ক্রিকেট নিয়ে গ্রহণযোগ্য সমালোচনা হোক

আগের সংবাদ

জলবায়ু পরিবর্তন ও বাংলাদেশের অবস্থান

পরের সংবাদ

বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক চেতনার মর্মই উপলব্ধি করতে হবে

আহমেদ আমিনুল ইসলাম

অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: অক্টোবর ৩১, ২০২১ , ৬:৩৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ৩১, ২০২১ , ৬:৩৫ পূর্বাহ্ণ

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সব সম্প্রদায়ের মানুষই মাতৃভূমির জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। এই দেশ তাই সবার। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও এদেশে ‘সংখ্যালঘু’ বলে সম্বোধনের মাধ্যমে কোনো সম্প্রদায়কে মনস্তাত্ত্বিক হীনমন্যতায় ফেলা যাবে না। এটিই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, আওয়ামী লীগের আদর্শ। সম্প্রতি দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাও হিন্দু সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে দৃঢ়কণ্ঠে এ কথাই উচ্চারণ করেছিলেন। উচ্চারণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী লীগের আদর্শের কথা। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ঠিকই জানতেন একশ্রেণির মানুষ এ আদর্শ থেকে বিচ্যুত হতে পারেন। তাই তিনি সবসময়ই বলতেন : ‘সাম্প্রদায়িকতা যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বাংলাদেশ। মুসলমান তার ধর্ম পালন করবে। হিন্দু তার ধর্ম পালন করবে। বৌদ্ধ তার ধর্ম পালন করবে। কেউ কাউকে বাধা দিতে পারবে না।’ তিনি আরো বলেছিলেন : ‘পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না।’ বলেছিলেন : ‘ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করা যাবে না।’ শুধু হিন্দুদের দিয়ে যেমন সোনার বাংলা গড়ে তোলা সম্ভব নয়, তেমনি শুধু মুসলমানদের দিয়েও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। সম্ভব নয় কেবল বৌদ্ধ বা কেবলমাত্র খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তোলা। এ দেশের মাটিতে যে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের দাগ লেগে আছে তা ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে যেমন চিহ্নিত সম্ভব নয়, তেমনি বাংলাদেশের আকাশে বাতাসে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অসহায় আড়াই লাখের বেশি নারীর নির্যাতন ও নিপীড়নের যে হাহাকারের আর্তনাদ ভাসমান তাও সম্প্রদায় নির্বিশেষে চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। কাজেই এ দেশ কোনো একক সম্প্রদায় বিশেষের নয়। যুদ্ধকালীন প্রেরণায় আমরা এ কথা উপলব্ধি করেছিলাম। তাই গানে গানে তখন প্রায়শই উচ্চারিত হয়েছিল অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অমিয় সঙ্গীত : ‘চাষাদের মুটেদের মুজুরের/ গরিবের নিঃস্বের ফকিরের/ আমারই দেশ সব মানুষের, সব মানুষের, সব মানুষের/ ছোটদের বড়দের সকলের/ গরিবের নিঃস্বের ফকিরের/ আমারই দেশ সব মানুষের, সব মানুষের, সব মানুষের/ নেই ভেদাভেদ হেথা কুলি আর কামারের/ নেই ভেদাভেদ হেথা চাষা আর চামাড়ের/ হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান- হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান দেশমাতা এক সকলের।’ কিন্তু স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বর্ষে আমরা যখন সম্প্রদায় বিশেষের ওপর ধর্মপালনে আঘাত ও আক্রমণ দেখি তখন বিস্মিত না হয়ে পারি না! যখন কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উপাসনালয় সাম্প্রদায়িক ক্রোধের আগুনে পুড়তে দেখি তখন আমরা বিমর্ষ বোধ করি! বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক ক্রোধ ও ঘৃণার এই বীভৎস রূপ বঙ্গবন্ধু চিন্তাও করেননি। আমরা কী শিক্ষা, কী আদর্শ, কী মন্ত্রের জোরে- কীভাবে নিজেদের ভেতরকার অশুভ এক দানবীয় শক্তি লালন করে চলেছি জানি না! তবে এটা জানি, এরূপ বাংলাদেশের জন্য ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়নি। আর জানি ধর্ম নিরপেক্ষ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রকাশের মধ্য দিয়েই আমাদের বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়ন করতে হবে।
কোনো কোনো রাজনৈতিক বলয় থেকে সরকার পতনের জন্য সবাইকে রাস্তায় নামার আহ্বান জানানো হয়েছে! এদের মধ্যে সম্প্রতি আবার ড. কামাল হোসেনকেও দেখলাম! বাংলাদেশে ড. কামাল হোসেন একজন অনন্য মেধাবী ব্যক্তিত্ব। কিন্তু তিনি সরকার পতনের লক্ষ্যে যে আহ্বান জাতির সম্মুখে প্রকাশ করেছেন তা বাস্তবায়ন করা তার পক্ষে কতটা সম্ভব সে বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতাদের মধ্যেও অন্যতম ব্যক্তিত্ব। নানা বিষয়ে তার মেধা ও প্রজ্ঞা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পাথেয় হতে পারে। কিন্তু তার সে মেধা বা প্রজ্ঞা রাজনীতির বিভ্রান্তিকর গোলকধাঁধায় কেমন যেন খেই হারিয়ে ফেলেছে। নানা বিষয়ে তার দক্ষতা থাকলেও রাজনীতিতে তিনি কতটুকু সফল তা এ দেশের মানুষ বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতাকালে গভীরভাবেই উপলব্ধি করেছে। বলতে গেলে তার সামগ্রিক জীবনে রাজনৈতিক কোনো সাফল্য বা ‘অর্জন’ যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তবে দেখতে পাব তার পুরোটাই বঙ্গবন্ধুর শাসনামলেই সম্ভব হয়েছিল। অর্থাৎ তার ‘রাজনৈতিক পরিচয়’ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কল্যাণেই বিশ্ববাসীর কাছে উন্মোচিত হয়েছিল। বিভিন্ন বক্তৃতা-ভাষণে তিনি যে বঙ্গবন্ধুর প্রতিই আস্থাশীল তাও বোঝানোর চেষ্টা করেন। বিগত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে সৃষ্ট নানামুখী জটিলতায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে বারবার তিনি বলার প্রয়াস পেয়েছেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে বর্তমানের আওয়ামী লীগের কোনোই সম্পর্ক নেই! কামাল হোসেনের আক্ষেপোক্তির আবেগিক মূল্য যে নেই সে কথাও বলা যাবে না। তবে জননেত্রী শেখ হাসিনার চেয়ে তিনিই বঙ্গবন্ধুকে বেশি গভীরভাবে উপলব্ধি করেন এ কথা মেনে নেয়াও কষ্টকর। আমরা মনে করি সময়ের নানা বাঁকের বিচিত্র চাহিদা মিটিয়ে মানুষ যেমন পরিবর্তনকে মেনে নিয়ে বিকশিত হয় তেমনি যে কোনো সংগঠনকেও যুগের দাবি পূরণ করে আধুনিক মানুষের আশ্রয়ে পরিণত হতে হয়। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে অনেক রূপ-রূপান্তরকে গ্রহণ করেছে, বর্জনও করেছে। শুধু আওয়ামী লীগ নয়, নিয়মিত গ্রহণ-বর্জন ও পরিবর্তন-পরিবর্ধনের মধ্য দিয়েই রাজনৈতিক দলসমূহ নিজেদের অস্তি¡কে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে, করছেও। তিনিও নানা পরিবর্তনকেই মেনে নিয়েছেন। আর মেনে নিয়েছেন বলেই আমরা দেখি ২০ দলীয় জোটের সঙ্গেও তার সখ্য রাখতে হয়েছিল, হচ্ছেও! এবং এখনো এমন অনেক রাজনৈতিক সংগঠনের সংস্পর্শে নিজেকে যুক্ত করেছেন বেঁচে থাকলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু লজ্জাই পেতেন না তাকে রূঢ়ভাবে তিরস্কারও করতেন।
