‘আই অ্যাম ইনচার্জ’ এবং ব্রিটেনের গণতন্ত্র

আগের সংবাদ

ভূমিকম্প মোকাবিলায় আমরা কতটা প্রস্তুত?

পরের সংবাদ

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ড. এম এ মোমেন

সাবেক সরকারি চাকুরে, নন-ফিকশন ও কলাম লেখক

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৭, ২০২১ , ১:২৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২৭, ২০২১ , ১:২৫ পূর্বাহ্ণ

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি অনার্স পড়ছেন (১৯৫২-৫৫) তার সহপাঠীদের মাত্র একজন ছিলেন নারী, অবাঙালি; প্রায় সার্বক্ষণিক বিষণ্নতাগ্রস্ত। শতবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রা নামের একটি সংক্ষিপ্ত রচনায় তিনি লিখেছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বছর নীলা নাগকে ছাত্রী হিসেবে পাওয়া গেলেও প্রথম নারী শিক্ষক পেতে বিশ্ববিদ্যালয়কে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৫ বছর; এখন ছাত্রী সংখ্যা ১৫ হাজার ৩০৫ এবং নারী শিক্ষক ৬৬৩ জন। প্রতীচ্যের/প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নিজের অবস্থান ধরে রাখলেও প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বিশ্বমানে কোথায় সে প্রসঙ্গ থাক, তিনিও এড়িয়ে গেছেন; তবে সংখ্যাবিচারে অগ্রগতি কে অস্বীকার করবে? সে সুযোগ নেই।
‘দুই যাত্রায় এক যাত্রী’ নামের দুই খণ্ডের আত্মজীবনীর প্রায় পুরোটা অধ্যাপক চৌধুরীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবন নিয়ে লেখা। এছাড়া তার অন্যান্য গ্রন্থ এবং স্মৃতি তাড়িত কয়েকটি দীর্ঘ রচনায় (যেমন ছত্রভঙ্গ আমরা তিনজন) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিবার্য উপস্থিতি রয়েছে। এই লেখাটি অধ্যাপক চৌধুরীর চোখে তার ক’জন ক্লাসমেট ও শিক্ষককে নিয়ে; তার শিক্ষক জীবনও ঈষৎ ছুঁয়েছি।
তিনি ভাবতেন, যদি স্কুলের চৌধুরী স্যারের মতো অঙ্ক পারতেন তাহলে তার আর কিইবা চাইবার থাকত। অঙ্ক না মেলার ভয় তাকে বিজ্ঞানের পথে পা মাড়াতে দেয়নি। তিনি নিজেই তার ভবিষ্যৎ বিজ্ঞান পাঠের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। এসব স্কুল জীবনের কথা, সেন্ট গ্রেগারিজ স্কুলের। তারপর নটর ডেম কলেজ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। অর্থনীতি পড়তে হলে গণিত ও পরিসংখ্যান পড়তেই হবে। সুতরাং বাবাকে জানিয়ে দিলেন অর্থনীতি নয় বাংলা পড়বেন। বাংলা পড়বেন! ধাক্কাটা বাবার জন্য পর্বতসমান, তারপরও সমঝোতার পথ তিনি খুলে দেন। সাব্যস্ত হয় তিনি ইংরেজি অনার্স পড়বেন, সাবসিডিয়ারি হবে অর্থনীতি আর রাষ্ট্রবিজ্ঞান। বাবা নিশ্চয়ই ভেবেছেন কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিসের প্রতিযোগিতায় ছেলেকে নামতে হলে প্রস্তুতি পর্বে এটা মন্দ কম্বিনেশন নয়।
অনার্স ক্লাসে একজনই ছাত্রী ছিলেন, আগা খান সম্প্রদায়ের, নামে মেহেরুন্নেসা আবদুল্লাহ মেহেরভাই, গুলিস্তান সিনেমা হলের মালিকদের একজন ছিলেন তার বাবা, সপ্রতিভ শহুরে মেয়ে; কিন্তু চার বছরই তাকে ম্রিয়মাণ থাকতে হয়েছে। কেউ তাকে সাহায্য করেনি, এমনকি টিউটোরিয়াল শিক্ষকও তার পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বলে তার সহপাঠী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন। অথচ ব্রিটেনে একজন শিক্ষার্থীর আগ্রহ জাগাতে তার অন্তর্গত শক্তি বের করে আনতে কতই না চেষ্টা করেন তার শিক্ষক।
