ভিন্ন ধর্মের প্রতি সহনশীলতা

আগের সংবাদ

বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকট নিরসন চাই

পরের সংবাদ

মৎস্য জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জনসচেতনতা

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৮, ২০২১ , ১২:৩৩ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ২৮, ২০২১ , ১২:৩৩ পূর্বাহ্ণ

আমরা বাঙালি। আমাদের বলা হয় মাছে-ভাতে বাঙালি। মাছ আর ভাত আমাদের পুরনো ঐতিহ্য। কিন্তু আজ সেই ঐতিহ্য ধ্বংসের মুখে। জলাশয়ে বিষ প্রয়োগে মাছ শিকারের ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এর ফলে মাছের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জলজ প্রাণী মারা গিয়ে একদিকে যেমন পরিবেশের ওপর পড়ছে বিরূপ প্রভাব পড়ছে, অন্যদিকে বিষ প্রয়োগে শিকার করা মাছ খেয়ে মানুষসহ অন্যান্য প্রাণী স্বাস্থ্যগতভাবে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। পত্র-পত্রিকায় প্রতিনিয়ত এ জাতীয় খবর প্রকাশিত হলেও তা অবস্থার কোনো উন্নতি হচ্ছে বলে মনে হয় না। গত কয়েক মাসে প্রকাশিত দেশের দৈনিক পত্রিকা পর্যবেক্ষণ করলেই এর সত্যতা বেরিয়ে আসে। আর আমরা জানি বাস্তবে যা ঘটে তার খুব কম অংশই পত্রিকায় আসে। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার মাছ বিষ প্রয়োগে মারা হচ্ছে। এতে শত শত মাছের প্রজাতি ধ্বংসের পাশাপাশি মৎস্য প্রজনন চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ মৎস্য ভাণ্ডার শূন্য হচ্ছে। সরকার হারাচ্ছে কোটি টাকার রাজস্ব। আর আমরা খাচ্ছি বিষাক্ত খাবার অনুপযোগী মাছ।
যদি আমরা একটু লক্ষ করি আমাদের বৃহৎ প্রাকৃতিক সম্পদ মানগ্রোভ বন সুন্দরবনের দিকে, যেখানে ৬ হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটার আয়তনবিশিষ্ট সুন্দরবনের স্থলভাগের পরিমাণ ৪ হাজার ১৪৩ বর্গকিলোমিটার ও জলভাগের পরিমাণ ২ হাজার ৮৭৪ বর্গ কিলোমিটার। সুন্দরবন বন বিভাগ পূর্ব ও পশ্চিম এ দুভাগে বিভক্ত। দুই বিভাগে মোট ৪টি রেঞ্জ রয়েছে। সুন্দরবনের মধ্যে ৪ শতাধিক খাল রয়েছে। এসব খাল-নদী পরিদর্শন করার জন্য ৭৬টি ক্যাম্প ও মাত্র ১৭৮ জন বন প্রহরী আছেন। যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম। এত কম সংখ্যক প্রহরী এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার জন্য সুন্দরবনের ঐতিহ্য এবং জীববৈচিত্র্য আজ ধ্বংসের দিকে।
আর এভাবে যদি মৎস্য শিকার চলতে থাকে তাহলে আমাদের দেশে মৎস্য সম্পদের বৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাবে। মৎস্য সম্পদের যদি প্রজনন ক্ষমতা এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিতে না পারি তারা হুমকির মুখে চলে যাবে। এক তথ্য মতে, বাংলাদেশ ২০১৭ সালে মাছ উৎপাদনে তৃতীয় স্থান লাভ করে এবং প্রাণিজ আমিষের ৫৮ শতাংশ আসে মাছ থেকে। আবার বিশ্বে গড়ে প্রাণিজ আমিষের ২০ শতাংশ আসে কেবল মাত্র মাছ থেকে। ২০১০ সালের জরিপ মতে, একজন লোক বছরে ১২ কেজি মাছ খায়। এখন সেটা ৩০ কেজিতে পৌঁছেছে। দেশের জিডিপিতে কৃষির অবদান ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ, যার এক-চতুর্থাংশ অবদান এককভাবে মৎস্য খাতের। প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার মাছ বিষ প্রয়োগে মারা হচ্ছে। এতে অভ্যন্তরীণ মৎস্য ভাণ্ডার শূন্য হচ্ছে। সরকার হারাচ্ছে কোটি টাকার রাজস্ব। আর আমরা খাচ্ছি বিষাক্ত খাবার অনুপযোগী মাছ। এভাবে আস্তে আস্তে একদিকে যেমন বনের গহিনে থাকা বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও মাছের পোনা ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে বিষ প্রয়োগ করে শিকার করা মাছ খেয়ে জনসাধারণ পেটের পীড়াসহ নানান জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এছাড়া