মা দুর্গার আগমনে সব সংকট কেটে যাক

আগের সংবাদ

মহাশক্তি রূপিণী মা দুর্গা

পরের সংবাদ

দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ বিশ্বের রোল মডেল

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৪, ২০২১ , ১২:৫৬ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ১৪, ২০২১ , ১২:৫৬ পূর্বাহ্ণ

প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৩ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ হ্রাসকরণ দিবস পালিত হয়। মূলত বন্যা, জলোচ্ছ¡াস, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, খরা ইত্যাদি এ দেশের মানুষের নিত্যসঙ্গী। প্রায় প্রতি বছরই বাংলাদেশে বন্যা, জলোচ্ছ¡াস, খরা, মৌসুমি ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা ঘটছে। বস্তুত ভৌগোলিক গঠন ও বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ দুর্যোগপ্রবণ দেশ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশে এ পর্যন্ত বিপুল প্রাণের ক্ষয়, ফসলের ক্ষতি, সম্পদহানি হয়েছে। ১৯৭০ সালে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সাইক্লোন ও জলোচ্ছ¡াসে প্রায় কয়েক লাখ লোকের মৃত্যু হয়। ১৯৮৮ সালের বন্যায় প্রায় ১ কোটি লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০০৭ সালে দেশে বন্যায় ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় সোয়া কোটি মানুষ। খেতের ফসল, বাড়িঘর, গবাদি পশু, গাছপালা সবই ধ্বংস হয়ে যায়। ভেঙে পড়ে দেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতি। ১৯৯১ সালে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলে প্রাণ হারায় প্রায় দেড় লাখ মানুষ। তবে দুর্যোগ মোকাবিলায় বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশ বেশ সাফল্য অর্জন করেছে। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের ‘গোর্কি’ নামের ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলীয় এলাকার প্রায় ৫ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। ভেসে যায় লাখ লাখ গবাদি পশু ও আবাদি ফসল। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল ঘণ্টায় ২৫০ কিলোমিটার বেগে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়টি প্রায় ১.৩৮ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। এছাড়া ১ কোটি মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়ে, ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১০ লাখ ঘরবাড়ি। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’-এ সাড়ে ৩ হাজার মানুষ মারা যায়। ঝড়ের প্রভাবে প্রায় ৯.৬৮ লাখ ঘরবাড়ি ধ্বংস এবং ২১ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়। ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ ও ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাংশে আঘাত হানে। আইলায় কমপক্ষে ৩ লাখ পরিবার ঘর-বাড়ি হারায়। প্রায় দুশ মানুষ মারা যায়। এই ঝড়ে দক্ষিণাঞ্চলে লবণ পানি প্রবেশ করায় পানীয় জলের তীব্র সংকট তৈরি হয়, যে সংকট এখনো কাটেনি। এছাড়া ২০১৩ সালের ১৪ মে ঘূর্ণিঝড় মোহসেনের আঘাতে কমপক্ষে ৫০ জন, ২০১৬ সালের ২১ মের ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর আঘাতে ২৪ জন, ২০১৭ সালের ৩০ মের ঘূর্ণিঝড় মোরার আঘাতে ৬ জন, ২০১৯ ?সালের ৩ মে ঘূর্ণিঝড় ফণীর আঘাতে ৯ জন, ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর বুলবুলের আঘাতে ২৪ জন প্রাণ হারায় এবং সর্বসাম্প্রতিক ২৫ মে আঘাত হানা ইয়াসের আঘাতে প্রাণহানি খুবই নগণ্য। তবে সব ঝড়েই ফসল এবং কাঁচা বাড়ি ঘরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
বিশেষ করে ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পরই উপকূলীয় এলাকায় সবুজবেষ্টনী প্রকল্প হাতে নেয়া হয় এবং এ প্রকল্প পরবর্তীতে ব্যাপক বনায়ন এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে উপকূলবর্তী এলাকায় ভাঙন প্রতিরোধ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। উপকূলবর্তী এলাকায় প্রচুর সাইক্লোন সেল্টারের পাশাপাশি ব্যাপক বনায়ন, বিশেষত ম্যানগ্রোভ জাতীয় বৃক্ষাদি রোপণ করার মাধ্যমে ঘূর্ণিঝড়ের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। উপরোক্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিগত তিন চার দশক আগে এ ধরনের দুর্যোগে যেখানে লাখ লাখ লোক মারা যেত, সেখানে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতার কারণে এখন প্রাণহানির সংখ্যা খুবই হাতেগোনা কয়েকজন। দুর্যোগ মোকাবিলায় মানুষের সচেতনতা যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে দুর্যোগ মোকাবিলার অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও দুর্যোগ প্রস্তুতির তথ্যও দ্রুত সবার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সাফল্য। এজন্য ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা মোকাবিলায় অনেক সক্ষমতা অর্জন করায় বিশ্বে বাংলাদেশের এই সক্ষমতা বেশ প্রশংসিত ও রোল মডেল হিসেবে কাজ করছে।
প্রকৃতি তার নিজের খেয়ালে চলে। তাই প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধ করার শক্তি যেমন মানুষের হাতে নেই, তেমনি জানা নেই আত্মরক্ষার কৌশলও। তবে দুর্যোগ মোকাবিলা করার প্রস্তুতি ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে অনেক ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। এজন্য গণসচেতনতা যেমন দরকার, তেমনি দরকার ঝড়-জলোচ্ছ¡াস ও বন্যা থেকে রক্ষা পাওয়ার মতো অবকাঠামো নির্মাণ, উঁচু বাঁধ তৈরি। রাষ্ট্রীয় সুপরিকল্পনার মাধ্যমে জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় আশ্রয়কেন্দ্র, আরো বেশি সবুজ বেষ্টনী তৈরি করা যেতে পারে এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতাকে আরো টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘আন্তর্জাতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ হ্রাসকরণ দিবস’ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের গৃহীত কার্যক্রম আজ বিশ্বব্যাপী প্রশংসনীয়। বাংলাদেশ এখন বিশ্বে রোল মডেল হিসেবে পরিচিত। দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ উত্তরোত্তর সাফল্য অর্জন করে যাচ্ছে এবং এ সাফল্য ভবিষ্যতেও ধরে রাখতে হবে।

মো. জিল্লুর রহমান : সতিশ সরকার রোড, গেণ্ডারিয়া, ঢাকা।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়