গাজীপুর থেকে মা ও মেয়ের মরদেহ উদ্ধার

আগের সংবাদ

ক্রিকেট নিয়ে হতাশা এবং পাকিস্তানপ্রীতির নির্লজ্জ দৃষ্টতা!

পরের সংবাদ

নবান্ন উৎসবের অতীত ও বর্তমান

রাশেদুজ্জামান রাশেদ

লেখক, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৫, ২০২১ , ১০:২৪ পূর্বাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২৫, ২০২১ , ১০:২৪ পূর্বাহ্ণ

বর্তমানে কৃষকরা মাঠে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন কারণ হেমন্ত ঋতুতে অর্থাৎ অগ্রহায়ণ মাসে কৃষকের নতুন বার্তা নিয়ে আমন ধানের আগমন। কৃষকের উৎপাদিত সোনালি ধানের সোনালি দিন। বাঙালির হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী এবং সবচেয়ে প্রাচীনতম উৎসব নবান্ন উৎসব। নবান্ন এক অসাম্প্রদায়িক উৎসব। এ উৎসব বাঙালি জাতিকে ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ করে। বিশেষ করে বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি জড়িয়ে আছে এর সঙ্গে। মাঠ ভরা ধানে সোনালি ছোঁয়া লাগলেই গ্রাম-বাংলায় বোঝা যেত যে নবান্ন আসছে। কবিদের কবিতার ছন্দ আর পালাগান, লোকনাট্য, কেচ্ছা-কাহিনী, ভাওয়াইয়া গান, লালনগীতি ও বাউল গানের আসর। নাচ আর গানে মুখরিত হতো মেলাপ্রাঙ্গণ। বর্তমান ডিজিটাল বাংলাদেশে কেন পালাগান আর বাউল গানের আসর বিপন্ন? কুরুচিপূর্ণ অপসংস্কৃতি দিয়ে কেন মানুষকে মাতিয়ে রাখা হচ্ছে? কেন কৃষকের ঘরে আনন্দ হারিয়ে যাচ্ছে? ফেসবুক, ইউটিউবসহ সব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্মীয় প্রচারের নামে নারীদের ভোগপিপাসা অথবা পণ্যের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। প্রতিটি ঘরে ঘরে মৌলবাদীদের আখড়া তৈরি হচ্ছে যার ফলস্বরূপ বর্ষবরণে হামলা, একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি দিতে বাধা, নবান্ন উৎসবকে হিন্দু সংস্কৃতি, সাম্প্রতিক সহিংসতা, করোনা ভাইরাস মুসলমানদের ওপর সংক্রমিত হবে না, করোনা টিকা দিলে নারী পুরুষ হবে আর পুরুষ নারী হবে ইত্যাদি কূপমণ্ডূক বক্তব্য দিয়ে যারা ধর্মের নামে রাজনীতি করে। তারাই সমাজের কাছে প্রিয় ব্যক্তি হয়ে যায়। তবে একটু ভালোভাবে লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে ধর্মীয় লেবাজ পড়া ব্যক্তি ধর্মের নামে বেশি অধর্মই বেশি করে। এদের বিষয়ে রাষ্ট্রকে সজাগ থাকতে হবে। আরো দৃঢ়তার সঙ্গে সজাগ থাকতে হবে কৃষকের সংকট নিরসনের জন্য। কারণ বর্তমানে কৃষাণ বধূকে আর ব্যস্ত দেখা যায় না নিজ হাতে চালের গুঁড়া দিয়ে আঁকা মাঙ্গলিক আলপনায়। চিড়া, মোয়া, নাড়ু পিঠা-পুলি, ক্ষীর-পায়েস ইত্যাদি কৃষাণির রান্না ঘরে তেমন আর রান্না হয় না। যান্ত্রিকতার ছোঁয়ায় এখন আর ঢেঁকির তালে মুখরিত হয় না আমাদের গ্রামগুলো। শুধু শহরের নাট্যশিল্পীরাই নবান্ন উৎসবকে জিইয়ে রেখেছেন। নবান্নের মেলায় পাওয়া যায় না আর বিভিন্ন ধরনের পিঠা, মিষ্টি, সন্দেশ, মণ্ডা-মিঠাই, খেলনা-পুতুল, মাটি-বাঁশ-বেত কাঠের তৈরি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। এভাবে অসাম্প্রদায়িক নবান্ন উৎসব বিপন্নের পথে চলতে থাকলে