হেসে খেলে জিতল শ্রীলঙ্কা

আগের সংবাদ

ডাচদের উড়িয়ে আইরিশ রূপকথা

পরের সংবাদ

বিচারহীনতায় বার বার সাম্প্রদায়িক সহিংসতা

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৯, ২০২১ , ৮:৩৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ১৯, ২০২১ , ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ

সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও সংখ্যালঘু নির্যাতন এ দেশে নতুন কোনো ঘটনা নয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরের বছর অর্থাৎ বাহাত্তর সালেই সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এরপর ধারাবাহিকভাবে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন ও নিপীড়ন চলেছে। এবার শারদীয় দুর্গোৎসব চলাকালেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রদায়িক সহিংস ঘটনা ঘটে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বরাবরের মতোই এসব ঘটনায় দায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আশ্বাস দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত সংখ্যালঘু নির্যাতনের কোনো একটি ঘটনায়ও শাস্তি হয়েছে এমন নজির নেই। উল্টো রামু ও নাসিরনগরে বীভৎস সাম্প্রদায়িক সহিংসতাকারীরা রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পাচ্ছে।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ৯ বছরে বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সাড়ে ৩ হাজারের বেশি হামলা হয়েছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা এরচেয়ে অনেক বেশি বলে দাবি করেন বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত। দুর্গাপূজার মধ্যে গত ১৩ অক্টোবর কুমিল্লার একটি মণ্ডপে কুরআন অবমাননার কথিত অভিযোগ তুলে বেশ কয়েকটি মণ্ডপ ও স্থাপনা ভাঙচুর হয়। তার জের ধরে গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৭০টির বেশি পূজামণ্ডপে হামলা-ভাঙচুর-লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে বলে জানান তিনি।

আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সাল থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৮ বছর ৯ মাসে হিন্দুদের ওপর ৩ হাজার ৬৭৯টি হামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৫৫৯টি বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা। এই সময়ে হিন্দুদের ৪৪২টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দেয়া হয়েছে। প্রতিমা, পূজামণ্ডপ, মন্দিরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ৬৭৮টি। এসব হামলায় আহত হয়েছে ৮৬২ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। নিহত হয়েছে ১১ জন। এর বাইরেও ২০১৪ সালে দুজন হিন্দু নারী ধর্ষণের শিকার হন। শ্লীলতাহানি করা হয় আরো চারজনের। এছাড়া ২০১৬, ২০১৭ ও ২০২০ সালে ১০টি হিন্দু পরিবারকে জমি ও বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে দখলের অভিযোগ ওঠে।

দুর্গাপূজা ঘিরে হামলা ও সহিংসতার তথ্য সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন এডভোকেট সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত। জাতীয় পার্টি, বিএনপির আমলে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৯০ সালে এরশাদের আমলে তিন দিন, ১৯৯২ সালে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসার পর ২৭ দিন এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াতের পুরো আমলজুড়ে সংখ্যালঘু নির্যাতন হয়েছে। তিনি বলেন, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আমরা আশা করেছিলাম এই ধারার পরিবর্তন হবে। কিন্তু‘ ২০১১ সাল থেকে গত কয়েক দিনের হামলা পর্যন্ত একই ধারায় সংখ্যালঘু নির্যাতন হয়ে আসছে। এর কারণ বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ তৈরি হয়েছিল বাঙালিত্বের ধারণা থেকে। এই ধারণা থেকে বাংলাদেশ অনেক সরে এসেছে। সংবিধানকে সাম্প্রদায়িকীকরণ করা হয়েছে। এই সংবিধান সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ?উৎসাহিত করছে।

এদিকে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করলেও সংখ্যালঘু নির্যাতন ও তাদের সম্পত্তি দখলে পিছিয়ে নেই কোনো রাজনৈতিক দলই। এই তালিকায় আছেন সংসদ সদস্য, স্থানীয় প্রতিনিধিসহ রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা। সংখ্যালঘু নেতারা মনে করেন, সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতনে সাম্প্রদায়িকতা যেমন আছে, তেমনি রাজনৈতিক কারণও আছে। অব্যাহতভাবে সংখ্যালঘু নির্যাতনের কারণ হিসেবে তারা বলছেন, বিচারহীনতা এবং দায় এড়ানোর সংস্কৃতি। এই ঘেড়াটোপেই ঘুরপাক খায় সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়টি। এতে তাদের সাহস এতটাই বেড়েছে, প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি পরের দিনই ১৫ অক্টোবর দেশের প্রায় শতাধিক মণ্ডপে প্রতিমা ও সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়। পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তারা।

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রদায়িক সহিংস ঘটনাগুলো পরিকল্পিত বলে মনে করেন রানা দাশগুপ্ত। তিনি বলেন, এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, সবই পরিকল্পিত। এই হামলার পেছনে পাঁচটি কারণ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। প্রথমত; সাম্প্রদায়িক শক্তি চাইছে এ দেশ থেকে সংখ্যালঘুদের তাড়িয়ে তাদের সম্পত্তি দখল করতে, এখানে রাজনৈতিক শক্তিও কাজ করছে। দ্বিতীয়ত; এদেশ থেকে সংখ্যালঘুদের তাড়িয়ে কিছুটা জনসংখ্যার ভার হ্রাস করা। তৃতীয়ত, দেশটাকে মুসলিম রাষ্ট্রে পরিণত করা, চতুর্থত, এদেশে যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটছে তাকে বাধাগ্রস্ত করা এবং পঞ্চমত, আগামী জাতীয় নির্বাচনকে লক্ষ্য রেখে তারা একটা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে চাইছে।

