নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে

আগের সংবাদ

শিক্ষা, শিক্ষক দিবস ও আমাদের ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক

পরের সংবাদ

সময় ফুরানোর আগে এদের কথা ভাবতে হবে

অজয় দাশগুপ্ত

কলাম লেখক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১০, ২০২১ , ২:০১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ১০, ২০২১ , ২:০১ পূর্বাহ্ণ

সমাজে তারুণ্য বা নবীনের জয়জয়কার খুব স্বাভাবিক। কিন্তু এটাও মানতে হবে অভিজ্ঞতার বিকল্প নেই। অভিজ্ঞতা ও জীবনবোধ না থাকলে কেউ সঠিকভাবে এগোতে পারে না। এর জন্য প্রবীণদের সাহচর্য ও সহযোগিতা দরকার। তবেই সমাজ হবে ভারসাম্যপূর্ণ ব্যালেন্সড। অথচ সমাজে সবচেয়ে অবহেলার শিকার এখন প্রবীণরাই। প্রবীণরা অসুস্থ, অসহায়, অবহেলিত, নিঃসঙ্গ ও সেবাহীন জীবনযাপন করছেন। বার্ধক্যের অসহায়ত্ব মোকাবিলায় সবাইকে ভাবতে হবে। কারণ আজ যে টগবগে যুবক কাল তিনি হয়ে যাবেন এক অসহায় প্রবীণ। বার্ধক্য সবাইকে ছুঁয়ে যাবেই।
প্রবীণ মানুষকে বিদেশে বলে সিনিয়র সিটিজেন। আমি যখন ৬০ বছরে পা রাখলাম তার আগেই লোকাল এমপির পাঠানো শুভেচ্ছা কার্ড পৌঁছে গিয়েছিল বাড়িতে। ক’দিন পর সরকারি নানা দপ্তর থেকে চিঠি আসা শুরু করেছিল। বিশেষত স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে একের পর এক টেস্ট, তাও অধিকাংশ ফ্রি। একদিকে এতে যেমন সুরক্ষা বা কুশলে রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে বয়স যে বেড়েছে তা মনে হওয়াই স্বাভাবিক। বয়সের বিচারে ৬০ বছরে পা রাখা মানে প্রবীণ। কিন্তু মনের বিচারে? মনের ভালো-মন্দ কি নবীন-প্রবীণ মানে? না মন মানতে চায় তা? বরং ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে শরীর মনে করিয়ে দিলেও মন তা মানে না। মনে হয় আগের মতো সব কাজ তেমনভাবে করা যাবে। কিন্তু কাজ করতে গেলেই বোঝা যায় শরীর আগের জায়গায় নেই। শ্লথ হয়ে আসা শরীর পারে না অনেক কিছুই।
এসব কারণে প্রবীণ মানুষের দরকার সাহচর্য। তাদের প্রয়োজন সহমর্মিতার হাত। অথচ দেশে ও সমাজে এরাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। দিল্লিতে বড়সড় একটা বুকশপে গিয়েছিলাম বই কিনতে। চমৎকার সাজানো বইয়ের দোকানটির এক কোণে দেখি কফি স্ন্যাকস আর টেবিলে টেবিলে কিছু বই। ভাবলাম এরা কি তবে সব ক্রেতাকেই চা-কফি খাইয়ে বিদায় করে? এবং তা কি সম্ভব? ভালো করে তাকাতেই দেখি পরিষ্কার লেখা আছে, কেবল সিনিয়র সিটিজেনই পারবেন ওসব টেবিলে বসে বই পড়তে, সঙ্গে চা-কফি ফ্রি। কী দারুণ ব্যবস্থা।
ঠিক তার উল্টো চিত্র দেখেছিলাম বাঙালি দোকানে। কানে কম শুনতে পাওয়া এক বয়সি নারীকে ধমকাচ্ছিলেন দোকানের সেলসম্যান। আশপাশের লোকজনদের কেউ কেউ মজা নিচ্ছিলেন আর কেউ কেউ বিরক্তির চরম সীমায়। যেন কানে কম শোনাটা বিরাট এক অপরাধ। প্রবীণ মানুষের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব বিষয়ে আমাদের মতো উদাসীন আর নিষ্ঠুর সমাজ বা রাষ্ট্র দ্বিতীয়টি নেই। যে কোনো উন্নত দেশে প্রবীণদের জন্য বাসে, ট্রেনে, গাড়িতে আলাদা সিট থাকে এবং কোনোভাবেই কেউ তা ব্যবহার করে না। খালি থাকলেও না। আমাদের সমাজে তার উল্টো। যদি থাকেও প্রবীণ কেউ এলে তাকে সিট ছেড়ে দেয়ার জন্য অন্যদের হাত লাগানো বা মারামারির বিকল্প নেই।