নতুন প্রজন্ম ভুলে যাবে নবান্ন নামে আমাদের একটি উৎসব আছে। কৃষকের মনে কেন উৎসব নেই? বাংলাদেশের কৃষকরা কেমন আছে? তারা তাদের ফসলের ন্যায্যমূল্য কতটুকু পায়? শ্রমিকদের একত্রিত হয়ে আন্দোলন করতে দেখা যায়, ছাত্রদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন দেখা যায়, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের আন্দোলন চলে প্রতিনিয়ত; কিন্তু রাজপথে কৃষকদের সংঘটিত কোনো আন্দোলন চোখে পড়ে না। কৃষক আন্দোলন কেন গড়ে ওঠে না? কৃষক আন্দোলনের বিপ্লবী নেতা মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর মতো কৃষক আন্দোলের নেতারা আজ দেশে বড় বিপন্ন। কে পারবেন কৃষকের অধিকার ছিনিয়ে আনতে। আমাদের দেশে শোষিতদের মধ্যে কৃষকদের সংখ্যা বেশি। স্বাধীনতার ৫০ বছরে রাষ্ট্রযন্ত্র কি পেরেছে কৃষকের কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য দিতে? এদেশে ১৭ কোটি মানুষের মুখের অন্ন জোগান দেন কৃষকরাই। তারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সোনালি ফসল উৎপাদন করে, তখন কৃষকের মুখে হাসি ফোটে। কিন্তু কার্তিকের শেষ সপ্তাহ থেকেই যখন ধান মাড়াইয়ের কাজ চলছে তখন হঠাৎ কৃষকের মাথায় হাত, কারণ ডিজেলের মূল্য প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এতে কৃষি খাতে উৎপাদন খরচ ৩০-৩৪ শতাংশ বেড়ে যাবে। কালোবাজারি করে কৃষকের পকেট কাটছে। এর সুষ্ঠু তদন্ত করা কি রাষ্ট্রের প্রয়োজন নেই। চাল, ডাল, পেঁয়াজ, তেল, গ্যাসসহ সব নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। কৃষকের মাথায় হাত, বাজার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় ফসল উৎপাদন করবে কীভাবে? যে কৃষক দেশের মানুষের খাবার জোগান দেয়, সেই কৃষক আজ কত অসহায় ও অবহেলিত। কৃষকের নীরব কান্না দেখার কেউ নেই। যে কৃষক দেশকে বাঁচায় সেই কৃষক টাকার অভাবে সন্তানের লেখাপড়ার খরচ দিতে পারেন না, চিকিৎসার অভাবে দিনের পর দিন হাসপাতালে ভর্তি হয়ে থাকেন। সেই কৃষকের ঘরে উৎসবের আমেজ থাকার তো কথা নয়। ফলে মৌলবাদী চক্র ও রাষ্ট্রযন্ত্রের জাঁতাকলে পৃষ্ঠ হয়ে বাঙালির নবান্ন উৎসব যেন বিপন্ন হওয়ার পথে। তাই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্রতিটি ইউনিয়নে একটি সরকারি ক্রয়কেন্দ্র চালু করে ধান, গম, পাট, আলুসহ অন্যান্য ফসল ক্রয় করতে হবে। ভূমিহীনদের নিবন্ধন কার্ড দিতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে লটারির মাধ্যমে নয়, সরাসরি কৃষকের কাছে কৃষিপণ্য ক্রয় করতে হবে। প্রত্যেক কৃষককে উৎসব ভাতা দিতে হবে। গ্রামীণ রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। উন্নয়ন বাজেটের ৪০ শতাংশ কৃষি খাতে বরাদ্দ দিয়ে খেতমজুরদের বছরে ন্যূনতম ১২০ দিনের কাজের ব্যবস্থা রাষ্ট্রকেই করতে হবে। কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে হলে কৃষকের কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র সেই অস্তিত্ব রক্ষা করতে হবে।
রাশেদুজ্জামান রাশেদ
লেখক, চট্টগ্রাম।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়