আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যাওয়া নিছক কোনো ঘটনা নয়

আগের সংবাদ

কর্ণফুলী রক্ষায় মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন দরকার

পরের সংবাদ

করোনায় বাণিজ্য ও স্বাস্থ্য চিত্র

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৩, ২০২১ , ১:৫১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ১৩, ২০২১ , ১:৫১ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের আশু ভবিষ্যৎটি কেমন দাঁড়াবে? ভালো যে নয় সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে। গত বছরেও করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গুতে কাবু ছিলাম; এ বছরও ব্যতিক্রম নয়। কয়েকটা বিপদ তো একেবারে ঘাড় চেপে ধরছে। অনেক মানুষ ইতোমধ্যেই বেকার হয়েছে, যাদের কাজ আছে তদেরও বড় একটা অংশ ঠিকমতো বেতন পাচ্ছে না। সঞ্চয় ভাঙিয়ে খাচ্ছে। ক্ষুদ্র পুঁজি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। ছাঁটাই চলছে। ছাঁটাই আরো বাড়বে। বিদেশ থেকে আমাদের মেহনতি ভাইরা ফেরত আসছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ব্যবসা হারিয়েছে; অনানুষ্ঠানিক খাতের লোকদের কর্ম-চাহিদা নেই। জীবিকার সন্ধানে যারা শহরে এসেছিল, তারা দলে দলে গ্রামে ফিরে যাচ্ছে, কিন্তু গ্রামে কর্মের সংস্থান নেই বলেই তারা শহরে এসেছিল, গ্রামে গিয়ে খাবেটা কী?
চিকিৎসা ব্যবস্থাটা দুর্বলই ছিল, করোনার আঘাতে তার ভেঙে পড়ার দশা। পণ্য সংস্কৃতির ফেলো কড়ি মাখো তেল নীতিটা চিকিৎসা ক্ষেত্রে ভালোভাবেই প্রতিষ্ঠিত; পাবলিকের জন্য যেসব হাসপাতাল সেগুলোর অবস্থা দেশের পাবলিকের মতোই করুণ, বিপরীতে প্রাইভেট বেশ রমরমা। তবে প্রাইভেট হাসপাতালে যাওয়ার মতো কড়ি তো আর পাবলিকের পকেটে নেই, যেতে হলে জমিজমা বেচতে হয়, না পারলে নিশ্চিত মরণ। সুবিধাভোগীরা বিদেশে যান; চিকিৎসার জন্য যান, চেক-আপের জন্যও যান। ভিভিআইপি যারা, তারা রাষ্ট্রীয় খরচে বিদেশে যান, তারা যে যাচ্ছেন, সেটা যাওয়ার সময় একবার খবর হয়, ফিরলে সেটাও খবরে আসে; বলা হয় মহামান্যদের দেশে প্রত্যাবর্তন ঘটেছে, মনে হয় দেশ বুঝি তাদের জন্য দেশ নয়, বিদেশ বটে।
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ খুবই অল্প, তদুপরি সেখানে ভয়াবহ রকমের লুটপাট চলছে। দেখা গেল বিপন্ন চিকিৎসাপ্রার্থীদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে এমন সব অঙ্কের টাকা তারা হাতিয়ে নিচ্ছে, যেটা শুনলে সুস্থ মানুষেরও অসুস্থ হয়ে পড়ার কথা। প্রতারণার অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটিয়েছেন একজন হাসপাতালওয়ালা। তার এক হাসপাতালের দুই শাখা। তিনি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে গেছেন করোনা মোকাবিলায় বিনা মুনাফায় সেবা দেবেন বলে। তার ল্যাবরেটরিতে টেস্টিং হবে। তার হাসপাতাল উন্মুক্ত থাকবে চিকিৎসাসেবার জন্য। তা তিনি কাজে কোনো তৎপরতার অভাব দেখাননি। তার দপ্তর থেকে হাজার হাজার ভুয়া সার্টিফিকেট ছাড়া হয়েছে, কত কোটি টাকা আয় করেছেন এবং কত লোককে যে বিপদে ফেলেছেন কে জানে। তবে এটা জানা গেছে যে, ধরা পড়ার আগে নিজের ভুয়া স্বেচ্ছাসেবী কাজের জন্য ১ কোটি ৯৬ লাখের একটি বিল তিনি দাখিল করেছিলেন, অল্পের জন্য সফল হননি। তার হাসপাতালে করোনা রোগীদের ভর্তিও করা হয়েছে, টাকাও