মা ইলিশ রক্ষা করে উৎপাদন বৃদ্ধি করি

আগের সংবাদ

বঙ্গবন্ধুর শাসনকালে ৩০ হাজার মানুষ হত্যার তত্ত্ব (!) বিএনপির মুখে

পরের সংবাদ

ভাসানচরের বিশ্ব স্বীকৃতি : এবার যাবে রোহিঙ্গারা?

মোস্তফা কামাল

সাংবাদিক ও কলাম লেখক; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন

প্রকাশিত: অক্টোবর ১২, ২০২১ , ১২:৫৩ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ১২, ২০২১ , ১২:৫৩ পূর্বাহ্ণ

জাতিসংঘের সংস্থাগুলো কক্সবাজারের মতো ভাসানচরে আশ্রিত রোহিঙ্গাদেরও মানবিক সহায়তা দেবে। প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত তারা এ সহায়তা অব্যাহত রাখবে। কী বা কতটুকু সহায়তা দেবে, এর সঙ্গে যুক্ত হলো স্বীকৃতির বিষয়টি। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন-ইউএনএইচসিআরের এ সমঝোতা স্মারকে সইয়ের মাধ্যমে প্রকারান্তরে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেল চরটি। ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা প্রশ্নে জাতিসংঘের সঙ্গে বাংলাদেশের খসড়া চুক্তি হয় গত জুলাইয়ের শেষদিকে। বাংলাদেশের আশা ছিল, চুক্তিটি চূড়ান্ত রূপ পাবে আগস্টের শুরুতে। সেই দৃষ্টে জাতিসংঘ কাজে নামবে সেপ্টেম্বর থেকে। কিন্তু কাজ সেই আলোকে হয়নি। মাসখানেক দেরিতে চুক্তি হলো অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরুতে ৯ অক্টোবরে। কোন পরিস্থিতিতে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত বাস্তুচ্যুত লাখো রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ মানবিক বিবেচনায় আশ্রয় দিয়েছে, তা বিশ্ব ইতিহাসে উল্লেখ থাকবে। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে কক্সবাজারের সীমিত জায়গায় সামলাতে না পারায় তাদের কিছু অংশকে নোয়াখালীর ভাসানচরে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। কিন্তু প্রথম থেকেই নানা বাধা। নানা বিপত্তি। বিভিন্ন মহলের পাশাপাশি সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিল জাতিসংঘও। তাদের বোঝাতে চেষ্টার কোনো কমতি করেনি সরকার। আলোচনা চলেছে নিবিড়ভাবে। এতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। সেখানে রোহিঙ্গাদের চলাচলের স্বাধীনতা, শিক্ষা, কর্মসংস্থানসহ নানা শর্ত সামনে এনেছে জাতিসংঘ। সেই সঙ্গে ছিল ভাসানচরের মতো কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির রাখার তাগিদ। আলোচনার এক পর্যায়ে গত ১৭ মার্চ তিন দিনের সফরে ভাসানচরে স্থানান্তরিত রোহিঙ্গাদের অবস্থা সরজমিন পর্যবেক্ষণ করেছে জাতিসংঘের ১৮ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। তাদের মতিগতি বুঝতেও সময় লেগেছে। মাসখানেক পর ভাসানচর নিয়ে ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানান ওই দলের প্রতিনিধিরা। অবশেষে তারা শরিক হলো রোহিঙ্গা সহায়তায়। করল সমঝোতা চুক্তি সই। সেই বিবেচনায় এটি মোটাদাগের ঘটনা। চুক্তির পর জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি ইয়োহানেস ভন ডার ক্লাও জানান, কক্সবাজারের মতো ভাসানচরেও তাদের মূল লক্ষ্য হবে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, সম্মানজনক ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের জন্য প্রস্তুত করে তোলা। সামনের দিনগুলোতে কোনো ব্যতিক্রম না হলে তারা ভাসানচর পরিস্থিতিতে সন্তুষ্ট। আধুনিক সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেই ১৮ হাজার রোহিঙ্গাকে এর মধ্যে ভাসানচরে রাখা হয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে আরো ৮০ হাজার রোহিঙ্গা সদস্যকে সেখানে নেয়া হবে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের চেষ্টা-তদবিরে একা বাংলাদেশ কুলাবে না। একক কোনো দেশের চাপে তা সম্ভবপর নয়। এজন্য আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে জাতিসংঘের প্রতি বাংলাদেশের আহ্বান অবিরতভাবে চলছে। মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনীর অত্যাচার থেকে বাঁচতে ২০১৭ সালের আগস্টে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় ১০ লাখের ওপর রোহিঙ্গা। তাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে বারবার টালবাহানা করে আসছে মিয়ানমার। চীনের অংশগ্রহণে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি চুক্তি হলেও একজন রোহিঙ্গাও এখনো দেশে ফিরতে পারেনি। তাদের ফেরত নিতে তাই মিয়ানমারকে চাপ বা বাধ্য করার প্রশ্ন এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এর পূর্বাপরে রয়েছে নানা দেশীয় কূটনীতি। চীন, জাপান ও ভারতের কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব হচ্ছে না- এমন কূটনৈতিক মত রয়েছে। দাতা সংস্থাগুলোর কারো কারো ভূমিকাও রহস্যজনক। কারো কারো আচরণ স্পষ্টই দ্বিমুখী।
রোহিঙ্গা তরুণ-যুবকদের উগ্রবাদ-মাদক-দলাদলিতে জড়িয়ে পড়া এখন আর উদ্বেগ নয়, ঘটনা। সেখানে যোগ হয়েছে খুন-খারাবিও। ভাসানচর নিয়ে জাতিসংঘের সঙ্গে চুক্তির আগ মুহূর্তে আনোয়ার মাঝি, মুহিবুল্লাহর মতো রোহিঙ্গা নেতা খুনের ঘটনা নতুন চিন্তা যোগ করেছে। মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের পর কক্সবাজারে মাঠ পর্যায়ের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চার সদস্যের প্রতিনিধি দল। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন তারা। কথা বলেছেন স্থানীয় রোহিঙ্গাদের সঙ্গে। পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন মনে করছেন মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ড প্রত্যাবাসন চেষ্টায় প্রভাব ফেলবে না। কিন্তু কেবল প্রত্যাবাসন নয়, উদ্বেগ তো আরো ডালপালা ছড়াচ্ছে। আরসা নামে পরিচিত আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির তৎপরতা বড় ভয়ংকর। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি দলের কক্সবাজার সফরের সময়ই উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ধরা হয় আরসার পাঁচ সদস্যকে। এরা রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় চাঁদাবাজি, অপহরণ, মাদকের কারবারসহ নানা কুকর্মে জড়িত ছিল। বিলম্বিত তথ্যে জানা গেছে, সশস্ত্র সংগঠন আরসার নেতৃত্বে কাজ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস এন্ড হিউম্যান রাইটস-এআরএসপিএইচআরের চেয়ারম্যান মুহিবুল্লাহকে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুহিবুল্লাহ পরিচিত মুখ হওয়ায় তাকে প্রস্তাব দিয়েছিল আরসা। তবে বনিবনা হয়নি। উপরন্তু দিনে দিনে শত্রæতা বেড়েছে। রোহিঙ্গাদের মধ্যে মুহিবুল্লাহর প্রচুর সমর্থক। তবে অস্ত্র-বলে এগিয়ে আরসা। তাদের ভয়ে কোণঠাসা থাকত মুহিবুল্লাহ সমর্থকরা। সেই ধারাবাহিকতায় মুহিবুল্লাহকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা অনেকের। ধারণার পেছনে পর্যাপ্ত কারণও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এক রোহিঙ্গা নেতাকে হোয়াটসঅ্যাপে অডিও বার্তা দিয়েছিলেন মুহিবুল্লাহ। মোবাইল নেটওয়ার্কের সমস্যা থাকায় রোহিঙ্গারা সাধারণত হোয়াটসঅ্যাপে সরাসরি কল না করে