বঙ্গবন্ধু একদা বলেছিলেন : ‘অযোগ্য নেতৃত্ব, নীতিহীন নেতা ও কাপুরুষ রাজনীতিবিদদের সঙ্গে কোনোদিন একসঙ্গে হয়ে কাজে নামতে নেই। তাতে দেশ সেবার চেয়ে দেশের ও জনগণের সর্বনাশই বেশি হয়।’ সাম্প্রতিককালে কেবল মাত্র আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু বর্ণিত ওপরের সব নেতিবাচক প্রত্যয় ধারণ করে টিকে থাকা দল ও নামমাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে কামাল হোসেনের ঐক্য ও সখ্য। এতে দেশের মানুষের কতটুকু কল্যাণ নিহিত আছে তাও বিরাট প্রশ্ন সাপেক্ষ বিষয়!
আওয়ামী লীগ টানা তিন মেয়াদে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন। তাই তাকে হটিয়ে নতুন কোনো সরকার আনতে হবে! এই যুক্তির ওপর ভর করে দেশের ভেতর নানা রকমের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়েছে। ‘সাম্প্রদায়িক হামলা’ বলে আমরা অনেকে দুর্গাপূজাকালীন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ-আঘাতকে বয়ান ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে গণমাধ্যম গরম করে ফেলছি বটে; কিন্তু এ পশ্চাতের সূ²াতিসূ² কার্যকারণের অনুসন্ধান করছি না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বহুবিধ সুবিধা থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় প্রচারাধিক্যের কারণে প্রকৃত ঘটনা ধামাচাপাই পড়ে যায়। আওয়ামী লীগ ১২ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে দেশের নানা ক্ষেত্রে যে উন্নয়ন সাধিত হয়েছে স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশে বাকি ৩৮ বছরেও সম্ভব হয়নি।
কামাল হোসেন কিংবা মান্না সাহেবরা জননেত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে সম্ভব হওয়া এ উন্নয়নকে ভালো চোখ তো দূরের কথা চোখেই যেন দেখতে পান না। তারা মানুষের কাছে ঝুড়িভরা গণতন্ত্রের কথা বললেও যে বিএনপির হয়ে পরোক্ষ এবং কখনো কখনো প্রত্যক্ষভাবে তারা কাজ করছেন সেই বিএনপির আমলে গণতান্ত্রিক যে সমাজব্যবস্থার করুণ চিত্র দেখে মান্না সাহেব ও অন্যান্য অনেকেই আওয়ামী লীগের নৌকায়ই উঠেছিলেন! আবার যে গণতন্ত্রের কথা বলতে বলতে অনেকেই গলদঘর্ম হয়েছেন সেকালের ‘সুষ্ঠু’ নির্বাচনেও তারা জনগণের রায় নিয়ে মহান সংসদের দরজা নাগাদ আসতে পারেননি। এসব ব্যক্তিগত আক্রমণ বা সমালোচনা নয়- প্রসঙ্গত উচ্চারিত নামমাত্র। এরকম অনেক নেতা ও রাজনৈতিক দলকে আমরা দেখেছি। শেষ পর্যন্ত এদের সবার মধ্যে আসলে ‘আওয়ামী বিরোধিতা’ এবং ‘সরকার পতন’ একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে উঠেছে! জাতির কল্যাণ নয়- আওয়ামী লীগের এই সরকারকে উৎখাতের নানারূপ চেষ্টা ২০ দলীয় জোটসহ আরো কিছু অতিশয় উচ্চাকাক্সক্ষী মানুষের স্বপ্ন ও সাধনায় পরিণত হয়েছে।
তারা তাদের স্বপ্ন সাধনা মনের মধ্যে গোপন রেখে সামাজিক ও ধর্মভিত্তিক কিছু রাজনৈতিক দলের আন্দোলনের ভেতর ঢুকে অপকৌশল ও ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে। অতীতে দেখেছি কিশোর আন্দোলন বা হেফাজতের ভাস্কর্যবিরোধী আন্দোলনে বিশেষ একটি গোষ্ঠী ‘হাওয়া’ দিয়ে গেছেন সরকার পতন ও ক্ষমতালাভের স্বপ্ন নিয়ে! মানুষের উদ্দেশ্য সৎ এবং মহৎ না হলে তার পক্ষে সাফল্য পাওয়া কঠিন। আমরা গত ১২ বছরে এ দেশের সাধারণ মানুষের নৈমিত্তিক জীবনের দাবি-দাওয়া নিয়ে কাউকেই তো রাজপথে দাঁড়াতে দেখলাম না! দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য ভালো কাজ করলেও কেবল ১২ বছর ক্ষমতায় আছে বলেই তাকে টেনে-হিঁচড়ে নামাতে হবে, রাজপথ দখল করতে হবে আশ্চর্য! আর তারই জন্য বাঙালির হাজার বছরের শাশ্বত অসাম্প্রদায়িক চেতনা বোধকেও আঘাত করতে হবে?
বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক চেতনার মর্ম উপলব্ধির মাধ্যমেই সব ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করতে হবে।
আহমেদ আমিনুল ইসলাম : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়