অপশক্তি রুখতে মাঠে আওয়ামী লীগ

আগের সংবাদ

কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা আজ

পরের সংবাদ

অপুষ্টি চক্রে দেশের পুষ্টি : করোনাকালে বেড়েছে ব্যাপকতা

প্রকাশিত: অক্টোবর ২০, ২০২১ , ৮:৪৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ২০, ২০২১ , ৮:৪৯ পূর্বাহ্ণ

দিনমজুর স্বামী রুবেল মিয়া আর দুই সন্তান নিয়ে গৃহপরিচারিকা ইয়াসমিনের সংসার। মানিকনগর পানির ট্যাংকি এলাকার একঘরে এই চার জনের বাস। দেশে করোনার সংক্রমণ শুরুর পর পুরোপুরি বেকার হয়ে যান রুবেল মিয়া। আর ইয়াসমিন যে চার বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন সেই কাজও হারান। এরই মধ্যে ইয়াসমিনের গর্ভে আবার সন্তান আসে। বড় সন্তানের বয়স পাঁচ বছর, ছোটটির দুই। করোনার আগে প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় মাছ বা ডিম থাকলেও করোনা শুরুর পর তা বাদ পড়ে যায়। তরকারিসহ নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় ভাতের থালায় আলুর প্রাধান্য বেড়ে যায়। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে তৃতীয় সন্তান জন্ম দেন ইয়াসমিন। শারীরিকভাবে দুর্বল ইয়াসমিন স্বল্প ওজনের সন্তান প্রসব করেন। চার মাসের মাথায় সেই সন্তান মারা যায়।

গোপীবাগ রেলগেট এলাকায় পিঠা বিক্রি করেন ফিরোজ মিয়া ও তার স্ত্রী রুনু বেগম। বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত ছয়টা স্টোভে চিতই ও তেলের পিঠা বানান এই দম্পতি। পিঠা বানানোর সময় রুনু বেগমের পাশে বসে থাকে তার আড়াই বছরের মেয়েটি। পাতলা গড়নের মেয়েটি যে অপুষ্টিতে ভুগছে তা তাকে দেখেই বোঝা যায়। কথার একপর্যায়ে রুনু বেগম জানান, তার তিনটি সন্তানই এমন লিকলিকে। করোনার কারণে ব্যবসা বন্ধ ছিল। জমানো পুঁজিও তেমন ছিল না। তিন বেলার খাবার জোগান দেয়াটা কষ্টকর হয়ে যায়। অভাবের সংসারে খাবার তালিকায় অনেক কাটছাঁট করতে হয়েছে। ক্ষুধা নিবারণ করাই ছিল মুখ্য। আর এখন টানতে হচ্ছে ঋণের বোঝা। করোনার সময় ধার-দেনা করে চলতে হয়েছিল। আক্ষেপ করে রুনা বলেন, ‘গরিবের অভাব কোনো দিনই যাইব না।’
ইয়াসমিন ও রুনার পরিবারের মতো অসংখ্য পরিবারের খাবার নিশ্চিত হলেও পুষ্টির বিষয়টি থেকে যাচ্ছে একেবারেই তলানিতে। করোনা মহামারির কারণে এর ব্যাপকতা বেড়েছে। তবে এও সত্য যে কোভিডের আগেও দেশের পুষ্টিনিরাপত্তার সূচকগুলো খুব একটা সন্তোষজনক পরিস্থিতিতে ছিল তেমনটা না।
তথ্য ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন সূচকে উন্নতি হলেও পুষ্টি খাতে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এখনো অনেকটা পিছিয়ে বাংলাদেশ। দেশে নবজাতক, শিশু, নারী ও প্রবীণ জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ এখনো স্থায়ীভাবে অপুষ্টিতে ভুগছে। স্বাভাবিক সময়ে অপুষ্টির যে চিত্র, করোনা মহামারিতে বেড়েছে তার ব্যাপকতা। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গবেষণায়ও এমন তথ্য উঠে এসেছে। পুষ্টি খাতে করোনা মহামারির এই ধাক্কা সামাল দিতে অনেক বেগ পেতে হবে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পুষ্টি ও পুষ্টিকর খাদ্য কী : খাদ্য উপাদান যে প্রক্রিয়ায় শরীরের তাপ ও শক্তি জোগায়, দেহের গঠন বৃদ্ধি ও ক্ষয়পূরণ করে এবং শরীরকে সবল ও রোগমুক্ত রেখে কর্মক্ষম জীবনযাপনে সহায়তা করে তাই হলো পুষ্টি। আমাদের দেহ বিভিন্ন উপাদান থেকে পুষ্টি পেয়ে থাকে। এই উপাদানগুলো হলো আমিষ, শর্করা, ¯েœহ পদার্থ, ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পানি। পুষ্টিকর খাবার বলতে বুঝায় প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় এই ছয়টি গ্রুপের খাবার থাকে। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) মতে, অপুষ্টির অর্থ হলো, একজন ব্যক্তির পুষ্টি গ্রহণের ক্ষেত্রে ঘাটতি বা ভারসাম্যহীনতা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গড়ে একজন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের দিনে ২১০০ কিলো ক্যালোরির প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় ক্যালরি পূরণ করেও যদি কোনো ব্যক্তির প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা পূরণ না হয় সেটিও পুষ্টিহীনতা।