বিষ প্রয়োগকৃত পানি পান করে বাঘ, হরিণসহ বনের নানা প্রাণীও বিভিন্নভাবে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। বন বিভাগ মাঝে মধ্যে এসব মৎস্য দস্যুদের আটক করলেও বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার কোনোভাবেই রোধ করা যাচ্ছে না। বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে মৎস্য আহরণ করলে মাছের বৈচিত্র্য ধ্বংসের দিকে চলে যাবে। বিষাক্ত কীটনাশক প্রয়োগের ফলে পানির মধ্যে থাকা সব মাছ ও পোনা নির্বিচারে মারা যাচ্ছে। ইকো সিস্টেমের জন্য এটি মারাত্মক হুমকি। আবার এরই ফলে ব্যাহত হচ্ছে প্রজনন প্রক্রিয়া। এছাড়া বিষ মিশ্রিত পানি খেয়ে ম্যানগ্রোভ বনের বিভিন্ন প্রাণী নানান জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অপরদিকে কীটনাশক প্রয়োগ করে মাছ ধরে বাজারে অবাধে বিক্রি হওয়ায় জনসাধারণ এক প্রকার না জেনেই এসব মাছ অহরহ কিনে অজান্তেই নিজেদের জটিল রোগে আক্রান্ত করছেন।
বিভিন্ন তথ্যমতে বোঝা যায়, পূর্ব ও পশ্চিম বন বিভাগে কয়েক বছর ধরে চলছে সর্বনাশা এই মাছ শিকার। এর সঙ্গে এক শ্রেণির মাঠ পর্যায়ের অসাধু বন কর্মচারী ও বনদস্যু বাহিনীগুলো সাপ্তাহিক চুক্তিভিত্তিক উৎকোচ গ্রহণ করে এই কর্মকাণ্ডের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছে। প্রতি বছর পূর্ব ও পশ্চিম বন বিভাগ থেকে কোটি কোটি টাকার মাছ বিষ দিয়ে মারা হয়। এরা আবার সুন্দরবনের মতো বৃহৎ প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যেও এই অবৈধ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সুন্দরবনেও একটি চক্র বেশ কয়েকটি গ্রুপ তৈরি করে তাদের লাখ লাখ টাকা দাদন দিয়ে বিষ প্রয়োগে মাছ ধরায়। এই সিন্ডিকেট অনেক সময় কতিপয় অসাধু বন কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সদস্যদের সঙ্গে আঁতাত করে এসব বিষ প্রয়োগে মাছ শিকারের কাজ চালিয়ে যায়।
তবে একটা বিষয় খুব মনে হয়, এসব অবৈধ মাছ শিকারের কারবারের সঙ্গে মাছের আড়তদার, দাদনদাতা ও এক শ্রেণির কীটনাশক বিক্রেতার পাশাপাশি বন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সদস্যদের উদাসীনতাকে দায়ী করা যায়। কারণ এত নিরাপত্তা এবং সতর্কতার মাঝেও কীভাবে জীববৈচিত্র্য নিয়ে অবৈধ চক্রের কাজ সফল হয়। সুন্দরবনে বন্য প্রাণী ও মৎস্যসম্পদের অফুরন্ত ভাণ্ডার থাকার পরও এর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের। বন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের জনবল অনেক কম। সুন্দরবনের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ যদি মৎস্য ও পাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণে থাকত তাহলে বিশাল কর্মকর্তা-কর্মচারী সুন্দরবনের সম্পদ রক্ষায় কাজ করতে পারত।
তাই আমাদের উচিত এসব অসাধু স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ীকে আইনের আওতায় আনার। তারা যেন আমাদের দেশের জীববৈচিত্র্য সংকট না করতে পারে। তারা একদিকে আমাদের দেশের অর্থনীতির ক্ষতি করছে, অন্যদিকে দেশের মানুষের স্বাস্থ্যহানিও করছে। তারা শুধু দেশের শত্রæ নয় বরং জাতীয় শত্রæ। সাধারণভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জীববৈচিত্র্য আজ ধ্বংসের দিকে। তার সঙ্গে যদি এভাবে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার করা হয় তাহলে জীববৈচিত্র্য অনেকাংশে হ্রাস পাবে। যেটা আমাদের পরিবেশের ওপর হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়াবে। তাই সবাই দায়িত্ব নিয়ে এসব অবৈধ মাছ শিকার বন্ধ করতে হবে, পাশাপাশি দেশের প্রাকৃতিক সম্পদগুলোর পরিচর্যার দিকে নজর রাখতে হবে।

মাজহারুল ইসলাম শামীম : শিক্ষার্থী, ফেনী সরকারি কলেজ।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়