নেয়া হয়েছে যথারীতি, কিন্তু সেখানে চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। যে জন্য তার নিজের পিতা যখন করোনায় আক্রান্ত হন তখন তাকে নিজের হাসপাতালে না এনে অন্যের হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন। পিতা মারা গেছেন। প্রতারক ভদ্রলোকের কর্মপ্রতিভা বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। তিনি অনেক কাজে যুক্ত ছিলেন। ধরা পড়ার পর জানা গেছে, টাকা জাল করাতেও নিয়োজিত ছিলেন তিনি। তাকে ধরতেও বিস্তর কষ্ট হয়েছে। তার কর্মচারীরা ধরা পড়েছেন। তিনি সবাইকে ফাঁকি দিয়ে একটানা ৯ দিন লুকিয়ে ছিলেন। দেশের ভেতরেই ধরা পড়লেন দেশ ছেড়ে পালাতে গিয়ে। বোরকা পরে, নারী সেজে পগারপার হয়েই গেছিলেন, অল্পের জন্যই কাত হয়েছেন। এমনটাই তো আমরা শুনতে পেলাম। আরো গভীর কিছু থাকলে জানেন তা অন্তর্যামী।
এই ভদ্রলোকের সম্বন্ধে যেসব তথ্য ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে তাতে বোঝা যায় আমাদের দেশে ডিটেকটিভ গল্প যারা লেখেন তাদের এখন আর বিদেশি কাহিনীর ছায়া অনুসরণ বা কায়া ধরে টানাটানি করার দরকার নেই, দেশের ভেতরেই প্রচুর খাঁটি জিনিস উৎপাদিত হচ্ছে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়ে গিয়েছিল লুটপাটের কাজকর্ম; তাতে আর বিরতি পড়েনি। প্রতারণাও শুরু হয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গেই। লুণ্ঠন ও প্রতারণা দুটোই এখন বেশ অপ্রতিহত গতিতে চলছে। প্রতারক এই ভদ্রলোকের নাম মোহাম্মদ সাহেদ; কিন্তু সেটা তার একমাত্র নাম নয়; সাহেদ করিম, মেজর করিম, কর্নেল চৌধুরী ইত্যাদি যখন যেমন তখন তেমন নামেও তিনি পরিচিত ছিলেন। তার অসাধারণ বাস্তববুদ্ধি তাকে বাতলে দিয়েছিল যে, সাফল্যের জন্য গুটিকয়েক পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত রাজনৈতিক যোগাযোগ। সেটা তার ছিল, নিজেকে তিনি আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক উপকমিটির একজন সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এবং রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের উচ্চ মহলে তার অবাধ যাতায়াত ছিল। র‌্যাব যখন তার হাসপাতাল সিল করে দিচ্ছে তখনো তার নৈতিক সাহস অক্ষুণ্ন ছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফোন করার। প্রতারক ভদ্রলোক এটাও বিলক্ষণ জানতেন যে, যুগটা হচ্ছে মিডিয়ার, মিডিয়াকে ঠিকভাবে হ্যান্ডেল করতে পারলে অনেকেই কুপোকাত হবেন। তা মিডিয়াকে তিনি ঠিকমতোই ধরেছিলেন। আমরা দেখিনি, তবে যারা দেখেছেন তারা বলেছেন যে টকশোতে তাকে নিয়মিতই দেখা যেত। আর নিয়ম তো এই যে, মিডিয়ায় যত দর্শনদান ততই প্রতিপত্তি বৃদ্ধি। সেটা তার ক্ষেত্রে ঘটেছে। সাধারণ দর্শক তো অবশ্যই এমনকি সরকারের পদস্থ লোকেরাও অনুমান করেছেন ইনি রাস্তাঘাটের লোক নন, অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ও বিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব। রাজনৈতিক অঙ্গনে তার বিচরণ তাতে সহজতর হয়েছে। জানা যায় টিভির ওপর সবটা নির্ভরতা না রেখে, প্রিন্ট মিডিয়ার দিকেও তিনি নজর দিয়েছিলেন। তার ভিজিটিং কার্ডগুলোর একটিতে তার পরিচয় দৈনিক নতুন কাগজ নামের পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে। কার্ডটি নাকি প্রেস ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্ট থেকে জারি করা। অকালে ধরা না পড়লে আমরা হয়তো একটি নতুন দৈনিকেরও দেখা পেতাম।
