ধর্মকে কেন বারবার আঘাত করা হয়?

আগের সংবাদ

হিন্দু পারিবারিক আইন ও হিন্দু মৌলবাদ

পরের সংবাদ

সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং একটি বিশেষ আইনের ভাবনা

প্রকাশিত: অক্টোবর ২২, ২০২১ , ১:০১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ২২, ২০২১ , ১:০১ পূর্বাহ্ণ

পবিত্র কুরআন শরিফ অবমাননার অভিযোগে কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপ থেকে সুকৌশলে যে আগুন ফেসবুকের মাধ্যমে সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল, সেই আগুনই অন্তত ১৬ জেলায় হিন্দুদের বাড়ি, প্রতিমা ভাঙচুরের ইন্ধন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে গেছে রংপুরের পীরগঞ্জের হিন্দু সম্প্রদায়ের তিনটি গ্রামকেও। এই সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কারণে এবার অনেক জায়গায় পূজার সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করা যায়নি, প্রতিমা বিসর্জনও হয়নি অনেক জায়গায়।
মূলত কুমিল্লার ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ৫ দিনের উৎসবের তাল কেটে যায় তৃতীয় দিনেই। মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীন হওয়া একটি দেশে- যে দেশটিকে এঁর স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক ও সব মানুষের দেশ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন, সেখানে এমন ঘটনা শুধু দুঃখজনকই নয়, দেশের মূল চেতনা ও নীতিরও পরিপন্থি। তবে একটু দেরিতে হলেও সরকারের পক্ষ থেকে নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীও কঠোর বার্তা দিয়েছেন। কিন্তু তাতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের মনে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, হৃদয় থেকে যে রক্তক্ষরণ হয়েছে, তার কতটুকু উপশম হবে সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
মুক্তিযুদ্ধের পর এদেশের হিন্দু সম্প্রদায় মানুষ নতুন দেশে সমধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অন্য সম্প্রদায়ের তুলনায় তারা ত্যাগও বেশি স্বীকার করেছেন। কিন্তু এত দীর্ঘ সময় পরও আমাদের সামনে এখন একটি প্রশ্ন স্পষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, আসলে তাদের এখনো এই দেশের নাগরিক হিসেবে মেনে নিতে পারছি কিনা? পরিসংখ্যান বলছে, পাকিস্তান আমল তো বটেই, স্বাধীন বাংলাদেশেও অধিকাংশ সময় সংখ্যালঘুদের কাটাতে হয়েছে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে। রাজনৈতিক সহিংসতার সুযোগে একটি স্বার্থান্বেষী মহল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে বারবার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে আসছে।
মূলত পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর থেকে তারা কার্যত দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়েছেন। তারপর সামরিক বা বেসামরিক লেবাসে জিয়া, এরশাদসহ যারাই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছেন, তারা শুধু যে সংবিধানকে ধর্মীয় এবং সাম্প্রদায়িকতার মোড়কে আবদ্ধ করেছিলেন তা নয়, মাইনরিটি ক্লিনজিং প্রক্রিয়াও ত্বরান্বিত করে গেছেন। ১৯৯০ ও ১৯৯২ সালে এরশাদ ও বিএনপির আমলে রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা লাগিয়ে সংখ্যালঘুদের বহু ঘরবাড়ি ও মন্দির ভাঙা হয়েছে। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা সারাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর যে তাণ্ডব চালিয়েছে- স্বাধীনতা-উত্তরকালে এটি ছিল সবচেয়ে ভয়ানক নির্যাতন। তখন পূর্ণিমা-সীমাদের কান্নায় বাতাস ভারি হলেও অপরাধীরা শাস্তি পায়নি। গণহত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ, জোর করে বিয়ে, ধর্মান্তরিত করা, চাঁদা আদায় ও সম্পত্তি দখল কোনো কিছুই যেন বাদ ছিল না সে সময়ে।
দেশে প্রায় দেড় কোটি লোক আছে হিন্দু সম্প্রদায়ের। পৃথিবীর অনেক দেশ আছে যে দেশের জনসংখ্যাই এর চেয়ে কম। এই বিরাট জনগোষ্ঠীর মেজরিটিই এখন শভিনিজমের বলি। আগে আড়ালে-আবডালে বলা হলেও এখন মুখের সামনেই তাদের বলা হয় ‘মালাউন’। এটা পরিষ্কার যে একাত্তরের পরাজিত শক্তি সংখ্যালঘু হ্রাসকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দেশে একটি গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের সংকট তৈরি করতে চায়। কারণ তারা ভাবছে, যদি সংখ্যালঘুদের তাড়িয়ে দেয়া যায় তাহলে বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র করাও সহজতর হবে।