কথা রেকর্ড করে বার্তা আদান-প্রদান করে। মুহিবুল্লাহর এমন কয়েকটি অডিও বার্তা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আরসার কার্যক্রম নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন তিনি। আরসা মূলত গড়ে উঠেছিল সৌদি আরবে চলে যাওয়া রোহিঙ্গাদের দিয়ে। মক্কায় থাকে এমন ২০ জন রোহিঙ্গা সংগঠনটি গড়ে তোলে। তারা বিভিন্ন দেশে থাকা রোহিঙ্গার সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করে। ২০১৭ সালের প্রথম দিকে রোহিঙ্গাদের কাছে আরসা কিছুটা জনপ্রিয়তা পেলেও এখন তা তলানিতে। রোহিঙ্গাদের এসব দলাদলি, কক্সবাজার থেকে ভাসানচর স্থানান্তর ইত্যাদির মধ্য দিয়ে তারা ‘কবে ফিরে যাবে’ বা ‘কবে ফেরত নেয়া হবে’- এ প্রশ্ন উহ্য হয়ে যাচ্ছে। তারা কি আদৌ মিয়ানমারে ফিরবে?- এ প্রশ্ন আরো প্রাসঙ্গিক। ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, সর্বপ্রথম পাকিস্তান আমলে ১৯৭০ সাল থেকে কিছু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মিয়ানমার থেকে এসে কক্সবাজারসহ বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে বসবাস শুরু করে। রোহিঙ্গাদের ভাষা আর চট্টগ্রামবাসীর ভাষা প্রায় এক হওয়ায় তারা সহজেই স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে যায়। আর বাংলাদেশ আমলে ঘটা করে প্রথম অনুপ্রবেশ ১৯৭৮ সালে। ওই সময় প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গা প্রবেশ করে কক্সবাজারের উখিয়া, টেকনাফ, রামু ও পার্বত্য বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার অস্থায়ী আশ্রয় শিবিরে অবস্থান নিয়েছিল। তখন বাংলাদেশ এককভাবে কোনো আন্তর্জাতিক মহলের সহযোগিতা ছাড়া আশ্রিত রোহিঙ্গাদের থাকা, খাওয়া ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করেছিল। সে সময় অপুষ্টি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় ১০ হাজার রোহিঙ্গা মারা যায়। পরে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ভিত্তিতে ওই ২ লাখ রোহিঙ্গা নিজ দেশে ফিরে যায়। এরপর দ্বিতীয় দফায় রোহিঙ্গাদের প্রবেশ ঘটে ১৯৯১-৯২ সালের মধ্যে। সে সময় প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। তাদের কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলার ১৪টি অস্থায়ী আশ্রয় শিবিরে রাখা হয়। সব আশ্রয় শিবির নির্মাণ করা হয় সংরক্ষিত বনভূমিতে বনজসম্পদ ও পাহাড় নিঃশেষ করে। ওই রোহিঙ্গাদের মধ্যে থেকে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গাকে কয়েক বছরের মধ্যে ফেরত নেয় মিয়ানমার সরকার। আরো প্রায় ৩৩ হাজার রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়া হয় টেকনাফের হ্নীলার নয়াপাড়া ও উখিয়া উপজেলার কুতুপালং আশ্রয় শিবিরে। সেই ৩৩ হাজার রোহিঙ্গাকে শরণার্থীর মর্যাদা দেয় বাংলাদেশ। ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রায় চার দশকে বাংলাদেশে ৪ ধাপে ব্যাপকসংখ্যক রোহিঙ্গা আসে। ধাপে ধাপে এবং বিচ্ছিন্নভাবে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা নিয়ে একক তথ্য নেই। সর্বসাকল্যে তা ১২ লাখ বলে প্রচারিত। তাদের সামান্য অংশ শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃত। তাদের বলা হয় রেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার-আরআরআরসি কার্যালয়ের হিসাবে সংখ্যাটি মাত্র মাত্র ৩৫ হাজার ৫১৯। বোঝা গেল কিছু?

মোস্তফা কামাল : সাংবাদিক ও কলাম লেখক; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়