এ যুগের আরেক অস্ত্র সেলফি; ছবি তুলে মোবাইলে রেখে দেয়া, প্রয়োজন মতো প্রদর্শন করা। সাহেদ সাহেব সে কর্তব্যকে মোটেই উপেক্ষা করেননি। রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে বহু গুরুত্বপূর্ণ মানুষের সঙ্গে তার ছবি তোলা, অথবা তৈরি করা অবস্থায় মজুত রয়েছে। যেগুলো দেখে কর্তাব্যক্তিরা পর্যন্ত ধারণা করতেন যে ইনি মস্ত একজন কেউকেটা। তাতে আমলা ও রাজনীতিক, উভয় মহলেই তার গুরুত্ব বাড়ত এবং নিশ্চিত অবস্থানে থাকত।
একটা ছবি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে তিনি তার ভুয়া কাজের জন্য স্বাস্থ্য দপ্তরের সঙ্গে ঘটা করে অঙ্গীকারে আবদ্ধ হচ্ছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অফিসেই চুক্তি স্বাক্ষরিত হচ্ছে। প্রবল বিক্রমে তিনি স্বাক্ষর দিচ্ছেন, তার ঠিক পাশে বসে রয়েছেন স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রী, মন্ত্রীর পাশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। এসব প্রশ্নের কোনো জবাব নেই। আসলে সরকারের নিজেরই তো জবাবদিহিতার দায় বলে কোনো কিছু নেই। প্রশ্ন করতে গেলে তো মুখ সামলাতে হয়। সদাপ্রস্তুত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভ্রƒকুটি রয়েছে। ওই আইন আর যাকেই নিরাপত্তা দিক প্রশ্নকারীদের যে নিরাপত্তা দেয় না সেটা পরীক্ষিত সত্য। যে কেউ, যখন ইচ্ছা, মামলা ঠুকে দিতে পারে; সে ছাত্রলীগের প্রাক্তন সদস্য হোক কি হালের এমপিই হোক। আর মামলা দিলেই আর কোনো কথা নেই, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তখনই ঝাঁপিয়ে পড়বে, ধরে-আনবে, জামিন দেবে না। জেলে পুরবে। এমনকি ধরে নিয়ে গেছে যে সেটাও অস্বীকার করতে পারে, ইচ্ছা করলে।
করোনায় উত্ত্যক্ত মানুষদের সঙ্গে প্রতারণার ব্যাপারে মোহাম্মদ সাহেদই যে একমাত্র ব্যক্তি এটা মনে করার কারণ নেই। অন্তত একজন তো ছিলেনই, যিনি সাহেদ সাহেবের গুরু বলে দাবি করতে পারেন। ইনিও একটি স্বেচ্ছাসেবক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন। ভদ্রলোকের চার চার জন স্ত্রী। চতুর্থজন একজন চিকিৎসক। চিকিৎসক স্ত্রীটির সাহায্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে অনুমতি নিয়ে তিনি নমুনা সংগ্রহের এবং নমুনা পরীক্ষার পর সার্টিফিকেট প্রদানের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। অধিদপ্তর কিছুটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিল পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানো যাচ্ছে না দেখে; ওই সুযোগে সদ্বব্যবহার করে তাদের অনুপ্রবেশ। তারা যে বিনামূল্যে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করছিলেন তা কিন্তু নয়, ভালো অঙ্কের টাকাই নিচ্ছিলেন। নমুনা পরীক্ষা করেই সার্টিফিকেট দেয়া হচ্ছিল, কিন্তু মাঝপথে এসে বুদ্ধি গেল খুলে, তারা দেখলে কেউ তো আর দেখছে না, পরীক্ষা-নিরীক্ষার অতসব ঝুট-ঝামেলার দরকার কী। তাই নমুনাগুলো নর্দমায় নিক্ষেপ করে তারা ইচ্ছামতো ডানে-বামে সার্টিফিকেট বিলি করা শুরু করে দিলেন। খবরে প্রকাশ ১৫ হাজার ৪৬০টি ভেজাল সার্টিফিকেট তারা মানুষের হাতে তুলে দিয়েছেন। ধরা না পড়লে আরো দিতেন।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়