অধ্যাপক চৌধুরী বলেননি, অনুক্ত থাকল যে কথাটি তা হচ্ছে এরই নাম প্রাচ্যের অক্সফোর্ড! অনাবাসিক হলেও ১৯৫২-তে ভর্তি হওয়া ছাত্র ১৯৫৩-তে হল ইউনিয়নের নির্বাচন করলেন, কার্যত যুক্তফ্রন্ট হয়ে মুসলিম স্টুডেন্টস লীগের বিরুদ্ধে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করলেন। ইংরেজির ক্লাসমেট চৌকস ও মেধাবী, ইংরেজি ও বাংলায় চমৎকার বক্তৃতা দিতে সক্ষম দারুণ রসবোধসম্পন্ন আবিদ হোসেন হলেন সাধারণ সম্পাদক। তার ক্লাসমেটদের মধ্যে আরো ছিলেন আবদুল বারি আর ফারুক আহমদ চৌধুরী, দুজনেই পাকিস্তান পররাষ্ট্র সার্ভিসে যোগ দিয়ে দেশ-বিদেশে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেছেন; লতিফুর রহমান প্রধান বিচারপতির পর ২০০১-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হয়েছেন। এই দুজন ক্লাসমেট একই পরিবারের দুই বোনকে বিয়ে করায় তার সঙ্গে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর আত্মীয়তার সম্পর্কও স্থাপিত হয়েছে, এস এম সোলায়মান প্রাদেশিক সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়ে জেলা প্রশাসক ও যুগ্ম সচিব হয়েছেন।
রশীদুজ্জামান অনার্স শেষ করেই ব্যারিস্টার হতে বিলেতে চলে গেছেন; সদাবিষণ্ন এস এম শামসুজ্জামানের বিষণ্নতা কাটেনি; মোতাহার হোসেন পরীক্ষকদের অবিচারের শিকার, বেসরকারি কলেজে ইংরেজি শিক্ষকতা করেছেন, মতিউর রহমান রেডিওতে রবীন্দ্র সংগীত গাওয়া দর্শনের এক ছাত্রীর প্রেমে পড়ে সহপাঠীদের কাছে হাসির পাত্র হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে রাজশাহী গিয়ে ইসলামের ইতিহাসে ভর্তি হয়েছেন। সিদ্দিকী শুরুতেই একমাত্র ছাত্রী মেহেরুন্নেসার প্রেমে পড়ে গেলেন; যথেষ্ট এক তরফা এই প্রেম তাকে মানসিক রোগী বানিয়ে কিছু সময়ের জন্য পড়াশোনা ছাড়াতেও বাধ্য করল।
আরো চারজন সহপাঠী রয়ে গেলেন, তারা সবাই মূলত শিক্ষক। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছিলেন মোহাম্মদ আলী, ভালো ফল নিয়ে আরো একটি এমএ করতে চলে গেলেন অক্সফোর্ড; রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিয় অধ্যাপক ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য পড়িয়েছেন। তারপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য হয়েছেন। আহসানুল হক একসঙ্গে ছাত্রজীবন কাটিয়ে পুনরায় কর্মজীবনের সঙ্গী হলেন তার। ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ও পিএইচডি করে দীর্ঘদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। কলেজ জীবন পর্যন্ত বিজ্ঞানের ছাত্র এনামুল করিমও তার সঙ্গে ইংরেজিতে পড়েন, তবে অসুস্থতার কারণে এক বছর পর পাস করে বেরিয়েছেন। কিছুকাল এক সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা, তারপর পিএইচডি করতে আমেরিকায়, আর ফিরে আসেননি। তার সহপাঠীদের মধ্যে বই কেনা ও বই পড়ায় সবাইকে ছাড়িয়ে যাওয়া তালেহ উদ্দিন খান তাৎক্ষণিক সরস জবাব দেয়ার পণ্ডিত, শিক্ষকতা দিয়ে তারও শুরু, কিন্তু ভয়ংকর সড়ক দুর্ঘটনার পর শিক্ষকতা ছেড়ে সাংবাদিকতায় গেলেন। লেখার হাত ছিল চমৎকার কিন্তু দুর্ঘটনার যন্ত্রণা তাকে লেখালেখি থেকেও সরিয়ে দেয়।
আর সেই আবিদ হোসেন, সম্ভবত তার এই অধ্যাপক সহপাঠীর স্মৃতির বড় অংশজুড়ে আছেন। তিনি বুদ্ধিমুক্তি আন্দোলনের নেতৃত্ব দানকারী আবুল হোসেনের পুত্র। সৈয়দ হয়েও তিনি সৈয়দ নামের সঙ্গে যোগ করেননি, আবিদও তাই, কিন্তু তাদের বিভাগীয় প্রধান সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন রয়ে গেলেন সৈয়দসর্বস্ব। আবুল হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনালগ্নে অর্থনীতির শিক্ষক ছিলেন। তিনি ঢাকা ছেড়ে কলকাতা গিয়ে আইন পেশায় যুক্ত হন এবং ১৯৩৮-এ, বয়স ৪২ হতেই মৃত্যুবরণ করেন। আবিদ হোসেন পঞ্চাশের দশকেই ব্যারিস্টার হয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে বিলেত চলে যান। ব্যারিস্টার হয়ে দেশে ফিরেছিলেন কিন্তু সুবিধা করতে পারেননি, আবার ফিরে যান এবং বাবার চেয়েও কম বয়সে হঠাৎ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা আড়াই হাজারের বেশি নয়, ছাত্রী শ-পাঁচেক। প্রক্টর ড. মযহারুল হকের ‘অতি পুরাতন’ ছোট কালো ফোর্ড গাড়িটি ছাড়া অন্য কোনো যন্ত্রচালিত যান প্রফেসর চৌধুরী কলাভবন ক্যাম্পাসে দেখেননি। ছাত্রছাত্রীদের পৈতৃক সূত্রে কারো কারো গাড়ি ছিল, কিন্তু সংকোচের কারণে গাড়ি নিয়ে ক্যাম্পাসে আসতেন না। বিদেশে পড়াশোনা শেষ করে তিনি যখন আটষট্টিতে কলাভবনে ফিরে এলেন চত্বরটা তখন ‘মোটরগাড়ির গমনাগমনে বেশ শিহরিত। শিক্ষকদেরও কারো কারো গাড়ি আছে। সে সময় বিদেশফেরতরা গাড়ি পাঠানোর হুকুম দিয়ে আসতেন, বন্দর থেকে গাড়ি ছাড়িয়ে এনে নিজের পরিবার ব্যবহার করলে তো কথাই নেই, বেচে দিলেও যথেষ্ট মুনাফা হতো।’ ‘মুনাফা’ বোঝার মতো পার্থিব বুদ্ধি না থাকলে বুদ্ধিমান সহকর্মীরা তাকে বোকা সাব্যস্তই করবেন, সম্ভবত তাই করলেন।
তার ভাষ্য, আইয়ুবের উন্নয়নের দশক যে পুঁজিবাদী পথটাকে বেশ প্রশস্ত করে দিয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। তিনি নিজের কথাও বলেছেন, কলেজ জীবন শার্ট আর পায়জামাতে কেটেছে, ফুলপ্যান্ট ধরেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের পর। জ্যাকেটও পরেছেন। ক্ষমতাযুক্ত চাকরির প্রত্যাশা করেননি বলে স্যুট বানানোর দর্জিখানায় তাকে ছুটতে হয়নি। ‘পঞ্চাশের দশকে ঢাকা শহরে স্যুট বানাবার নির্ভরযোগ্য দোকানের সংখ্যা ছিল একেবারে নগণ্য। যারা চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যেত তাদের স্যুট তৈরির জন্য ওসব দোকানের শরণাপন্ন হতে হতো। সিএসএস পরীক্ষার্থীদের জন্য ওটি ছিল অবশ্যকরণীয় কর্তব্য, নইলে ভাইবা পরীক্ষায় দর্শন দেয়া মাত্রই নাকচ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকত। আমার নিজের জামা-কাপড়ের কথা স্মরণ করলেও একটা পরিবর্তন দেখতে পাই, সেটা ওই পুঁজিবাদী লাইনেই।’
একদা প্রেমকুমার, হুমায়ুন কবীরের কাছে প্রেমিকাকে হারিয়ে চিরকুমার বি সি রায় সিরাজুর ইসলাম চৌধুরীর শিক্ষক ও সহকর্মী দুই-ই ছিলেন। তিনি ধুতি পরতেন, অন্য পোশাকে তাকে ভাবাও যেত না। ১৯৬৪-এর দাঙ্গা থামার পর ‘প্রথম যেদিন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে এলেন, ক্লাস নিতে, লজ্জায়, দুঃখে, বেদনায় আমরা তার দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারিনি। ধুতি ছেড়ে তিনি এসেছিলেন ট্রাউজার্স ও শার্ট পরে। একে তো অনভ্যস্ত তদুপরি নিশ্চয়ই তাড়াহুড়ো করে তৈরি করা, তাই ওই পোশাকে তাকে মানায় তো না-ই খাপও খায়নি, কেমন যেন অনুমান হচ্ছিল, যে ট্রাউজার্সটা বোধ করি গা থেকে খসে পড়ে যেতে যাচ্ছে।… ওই অপমানের পর বি সি রায় তার বেশি দিন তার নিজের দেশে থাকেননি, শরণার্থী হয়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে গেলেন।’
বি সি রায়ের বিদায়ে বিভাগীয় শিক্ষকরা তখনকার শাহবাগ হোটেলে একটি ডিনারের আয়োজন করেছিলেন। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীও হাজির ছিলেন তরুণ শিক্ষক হিসেবে। বিলাতফেরত শিক্ষকদের একজন তাকে বলেছেন, ‘তুমি সুন্দর একটা জ্যাকেট পরলে অথচ টাই পরলে না।’ যে উত্তর তিনি দিতে চেয়েছিলেন তা দেয়া হয়নি। লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি যখন স্নাতকোত্তর কোর্স করছেন তখন একজন ভারতীয় ছাত্র সম্ভবত নিজের টকিং পয়েন্টসের স্বল্পতাহেতু প্রফেসর (জর্জ রিচার্ড) উইলসন নাইটকে (১৮৯৭-১৯৮৫) জিজ্ঞেস করে বসেন, আপনি টাই পরেন না কেন?
