আপনাকে পড়েছি পড়তেই থাকব

আগের সংবাদ

প্রসঙ্গত স্বাস্থ্যসেবায় বিদেশ নির্ভরতা নয় : সহনশীলতায় অনন্য শেখ হাসিনা

পরের সংবাদ

অনন্ত হাঁ মুখের ঝুলন্ত শিকার

অনলাইন ডেস্ক

কলাম লেখক

প্রকাশিত: নভেম্বর ২১, ২০২১ , ১:৪৬ পূর্বাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২১, ২০২১ , ১:৪৬ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনেকগুলো বছর কেটে গিয়েছে। পতাকা উড়িয়ে, মাইক বাজিয়ে ঘটা করে আমরা স্বাধীনতা দিবস পালন করি প্রতি বছর। উৎসবের ঘনঘটার কোনো কমতি নেই, আবার জনজীবনে আঁধার নামতেও কোনো কমতি নেই। যত ভিড়, ততই যেন নির্জনতা। বিশেষ করে বাংলার মেয়েদের নিয়ে আশঙ্কার জায়গাটি কমছে না, বরং যেন বেড়েই চলেছে সময়ের হাত ধরে। রামমোহন, বিদ্যাসাগর মেয়েদের স্বাধীনতা নিয়ে সে কথা আগেই বলেছেন, কাজ করেছেন। তারপর কত সময় পার হয়েছে, কত জল গড়িয়েছে নদী-সমুদ্রে। কিন্তু এখনো মেয়েদের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হয়, কাজ করতে হয়। এখনো কারো কারো মনে প্রশ্ন জাগে- স্ত্রী স্বাধীনতা থাকলে, পুং স্বাধীনতা শব্দটির অস্তিত্ব নেই কেন? স্বাধীনতা যেন পুরুষের জন্মগত অধিকার! এ নিয়ে কথা বলার কিছু নেই! নারীর ক্ষেত্রে স্বাধীনতা প্রদানের কথাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নারীকে স্বাধীনতা দিতে হয়। তাদের জন্য পুরুষের মতো করে স্বাধীনতা নিজে অর্জনের বস্তু নয়। আপনার প্রতিবেশীর বাড়িতে খোঁজ নিলে দেখবেন, ভদ্রলোক চেঁচামেচি করছেন- ‘যতই স্বাধীনতা দিই, তুমি ততই মিস ইউজ করো। বাড়িতে ছেলে কাঁদছে, তারপরও তুমি নিউমার্কেটে যেতে চাইলে! বললাম- যাও। কিন্তু তাই বলে সন্ধ্যে পার করে বাড়িতে ফিরবে?’ স্কুলের মাঠে অপেক্ষারত ছোট ছেলে-মেয়েদের মায়েদের অনেকের মুখেই শুনবেন, বাড়িতে আমাকে প্রচুর স্বাধীনতা দেয়। এভাবে বলতে তাদের আত্মসম্মানে লাগে না। তারা বুঝতেই ভুলে গিয়েছে- স্বাধীনতা নিঃশ্বাস নেয়ার মতো স্বাভাবিক ঘটনা; এটা চামচ দিয়ে মুখে তুলে দেয়ার বিষয়বস্তু নয়।
আমরা তো মেনেই নিয়েছি অসাম্যের এ বিধানকে। আমরা মেনেই নিয়েছি, আমাদের চারদিকে ছড়ানো-ছিটানো থাকতেই পারে যৌনদাসীদের অস্তিত্ব। কোনো এক যৌনদাসী আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘যেদিন ১০ জনকে নিয়ে শুতে হতো, সেদিনটি আমার জন্য ভালো দিন হিসেবেই ধরতাম।’ এ প্রকট সমস্যা শুধু ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল কিংবা ফিলিপিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বছর তিরিশের স্যান্ড্রা এখনো শিউরে ওঠেন নিজের পুরনো দিনের কথা ভেবে। ম্যাক্সিকোর ১৯ বছরের তরুণীকে অপহরণ করে নিয়ে আসা হয় আমেরিকায়। রাতারাতি তিনি বনে যান যৌনদাসী। তার দালাল অ্যালফ্রোডার ইচ্ছানুসারে তাকে যেতে হতো নানা জায়গায়। মেটাতে হতো অসংখ্য পুরুষের ক্ষুধা। নিজের খিদে পাক, তেষ্টা পাক- কাজের সময় এসবের কোনো সুযোগ নেই। সামান্য প্রতিবাদে জুটেছে অকথ্য গালাগালি আর শারীরিক নির্যাতন। শেষ পর্যন্ত কীভাবে পালিয়ে বেঁচেছিলেন, সে গল্পও তার কম রোমাঞ্চকর নয়। ইংল্যান্ড থেকে মায়ের সঙ্গে গ্রিসে বেড়াতে এসেছিল ১৪ বছরের মেগান স্টিফেন্স। রাতারাতি প্রেমে পড়ে গিয়েছিল এক তরুণের সঙ্গে। প্রেমিকবেশি দালালের প্রেমের ফাঁদে পা দিতে গিয়ে এক চোরাবালিতে তলিয়ে গিয়েছিল মেগান। মেগানের কথায়, ‘যতদিন আমি বুঝতে পেরেছিলাম ক্ষতিটা ঠিক কত বড়, ততদিনে আর কিছু হারানোর বাকি ছিল না।’ স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও এখনো কথা বলতে গেলে আর্তনাদের মতো হয়ে ওঠে তার কণ্ঠস্বর।