পরিসংখ্যান তুলে ধরে এই সিনিয়র আইনজীবী বলেন, সাত বছর আগে কুরআন অবমাননা করে ফেসবুকে ছবি পোস্ট করার অভিযোগ তুলে রামুর ১২টি বৌদ্ধমন্দিরে আগুন দেয়া হয়। হামলা করা হয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বৌদ্ধ মন্দিরে। ২০১২ সালে হামলা হলেও তার কোনো বিচার হয়নি। নাসিরনগর, সাতক্ষীরাসহ দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে প্রতিনিয়ত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। এ পর্যন্ত হাজার হাজার ঘটনা ঘটলেও কোনোটির সুষ্ঠু বা প্রকৃত বিচার হয়নি। বিচারহীনতা ও দায়মুক্তির কারণে সংখ্যালঘু নির্যাতনে সন্ত্রাসীরা উৎসাহিত হচ্ছে।

এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ভোরের কাগজকে জানান, সব ঘটনা অনাকাক্সিক্ষত। এদের আইনের আওতায় এনে বিচার করা হবে, অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, চলছে গ্রেপ্তারের চেষ্টা। দোষিদের দ্রুত বিচার আইনের আওতায় আনা হবে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা সাম্প্রদায়িক হামলা বা সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাকারীদের দ্রুত বিচার আইনে আনার বিষয়টি চিন্তা-ভাবনা করছি। প্রয়োজনে দ্রুত বিচার আইনে এদের বিচার করা হবে।
এ বিষয়ে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ মনে করেন, প্রশাসন যথাযথ ভূমিকা পালন করেনি। সংখ্যালঘু নির্যাতনের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতির প্রয়োগ না থাকা, আইনের সঠিক প্রয়োগ না হওয়া এবং আইনের ফাঁকফোঁকর দিয়ে অপরাধীরা জামিনে বেরিয়ে যাওয়া। ফলে তারা আবারো সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন করতে সাহস পায়। প্রশাসনের গাফিলতির বিষয়টি স্বীকার করে সাবেক এই আইনমন্ত্রী বলেন, দুর্গাপূজার সময় যে অনেক মন্দির ও বিগ্রহ ভাঙচুর করা হলো, সেখানে তো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছিল, তারা তাহলে কেন প্রতিরোধ করল না? এখানে তাদের গাফিলতি রয়েছে। সরকারকে আরো কঠোর অবস্থান নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সম্প্রতি সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে আমরাই পারি জোটের চেয়ারপারসন এডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, এ ধরনের সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পকে প্রতিহত না করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের নীরবতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির দায় রয়েছে। এই দায় এড়িয়ে গেলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে অস্বীকার করা হবে এবং বাংলাদেশ অচিরেই তালেবানি রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

এ প্রসঙ্গে রানা দাশগুপ্ত বলেন, আমরা বলেছিলাম একটি সংখ্যালঘু কমিশন ও সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন গঠন করা হোক; কিন্তু আড়াই বছর হলেও বর্তমান সরকারি দল তার নির্বাচনী অঙ্গীকার রাখেনি। ২০০৮ সালে নির্বাচনে সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার ঘটনার বিষয়ে হাইকোর্টে একটি রিট হয়েছিল। বিচারপতি শাহাবুদ্দীন কমিশনে আমরা ১৫ হাজার কেসের তথ্য-উপাত্ত দিয়েছিলাম। ২০১১ সালে তার একটা রিপোর্ট দেয় কমিশন। কিন্তু এ পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি। আমরা চাই সরকার এই মেয়াদে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন করবে, সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, বৈষম্য বিলোপ আইন প্রণয়ন, অর্পিত সম্পত্তি আইনের বাস্তবায়ন প্রকৃত মালিকদের হাতে হস্তান্তর এবং সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির পূর্ণ বাস্তবায়ন চাই।

রামু হামলায় মামলা হয়েছিল মোট ১৯টি, যদিও তা এখন স্থবির। রামু, উখিয়া ও টেকনাফে সহিংসতার ঘটনায় এজাহারভুক্ত ৩৭৫ জনসহ ১৫ হাজার ১৮২ জনের বিরুদ্ধে ১৯টি মামলা দায়ের করা হলেও পরবর্তীতে সব আসামিই জামিন পান। ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর এসব হামলার ঘটনা ঘটে। ক্ষমতাসীন দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে হামলায় অংশ নেয়ার অভিযোগ ওঠে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হয় ২০১৬ সালে। ওই ঘটনায় একাধিক মামলা হলেও আসামিরা জামিন পেয়ে বহাল তবিয়তে। এছাড়া যশোরের চৌঁগাছা ও অভয়নগরের মালোপাড়া, মুন্সিগঞ্জের লৌহজং, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়াসহ গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বিভিন্ন সময় সা¤প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। যশোরের পাশাপোল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহীন ও তার বাহিনীর অত্যাচারে ইতোমধ্যে ৩০টি হিন্দু পরিবার দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছে। অভয়নগরের মালোপাড়ায় হিন্দু সম্প্রদায় ২০১৪ সালে যে ভয়াবহ অত্যাচারের শিকার হয়েছিল তা থেকে তারা এখনো আতঙ্কমুক্ত হতে পারেনি।

ডি- এইচএ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়