সোনালি আঁশের সোনালি দিনের অপেক্ষায় চাঁপাইয়ের চাষিরা

আগের সংবাদ

মিলছে টিকা, করোনায় স্বস্তি

পরের সংবাদ

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত : রংপুরে একই আঙিনায় মন্দির ও মাজার

প্রকাশিত: অক্টোবর ১১, ২০২১ , ৮:২৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ১১, ২০২১ , ৮:২৭ পূর্বাহ্ণ

রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। বদরগঞ্জ পৌর শহরের পুরাতন বাজারে একই আঙিনায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বারোয়ারী কালীমন্দির এবং মুসলিমদের পীর বদর বাবার মাজার। সনাতন ধর্মের মানুষ তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান যথা নিয়মে পালন করেন। পাশাপাশি মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের ধর্মগুরু বদর বাবার মাজারে ইসলাম ধর্মমতে আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন।

এখানে কারও সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো বদর বাবার মাজার বদরগঞ্জের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে যেমন দীপ্যমান, তেমনি প্রায় ১০০ বছরের পুরনো বারোয়ারী কালী মন্দির হিন্দু সম্প্রদায়ের সনাতন সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু। সনাতন ধর্মের মানুষের এটি কালীমন্দির হলেও এখানে দুর্গাপূজা, কালীপূজা, শ্যামাপূজা, বাসন্তিপূজাসহ সব পূজার আয়োজন এই মন্দিরে হয়ে থাকে। বদরগঞ্জে দুর্গাপূজার বৃহত্তম প্রতিমা এই মন্দিরেই হয়। পাশাপাশি বদর বাবার মাজারের এক পার্শ্বে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের স্থান নির্ধারণ করা আছে। যারা ব্যবসায়িক ব্যস্ততার কারণে মসজিদে যেতে পারেন না বা জামাত ধরতে পারেন না তারা এখানেই নামাজ আদায় করেন।

একদিকে পূজা অন্যদিকে নামাজ এ যেন এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। হিন্দু-মুসলিম কারো মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। যার যার ধর্ম নিজের মতো করে পালন করছেন সবাই। বদরপীরের মাজার পরিচালনা কমিটিতে সনাতন ধর্মের মানুষকেও রাখা হয়েছে। বারোয়ারী কালী মন্দির থেকে ৫০ গজ দূরে বদরগঞ্জ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ। নামাজের সময় বিশেষ করে মাগরিবের নামাজের সময় মুসলিমরা মসজিদে যান, হিন্দুরা মন্দিরে।

মন্দিরে ঢাক বাজে, মোমবাতি জ্বালিয়ে পূজা করা হয়, অপরদিকে মসজিদে আজান দিয়ে নামাজ আদায় করা হয়। হিন্দু সম্প্রদায় নামাজের সময় ঢাক বন্ধ করে শুধু অন্যান্য আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন। কারো ধর্ম পালনে কেউ বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি এই ১০০ বছরে। আরো আশ্চর্যের বিষয় বদরগঞ্জ থানাপাড়ায় একই প্রাচীরের এক পাশে ঈদগাহ মাঠ, অপরপ্রান্তে হিন্দুদের মহাশ্মশান।

সনাতন ধর্মের ছেলেমেয়েদের বিয়েতে মন্দিরে এসে পূজা দেয়া তাদের রীতি। এখানে বিয়ে উপলক্ষে মন্দিরে পূজা দিতে এলে বর, কনে এবং তাদের অভিভাবকসহ সবাই বদর বাবার মাজারে ধূপ জ্বালিয়ে প্রার্থনা করেন সনাতন ধর্মের মানুষজন।

কথিত আছে ১৭ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এক আধ্যাধিক পুরুষ জঙ্গল বেষ্টিত বর্তমান স্থানে আসন গ্রহণ করেন। সেখানে বসে তিনি তার ধর্ম প্রচারসহ নানাবিধ কাজ করতেন। বদরপীর এখানে অবস্থানকালে মানুষদের বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় আচার পালনের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করতে পেরেছিলেন। একদিন সবার অজান্তেই তিনি নিরুদ্দেশ হন। তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে এলাকার মানুষ জানতে পারেন তিনি চট্টগ্রামে মারা গেছেন। তাই তার মাজার বর্তমানে এই স্থানেই স্থাপন করা হয় এবং তার নামেই বদরগঞ্জের নামকরণ করা হয় বলে জনশ্রæতি রয়েছে। তার আগে এই এলাকা বৈকুণ্ঠপুর নামে পরিচিত ছিল। আরো পরে জলুবর নামে যমুনেশ্বরী নদীর তীরে বন্দর গড়ে ওঠে।

পাশাপাশি বদরপীরের মাজার ঘেঁষে বদরগঞ্জ বারোয়ারী কালীমন্দির ১৪০৫ বঙ্গাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রায় ১২০ বছর ধরে সনাতন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়ে আসছে। এবারে বদরগঞ্জে মোট ১২১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

কবি, সাহিত্যিক ও ইতিহাসবিদ আবুল কাশেম সরকার স্মৃতিচারণ করে বলেন, ৩০০ বছরের পুরনো বদরপীরের মাজার বদরগঞ্জের সব ধর্মের মানুষের তীর্থস্থান হিসেবে খ্যাত। এখানে বদরগঞ্জ ছাড়াও পার্শ্ববর্তী জেলা দিনাজপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট থেকে মানুষ আসেন। এখানে ধর্মের কোনো ভেদাভেদ নেই। সব ধর্মের মানুষ তার মাজারে মানত করেন এবং দান-খয়রাত করেন।

রংপুর সরকারি কারমাইকেল কলেজের অধ্যাপক আখতারুজ্জামান চৌধুরী লাবলু বলেন, বদরগঞ্জে মসজিদ, মন্দির ও মাজার সব ধর্মের মানুষের কাছে সমান পূজনীয়। এখানে ধর্ম পালনে কেউ কখনো কারো প্রতিপক্ষ হয়নি। বরং আমার চোখে দেখা সনাতন ধর্মের মানুষরাও মুসলমানদের ঈদ কিংবা অন্য কোনো ধর্মীয় পার্বণে সমান আনন্দ উপভোগ করেন। সনাতন ধর্মের মানুষ যেমন পূজায় নিমন্ত্রণ করেন তেমনি ঈদে তাদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়। বদরগঞ্জের মানুষ বিশ্বাস করে ধর্ম যার যার আনন্দ-খুশি সবার।

বারোয়ারী কালীমন্দিরের পূজা কমিটির সাবেক কোষাধ্যক্ষ গণেশ শর্মা বলেন, পূজার সময় এই মন্দিরে হিন্দু ছাড়াও অন্য ধর্মের মানুষও সহযোগিতা করেন। বদর বাবার মাজারের কোনো অপবিত্রতা হোক কেউ চায় না। করেও না। সব ধর্মের মানুষ মাজারে আসেন এবং আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন।

রংপুর-২ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য আবুল কালাম মো. আহসানুল হক চৌধুরী ডিউক বলেন, বদরগঞ্জে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি শত বছরের। এখানে ধর্মে ধর্মে কোনো বিভেদ নেই। সব ধর্মের মানুষ সমানভাবে তাদের ধর্ম পালন করে আসছেন। সব মসজিদ, মন্দির ও মাজারে আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে।

আর- এমআর / ডি- এইচএ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়