স্বাধীনতার পঞ্চাশে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে

আগের সংবাদ

সহিংসতার মধ্যেই ১ হাজার ইউপিতে ভোট শুরু

পরের সংবাদ

যানবাহন চলাচলে উন্মুক্ত হচ্ছে পদ্মা সেতু : ঐতিহাসিক কারণেই ৩০ জুনের বদলে ২৩ জুন করুন

আহমেদ আমিনুল ইসলাম

অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৮, ২০২১ , ১২:৫৮ পূর্বাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২৮, ২০২১ , ১২:৫৮ পূর্বাহ্ণ

বাঙালির স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায়ে। ‘ফিনিশিং টাচ’-এর কাজ বাকি এখন। তাই এই সেতু উদ্বোধনের সময়ও ঘনিয়ে আসছে। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি এই সেতুর ওপর দিয়ে প্রমত্তা পদ্মা পার হওয়ার দৃশ্য অবলোকনের জন্য। কী আবেগঘন হবে সেই পারাপার! পদ্মা সেতু নিয়ে কত গাল-গল্প, কত কিস্সা-কাহিনী! দেশের এক শ্রেণির মানুষ এবং বিশেষ একটি রাজনৈতিক মহল সর্বোপরি সেই চিহ্নিত দলটির সর্বোচ্চ ব্যক্তিত্বটিও পদ্মা সেতু নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপে মশগুল হয়েছিলেন। বিদেশেও তারা নানা রকমের দূতিয়াল নিযুক্ত করেছিলেন, নিযুক্ত করেছিলেন আন্তর্জাতিক মানের ‘লবিং’ প্রতিষ্ঠানও। যাতে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থ প্রদান না করে! রাজনীতির বাইরের সুশীল সমাজেরও কোনো কোনো খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যাতে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন না ঘটে সেই চেষ্টাই করেছেন। ষড়যন্ত্রকারী বিভিন্ন গোষ্ঠীর তৎপরতায় দেশ-বিদেশে মুখরোচক আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছিল পদ্মা সেতুর কথিত দুর্নীতি (!)। ‘চিলে কান নিয়ে গেছে’ গল্পের সার্থক প্রতিচিত্র ছিল পদ্মা সেতু সম্পর্কিত দুর্নীতি প্রসঙ্গ। কেউ আর কানে হাত দিয়ে দেখেননি সত্যি সত্যি চিলে কান নিয়েছে কি-না! যে প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক কোনো অর্থই দেয়নি সেই প্রকল্প থেকে আর্থিক দুর্নীতির রসালো গালগল্প, ব্যঙ্গচিত্রের অন্ত ছিল না, ছিল না রাজনৈতিক ‘রিটোরিক’-এর অভাবও!। আর ডিজিটাল বাংলাদেশের কল্যাণে এ দেশে নতুনভাবে যাত্রা করা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পদ্মা সেতুর ‘দুর্নীতি’ বিষয়ে একেবারে যেন বিএনপি-জামায়াতেরই ‘ফটোকপি’ ছিল! বলা যায় তাদেরই প্রেতাত্মা ভর করেছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীদের ওপর! কী বিচিত্র রঙ্গ-ব্যঙ্গ-রগড়! কিন্তু কেউ কখনো খতিয়ে দেখার চেষ্টা মাত্র করেননি যে, পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক কত টাকা দিয়েছে আর কত টাকার দুর্নীতি সেখানে সংঘটিত হয়েছে! অথচ ‘পদ্মা সেতু দুর্নীতি’ একটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ‘ফেনমেনা’ হিসেবে সবার কাছে অতি আগ্রহের হয়ে ওঠে! কথিত দুর্নীতি নিয়ে প্রত্যেকে এমনভাবে গল্প ফেঁদেছেন যেন সব কিছুই তাদের চাক্ষুস ছিল! পদ্মা সেতু নিয়ে কত মন্দ কথার উপাখ্যান রচিত হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই! কিন্তু জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বে সব গাল, গল্প, কিস্সা, কাহিনীর কল্পিত জগৎ থেকে বের হওয়া সম্ভব হয়েছে। বিস্ময়কর সব হলিউডীয় সিনেমাটিক নৈপুণ্যে তৈরি ‘থ্রিলার’ নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব হয়েছে। জননেত্রী শেখ হাসিনার একক সিদ্ধান্তের ফসল হিসেবে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে বাঙালির গর্ব ও অহংকারের সবচেয়ে ব্যয়বহুল স্থাপনা রূপে পদ্মা সেতু প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। আগামী অল্প কয়েক মাস পরেই সবার জন্য এই সেতু উন্মুক্ত