অনন্ত হাঁ মুখের ঝুলন্ত শিকার

আগের সংবাদ

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান : আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় ভূমিকা জরুরি

পরের সংবাদ

প্রসঙ্গত স্বাস্থ্যসেবায় বিদেশ নির্ভরতা নয় : সহনশীলতায় অনন্য শেখ হাসিনা

আহমেদ আমিনুল ইসলাম

অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: নভেম্বর ২১, ২০২১ , ১:৪৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২১, ২০২১ , ১:৪৭ পূর্বাহ্ণ

১৭ নভেম্বর বিকেলে ইউরোপ সফর সম্পর্কে সাংবাদিকদের অবহিত করতে গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে। শেখ হাসিনা ৩১ অক্টোবর থেকে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত গøাসগো, লন্ডন ও প্যারিসে সরকারি সফরকালে কপ২৬-এ বিশ্ব নেতাদের শীর্ষ সম্মেলন, বাংলাদেশ বিনিয়োগ শীর্ষ সম্মেলন-২০২১, ইউনেস্কো সদর দপ্তরে সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য ‘ইউনেস্কো-বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আন্তর্জাতিক পুরস্কার’ প্রদান অনুষ্ঠান, ইউনেস্কোর ৪১তম সাধারণ সম্মেলন, প্যারিস শান্তি ফোরাম, ইউনেস্কোর ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং উচ্চ পর্যায়ের অন্যান্য কয়েকটি অনুষ্ঠানে যোগদান করেন তিনি। ১৪ নভেম্বর দেশে ফেরার পর ১৭ নভেম্বর সফরকালীন বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনের এই আয়োজন। ইউরোপ সফর নিয়ে সংবাদ সম্মেলন হলেও সমসাময়িক অনেক বিষয়ই প্রশ্নোত্তর পর্বে ওঠে এসেছে। তিনি বরাবরের মতো সাংবাদিকদের প্রশ্নের সাবলীল উত্তর দিয়েছেন। বিদেশ সফর পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর নিয়মিত এরূপ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজনে সাংবাদিকরা সফরকালীন অভিজ্ঞতার পাশাপাশি দেশীয় নানা বিষয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ পান। নানা প্রশ্নের মধ্য দিয়ে সাংবাদিকরা বিভিন্ন বিষয়ে শেখ হাসিনার কাছ থেকে সরকারের মনোভাব বোঝারও প্রয়াস পান। সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নে বেগম জিয়ার মুক্তি ও চিকিৎসা প্রসঙ্গ এসেছে, এসেছে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রসঙ্গ। প্রশ্ন এসেছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে যে সহিংসতা চলছে সে সম্পর্কেও। শেখ হাসিনা সেসব প্রশ্নের যৌক্তিক এবং বাস্তবসম্মত উত্তর প্রদান করেছেন। আমরাও মনে করি কোনো নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা একেবারেই কাম্য নয়। তবু স্থানীয় নির্বাচনে তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্রের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বহনকারী ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলাদেশের চেয়ে ব্যাপক আকারে সহিংসতা ঘটে। অন্তত আমাদের সীমান্ত-ঘেঁষা পার্শ্ববর্তী পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত নির্বাচনে যে সহিংসতা ঘটে তার তুলনীয় একটি ঘটনাও এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ঘটেছে বলে আমরা জানি না, অন্তত গণমাধ্যমে সেরূপ খবর প্রকাশিত হয়নি। সাংবাদিকদের প্রশ্ন থেকে বাদ পড়েনি সাম্প্রতিককালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে টাইগারদের ব্যর্থতার প্রসঙ্গ। কিন্তু তিনি ধৈর্য ও সহনশীলতার সঙ্গে শুধু যে সাংবাদিকদের প্রশ্নেরই জবাব দিয়েছেন তা নয়- বরং অনেক ক্ষেত্রে তার বক্তব্যে ধৈর্য ও সহনশীল হওয়ার জন্য সাংবাদিকদের মাধ্যমে আমাদেরও সচেতন করেছেন। বিশেষ করে, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে টাইগারদের ব্যর্থতায় আমাদের তিনি হতাশ না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন ‘সবসময় ব্যাটে বলে মিলে না’। প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্বের মুখ থেকে এমন ধৈর্য ও সহনশীলতার বার্তা যে কোনো পরিস্থিতিতে আমাদের সুস্থির থাকার প্রেরণা জোগায়। তিনি যদি বলতেন ‘হ্যাঁ, এমন টি-টোয়েন্টি দল দিয়ে আমাদের চলবে না, দ্রুত সব বদলিয়ে ফেল’- তবে তা সময়ের বিবেচনায় কখনো না কখনো হঠকারিতাকেই স্পষ্ট করত। বরং তিনি বলেছেন আরো ‘অনুশীলন করতে হবে, সে দিকেই মনোযোগ দিতে হবে’। একজন অভিভাবকের কণ্ঠস্বর তো এমনই হওয়া উচিত। আর সেই ঔচিত্যবোধ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো জননেত্রী শেখ হাসিনাও যে অত্যন্ত আন্তরিকভাবে লালন করেন তা স্পষ্ট। বলাবাহুল্য, পারিবারিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাদৃষ্টে ধৈর্য ও সহনশীলতাসহ তার কাছ থেকে অনেক কিছুই আমাদের শিক্ষার আছে। বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ও চিকিৎসা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনার বক্তব্য সাময়িকভাবে অনেকের কাছে ‘তিতা’ লাগতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের সামগ্রিক ইতিহাসের পটভূমিতে বিবেচনা করলে দেখা যাবে শেখ হাসিনার বক্তব্য এবং অবস্থান যথার্থ, সহনশীল এবং মানবিকতায় অনুজ্জ্বল নয়।
বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসাগ্রহণের বিষয়ে প্রতিদিনই কোনো না কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য এবং দলীয় ব্রিফিং শুনতে পাই। তার পরিবারের পক্ষ থেকেও সরকারের কাছে বারবার এরূপ আবেদন করার বিষয়ও গণমাধ্যমে দেখছি। বেগম জিয়া একাধিক মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী হলেও আইনের বিচারে বর্তমানে তিনি দণ্ডিত ও সাজাপ্রাপ্ত আসামি- এই বাস্তবতা অস্বীকারের কোনো উপায় নেই। করোনা মহামারি শুরু হলে ২০২০ সালে মানবিক কারণে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতায় তাকে নিজের বাড়িতে অবস্থান ও চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়। অপরাধ প্রমাণ হওয়ায় শাস্তি নিশ্চিত ও দণ্ডিত ব্যক্তিকে কারাগারের বাইরে অবস্থানের এই ঘটনা বিরল। তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং বয়স বিবেচনায় সরকার তাকে এই সুযোগ-সুবিধাটি দিয়েছে। খালেদা জিয়ার পরিবার ও তার দলের পক্ষ থেকে দেশের বাইরে গিয়ে চিকিৎসাগ্রহণের অনুমতি চেয়ে গণমাধ্যমকে একাধিকবার ব্যস্তও করেছে। বিএনপির পাশাপাশি তার শরিক দলের অনেকেই এই একই দাবি বারবার উসকে দিয়ে প্রতিদিন খবর তৈরি করে চলেছেন। কিন্তু সরকারের দাবি তারা ‘যথেষ্ট মানবিক’ বলেই তিনি কারাগারের বাইরে নিজের বাড়িতে অবস্থান করতে পারছেন। তাদের বিবেচনায় এটাই যথেষ্ট! গত বছরও এই বিষয়ে গণমাধ্যমে আমরা টানটান অবস্থা দেখেছিলাম। আইনমন্ত্রী সে সময় বলেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া যে সুযোগটি পেয়েছেন তা দণ্ডিতেরা সাজাপ্রাপ্ত অবস্থায় একবারই ভোগ করতে পারেন এবং সেটি ইতোমধ্যে তিনি ভোগও করছেন। পরবর্তীতে দণ্ডিত ব্যক্তির মুক্তি বা কাক্সিক্ষত বিদেশ ভ্রমণ বা চিকিৎসাগ্রহণের জন্য যে পথটি খোলা থাকে তা হলো রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা। সবারই জানা, মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে কোনো দণ্ডিত ব্যক্তি দণ্ড মওকুফের আবেদন করলে তাকে দোষ স্বীকারের মাধ্যমে আর্জি জানাতে হয়। দল হিসেবে এবং রাজনৈতিক কারণেই বিএনপি হয়তো তা করবে না। বেগম জিয়ার চিকিৎসার বিষয়টি জরুরি বলে বিএনপি এবং তার সমমনা দলগুলোর দাবি। জরুরি হলে রাষ্ট্রপতির কাছে কেন দণ্ড মওকুফের আবেদনটি করবেন তা সরলমতির সাধারণ মানুষকে ভাবায় বটে। তিনি যে দোষী তা দেশের আইন ও আদালতে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত- তাই তিনি সাজাপ্রাপ্তও। এই বাস্তবতা সবাই অবগত। বিদেশে চিকিৎসাগ্রহণ সত্যিই জরুরি হলে রাজনৈতিক ‘ইগো’ ধরে রাখতে গিয়ে শুধু শুধু জীবন নিয়ে খেলার কোনো অর্থ হয় না বলেও সরলমতি সাধারণের অভিমত। আগে জীবন, পরে রাজনীতি ও অন্য কিছু। কিন্তু বিদেশে চিকিৎসার নামে প্রকৃতপক্ষে দলটির ভেতর-বাইরে কী ঘটছে তা বোঝা মুশকিল!