সবচেয়ে বেশি অবহেলা আর নির্যাতন করা হয় ঘরে। নির্যাতন শব্দটি ভালো করে বুঝতে হবে। এটি কেবল শারীরিক না। যখন একজন মানুষ কানে কম শুনতে শুরু করেন তখন তিনি হয়তো তা বুঝতে পারেন না। বোঝার সময় আসতে আসতেই তার প্রতি যে অনাচার-অবিচার সেটা কি কেউ খেয়াল করেন? ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখছি ঘরের মানুষই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় তাদের। হয়তো তারা নিজেরাই বুঝতে পারে না তারা কেন কী করছে। কিন্তু যে মানুষটি ভুক্তভোগী তার জীবনে তখন নেমে আসে করুণ ছায়া। তিনি মনে মনে একা হতে হতে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যান যাকে পরিভাষায় বলা হয় উইথড্রয়াল সিম্পটম। এর মানে হচ্ছে ওই মানুষটি আর কাউকে সহ্য করতে পারেন না। তার মনে হতে থাকে এ দুনিয়ায় তিনি অচল। আর এই অসহায়ত্ব তাকে আরো জেদি আর অভিমানী করে তোলে। সে জেদ আর অভিমান থেকেই একা জীবন, একা একটি ঘরের কোণে লুকিয়ে থাকতে থাকতে হয়ে ওঠেন মনোরোগী। এমন বয়স্ক মনোরোগী দেশে ঘরে ঘরে আছে। তাদের কেউ কোনোদিন বলে না, আজ বিকালে আমার সঙ্গে পার্কে চলো। বা বলে না- চলুন আপনাকে কোনো হোটেলে নিয়ে যাই। নিয়ে যাই কোনো থিয়েটারে। বরং উল্টোটাই দেখি আমরা। তরুণ-তরুণীরা, কম বয়সিরা সিনেমা-থিয়েটার দেখতে যাওয়ার আগে লিস্ট করার সময় এদের নাম কেটে বাদ দিয়ে দেয়। বলে, উনি বুড়া মানুষ উনি গিয়ে কী করবে? এই যে অবহেলা আর সরিয়ে রাখা- এর কষ্ট বোঝা সহজ না। অথচ এই আমরাই বলি মানুষের যত বয়স বাড়ে তত তারা শিশু হয়ে ওঠে। তো শিশু কী করে? কী চায়? সে তো আনন্দ-ফুর্তি শিশুসুলভ এক জগতে ডুবে থাকতে চায়। আর আমরাই তাদের মনে করি বুড়ো হয়ে গেছে অতএব বাদ। এই নিষ্ঠুরতা বন্ধ করা দরকার। আমি আমার জীবন থেকে বলতে পারি- আমার মা সবার প্রিয় একজন মানুষ ছিলেন। ছেলে-বুড়ো সবাইকে তিনি ভালোবাসতেন, ভালোবাসাও পেতেন তেমন। অথচ সে তারাই শেষের দিকে তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনত না। ততদিনে মা কানে খাটো কম শোনেন। অনেক কথা গুছিয়ে বলতে পারতেন না। ছিল আলজ্যাইমার। স্মৃতিশক্তির সে দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার সময় দিত না কেউ। অসংলগ্ন কিংবা ভুল কিছু বললে মুখ টিপে হাসত সবাই। মা ঠিকই বুঝতেন। আমি বেড়াতে গেলে যখনই এমন প্রসঙ্গ তুলতাম এক গাল হাসি হেসে এড়িয়ে যেতে চাইতেন। মাঝে মাঝে বলে ফেলতেন ওরা কেউই তাকে সময় দিতে চায় না। গুরুত্ব দেয় না। ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। আমার ছোট দিদির মতো অনেকে আছেন যারা এদের ভালোবেসে সময় দিত বা দেয়। এরাই ভরসা। এরাই এদের মনটাকে বাঁচিয়ে রাখে।
দিনকাল পাল্টেছে। এখন প্রবীণদের জন্য ওল্ড হোম বৃদ্ধাশ্রম আছে। বিদেশে এসব ওল্ড হোমও এখন শ্রেণিবিভাগের আওতায়। যেমন ভারতীয়রা এই ব্যবসা শুরু করে দিয়েছেন। সেখানে থাকলে জি টিভি, হিন্দি সিনেমা, সাউথ ইন্ডিয়ান সিনেমা সব দেখা যাবে। খাবারও ভারতীয় স্টাইলের। আবার শ্বেতাঙ্গদেরও আছে এমন শত শত ওল্ডহোম। বাংলাদেশের প্রবীণদের জন্য এখনো তেমন একক কিছু না হলেও এদেশে এই সিডনি শহরে যে তা হবে এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
এখন ডিজিটাল দুনিয়া। পৃথিবী মানুষের হাতের মুঠোয়। সে দুনিয়ায় প্রবীণরাও পিছিয়ে নেই। এই যেমন আমি ৬০ পেরুনো মানুষ, আমি কম্পিউটারে টাইপ করছি, ফেস বুকিং করি। সামাজিক মিডিয়ার কল্যাণে জগতের সঙ্গে থাকি। আমার চেয়ে বয়স্ক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীও আছেন এই দলে। কাজেই তাদের হাতে রসদ থাকলে বা উপকরণ থাকলে তারাও আজ একা নয়। কিন্তু এর সঠিক ব্যবহার বা তারুণ্যের মতো ব্যবহার তারা পারেন না। তাই তাদের সাহায্য আর সহায়তা দরকার।
সবার ওপরে রাষ্ট্র, সমাজ আর মানুষের সহমর্মিতা। এগুলো যতদিন গড়ে না উঠবে কিংবা যতদিন প্রবীণদের পাশে না দাঁড়াবে ততদিন কিছু হবে না। একটা কথা আমরা সবসময় বলি, একদিন সবাই বুড়ো-বুড়ি হবে, কাজেই মানতে শেখো। তার চেয়েও জরুরি একটা কথা কেন বলি না? এই মানুষগুলোর আয়ু আর কতদিন? সারাজীবন যারা শ্রম, মেধা, বুদ্ধি-বিদ্যা দিয়ে সংসার পালন করেছে, দেশ ও মানুষের পাশে ছিল বিদায় বেলার কিছু বছর, তাদের আমরা কি ভালোভাবে সহ্য করে বিদায় জানাব না?
এই ভাবনাটা উদিত হোক। ভালো থাকুন প্রবীণ নামের একদা মৃত্তিকা কাঁপানো মানুষরা।
অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়