মেট্রোরেল : মহাসড়ক নেটওয়ার্ক উন্নয়নে নতুন পালক

আগের সংবাদ

আফসার আহমদ স্যার এ চিঠি পাবেন কি না জানি না

পরের সংবাদ

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সতর্ক থাকতে হবে

ড. মিল্টন বিশ্বাস

অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৭, ২০২১ , ১:৫২ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ১৭, ২০২১ , ১:৫২ পূর্বাহ্ণ

শারদীয় দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে ১২ অক্টোবর থেকে এদেশে যখন অনাবিল আনন্দযজ্ঞ চলছে তখন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টে একদল খুনি মানুষ মেতে ওঠে। কুমিল্লায় পূজামণ্ডপে কথিত পবিত্র কুরআন অবমাননার ঘটনায় সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের হাজার বছরের সম্প্রীতির ঐতিহ্য এক নিমিষে ধুলায় মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। অপপ্রচার সম্বল করে বিভিন্ন ঘটনাকে ইস্যু বানিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে মন্দিরে হামলা ও ভাঙচুরের মাধ্যমে দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার এ ধরনের প্রচেষ্টা নতুন নয়। এসব কাজে ইসলামের নামে উগ্র সাম্প্রদায়িক-রাজনৈতিক শক্তির ইন্ধন সাধারণ বিষয়।
১৩ অক্টোবর সকালে কুমিল্লায় নানুয়া দিঘিরপাড় পূজামণ্ডপে কথিত ‘কুরআন অবমাননার’ অভিযোগ তুলে বেশ কিছু মন্দিরসহ শহরের সালাউদ্দীন রোড কালীগাছতলা ও কাপুড়িয়া পট্টির মণ্ডপেও হামলা হয়। পরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে শহরে বিজিবি মোতায়েন করা হয়। এর জের ধরে গাজীপুর, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও মৌলভীবাজারে বেশ কিছু মন্দির ও পূজামণ্ডপেও হামলা-ভাংচুর হয়। চাঁদপুরে হামলাকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে প্রাণহানিও ঘটে। পরে সেখানে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলায় মন্দিরে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে ১৮ জনকে আটক করেছে পুলিশ। বান্দরবানের লামা উপজেলায় মিছিল করে এসে মন্দির ও হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা করা হয়েছে। এ সময় দুইপক্ষের সংঘর্ষে ১২-১৩ জন আহত হন। সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে একজন এসআইসহ ৩ পুলিশ সদস্যও আহত হন।
দুর্গোৎসবের মধ্যে কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মকে ব্যবহার করে যারা সহিংসতা সৃষ্টি করছে তাদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হবে বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঢাকেশ্বরী মন্দিরে ১৪ অক্টোবর মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি আয়োজিত শারদীয় দুর্গাপূজার মহানবমীর অনুষ্ঠানে গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি বলেছেন, যেখানে যেখানে যারাই এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটাবে সঙ্গে সঙ্গে তাদের খুঁজে বের করা হবে। আমরা অতীতেও করেছি, ভবিষ্যতে আমরা করতে পারব এবং যথাযথ শাস্তি তাদের দিতে হবে। এমন শাস্তি- যেন ভবিষ্যতে আর কেউ সাহস না পায়, সেটাই আমরা চাই।’ অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল জানিয়েছেন, ‘স্বার্থান্বেষী মহলের উদ্দেশ্যমূলক কাজ এটি। জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কেউ উসকানি দিলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও গুজব ছড়ানো হচ্ছে। যারা এসব অপচেষ্টা করছে ও করবে, তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।’
আজ যে অশুভ শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, ধর্মীয় সহাবস্থানকে নষ্ট করছে তাদের সমূলে উৎপাটন জরুরি হয়ে উঠেছে। কারণ ২০১৯ সালে ভোলা জেলায় ঘটে যাওয়া ঘটনা নিশ্চয়ই সবার মনে থাকার কথা। সে সময় সেখানে ফেসবুক মেসেঞ্জারে যে আইডি থেকে ধর্ম নিয়ে অবমাননাকর বক্তব্য দেয়া হয়েছিল, সেটি ‘হ্যাকড’ হয় বলে পুলিশ নিশ্চিত করে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, মেসেঞ্জারে ওই বক্তব্যের ‘স্ক্রিনশট’ ব্যবহার করেই বোরহানউদ্দিনে উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয়। ২০ অক্টোবর (২০১৯) বোরহানউদ্দিন ঈদগাহ ময়দানে ‘মুসলিম তাওহিদী জনতার ব্যানারে বিক্ষোভ সমাবেশ হয় এবং এক পর্যায়ে পুলিশের ওপর হামলা চালায় শত শত মানুষ। বেলা পৌনে ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত উপজেলা সদরে দফায় দফায় ওই সংঘর্ষে এক মাদ্রাসাছাত্রসহ চারজন নিহত ও আহত হন ১০ পুলিশ সদস্যসহ শতাধিক। ১৮ অক্টোবর রাতে বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্য নামের ২৫ বছর বয়সি এক যুবক বোরহানউদ্দিন থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। সে জানায় তার ফেসবুক আইডি ‘বিপ্লব চন্দ্র শুভ’ হ্যাক করা হয়েছে। এজন্য ভোলার পুলিশ সুপার ধর্ম অবমাননার গুজবের বিষয়টি নিয়ে ১৯ অক্টোবর স্থানীয় আলেমদের শান্ত রাখার চেষ্টা করেছিলেন; কিন্তু তারপরও পরের দিন ওই বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজনে বিভিন্ন এলাকা থেকে লোক জড়ো করা হয়। অর্থাৎ স্থানীয় জনগণকে কে বা কারা উসকানি দিয়েছে, সহিংস জমায়েতের আয়োজন করেছে- এসবই ছিল দুর্ভাবনার বিষয়। বোরহানউদ্দিনের ওই হিন্দু যুবকের ফেসবুক আইডি হ্যাক করার অভিযোগে দুই মুসলমান যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত দুই মুসলিম তরুণ মুসলমান হয়েও নবীজী (সা.) সম্পর্কে বাজে কথা লিখে আরেকজনকে জড়াবার চেষ্টা করেছে- যা সাম্প্রদায়িক উসকানির নির্মম দৃষ্টান্ত। কক্সবাজারের রামুর এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের ঘটনার মতো অন্যের ক্ষতি করার জন্য, অন্যকে ফাঁসানোর জন্য এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে কিছু মানুষ। ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়িয়ে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের রামু উপজেলায় হামলা চালিয়ে লুটপাটসহ ১২টি বৌদ্ধ মন্দির ও ৩০টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে রসরাজ নামে এক হিন্দু মৎস্যজীবীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ এনে লোকজনকে খেপিয়ে তুলে ঘরবাড়ি ও মন্দিরে হামলা চালানো হয়। অর্থাৎ ২০২১ সালের কুমিল্লার ঘটনা নতুন নয়।
অতীতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মানুষ হত্যা ও নারী ধর্ষণ মুখ্য ঘটনা ছিল। কিন্তু কুমিল্লায় গত ১৩ অক্টোবর এবং কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলায় ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর শনিবার রাতের পরিস্থিতি ও হামলার ধরন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলা। দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে উন্নতি ঘটেছে; সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি বৃদ্ধি পেয়েছে। এসবকেই ধ্বংস করতে চায় মৌলবাদী জনগোষ্ঠী। আসলে মুসলিমদের সঙ্গে হিন্দু ও বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে ফায়দা লুটেছে কেউ কেউ। মৌলবাদী ও জঙ্গিগোষ্ঠীর প্রচারণায় ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর প্রচেষ্টা রয়েছে এখনো। তবে ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের বিরুদ্ধে যারা সোচ্চার হয়েছেন; তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সব ধর্মের মানুষ। সত্যিই ‘ধর্মীয় বিষয়ে গুজব ছড়িয়ে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা’ আমাদের মতো অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগজনক ঘটনা। তবে সুখের বিষয় শেখ হাসিনার সরকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের ঘটনার পর পরই অবিলম্বে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট হয় এমন কোনো কর্মকাণ্ড সরকার বরদাশত করবে না বলেও প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানিয়ে দিয়েছেন। ‘সম্প্রীতি রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের বিকল্প নেই’ বলা হচ্ছে বারবার। সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এই ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ হতে হবে দল-মত নির্বিশেষে মানুষের দ্বারা; তাহলে বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যে জাতি-ধর্ম-বর্ণ সম্মিলিতভাবে বেঁচে থাকার প্রয়াস সফল ও সার্থক হয়ে উঠবে। মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু আর আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির যা কিছু প্রাণিত সম্পদ তার জন্য দরদ ঢেলে আকাক্সক্ষার মেঘ হয়ে ঝরে পড়া আমার বাংলাদেশ। অথচ দাঙ্গা ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় পাল্টে যায় তার রূপ। এখনো সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের উসকানি থেমে নেই।
মূলত পরিকল্পিতভাবে যারা আমাদের ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করছে তারা দেশ, জাতি ও সব ধর্মের শত্রæ। সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে এই শত্রæদের মোকাবিলা করতে হবে। দেশবাসীকেও গুজবে কান না দেয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কারণ বাংলাদেশে সব ধর্মের মানুষের স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের অধিকার রয়েছে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া কারো কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়। যার যার ধর্ম তার তার কাছে। সব ধর্মের মানুষ এদেশে বাস করবে। সেভাবেই তিনি দেশটাকে গড়ে তুলতে চাইছেন। দেশে একটা অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে। ফেসবুকে নানা ধরনের অপপ্রচার সব জায়গায় ছড়ানো হচ্ছে। এ দেশ এখন ভালোভাবে চলছে, অগ্রগতি হচ্ছে। তবু একটা শ্রেণি নানাভাবে একটা অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাইছে। কারণ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার যত ঘটনা বাংলাদেশে ঘটেছে কোনোটির সঙ্গেই ধর্ম নয়, রাজনীতি জড়িত। এজন্যই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৪ অক্টোবর আরো বলেছেন, ‘কিছু মানুষের ভেতরে এই দুষ্টবুদ্ধিটা আছে, যখন একটা জিনিস খুব সুন্দরভাবে চলছে, সেটাকে নষ্ট করা। বাংলাদেশ যখন উন্নয়নের পথে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, সে সময় এই যাত্রাটাকে ব্যাহত করা, সেই সঙ্গে দেশের ভেতরে একটা সমস্যা সৃষ্টি করা। যারা জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে না, বিশ্বাস অর্জন করতে পারে না, রাজনীতি নেই, কোনো আদর্শ নেই, তারাই এ ধরনের কাজ করে।’
ড. মিল্টন বিশ্বাস : অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়