স্যান্ড্রা কিংবা মেগান, আলেয়া কিংবা লক্ষ¥ী- এমন রাশি রাশি নাম পাশাপাশি বসিয়েও এ তালিকা শেষ করা যাবে না। জাতিসংঘের হিসাব বলছে, পৃথিবীজুড়ে যত মানুষ পাচার হয়ে যায়, তাদের ৮০ শতাংশই আসলে যৌনদাসী হিসেবে। সারা পৃথিবীতেই যুবতী আর কিশোরীদের ব্যবহার করা হয় যৌনতার অনন্ত হাঁ মুখের ঝুলন্ত শিকার হিসেবে। যৌন ব্যবসাকে যে পৃথিবীর আদিমতম ব্যবসা বলা হয়, এ কথা সবারই জানা। যৌনদাসীরা সেই আদিম ব্যবসারই অংশ। দেহব্যবসাকে আইনি স্বীকৃতি দেয়া উচিত কিনা, তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত আছে। পরিসংখ্যান বলছে, ১০৯টি দেশে যৌনব্যবসা বেআইনি। আবার ৭৭টি দেশে এ পেশাকে আইনি স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। তবে দেহ ব্যবসা পেশাজীবী এবং যৌনদাসীর মধ্যে যে পার্থক্য বিদ্যমান, তা স্বীকার করার পক্ষে সবাই। সেক্ষেত্রে ‘যৌনদাসী’ নামক ঘৃণ্য শব্দটিকে পৃথিবী থেকে চিরতরে মুছে দিতে সবাই একমত। কিন্তু সমাজ থেকে আজো তা দূর হয়ে যাচ্ছে না। ঠিক কত পুরনো এই যৌন দাসত্ব? রোজমেরি বেগেলো তার ‘হিস্ট্রি অব সেক্সুয়াল সেøভারি’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ‘প্রাচীন গ্রিস ও রোমেও যৌনদাসীর প্রচলন ছিল। ইতিহাস এভাবেই পদে পদে বুনে রেখেছে নারীদের লজ্জার জলছাপ।’ জাপানের ‘কমফোর্ট উইমেন’-এর কথা কি মনে আছে কারো? জাপানি সেনাদের তুষ্ট করতে কোরিয়া, নেদারল্যান্ডস বা জাপানের হতভাগ্য মেয়েদের ধরে এনে যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করা হতো। অন্তত দু’লাখ নারীকে এভাবে সেনার বিনোদনে ব্যবহার করার হিসাব মিলেছে। তবে অনেক সময় চূড়ান্ত অসহায়তার মধ্যেও জেগে ওঠে প্রতিরোধের আগুন। আইসিস জঙ্গি নেতা আবু আনাসকে গুলি করে হত্যা করেন তার এক যৌনদাসী। অন্যদিকে এ দলে নাদিয়া মুরাদও আছেন। যৌনদাসী থেকে নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী হয়ে ওঠার রূপকথার কাহিনী গড়ে নাদিয়া নারীমুক্তির ক্ষেত্রে চূড়ান্ত এক নিদর্শন হয়ে আছেন। নাদিয়া বর্ণনা দিয়েছেন, কীভাবে আইসিস জঙ্গিরা তার ছয় ভাইসহ গ্রামের পুরুষদের খুন করে সমস্ত নারীকে অপহরণ করেছিল। ইয়াজিদি এ নারী হার মানেননি। পালাবার চেষ্টা করে গণধর্ষিতা হয়েছিলেন। তবুও শেষ পর্যন্ত তিনি পালিয়ে আসতে পেরেছিলেন। নাদিয়ার জীবনের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়- নারীর একলা রুখে দাঁড়ানো, খাদের ধার থেকে ফিরে আসার গল্প ইতিহাসের পাতায় এক দীর্ঘ অধ্যায়ের অংশ। নাদিয়ার নোবেল বিজয় পুরো বিশ্বকেই মনে করিয়ে দেয়- মানুষ ধ্বংস হতে পারে, হার মানতে পারে না।
পুরুষ-মহিলা সাম্যের নিরিখে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। লিঙ্গ বৈষম্যের সূচকে বাংলাদেশের স্থান লজ্জাজনক। কোভিড অতিমারি আবার বাংলাদেশের মেয়েদের বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। মেয়েরা বেশি কাজ হারিয়েছেন। ডিজিটাল প্রযুক্তির নাগাল না পাওয়াতে মেয়েদের পড়াশোনার বেশি ক্ষতি হয়েছে। গৃহহিংসা বেড়েছে। বাংলাদেশে নারীদের স্বাধীনতা এখনো পড়ে আছে পুরুষদের ছাড় দেয়ার মধ্যে। আজো স্বাধীনতা অর্জন করে নিতে পারছেন না বাংলাদেশের নারীরা। পুরুষ যেটুকু ভিক্ষা দিচ্ছে, নারী তাকেই তার ‘স্বাধীনতা’ নামের বিলাসিতা ভেবে গ্রহণ করছেন। নারী হচ্ছে অসাম্য সমাজের এক নির্ধারিত শাস্তির প্রতিনিধি।
মেজর (অব.) সুধীর সাহা : কলাম লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়