বিদেশে চিকিৎসাগ্রহণের ব্যাপারে শুধু বেগম খালেদা জিয়াই নন, এ দেশের সাধারণের মধ্যেও যে আগ্রহ তা নিয়ে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের চিকিৎসা শাস্ত্র এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি আশঙ্কা অনেকের মধ্যে কাজ করে। অন্তর্গত এক প্রশ্ন সবসময়ই আমাদের বিচলিত করে- আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা আসলে কোথায় যাচ্ছে! দক্ষ ডাক্তার তৈরিতে মনোযোগ নেই, যদিও বা কখনো হাতেগোনা দুয়েকজন দক্ষ ডাক্তারের সন্ধান মেলে; কিন্তু সেখানে মাত্রাতিরিক্ত রোগীর চাপে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া নানাভাবে ‘অস্বাস্থ্যকর’ হয়ে ওঠে! আর হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার কথা না বলাই ভালো!
স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার উন্নতি হয়েছে। তবে এ কথাও সত্য যে, চাহিদা এবং বৈশ্বিক মান বিবেচনায় চিকিৎসা ক্ষেত্রের সাফল্য নিয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার অবকাশ নেই। তাই পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ অন্যান্য দেশে চিকিৎসাসেবা গ্রহণকারীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। উচ্চবিত্তের মানুষের পাশাপাশি সচ্ছল মধ্যবিত্তও এখন দেশের চিকিৎসার মান এবং ব্যবস্থাপনার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছে। বাইরের দেশে চিকিৎসাগ্রহণে মানুষের এমন প্রবণতায় প্রমাণ হয় প্রায় সমান খরচে বাংলাদেশের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি উন্নতমানের সেবা অন্য যে কোনো দেশেই পাওয়া সম্ভব। পাসপোর্ট ও ভিসা জটিলতা না থাকলে এ সংখ্যা হু হু করে বাড়ত। উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের গণ্ডি পেরিয়ে তা নিম্নবিত্তকেও প্রভাবিত করত। দেশে একে তো দক্ষ চিকিৎসকের স্বল্পতা তারপর আবার সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নানা রকমের জটিলতা এই উভয় সংকটই মানুষকে চিকিৎসা গ্রহণে বহির্মুখী করে তুলছে। আমাদের দেশের সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার কথা বাদ দিলেও বলা যায় বেসরকারি খাতের চিকিৎসা খাতও ততটা দক্ষতা অর্জনে সক্ষম হয়নি। যে দক্ষতাগুণের কারণে প্রায় একই খরচে বিদেশ থেকে বহুগুণ উন্নতমানের সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত হয়। দেশের মন্ত্রী আমলা থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদদের বিদেশে চিকিৎসাগ্রহণের আধিক্য আমাদের স্বাস্থ্য খাতকে আরো দুর্বল ও আত্মবিশ্বাসহীন করে তুলছে। জননেত্রী শেখ হাসিনার ছবিসংবলিত একটি বাণী ঢাকার অনেক হাসপাতালের গেটের সামনে টানানো আছে। সেখানে তার উদ্ধৃতিতে বলা আছে ‘আমি কখনো অসুস্থ হয়ে পড়লে আমাকে বিদেশে না নিয়ে দেশেই চিকিৎসা করাবেন।’ শেখ হাসিনার এ বাণী সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সামগ্রিকভাবে ডাক্তার সমাজকেও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ গড়তে হলে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর বিকল্প নেই। শেখ হাসিনার প্রেরণা সবার মধ্যে সঞ্চারিত হলে আমাদের স্বাস্থ্য খাত ক্রমান্বয়ে সুগঠিত এবং সক্ষম হবে। বিগত কয়েক বছর ধরে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ ভারতকে পেছনে ফেলার সক্ষমতা দেখিয়েছে। অর্থনীতিবিদরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন বাংলাদেশ তার এই অবস্থান ২০২৫ সাল পর্যন্ত ধরে রাখতে পারবে। কিন্তু চিকিৎসা খাতে ভারতের কাছাকাছি পৌঁছতে আমাদের কত সময় লাগবে বলা কঠিন! বর্তমানের এই গতি নিয়ে স্বাস্থ্য খাতটি এগোতে থাকলে, নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানো আমাদের পক্ষে দুরূহ হয়ে পড়বে। আদৌ পৌঁছাতে পারব কি না তাই সন্দেহ। সরকার এবং পেশাসংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিকতায় স্বাস্থ্য খাতও ‘২০৪১ সালের উন্নত ও সমৃদ্ধ’ রাষ্ট্রের উপযোগী হোক। স্বাস্থ্য খাতে বিদেশনির্ভরতা আর নয়।
আহমেদ আমিনুল ইসলাম : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়