প্রথম আলোর ২০১২-এর ২২ সেপ্টেম্বরের একটি রিপোর্ট থেকে জানা যায়, দেশের জনসংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে না। ২০০১ ও ২০১১ সালের আদমশুমারির জেলাভিত্তিক তথ্য পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, ১৫টি জেলায় হিন্দু জনসংখ্যা কমে গেছে। জনসংখ্যাবিদদের মতে, এটি ‘মিসিং’ পপুলেশন বা ‘হারিয়ে যাওয়া মানুষ’। এরা কেন হারিয়ে গেল? কেন নীরবে দেশত্যাগ করার কারণে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারে অবিশ্বাস্য নেতিবাচক প্রভাব পড়ল সেটা নিয়ে কেউ কি ভেবেছে? পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, বরিশাল বিভাগের কোনো জেলাতেই হিন্দুদের সংখ্যা বাড়েনি। বরিশাল, ভোলা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, বরগুনা- এই ৬ জেলায় ২০০১ সালের আদমশুমারিতে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ৮ লাখ ১৬ হাজার ৫১ জন। ২০১১ সালের শুমারিতে সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৬২ হাজার ৪৭৯ জনে। খুলনা বিভাগের বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা, নড়াইল ও কুষ্টিয়া- এই ৫ জেলায় হিন্দুদের সংখ্যা আগের চেয়ে কমেছে। উল্লেখ্য, ২০০১ সালে বরিশাল ও খুলনা বিভাগেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।
কয়েক বছর ধরে আমরা দেখছি, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিতাড়ন ও উচ্ছেদে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা অন্যান্য দল একযোগে কাজ করে থাকে। ২০১২ সালে রামুতে ট্রাকে লোক এসে বৌদ্ধমন্দিরে হামলা করেছে। নাসিরনগরে কয়েক ঘণ্টা ধরে হামলা করা হয়েছে। আর সুনামগঞ্জের শাল্লায় তো মাইকিং করে লোক জড়ো করা হয়েছে।
এসব ঘটনা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, দীর্ঘ প্রস্তুতি নিয়েই সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা করা হয়। আরেকটি ব্যাপার হলো, যত হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাই ঘটুক- পুলিশ আসে ঘটনার পরে। কুমিল্লায় পূজামণ্ডপে হামলা ও লুটপাটের পর পুলিশ এসেছে, একই অবস্থা রামুতেও হয়েছিল। আর পীরগঞ্জে আমরা দেখলাম, পুলিশ নিরাপত্তা দিতে গেল এক জায়গায়, কিন্তু অগ্নিসংযোগ হলো অন্য জায়গায়।
আমরা নিজেদের অসাম্প্রদায়িক দাবি করছি। অথচ কয়েকদিন ধরে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যে সন্ত্রাসী হামলা হলো, তাদের মন্দির ও পূজামণ্ডপে ভাঙচুর করা হলো, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করা হলো- সেসব ঘটনা সংখ্যাগুরুদের মনে কি খুব একটা দাগ কেটেছে? উল্টো রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা যেসব কথা বলছেন, তাতে আক্রান্তের ওপর তাদের সহানুভূতি প্রকাশের চেয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লাভের চেষ্টাই বেশি দেখা যাচ্ছে। এ কারণে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত আক্ষেপের সঙ্গে বলেছেন, ‘রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি আমাদের আস্থা নেই।’ কিন্তু এই অনাস্থা কি একদিনে তৈরি হয়েছে? দিনে দিনে আক্রান্ত হতে হতে তাদের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে।
কোনো দেশের সংখ্যালঘুরা নিরাপদ থাকবে কিনা, তা অনেকাংশে নির্ভর করে সেই দেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মন-মানসিকতার ওপর। বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষরা মাটি কামড়ে এ দেশেই থাকতে চায়। তাদের তাড়িয়ে বা তাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করে বাংলাদেশ কি লাভবান হতে পারবে? বাংলাদেশ পাকিস্তানের মতো হোক সেটা আমরা কেউই চাই না। দেশটিতে একদিকে যেমন সংখ্যালঘু নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়া সফলতার সঙ্গে সমাপ্তির পথে একইভাবে সংখ্যাগুরুরাও নিজেরা নিজেরা মারামারি করছে। সেখানে শিয়ারা সুন্নিদের মারছে, আর সুন্নিরা মারছে শিয়াদের। আর সবাই মিলে হত্যা করছে মানবতাকে। বাংলাদেশেও যাতে সেই পরিস্থিতির উদ্ভব না হয়, সে জন্য এখনই আমাদের সজাগ হওয়া উচিত।
এর পাশাপাশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে সুরক্ষায় নারী নির্যাতন দমন আইনের মতো একটি বিশেষ আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে। আমাদের যে আইনগুলো আছে, সেসব দিয়ে এ সমস্যা মোকাবিলা করা যাবে না। এই আইন প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত সন্ত্রাস দমন আইন, দ্রুত বিচার আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের প্রয়োগ ঘটানো যেতে পারে। সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়ানো উচিত সংখ্যালঘুদের স্বার্থে নয়, সংখ্যাগুরুদের স্বার্থেও। কারণ বহুত্ববাদের ধারণা থেকে রাষ্ট্র একবার সরে এলে সেটি ফিরিয়ে আনা শুধু কঠিনই হবে না অসম্ভব একটি কাজও হবে।

মর্তুজা হাসান সৈকত : কবি ও লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়