তথ্যউপাত্ত যা বলছে : জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, জাতিসংঘ শিশু তহবিল এবং আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (ইফাদ) যৌথ উদ্যোগে চলতি বছরের ১৫ জুলাই প্রকাশিত হয়েছে ‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি এন্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদন। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ছয় জনের একজন অপুষ্টিতে ভুগছে।

জাতীয় পুষ্টি পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টি বা খর্বতায় ভুগছে ৩১ শতাংশ। ৮ শতাংশ ভুগছে তীব্র অপুষ্টি বা কৃশতায়। বয়স অনুপাতে কম ওজন ২২ শতাংশ শিশুর। এ ছাড়া শিশু ও নারীদের ক্ষেত্রে সাব-ক্লিনিক্যাল আয়োডিনের স্বল্পতাও রয়েছে। সর্বশেষ হিসাবে শিশুদের ৪০ শতাংশই এ সমস্যায় ভুগছে। আর নারীদের মধ্যে ৪২ শতাংশের মধ্যে এ সমস্যা দেখা যায়। বর্তমানে রক্তস্বল্পতা মাতৃমৃত্যুর অন্যতম কারণ।

২০২০ সালে জুলাই মাসে খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ পরিচালিত ‘দরিদ্র মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির ওপর কোভিড ১৯-এর প্রভাব’ শীর্ষক জরিপের ফল প্রকাশিত হয়। তাতে দেখা গেছে, ওই জনগোষ্ঠীর ৮৭ শতাংশই খাদ্য ও পুষ্টির সংকটে রয়েছে। ২০২০ সালে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯ দশমিক ৯ শতাংশ (৮১ কোটি ১০ লাখ) মানুষ অপুষ্টিতে ভুগেছে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন। যা ২০১৯ সালের তুলনায় ৮ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের সংখ্যা বাড়তে নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে করোনা মহামারি। অপুষ্টির শিকার মানুষের অর্ধেকের বেশি (৪১ কোটি ৮ লাখ) এশিয়ায় এবং এক-তৃতীয়াংশের বেশি (২৮ কোটি ২০ লাখ) আফ্রিকায় বসবাস করে।

