নবান্ন উৎসবের অতীত ও বর্তমান

আগের সংবাদ

বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে

পরের সংবাদ

ক্রিকেট নিয়ে হতাশা এবং পাকিস্তানপ্রীতির নির্লজ্জ দৃষ্টতা!

জুবায়ের আহমেদ

শিক্ষার্থী, বিজেম, কাঁটাবন, ঢাকা

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৫, ২০২১ , ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২৫, ২০২১ , ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ

খেলা বিনোদনের অনেকগুলো মাধ্যমের মধ্যে একটি এবং ক্রিকেট অন্য ৮/১০টি খেলার মতো একটি খেলা হলেও ভারতীয় উপমহাদেশে ক্রিকেট জাতীয়তাবাদে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশে ক্রিকেট এখন ক্রিকেটার কিংবা সাধারণ নাগরিকদের জন্য দেশপ্রেম জাহির করা কিংবা দেশদ্রোহিতার তকমা পাওয়ার উপলক্ষও। খেলাটি আর খেলাতে নেই, বাঙালির রক্ত কণিকার সঙ্গে মিশে গেছে। দৈনন্দিন আলাপ-আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে ক্রিকেট। আবেগী সমর্থকদের কেউ কেউ বলে থাকেন ‘ক্রিকেটে খাই, ক্রিকেটে ঘুমাই’। অথচ বাস্তবতা হলো ভিন্ন থেকে ভিন্নতর। ক্রিকেট নিয়ে উন্মাদনার মাঝেই কত নিরীহ মানুষ ক্ষুধার সঙ্গে লড়াই করে হেরে যায়। কত পিতা-মাতা শিশু-সন্তানের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে না পারার হতাশায় সপরিবারে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। দুর্নীতি, সুদ, ঘুষ, অর্থপাচারসহ নানামুখী রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সমস্যা আড়ালে পড়ে থাকে ক্রিকেট নিয়ে বেঘোর উন্মাদনার কারণে। নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত বাঙালি জাতিকে এক সময় আনন্দে ভাসাত ফুটবল। ফুটবলের ব্যর্থতায় জনপ্রিয়তার রেস থেকে ফুটবলকে পেছনে ফেলে এখন জায়গা করে নিয়েছে ক্রিকেট। বিশ্ব মঞ্চে ক্রিকেটে ছোট ছোট সফলতার সুবাদে মানুষ ক্রিকেট নিয়ে ভাবছে, সফলতার আনন্দে আন্দোলিত হচ্ছে, ব্যর্থতার হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে। আশরাফুল-মাশরাফি-সাকিব-তামিম-মুশফিক-মুস্তাফিজদের হাত ধরে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ কিংবা বড় মঞ্চে পাওয়া সফলতাগুলোর সুবাদে সমর্থকদের স্বপ্নের রং ডানা মেলে আকাশে উড়ছে। কিন্তু সাকিব-তামিম-মুশফিক-রিয়াদরা সমর্থকদের প্রত্যাশা কিংবা দলের অবস্থান অনুযায়ী পারফর্ম করতে পারছে না। আধুনিক ক্রিকেটের জমানায় বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেট শুরু করলেও অদ্যাবধি দুই দশক পেরিয়েও সমীহ জাগানিয়া শক্তি হতে পারেনি টেস্ট ক্রিকেটে।স¤প্রতি বিশ্বকাপে চরম ব্যর্থতায় হতাশায় নিমজ্জিত জাতি পাকিস্তান সিরিজে টাইগারদের সফলতা দেখতে মরিয়া হয়ে থাকলেও টি-টোয়েন্টি মানের দল গঠন করতে না পারা এবং প্রথম ম্যাচে জয়ের ক্ষেত্র তৈরি করেও পরাজয়বরণ করেছে বাংলাদেশ। এরই মাঝে ঘটল আরেক কাণ্ড, ৭১-এর পরাজিত শক্তি, ৩০ লাখ শহীদের ঘাতক পাকিস্তানের পতাকা নিয়ে মাঠে প্রবেশ করেছে পাকিস্তানের এদেশীয় দোসরদের কিছু উত্তরসূরি। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার মিডিয়ার সামনেও গর্ব করে বলছে তারা পাকিস্তান ক্রিকেটের সমর্থক, পাকিস্তানকে তাদের ভালো লাগে, তারা মুসলিম তাই। এই তরুণরা বলতে চাইছে ক্রিকেটের সঙ্গে রাজনীতি মিশাবেন না, কিন্তু এই গর্দভগুলো বুঝে না, পাকিস্তান ইস্যু রাজনীতি না, এরা ১৯৭১-এর তাণ্ডব সম্পর্কে শুনেনি। লাখ লাখ নির্যাতিত মা-বোনের আকাশ ভারি করা কান্নার যন্ত্রণা তারা উপলব্ধি করতে পারে না। এই গর্দভগুলো এটা বুঝেনি যে, যখন নিজ দেশ অন্য কোনো দেশের সঙ্গে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করে, তখন নিজ দেশ মানেই আমি, ওরা ১১ জন আমাদের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছে, আমাদের মতো সাধারণ নাগরিকদের কারো ভাই কিংবা বন্ধুও হয় রিয়াদ-ফিজরা। আমরা কী করে নিজ দেশের খেলাতেও বিপক্ষ দলের পতাকা নিয়ে মাঠে ঢুকি। আবার যেই দেশটি থেকে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে, ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে দেশকে স্বাধীন করতে হয়েছে, লাল-সবুজের পতাকার সৃষ্টি হয়েছে, সেই দেশের পতাকা নিয়ে মাঠে যাওয়া মানে নিজকেই নিজে অস্বীকার করা। শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করার শামিল। আরো দুঃখজনক বিষয়, তারা তাদের ভুল কাজকে জায়েজের জন্য নানা প্রকার যুক্তি দেখাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, কেউ বা আবার বলছে বিসিবি কর্তাদের ভুল কাজের প্রতিবাদস্বরূপ পাকিস্তানকে সমর্থন করা হচ্ছে। কী অযৌক্তিক ও নির্লজ্জ মন্তব্য এসব। নিজের ভাই কিংবা বন্ধু ভুল কাজ করলেই কি আমরা তাদের বাদ দিয়ে অন্য কাউকে সমর্থন করতে পারি, কখনোই না।
ক্রিকেট নিয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। রাজনৈতিক, ধর্মীয় কিংবা সামাজিক ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে লাল সবুজের প্রতিনিধিত্বকারীদের হয়ে গলা ফাটাই। এই ক্রিকেটাররাই আমাদের হাসায়, কাঁদায়। কর্তাদের সঠিক সিদ্ধান্তে আমরা সাধুবাদ জানাই, ভুল সিদ্ধান্তে তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়ি। খেলাধুলা যেহেতু একটি চলমান প্রক্রিয়া, সেহেতু সফলতার পরে ব্যর্থতা কিংবা ব্যর্থতার পরে সফলতা আসবেই। আমরা সাময়িক হতাশায় নিমজ্জিত হলেও আমাদের চূড়ান্ত হতাশ হওয়ার কারণ নেই। আমরা হতাশ হলেও ভুল কাজ করা শোভা পায় না। নিজ দেশ যতই খারাপ খেলুক, আমরা কখনোই নিজ দেশের সঙ্গে খেলা অন্য দলের সমর্থন করতে পারি না, তাদের পতাকা হাতে নিয়ে মাঠে যেতে পারি না, তাদের পতাকা মেলে ধরতে পারি না। আর দলটি যখন পাকিস্তান, তখন তো তা ঘোরতর অপরাধ। যে পতাকা আমাদের তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতে উড়িয়ে পাকবাহিনী আমাদের শাসন করত, শোষণ করত, সবসময় আমাদের দাবিয়ে রাখার সব আয়োজনই করত, সেই পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৯৭১-এ লড়াই করে দেশ স্বাধীন করার পর পুনরায় এ দেশের মাটিতে এ দেশে জন্ম নেয়া, বাঙালি পরিচয় দেয়া কারো হাতে পাকিস্তানি পতাকা বড্ড বেমানান, ঘোরতর দেশদ্রোহিতার শামিল, লাখো শহীদের রক্তের সঙ্গে বেইমানির শামিল। তা যত দ্রুত পাকিস্তানের এ দেশীয় বর্তমান দোসররা বুঝতে পারবে, ভুল স্বীকার করে শুদ্ধতার সঙ্গে বসবাস করবে, ততই মঙ্গল।
জুবায়ের আহমেদ
শিক্ষার্থী, বিজেম, কাঁটাবন, ঢাকা।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়