সহিংসতার মধ্যেই ১ হাজার ইউপিতে ভোট শুরু

আগের সংবাদ

আবরার হত্যা: ২২ আসামি আদালতের হাজতখানায়

পরের সংবাদ

সাবেক ডিসি সুলতানা পারভীনকে মাফ করে দিলেন রাষ্ট্রপতি

আমি কী প্রতিকার পেলাম: রিগ্যান

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৮, ২০২১ , ৮:৪৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২৮, ২০২১ , ৯:৩১ পূর্বাহ্ণ

মধ্যরাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে বাংলা ট্রিবিউন ও ঢাকা ট্রিবিউনের জেলা প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম রিগ্যানকে কারাদণ্ড দেয়ায় কুড়িগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) সুলতানা পারভীনকে দেয়া ‘লঘুদণ্ড’ মাফ করে দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ। এর ফলে সুলতানা পারভীনের বেতন বাড়ানো দুই বছরের জন্য স্থগিত রাখার যে ‘লঘুদণ্ড’ সাড়ে তিন মাস আগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় দিয়েছিল, তা বাতিল করে অভিযোগের দায় থেকেও তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

তবে সাবেক ডিসি সুলতানা পারভীন মাফ পেয়ে পার পেলেও কুড়িগ্রামের তৎকালীন রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর (আরডিসি) নাজিম উদ্দিন, এনডিসি এস এম রাহাতুল ইসলাম ও সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমার শাস্তির বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত করেনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। শুধু কুড়িগ্রামের তৎকালীন রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর (আরডিসি) নাজিম উদ্দিনের পদাবনতির সুপারিশ করা হয়েছে। এনডিসি এস এম রাহাতুল ইসলামের তিন বছর বেতন বাড়বে না। এছাড়া, সেই রাতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালন করা সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমাকে চাকরিচ্যুত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ডিসি সুলতানা পারভীন রাষ্ট্রপতির কাছে মাফ পাওয়ায় অন্য কর্মকর্তারাও মাফ চেয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করবেন। তবে আরডিসি নাজিম উদ্দিনের ক্ষেত্রে সম্ভবত মাফ করা সম্ভব হবে না, কারণ তার বিরুদ্ধে দুদকের মামলা চলছে। বর্তমানে ডিসি সুলতানাকে জনপ্রশাসনে ন্যস্ত করা হলেও কোনো পদে দায়িত্ব দেয়া হয়নি। আরডিসি নাজিম উদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে রাহাতুল ইসলাম বর্তমানে বরিশাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সহকারী কমিশনারের দায়িত্বে রয়েছেন। রিন্টু বিকাশ চাকমাও এখন কোনো দায়িত্বে নেই।

জানতে চাইলে সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগ্যান বলেন, রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের অভিভাবক। তিনি আমার বিষয়টিও দেখতে পারতেন। অপরাধটা আমার সঙ্গে হয়েছে, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আমি। দণ্ড বাতিল করার অর্থ হচ্ছে, অপরাধটা আমার সঙ্গে হয়নি। এটা আমি মেনে নিতে পারছি না। আমি হতাশ। তাহলে কী প্রতিকার পেলাম আমি- এমন প্রশ্ন জানিয়ে তিনি বলেন, লঘু শাস্তি দেয়ায় এমনিতেই আমি সংক্ষুব্ধ ছিলাম। সেই লঘু শাস্তিটাও যখন বাতিল হয়ে যায়, তখন আসলে আর কোনো আশার আলো দেখছি না। তিনি বলেন, নিরাপরাধ হয়েও শাস্তি ভোগ করার প্রমাণ আমি আর অপরাধী প্রমাণিত হওয়ার পরও শাস্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার উদাহরণ হচ্ছে ডিসি সুলতানা ও তার সহকর্মী চারজন। তবে মামলাটি

হাইকোর্টে আছে, সেখানে তিনি ন্যায়বিচার পাবেন বলে আশাবাদী। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) আইন ও এর বিধিমালা নিয়ে প্রশ্ন তুলে রিগ্যান বলেন, সরকারি কর্মচারীরা লাগামহীনভাবে অপরাধ করবেন, আর শাস্তির বেলায় সে অপরাধ উপেক্ষা করা হবে- আমি মনে করি এ আইন ও বিধি সংবিধান পরিপন্থি। জনগণের টাকায় যাদের বেতনভাতা হয়, তারা আইনগত বিশেষ সুবিধা পেলে সেটা সংবিধান পরিপন্থি বলে আমি মনে করি।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আদেশে যা বলা হয়েছে : ওএসডি হয়ে থাকা উপসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা সুলতানা পারভীনের শাস্তির আদেশ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এসেছিল গত ১০ আগস্ট এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে। সেই প্রজ্ঞাপন বাতিল করে গত ২৩ নভেম্বর আরেকটি প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, সেখানেই সুলতানা পারভীনের শাস্তি বাতিলের বিষয়টি জানানো হয়।