গেøাবাল অ্যালায়েন্স ফর ইম্প্রুভড নিউট্রিশন (গেইন), বাংলাদেশের পরিচালক ড. রুদাবা খন্দকার জানান, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পরেও দেশে পর্যাপ্ত ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যের ঘাটতি রয়েছে। দেশে অপুষ্টি প্রাদুর্ভাবের মধ্যে ভৌগোলিক এবং আর্থ-সামাজিক বৈষম্য রয়েছে। অপুষ্টি শহরের তুলনায় গ্রামে বেশি।
অপুষ্টির কারণ কী : এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নিউট্রিশন এন্ড ডায়েটেটিকস ফোরামের (বিএনডিএফ) সভাপতি এবং বারডেম হাসপাতালের পুষ্টি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. শামসুন নাহার নাহিদ (মহুয়া) ভোরের কাগজকে বলেন, দরিদ্রতাই অপুষ্টির মূল কারণ নয়। সঠিক খাদ্যাভ্যাসের বিষয়ে মানুষের অসচেতনতা এবং নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্যতার অভাবও অপুষ্টির অন্যতম কারণ। বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো; মানুষ এখনো অতিরিক্ত পরিমাণে ভাত ও অপর্যাপ্ত পুষ্টি উপাদান সম্বলিত খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় অন্য যে পুষ্টিকর খাবারগুলো আছে, যেমন শাক-সবজি, মাছ-মাংস, ডিম-দুধ-ডাল এগুলো খাওয়ার ব্যাপারে খুব একটা জোর দেন না। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে অনেকের মাছ-মাংস, শাক-সবজি ফলমূলের মতো পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারছেন না। আবার সামর্থ্য থাকলেও অনেকে জানেন না কোন খাবারগুলো, কী পরিমাণে খেতে হবে। খাদ্যে ভেজালের আতঙ্কে অনেকে জেনেবুঝেও পুষ্টিকর খাবার এড়িয়ে চলেন। এ ছাড়া বাংলাদেশে যে উপায়ে রান্না করা হয় খাবারের পুষ্টি উপাদান নষ্ট হওয়ার পেছনে সেটিও একটি কারণ। অপুষ্টির কারণে ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি, কম ওজন, কম উচ্চতা (খর্বাকৃতি), মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত, গলগণ্ডসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হতে পারে বলে জানান এই পুষ্টিবিদ।

সংশ্লিষ্টরা কী বলছেন : সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানান, বর্তমান বিশ্বে প্রায় ১০০ কোটি মানুষ পুষ্টিকর খাবার পায় না। আর দেশে ১০ শতাংশ মানুষ এখনো পুষ্টিহীনতায় ভোগে। বাংলাদেশে পুষ্টির ঘাটতি থাকলেও আশপাশের দেশ থেকে ভালো অবস্থানে আছে। এমনকি ভারতের চেয়েও পুষ্টির দিক থেকে ভালো অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। পুষ্টিহীনতার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, আমাদের দেশে কিছু মানুষ নানা কারণে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করতে পারে না। এর মধ্যে দেশে পুষ্টিকর খাদ্যে ভেজাল বা কেমিক্যাল মেশানোর ফলে অনেক মানুষ সাধ্য থাকলেও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করে না।

এ প্রসঙ্গে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। খাদ্য উৎপাদনও বেড়েছে। এখন আমাদের পুষ্টির বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিকল্পিতভাবে পুষ্টির চাহিদা নিশ্চিত করতে সরকার মাছচাষ, খামার, ফলের চাষ করছে। দরিদ্রসীমার নিচে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর মাঝে পুষ্টি সমৃদ্ধ চাল বিতরণ করা হচ্ছে। ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবারে নিশ্চয়তার বিষয়েও সরকার কাজ করছে।

জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের (আইপিএইচএন) পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসির উদ্দিন মাহমুদ জানান, পুষ্টি বিষয়ে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সরাসরি কাজ করছে। পরোক্ষভাবে ২২টি মন্ত্রণালয় পুষ্টির সঙ্গে জড়িত রয়েছে। সবাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পুষ্টি নিয়ে কাজ করছে। শিশু পুষ্টি নিশ্চিত করতে দেশের প্রতিটি হাসপাতালে পুষ্টি কর্নার স্থাপন করা হয়েছে। জেলা পর্যায়েও আলাদা শিশু পুষ্টি কর্নার রয়েছে। শিশুদের স্বাস্থ্যগত ক্ষতি প্রতিরোধে কাজ চলছে। গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির জন্য কাউন্সিলিংয়ের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। দেশের পুষ্টিমান বাড়ানোর জন্য আয়রন ও আয়োডিনের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। সারা দেশে সেটি মনিটরিং করা হচ্ছে। যাতে বাংলাদেশে আয়োডিনের ঘাটতিজনিত সমস্যার সমাধান হয়।

এসএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়