শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতি আমাদের উদ্বিগ্ন করে

আগের সংবাদ

সরকারের উন্নয়ন দেখে সারাবিশ্ব প্রশংসা করছে: সালমান এফ রহমান

পরের সংবাদ

সংকট আর বাড়ানো যাবে না

রণেশ মৈত্র

রাজনীতিক ও কলাম লেখক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১১, ২০২১ , ১২:৫১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ১১, ২০২১ , ১২:৫১ পূর্বাহ্ণ

অতি সম্প্রতি নিজ অফিসে কর্মরত থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ প্রবাসী মিয়ানমারের বিতাড়িত রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের সর্বাধিক জনপ্রিয় নেতা আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। ইদানীং এই খবর দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমগুলোতে প্রতিদিন বড় বড় শিরোনামে প্রকাশিত হচ্ছে। কী কারণে এবং কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটাল তা তদন্তের ব্যাপার। কারণ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থাকা মুহিবুল্লাহ যতই খ্যাতিসম্পন্ন হোন এই হত্যালীলার পূর্ব পর্যন্ত তা ঘুণাক্ষরেও জানতাম না।
অপরদিকে এই ঘটনার পরপরই বাংলাদেশস্থ আমেরিকান রাষ্ট্রদূত, ব্রিটিশ হাইকমিশনার ও অপরাপর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে এর প্রতিবাদ জানিয়ে দ্রুত উপযুক্ত তদন্ত দাবি জানিয়ে সংবাদপত্রে বিবৃতি দিলেন। তাও ব্যাপক প্রচার পেল। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন তার প্রত্যয় জানিয়ে বললেন, গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে মুহিবুল্লাহ হত্যার তদন্ত করতে বাংলাদেশ সরকার বদ্ধপরিকর।
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অনুষ্ঠিত এই হত্যালীলার পর সেখানকার পরিস্থিতি এই মুহূর্তে যেমন দাঁড়িয়েছে তা হলো : রাত হলেই রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন ক্যাম্পে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করছে বিভিন্ন সশস্ত্র গ্রুপ। দিনে ক্যাম্পগুলো ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর তৎপরতা থাকলেও সন্ধ্যা নামার পরপরই মিয়ানমারের রোহিঙ্গাভিত্তিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো তৎপরতা শুরু করে। এই গ্রুপের অনেকের হাতে ভারী অস্ত্রও রয়েছে। ক্যাম্প ঘিরে বৈধ-অবৈধ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে তারা নিজেদের শক্তি প্রদর্শন শুরু করে। আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় অনেক সময় এসব গ্রুপ খুনোখুনি শুরু করে ও সংঘর্ষে জড়ায়। মাঝে মধ্যে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটলেও মুহিবুল্লাহর মতো জনপ্রিয় নেতাকে হত্যার পর সাধারণ রোহিঙ্গারা এক ধরনের চাপা আতঙ্কে রয়েছেন। নিজ দেশে প্রত্যাবাসন নিয়েও অনেকে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। আবার অনেকে এই হত্যার জের ধরে আগামীতে অপ্রীতিকর অবস্থারও আশঙ্কা করছেন।
রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরে যাওয়া নিয়েও তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় মুহিবুল্লাহ ‘আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস এন্ড হিউম্যান রাইটাস’ নামের একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের কাছে তিনি ‘মাস্টার মুহিবুল্লাহ’ নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন।
মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটনের মতে, মুহিবুল্লাহ রোহিঙ্গাদের একটি পতাকাতলে আনতে সমর্থ হন। রোহিঙ্গাদের নিজ মাটিতে ফেরানোর স্বপ্ন দেখাতে পেরেছিলেন। সর্বশেষ মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক গ্রুপগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে মুহিবুল্লাহ রোহিঙ্গাদের কথা তাদের বোঝাতে সক্ষম হন। তার মতো ক্যারিশমেটিক নেতার কারণে ক্যাম্প ঘিরে আরসাসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গ্রুপ আতঙ্কিত ছিল। তার হত্যার মধ্য দিয়ে সশস্ত্র গ্রুপগুলো তাদের কর্মকাণ্ডের বিস্তৃতি ঘটাতে সক্ষম হবে বলে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
অপরদিকে মিয়ানমার এই হত্যাকাণ্ডের দায় তাদের কাঁধে এসে পড়তে পারে এমন আশঙ্কায় তারা অর্থাৎ রোহিঙ্গা স্যালভশন আর্মির মুখপাত্র মৌলভী সোয়েব দাবি করেছেন- ‘এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরসা কোনোভাবেই জড়িত নয়, মিয়ানমার সরকারের এজেন্টরাই মুহিবুল্লাহ হত্যায় জড়িত।’
