ফের হারে কোচ ছাঁটাই বার্সেলোনার

আগের সংবাদ

পোশাক খাতে ক্রয়াদেশ বাড়ছে

পরের সংবাদ

নাসিরনগর হামলার ৫ বছরেও শেষ হয়নি ৭ মামলার তদন্ত

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৮, ২০২১ , ৮:৪৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ২৮, ২০২১ , ৮:৪৫ পূর্বাহ্ণ

** গ্রেপ্তার ১২৬ আসামির সবাই জামিনে মুক্ত

** ৩ জন পেয়েছিলেন আ.লীগের মনোনয়ন

** এখনো আতঙ্কে থাকেন ভুক্তভোগীরা

কুমিল্লার হোমনার সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পর ফেসবুকে ইসলাম ধর্মকে অবমাননার অভিযোগে আরো কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে। তার মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার হামলার ঘটনাটি ছিল ভয়াবহ। বলা যায়, পরিকল্পিতভাবেই তাণ্ডব চালানো হয়েছিল সেখানে। সরকার দলীয় তৎকালীন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের ইন্ধনেই এমন সহিংস ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে।

যা ঘটেছিল: ঘটনাটি ঘটে ২০১৬ সালের ২৯ অক্টোবর নাসিরনগর উপজেলার হরিণবেড় গ্রামে। রসরাজ দাস নামে জেলে পরিবারের এক নিরক্ষর যুবক ফেসবুকে পবিত্র কাবাশরিফকে অবমাননা করেছে- এমন অভিযোগে তাকে পিটিয়ে পুলিশে দেয় একদল স্থানীয় যুবক। পরের দিন ৩০ অক্টোবর এলাকায় মাইকিং করে নাসিরনগর উপজেলা সদরে প্রতিবাদ সমাবেশ আহ্বান করা হয়। ওই দিন সকাল ১০টার দিকে নাসিরনগর উপজেলা সদরে ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত’ এবং ‘তৌহীদি জনতা’র ব্যানারে আলাদা ২টি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এই সমাবেশে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও অংশ নিয়েছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, এই সমাবেশে সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক বক্তব্য দেন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত এবং হেফাজত ইসলামের নেতারা। সমাবেশ শেষে হরিণবেড় থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরের হরিপুর ইউনিয়ন থেকে ১৪/১৫টি ট্রাক ভরে মানুষ আসার পর হামলা হয় নাসিরনগরের হিন্দুপল্লীতে। ৮টি হিন্দু পাড়ায় অন্তত ৩০০টি বসতঘর ও ১০টি মন্দিরে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। এখানেই শেষ হয়নি। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ৪ নভেম্বর আরেক দফা হামলা হয় নাসিরনগরের হিন্দুদের ওপর। ওই হামলায় এলাকার অন্তত ৬টি বাড়িতে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। পরে জানা যায়- ৩০ অক্টোবর যেসব ট্রাক ও ট্রাক্টরে চড়ে হামলাকারীরা হরিণবেড় এসেছিল সেগুলোর ব্যবস্থা ও অর্থের জোগান দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ দলীয় স্থানীয় চেয়ারম্যান দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখি।

হামলার নেতৃত্বে যাদের নাম: নাসিরনগর হামলার ঘটনায় স্থানীয় ও জেলার আওয়ামী লীগ নেতাদের একাংশের উসকানির অভিযোগ ছিল। জেলা জজ আদালতের তথ্যমতে, ঘটনার প্রায় ১৩ মাস পর ২০১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর উপজেলা সদরের গৌরমন্দির ভাঙচুর মামলায় নাসিরনগর সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল হাসেম, পূর্বভাগ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমানের ভাই মো. আক্তার মিয়া ও হরিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখিসহ ২২৮ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট জমা দেয় পুলিশ। চার্জশিটে ২২৮ জনের মধ্যে দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখিকে ঘটনার ‘মূল হোতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া তৎকালীন মৎস্য ও পানিসম্পদমন্ত্রী প্রয়াত ছায়েদুল হকের পিএস মিজান, চাপৈরতলা ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সভাপতি সুরুজ আলী হাজিসহ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মীরা এই সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলেও অভিযোগ আছে।

মামলা ও আসামির সংখ্যা: নাসিরনগরে হামলার ঘটনার পর মোট ৮টি মামলা হয়। এসব মামলায় অন্তত ২৫০ থেকে ৩ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। পুলিশ মোট ১২৬ জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠিয়েছিল। তবে তারা সবাই এখন জামিনে মুক্ত।

মামলার বর্তমান অবস্থা: নাসিরনগর হামলার পাঁচ বছর পূর্ণ হবে আগামী শনিবার (৩০ অক্টোবর)। অথচ এই দীর্ঘ সময়েও মামলাগুলোর তদন্ত শেষ হয়নি। ৮টি মামলার মধ্যে মাত্র একটির চার্জশিট দাখিল করতে পেরেছে পুলিশ। একটি মামলা তদন্ত করছে গোয়েন্দা বিভাগ, বাকি ৬টি তদন্ত করছে নাসিরনগর থানা পুলিশ। অভিযোগ আছে, চার্জশিট দেয়ার জন্য পুলিশ সুপারের কাছে বেশ কয়েকবারই আবেদন করেছিলেন পিপি। কিন্তু কাজের তেমন কোনো অগ্রগতি নেই।