প্রফেসর নাইট জবাব দিয়েছিলেন, আমি ব্যাংকের কেরানিও নই, বিমার দালালও নই, সুতরাং আমি টাই পরতে বাধ্য নই। একদা ঘনিষ্ঠ বন্ধু মুজিব সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে দুই বছর খুইয়ে পাসিং আউটের সামান্য আগে সেনাধ্যক্ষ হওয়ার স্বপ্ন পরিপক্ব না হতেই বাদ পড়ে যান, সেই ব্যাচেই ছিলেন পরবর্তীকালের রাষ্ট্রপ্রধান জিয়াউর রহমান। মুজিব বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থগুলোর স্বাদ নেবেন বলেই জুনিয়রদের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি অনার্সে ভর্তি হলেন।
ইংরেজির লেকচারার আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ সিএসপি হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিলে তার জায়গায় সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যোগ দেন এবং তার ক্লাসগুলোই তাকে নিতে হয় (আবু জাফর ওবায়দুল্লাহও যোগ দিয়েছিলেন সিএসপি হয়ে সরকারি চাকরিতে যোগ দেয়া মুজিবুল হকের জায়গায়)। তিনি লিখেছেন তৃতীয় বর্ষের ‘ক্লাসে ঢুকে দেখি মুজিব বসে আছে। ছাত্র নয়, বন্ধু নয়, তার ভঙ্গিটা অভিভাবকের মতো। যেন আমি ঠিক মতো পড়াতে পারছি কি-না সেটা দেখছে, এবং একই সঙ্গে চোখ রাখবে ছাত্রদের ওপর তারা যেন আমাকে উত্ত্যক্ত না করে।’ বাস্তবিকই বন্ধু অভিভাবক। বিকালে যখন মুজিব-সিরাজ-ক্ষীরু ত্রয়ীর জ্যেষ্ঠ ক্ষীরুর অফিসে দেখা হলো মুজিব তাকে ক্লাসে শিক্ষক হিসেবে তার করণীয় নিয়ে শিক্ষণীয় কিছু টিপসও দিলেন। এই বন্ধুটি বিভিন্ন সংকটে ও সংকটের সম্ভাবনা অনুমান করে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জড়িয়ে এমনই একটি সংকটের কাহিনী লিখেছেন ‘ছত্রভঙ্গ আমরা তিনজন’-এ; এরশাদ শাসনামলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট ভিসি পদে নিয়োগের জন্য প্রথা অনুযায়ী চ্যান্সেলরের কাছে তিনজনের নাম প্রস্তাব করে, শীর্ষস্থানে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর নাম। চ্যান্সেলর অন্য কেউ নন, স্বয়ং প্রেসিডেন্ট। তালিকাটি গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়। সাধারণত প্রথম নামটিই বিবেচিত হয়। বন্ধুর নাম দেখে তাকে অভিনন্দন জানাতে মুজিব যখন ফোন করলেন তিনি তাকে আসতে বললেন। মুজিব সঙ্গত কারণেই ধরে নিয়েছেন এবার তার দায়িত্ব হচ্ছে অধ্যাপক চৌধুরী যাতে কোনো কারণে বাদ না পড়ে যান তা নিশ্চিত করা, তার শক্তি ঘনিষ্ঠ বন্ধু অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল মান্নান সিদ্দিকী, তিনি এরশাদের ঘনিষ্ঠ মন্ত্রীদের একজন।
কিন্তু এসে শুনলেন ভিন্ন কথা, তিনি ভাইস চ্যান্সেলর হতে আগ্রহী নন, এটা তার বন্ধুকে দিয়ে প্রেসিডেন্টকে জানিয়ে দিতে হবে।
প্রেসিডেন্ট একে একে তিনজনকেই ইন্টারভিউ করলেন। তিনি কেন হতে চাচ্ছেন না প্রেসিডেন্টই জিজ্ঞেস করলে তিনি তার প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার অভাবের অজুহাত খাড়া করলেন। তালিকায় দু’নম্বর প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর এ কে এম সিদ্দিকের ওপরও সরকার তুষ্ট ছিল না, সুতরাং নাকচ হয়ে গেলেন। নিয়োগ পেলেন তালিকার তিন নম্বর ফলিত পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক শামসুল হক।
ড. এম এ মোমেন : সাবেক সরকারি চাকুরে, নন-ফিকশন ও কলাম লেখক।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়