হত্যাকাণ্ডের পর মুহিবুল্লাহর ভাই হাবিবুল্লাহ এ ঘটনায় আরসার হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছিলেন। মৌলভী সোয়েব বলেন, ‘আমাদের ভাই মাস্টার মুহিবুল্লাহ রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার বিচার নিয়ে কাজ করছিলেন। পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠা করে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার প্রচেষ্টা ছিল অসাধারণ। এমন একজন রোহিঙ্গা নেতাকে হত্যা রোহিঙ্গাদের জন্য একটা বড় ক্ষতি।’ তিনি বলেন, এর আগেও মে মাসের ১৫ তারিখে আরেক রোহিঙ্গা নেতা শত্তিকত আলীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তাতে মুহিবুল্লাহ হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজনের বক্তব্য রয়েছে। অপরদিকে একজন রোহিঙ্গা নেতা বলেন, ‘একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের কাছে আমরা রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে চাঁদা তুলি তাদের দেয়ার জন্য। এভাবে আর কতদিন সম্ভব? ভয়ে অনেকে ক্যাম্প ছেড়েছি।’
মুহিবুল্লাহকে হত্যার পর অনেক মাঝি আত্মগোপনে চলে গেছেন বলে তিনি জানান। আবদুর রশিদ নামে আরেক রোহিঙ্গা নেতা জানান, ক্যাম্পে কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপ অত্যন্ত তৎপর। তারা নানাভাবে রোহিঙ্গাদের নির্যাতন করে। মাদক ব্যবসায় জড়িত হতে পারে। আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় তারা রোহিঙ্গা নেতাদের হত্যা করে চলেছে।
আর একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, মিয়ানমারভিত্তিক রোহিঙ্গা সশস্ত্র গ্রুপের মধ্যে রয়েছে ওয়ান শুটার গান। ওয়ান ব্যারেলের এই অস্ত্রতে এসএমজি ও একে কোর সেভেন রাইফেলের গুলি ব্যবহার করতে দেখা যায়। আবার অনেক গ্রুপের কাছে হাতে তৈরি অস্ত্রও রয়েছে। সম্প্রতি চট্টগ্রামে একটি অস্ত্রের চালান ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরে জানা যায়, এই অস্ত্রের গন্তব্য ছিল রোহিঙ্গা ক্যাম্প।
কক্সবাজারের মাঠ পর্যায়ের আর এক কর্মকর্তা বলেছেন, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গ্রুপগুলোর হাতে শুটার গান ছাড়াও অল্পসংখ্যক ৭.৬৫ বোরের পিস্তল ও আইএমএস পিস্তল রয়েছে। মুহিবুল্লাহকে হত্যা করা হয়েছে। তা না হলে একসঙ্গে এতগুলো গুলি ছোড়া সম্ভব ছিল না। এই হত্যাকাণ্ডকে সশস্ত্র বাহিনীর গ্রুপগুলোর পক্ষ থেকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বলে মনে করা হচ্ছে। এটা একাধারে যেমন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, তেমনি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে একটা অনিশ্চয়তাও তৈরি করতে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কক্সবাজারকে ঘিরে সরকারের একাধিক মেগা প্রকল্পের কাজ চলছে। সেখানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিরাপদ রাখা অত্যন্ত জরুরি। দেশি-বিদেশি অশুভ তৎপরতার বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে অনেক বেশি তৎপর ও সতর্ক থাকার বিষয়টি জোরালোভাবে বিবেচনায় নেয়ার কথা বলছেন অনেকে।
জানা যায়, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিভিন্ন নামে যেসব বাহিনী রয়েছে। সাধারণ রোহিঙ্গারা তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে নিতান্তর অসহায় হয়ে। ক্যাম্প ঘিরে সক্রিয় এসব সশস্ত্র গ্রুপের অপরাধ তৎপরতার মধ্যে রয়েছে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়। এছাড়া অনেকে ইয়াবা ও অস্ত্র কারবারের নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। আবার নারীদের জিম্মি করে অনৈতিক কাজে জড়াতে বাধ্য করে সশস্ত্র গ্রুপগুলোর অনেক সদস্য। সাধারণ রোহিঙ্গাদের অন্য দেশে পাচার করেও অনেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। অপর সশস্ত্র গ্রুপের আস্তানায় অভিযানে গেলে র‌্যাবের ওপর গুলি চালায়। ২০১০ সালের ৩০ ডিসেম্বর নয়াপাড়া ক্যাম্পের পাশে একটি সশস্ত্র গ্রুপের আস্তানায় অভিযানে গেলে র‌্যাবের ওপর গুলি চালায় একটি বাহিনী। এতে কক্সবাজার র‌্যাব ১৫-এর সিপিসি-২ হোয়াইক্যাং ক্যাম্পের সৈনিক ইমরান ও করপোরাল শাহাবুদ্দিন গুলিবিদ্ধ হন। চলতি বছরের জুলাইয়ে টেকনাফ থেকে সিএনজিচালিত অটোচালক মাহমুদুল করিমকে অপহরণ করে তার পরিবারের কাছে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। তার পরিবারের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা দেয়া হলেও তাকে জীবিত পাওয়া যায়নি। পরে বন বিভাগ জঙ্গল পরিষ্কার করতে গেলে একটি কঙ্কাল দেখতে পায়। সেই কঙ্কালের পরনের পোশাক দেখে তাকে মাহমুদুল করিম হিসেবে চিহ্নিত করে তার পরিবার। এই ঘটনায়ও রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো জড়িত বলে জানা যায়। এছাড়া রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ব্যবসায়ীকে কল করে চাঁদাও দাবি করা হয়। জানা যায়, কাপড় ব্যবসায়ী নূর নবীর কাছ থেকে চাঁদাও আদায় করেছিল সন্ত্রাসীরা। এই করুণ এবং ভয়াবহ বা নারকীয় ইতিহাসের শেষ নেই যেন।