ঘটনার আড়াই মাস পর জামিনে বের হয়ে রসরাজ বলেছিলেন, তিনি ফেসবুক চালাতে জানেন না। পাসওয়ার্ড কী সেটিও তার জানা নেই। রসরাজের বিরুদ্ধে করা মামলাটি ২০১৭ সালের ৫ নভেম্বর জেলা গোয়েন্দা পুলিশকে তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়। ওই মামলায় পিবিআই রসরাজের ফেসবুক, মোবাইল ফোন ও মেমোরি কার্ডসংক্রান্ত ফরেনসিক প্রতিবেদন দিয়েছে। ওই প্রতিবেদনে রসরাজের কোনো সম্পৃক্ততা পায়নি পিবিআই।

নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হাবিবুল্লাহ সরকার ভোরের কাগজকে বলেন, এই ঘটনায় নির্মল কুমার চৌধুরী বাদী হয়ে যে মামলাটি করেছিলেন তা বিচারাধীন আছে। ৬টি মামলায় তথ্য সংগ্রহসহ বেশ কিছু কাজ চলমান আছে। আশা করছি, খুব শিগগিরই আমরা কাজগুলো শেষ করতে পারব।

চার্জশিটভুক্ত ৩ আসামি পেয়েছিল নৌকার মনোনয়ন! : চলমান ইউপি নির্বাচনের ২য় ধাপে আশ্চর্যজনকভাবে নাসিরনগরে সহিংস ঘটনার মামলার চার্জশিটভুক্ত তিন আসামি দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখি, মো. আক্তার মিয়া ও আবুল হাসেমকে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল, যা নিয়ে গণমাধ্যমের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে তিন বিতর্কিত ব্যক্তির প্রার্থিতার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে জেলা কমিটির পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কাছে চিঠি পাঠানো হয়। পরে অবশ্য আতিকুর রহমান আঁখি ও আবুল হাসেমের মনোনয়ন বাতিল হয়।

ভুক্তভোগীদের বক্তব্য: হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘোষ পাড়ার বিনোদ ঘোষ, কাশি পাড়ার পূর্ণিমা রাণী দাস জানান, ঘটনার কথা মনে পড়লে এখনো তাদের বুক কাঁপে। চোখের সামনে নিজের ঘরবাড়িতে ভাঙচুর-লুটপাত হতে দেখেও নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে তাদের। এলাকার একটি মন্দিরও হামলাকারীদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। সেখানেও সমানতালে চালানো হয়েছে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট। এখনো দেশের কোথাও কোনো সহিংস ঘটনা ঘটলে আতঙ্কে থাকেন তারা।

এলাকাবাসীরা বলছেন, সেদিনে ওই ঘটনা অনেকেই মোবাইলে ভিডিও করেছিলেন। তারপরও জড়িতদের অনেককে আইনের আওতায় আনা হয়নি। যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল তাদের সবাই এখন জামিনে মুক্ত। তাদের বিরুদ্ধে কিছু বললেই রোষানলে পড়তে হয়। তাই সব সময় ভয়ে থাকেন তারা।

বিশিষ্টজনদের বক্তব্য: নাসিরনগরের সহিংস ঘটনার মামলা প্রসঙ্গে গত ২৩ অক্টোবর এক অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, নাসিরনগরের ঘটনার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। আমি বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই, যতক্ষণ পর্যন্ত তদন্ত শেষ না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত কিন্তু আদালতের বিচারিক এখতিয়ার হয় না। আদালতের হয়তো অনেকগুলো ইন্টারিম অর্ডার দেয়ার ক্ষমতা থাকে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত পুলিশ প্রতিবেদন না আসে আদালত কিন্তু বিচারিক কাজ শুরু করতে পারে না। আমরা সেটির জন্য অপেক্ষা করছি। আমি সবাইকে আশ্বস্ত করতে চাই, তদন্ত শেষ হয়ে এটা বিচারিক আদালতে এলেই দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার সম্পন্ন করা হবে।

নাসিরনগর উপজেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নাসিরনগর শাখার সভাপতি সুজিত কুমার চক্রবর্তী ভোরের কাগজকে বলেন, এলাকায় এখন ঝামেলা নেই। তবে দেশের কোথাও সাম্প্রদায়িক সহিংস ঘটনা ঘটলে এলাকাবাসী আতঙ্কে থাকে। আসামিরা এখন সবাই জামিনে মুক্ত। ঘটনা ঘটেছে ২০১৬ সালে। কিন্তু এখনো ৭টি মামলার চার্জশিটই দিতে পারেনি পুলিশ। এটি দুঃখজনক।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া নাগরিক ফোরামের সভাপতি পীযূষ কান্তি আচার্য জানান, এ রকম একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে চার্জশিট দিতে যদি ৫ বছর পেরিয়ে যায়, এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কী হতে পারে।

ডি-এফবি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়