করা হবে বলে জানা গেছে। এ দেশের কোটি কোটি মানুষ এবং বিশ্ববাসী সেই মাহেন্দ্রক্ষণটির অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। আমরা আমাদের উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছি স্বপ্নের পদ্মা সেতুর দিকে- যে সেতু কেবল নদী পারাপারেরই সেতু মাত্র নয়, স্বল্পোন্নত কিংবা মধ্যম আয়ের দেশ থেকে আমাদের উন্নত এবং সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পৌঁছে দেয়ারও মেলবন্ধন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। উত্তাল ও প্রমত্তা পদ্মা নদীর বুকে অনন্য সৌন্দর্য ও শোভা নিয়ে ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান হয়েছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু। এখন কেবল শেষ পর্যায়ের কিছু কাজ সেরে পারাপারের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার অপেক্ষা!
আমাদের ধারণা এবং একইসঙ্গে অনেকের এমন আশাবাদ ছিল যে, জাতীয় যে কোনো ঐতিহাসিক দিবসকে আরো তাৎপর্যমণ্ডিত করে তোলার অভিপ্রায় নিয়ে কিংবা পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী দিনটিকে ততোধিক মহিমা প্রদানের লক্ষ্যে কোনো ঐতিহাসিক দিবসে জাতীয় এই বৃহৎ স্থাপনাটির উদ্বোধন সম্পন্ন হবে। যে কোনো দিন এরূপ কাজের উদ্বোধন কাম্য নয়। এক ইতিহাসকে সাক্ষী রেখে আরেক ইতিহাসের সূচনা হোক এটা আমাদের প্রত্যাশা। কিন্তু গত সপ্তাহের সোমবারে (২২.১১.২১) মন্ত্রিপরিষদ সভাশেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব সাংবাদিকদের সঙ্গে ব্রিফিংকালে আগামী ২০২২ সালের ৩০ জুন পদ্মা সেতু সবার জন্য অর্থাৎ যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে বলে জানান। মন্ত্রিসভা বৈঠকে ২০২০-২১ অর্থবছরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং বিভাগগুলোর কার্যাবলি সম্পর্কিত বার্ষিক প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে এরূপ তথ্য জানানো হয়। সে দিন প্রধানমন্ত্রীর ভার্চুয়াল সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ সংক্রান্ত বিষয়ে অনুমোদন দেয়া হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আশা করছি ৩০ জুন বা তার আশপাশের সময়ে ইনশাল্লাহ যান চলাচল ওপেন করে দেয়া হবে।’ পদ্মা সেতু অনেক আবেগের বলেই এই সেতুটির উদ্বোধনের সঙ্গেও আমাদের ইতিহাস ও আবেগ মথিত একটি দিন-ক্ষণ নির্ধারণ করলে ভালো হয়। গৌরবমণ্ডিত পূর্ব ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় পদ্মা সেতু আমাদের সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের সঙ্গে মেলবন্ধন সৃষ্টি করবে। তাই পদ্মা সেতুর উদ্বোধনকালে একটি ঐতিহাসিক দিবসকে অবলম্বন করতে পারলে জাতীয় চেতনার মর্মমূলে তা আরো প্রেরণা সঞ্চার করবে। ইতোপূর্বে বেশ কয়েকবার শুনেছিলাম ২০২১ সালের ২৬ মার্চ কিংবা ১৬ ডিসেম্বর আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হবে। কিন্তু নদী শাসনসহ প্রাকৃতিক নানা প্রতিকূলতায় সেতুর কাজ ও লক্ষ্যমাত্রা কয়েক দফা পেছাতে হয় বলে সেই লক্ষ্যমাত্রা ঠিক রাখা যায়নি। সর্বশেষ আসছে ২০২২ সালের ৩০ জুন সেতুর উদ্বোধনের দিনক্ষণ মোটামুটিভাবে নির্ধারিত হলো মন্ত্রিসভা বৈঠকে। নিঃসন্দেহে এটি আনন্দের সংবাদ, জাতীয় এক স্ফূর্তিরও সংবাদ। তবে আমরা মনে করি জুন মাসের ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন হলো ৭ জুন। এই দিনটিকে আমরা ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা’ দিবস হিসেবে পালন করে থাকি। জুন মাসের আরেকটি ঐতিহাসিক দিন হলো ২৩ জুন। ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে অবিভক্ত এবং বৃহত্তর বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। এই দিনটিতেই আবার কালের আবর্তনে বাংলাদেশে এমন একটি রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়, যার উজ্জ্বল এক সংগঠক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে স্থান করে নিতে সক্ষম হয়। অর্থাৎ অষ্টাদশ শতাব্দীর ২৩ জুন বাংলার ইতিহাসে এক নবাবের (সিরাজউদ্দৌলা) পতন এবং বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকের শেষ বছরে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আরেক নবাবের (বঙ্গবন্ধুর!) উত্থান ত্বরান্বিত হয় বলেও কোনো কোনো ইতিহাসবেত্তা রূপকার্থে বলে থাকেন। বাংলার স্বাধীনতা হারানোর জন্য নবাব সিরাজউদ্দৌলা এবং হৃত-স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংগ্রাম যে ঐতিহাসিক দিনটিকে ঘিরে আবর্তিত তা ২৩ জুন। ২০২২ সালের ২৩ জুন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তার প্রতিষ্ঠার ৭৩তম বার্ষিকী পালন করবে। ৭৩ পেরিয়ে ৭৪তম বর্ষে পদার্পণ করবে দলটি। তাই উপরিউক্ত ঐতিহাসিক ঘটনা বিবেচনায় ৩০ জুনের পরিবর্তে ২৩ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধন তাৎপর্যপূর্ণ হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
বাংলাদেশের সুপ্রাচীন একটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। এই দলটির নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে শ্রেণি-পেশা, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সব বাঙালির ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন এবং সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। আওয়ামী লীগ এখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন। উপরন্তু প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর ধরে সভাপতির দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগকে যুগোপযোগী ও চৌকস একটি রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত করেছেন। তার দক্ষ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জনগণের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে চারবার সরকার গঠন করে। কেবল মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদানই নয়, স্বাধীনতা লাভের আগে-পরে এ দেশের মানুষের ন্যায়সঙ্গত ও গণতান্ত্রিক সব আন্দোলন-সংগ্রামে আওয়ামী লীগের রয়েছে অভূতপূর্ব ভূমিকা ও অবদান। সার্বিক বিবেচনায় পদ্মা সেতুর মতো একটি বৃহৎ স্থাপনা উদ্বোধনের জন্য ২৩ জুন দিনটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের সুবিবেচনায় নিতে পারে বলে আমাদের প্রত্যাশা। এটি আমাদের একটি দাবিও বলা যেতে পারে। জুন মাসে বাঙালির ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ দুটি দিবস আছে। একটি ৭ জুন ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা’ দিবস এবং অপরটি ২৩ জুন ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগে’র প্রতিষ্ঠা দিবস। আমরা মনে করি, জুন মাসে পদ্মা সেতু উদ্বোধন করতে হলে ৭ জুন ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবস অথবা ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা দিবসের কোনো বিকল্প তারিখ হতে পারে না। আবার কোনো কারণে এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠান পিছিয়ে জুলাই মাসে চলে গেলে দেখব সে মাসটিতে বাঙালির জীবনে তাৎপর্যমণ্ডিত তথা ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ কোনো দিনক্ষণই নেই। তাই পদ্মা সেতুর অবশিষ্ট যেসব কাজ রয়ে গেছে তার জন্য কর্মীসংখ্যা কিংবা শ্রমঘণ্টা বাড়িয়ে হলেও ২৩ জুনের মতো একটি ঐতিহাসিক দিনে সেতুটির উদ্বোধন হোক- এটাই দেশবাসীর সঙ্গে আমাদেরও প্রত্যাশা।

আহমেদ আমিনুল ইসলাম : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়