্সিলরসহ জোড়া খুনের প্রধান আসামি ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত

আগের সংবাদ

পার্বত্য শান্তিচুক্তির ২ যুগ পূর্তি: শান্তি প্রতিষ্ঠা কত দূর?

পরের সংবাদ

পার্বত্য শান্তিচুক্তির দুই যুগ পূর্তি

অস্ত্রের ঝনঝনানি আজো বন্ধ হয়নি পাহাড়ে

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২, ২০২১ , ৯:২৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ডিসেম্বর ২, ২০২১ , ৯:২৭ পূর্বাহ্ণ

আস্থা ও অবিশ্বাসের দোলায় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দুই যুগেও পাহাড়ে আজো শান্তি আসেনি। বন্ধ হয়নি রক্তপাত, হানাহানি। জিম্মি হয়ে পড়েছে পাহাড়ের কয়েক লাখ মানুষ। প্রতিনিয়ত পাহাড়ে বারুদ ও লাশের গন্ধে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। চুক্তির ২ যুগ পরও পাহাড়ে আঞ্চলিক দলের একাধিক সশস্ত্র গ্রুপের মধ্যে প্রতিনিয়তই ঘটছে সংঘাত। পড়ছে একের পর এক লাশ। কারো মায়ের বুক খালি হচ্ছে, সন্তান হারা হচ্ছেন মা-বাবা, কেউ বাবাকে হারিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছে। তারপরও কেউ মুখ খুলতে পারছে না।

সর্বশেষ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দুই যুগ পূর্তির ২ দিন আগে গত মঙ্গলবার রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার বন্দুকভাঙ্গার চিকিং এলাকায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির আঞ্চলিক সামরিক কমান্ডার আবিষ্কার চাকমাকে গুলি চালিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ। পার্বত্য অঞ্চলে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর দ্বন্দ্ব ও সংঘাতে গত ২৪ বছরে প্রাণ গেছে ৭ শতাধিক মানুষের। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫ শতাধিক নেতাকর্মী হারিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজিসহ সাত কারণে সংঘর্ষের এসব ঘটনা ঘটছে বলে মনে করছেন স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশ করা পিসিজেএসএস বর্তমানে জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার নেতৃত্বে এবং ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর আত্মপ্রকাশ করা ইউপিডিএফ চলছে প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি প্রসিত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে। এরপর ২০১০ সালে আঞ্চলিক দুটি বড় দল ভেঙে রূপ নেয় জেএসএস সংস্কার গ্রুপ এবং ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক গ্রুপ। ২০১৯ সালে নতুন আরেকটি সংগঠন মগ পার্টি নামে আত্মপ্রকাশ করে। তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন এলাকা নিয়ে এই সংগঠনগুলো নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পাহাড়ে প্রতিনিয়ত সংঘাত লাগিয়ে রাখছে।

পিসিজেএসএসের (সন্তু লারমা) দুই শতাধিক এবং ইউপিডিএফ (প্রসিত) গ্রুপের তিন শতাধিক নেতাকর্মী প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হয়েছেন বলে সংগঠন দুটির নেতারা দাবি করেন। অন্যদিকে ২০১০ সালে আত্মপ্রকাশ করা পিসিজেএসএস (এমএন লারমা) গ্রুপের দাবি, তাদের ৬৬ জন এবং ২০১৮ সালে আত্মপ্রকাশ করা

ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) ৭ নেতাকর্মী এ পর্যন্ত সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্বে ৩০ জনেরও বেশি সাধারণ লোক প্রাণ হারিয়েছেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে জাতীয় ও রাজনৈতিক চিহ্নিত করে এর স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে ঐতিহাসিক এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়- যেটি ‘পার্বত্য শান্তিচুক্তি’ হিসেবে সার্বজনীন স্বীকৃতি লাভ করে। কিন্তু চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্তাবলি আজো অবাস্তবায়িত। বর্তমানে চুক্তির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় বিরাজ করছে স্থবিরতা। ফলে পাহাড়ের পরিস্থিতি দিন দিন জটিলতার দিকে এগোচ্ছে বলে মন্তব্য সাধারণ থেকে শুরু করে স্থানীয় বিভিন্ন মহলের।

পার্বত্য চুক্তির দুই যুগ পরে এসেও পাহাড়ের মানুষের মাঝে আস্থা ও অবিশ্বাসের ভিত দিন দিন বাড়ছে। পাহাড়ের সাধারণ মানুষ পার্বত্য চুক্তির পক্ষে-বিপক্ষে মত দিয়েছেন। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য একটি পক্ষ বললেও অপর পক্ষ পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের আগে পাহাড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধ এবং প্রত্যাহারকৃত সেনা ক্যাম্পগুলো পুনঃস্থাপন করে পাহাড়ে শান্তি ফিরিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছে।

জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার এমপি বলেন, চুক্তি বাস্তবায়ন হচ্ছে যেমন সত্য, তেমনি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি সেটাও সত্য। পাহাড়ের মানুষের মধ্যে চুক্তি নিয়ে যে অবিশ্বাস কাজ করছে তা দূর হতে হবে। চুক্তির ২৪ বছরে পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্রধারী ও সন্ত্রাসীদের হাতে সবচেয়ে বেশি লোক মারা গেছে ক্ষমতাসীন দলের। তিনি বলেন, সরকার ও জেএসএসের মধ্যে সন্দেহ জমেছে সেটা পরিহার করে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায়ের মাধ্যমে চুক্তি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। আমরা বারবার দাবি দিয়ে আসছি, পাহাড় থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। জেএসএস একদিকে চুক্তির কথা বলছে অন্যদিকে দিন-রাত মানুষ খুন করছে। তাই আসুন শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে চুক্তির বাকি ধারাগুলো বাস্তবায়ন করি।

সরকারের পক্ষে বলা হচ্ছে, চুক্তির ৭২ ধারার ৪৮টি এরই মধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। বাকি ধারাগুলো বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।

পার্বত্য শান্তিচুক্তির ২৪তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিসহ তিন পার্বত্য জেলায় সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এ উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। রাঙ্গামাটিতে জনসংহতি সমিতির উদ্যোগে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। ‘পার্বত্য চুক্তি ও জুম্মস্বার্থ পরিপন্থি সব কার্যক্রম প্রতিরোধে এবং জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে জুম্ম ছাত্র ও যুবসমাজকে অধিকতর শামিল হওয়ার’ আহ্বানে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহসভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য ঊষাতন তালুকদার। এছাড়া আলোচনা সভার আয়োজন করেছে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং ৩ ডিসেম্বর আলোচনা সভা করবে জেলা আওয়ামী লীগ।

ডি-ইভূ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়