ব্লক বেইড অতঃপর
জনপ্রিয় রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহকে হত্যার পর কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাধারণ রোহিঙ্গার মনে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ক্যাম্প ঘিরে একগুচ্ছ নতুন পরিকল্পনা নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীতিনির্ধারকরা। লাম্বাশিয়ায় যে ক্যাম্পে মুহিবুল্লাহকে খুন করা হয় সেখানে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সদস্য সংখ্যা চারগুণ বাড়ানো হয়েছে। এর একটি দায়িত্ব পালন করবে ভাসানচরে অপরটি কক্সবাজারে। টানা ব্লক রেইড ও চিরুনি অভিযান চালানোরও সিদ্ধান্ত হয়েছে।
১৪ আর্মড পুলিশের ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক পুলিশ সুপার নাইমুল হক জানান, এখন তারা জোর দিচ্ছেন মুহিবুল্লাহ হত্যাকারীদের চিহ্নিত করতে এবং তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে। ক্যাম্পে ব্লক রেইডসহ দিনে-রাতে ধারাবাহিক অভিযানও চলছে। ক্যাম্প ঘিরে নিরাপত্তা বেষ্টনী থাকায় ধারণা করা হচ্ছে মুহিবুল্লাহর খুনিরা কেউ পালিয়ে যেতে পারবে না। সমন্বিত গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের ওপরও জোর দেয়া হয়েছে।
সর্বশেষ জানা গেল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তাবৎ চোরাচালানকারীকে প্রতিরোধ করতে কক্সবাজার-মিয়ানমার সীমান্তে কর্মরত সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে গুলি করার নির্দেশ দেয়া হবে।
এবারে শেষ কথায় আসা যাক। উপরের বিস্তারিত খবর দৃষ্টে কক্সবাজার এলাকার ভয়ংকর পরিস্থিতি সম্পর্কে জানা গেল। মুহিবুল্লাহকে হত্যার আগে দেশি-বিদেশি গোয়েন্দা এবং দেশীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যর্থ হয়েছে। ৭ অক্টোবর পর্যন্ত কিছুসংখ্যক রোহিঙ্গাকে গ্রেপ্তার করা হলেও তা সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা মাত্র।
এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন করাই যায়, এক. রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে সরকার এবং বিদেশিরা যারা মুহিবুল্লাহ হত্যায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তারা কি আদৌ আন্তরিক ও তৎপর।
দুই. একটি বহুল জনসমষ্টির জন্য বাংলাদেশ একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র কি ওই লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে অনির্দিষ্টকাল ধরে আশ্রয় দিতে সক্ষম?
তিন. বিদেশি রাষ্ট্রগুলো কি উপযুক্ত পরিমাণে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রদান বা ওই দেশ থেকে আমদানি-রপ্তানি ও লোক চলাচল বন্ধ করতে আগ্রহী হবে, যদি আগামী ছয় মাসের মধ্যে মিয়ানমার সবাইকে ফেরত না নেয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আদালত ও সংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের দেশে সত্যিই ফেরাতে চায়- নাকি তাদের বাংলাদেশে রেখে অবৈধ বাণিজ্যে লিপ্ত রেখে ভালো মানুষদের খুনের শিকারে পরিণত করতে চায়? যে করেই হোক, রোহিঙ্গাদের ফেরানো হোক- নইলে সংকট বাড়বেই।

রণেশ মৈত্র : রাজনীতিক ও কলাম লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়