সিনিয়র সচিব কে এম আলী আজম স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, যেহেতু মোছা. সুলতানা পারভীন তার ওপর আরোপিত উল্লিখিত লঘুদণ্ডাদেশ মওকুফের জন্য গত ৬ সেপ্টেম্বর মহামান্য রাষ্ট্রপতির সমীপে আপিল আবেদন পেশ করলে মহামান্য রাষ্ট্রপতি সদয় হয়ে মোছা. সুলতানা পারভীনের আপিল আবেদন বিবেচনা করে পূর্বে প্রদত্ত দুই বছরের জন্য ‘বেতন বৃদ্ধি স্থগিত রাখা’ নামীয় দণ্ডাদেশ বাতিল করে তাকে অভিযোগের দায় হতে অব্যাহতি প্রদান করেছেন। সেহেতু মোছা. সুলতানা পারভীন, সাবেক জেলা প্রশাসক, কুড়িগ্রাম, বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (উপসচিব), জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে রুজুকৃত বিভাগীয় মামলায় দুই বছরের জন্য বেতন বৃদ্ধি ‘স্থগিত রাখা’ নমনীয় লঘুদণ্ড প্রদান করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গত ১০ আগস্টের প্রজ্ঞাপনটি বাতিলপূর্বক তাকে অভিযোগের দায় থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হলো।

যা ঘটেছিল সেদিন : বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম রিগ্যানকে গত বছরের ১৩ মার্চ গভীর রাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে মাদক রাখার অভিযোগে এক বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমা ওই অভিযান পরিচালনা করেন। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার নাজিম উদ্দিন এবং সহকারী কমিশনার এস এম রাহাতুল ইসলামও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। কুড়িগ্রামের ওই সময়কার ডিসি সুলতানা পারভীনের নির্দেশেই আরিফুল ইসলামকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেয়া হয় বলে আরিফুলের পরিবারের অভিযোগ করেন।

বিসিএস ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তা সুলতানা কুড়িগ্রাম শহরের একটি সরকারি পুকুর সংস্কারের পর নিজের নামানুসারে ওই পুকুরের নাম ‘সুলতানা সরোবর’ রাখতে চেয়েছিলেন জানিয়ে বাংলা ট্রিবিউনে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন রিগ্যান। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের ১০ মাস পর জেলা প্রশাসন আরিফুলের বাড়িতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে তাকে সাজা দেয়। ওই ঘটনা তুমুল সমালোচনার জন্ম দেয়, বিষয়টি হাইকোর্টেও গড়ায়। পরে রিগ্যানকে জামিন দেয় কুড়িগ্রামের আদালত। মুক্তি পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন রিগ্যান। সেখানে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘হাত ও চোখ বাঁধা’ অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার পর তাকে ‘বিবস্ত্র করে অমানুষিক নির্যাতন’ করা হয়। চোখ বেঁধে তার কাছ থেকে স্বাক্ষরও নেয়া হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর ডিসি সুলতানা পারভীন, আরডিসি নাজিম উদ্দিন, সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমা ও এস এম রাহাতুল ইসলামকে কুড়িগ্রাম থেকে সরিয়ে দেয় সরকার। পরে ২০২০ সালের ১৯ মার্চ ডিসি সুলতানা পারভীন, সাবেক তিনজন সহকারী কমিশনারসহ ৩৫-৪০ জনের বিরুদ্ধে কুড়িগ্রাম সদর থানায় অভিযোগ দায়ের করেন সাংবাদিক আরিফুল। হাইকোর্ট ওই অভিযোগ মামলা হিসেবে রেকর্ডের নির্দেশ দেয়ার পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালতে তাকে দেয়া সাজা স্থগিত করে। এরপর ২৬ মার্চ সুলতানা পারভীনসহ তার কার্যালয়ের সাবেক তিনজন সহকারী কমিশনারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়।

সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালায় ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ‘কারণ দর্শাও’ নোটিস দিলে সুলতানা পারভীন লিখিত জবাব দাখিল করে ব্যক্তিগত শুনানি চান। ওই বছরের ৯ আগস্ট শুনানিতে হাজির হয়ে তিনি যে মৌখিক বক্তব্য ও লিখিত জবাব দেন, তা ‘সন্তোষজনক বিবেচিত না হওয়ায়’ বিভাগীয় মামলাটি তদন্তের জন্য তদন্ত বোর্ড গঠন করা হয়। ওই তদন্ত বোর্ডের আহ্বায়ক ছিলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আলী কদর। বোর্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়, সুলতানা পারভীনের বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণের’ অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২৩ নভেম্বরের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, তদন্ত বোর্ডের প্রতিবেদন এবং অন্যান্য কাগজপত্র পর্যালোচনা করে সুলতানা পারভীনকে গুরুদণ্ড দেয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়। এরপর চলতি বছরের ৮ জুন তাকে দ্বিতীয় কারণ দর্শাও নোটিস দেয় মন্ত্রণালয়। সুলতানা পারভীন ২২ জুন লিখিতভাবে তার জবাব দেন। সব বিচার-বিশ্লেষণ শেষে ১০ আগস্ট তাকে বেতন বৃদ্ধি দুই বছরের জন্য স্থগিত রাখার ‘লঘুদণ্ড’ দেয়া হয়। সেই লঘুদণ্ডের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করেছিলেন সুলতানা পারভীন। রাষ্ট্রপতি তা গ্রহণ করে অভিযোগের দায় থেকে তাকে অব্যাহতি দিলেন।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়