ভোটযুদ্ধে সরগরম তৃণমূল

আগের সংবাদ

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস আজ

পরের সংবাদ

মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে এখনো অনেক পিছিয়ে দেশ

প্রকাশিত: অক্টোবর ১০, ২০২১ , ৮:৩২ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ১০, ২০২১ , ৮:৩২ পূর্বাহ্ণ

‘কেবল নিরোগ থাকাটাই স্বাস্থ্য নয়; বরং শারীরিক, মানসিক, আত্মিক ও সামাজিকভাবে ভালো থাকার নামই স্বাস্থ্য।’ ১৯৪৮ সালে স্বাস্থ্যের সংজ্ঞাকে এভাবেই সংজ্ঞায়িত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)। কিন্তু এর খণ্ডিত ব্যাখায় ‘স্বাস্থ্য’ শব্দটি এখনো অনেকটাই সীমাবদ্ধ ‘শারীরিক’ অংশে। মনের অর্থাৎ মানসিক বিষয়টি ছিল একেবারেই অন্তরালে। তবে ধীরগতিতে হলেও দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় গুরুত্ব পাচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্য। তবে শারীরিক চিকিৎসার ব্যাপ্তি যতটা বেড়েছে, মানসিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে তা বেড়েছে যৎকিঞ্চিৎ। মানসিক স্বাস্থ্যর ক্ষেত্রে উদাসীনতার চিত্র লক্ষ্য করা যায় এই খাতের বরাদ্দ দেখেই। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দকৃত মোট বাজেটের দশমিক ৫০ শতাংশের কম ব্যয় হয় মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায়। রয়েছে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ও দক্ষ চিকিৎসক সংকটও। অথচ বলা হয়, মানসিক স্বাস্থ্যের দরুন একজন মানুষ সেই ক্ষমতা অর্জন করে, যা তাকে নিজের সঙ্গে এবং তার চারপাশে থাকা অন্যদের সঙ্গে যুক্ত হতে বা একাত্ম হতে সাহায্য করে। শুধু তাই নয়, এই দক্ষতার জোরে মানুষ তার জীবনের নানা চ্যালেঞ্জ নিতেও সক্ষম হয়।

জনস্বাস্থ্যবিদরা মনে করছেন, মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণে প্রাণহানির সংখ্যা কোভিড-১৯ রোগে প্রাণহানির চেয়ে বেশি। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবেলা ও চিকিৎসায় সম্পদ বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। দেশে মানসম্পন্ন মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি থাকায় মানুষ শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে সর্বোচ্চ অধিকার ভোগ করতে পারছে না। আর মানসিক অসুস্থতার শিকার হচ্ছে শিশু, কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্করা। এর প্রভাব পড়ছে স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতায়। ক্ষতি হচ্ছে বিশাল অঙ্কের অর্থ। যদিও এই বিষয়ে আলাদা কোনো গবেষণা নেই। তবে সম্প্রতি ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী তরুণদের এ সমস্যায় বছরে ক্ষতি প্রায় ৩৯০ বিলিয়ন ডলার। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার লক্ষ্য ৩-এ সুস্বাস্থ্য আর কল্যাণ অর্জনের জন্য আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুহার কমানো, মাদকের অপব্যবহার কমিয়ে আনা, অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ; লক্ষ্যমাত্রা ১০-এ অসমতা হ্রাস করতে হলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কথা বলা আছে।

৭ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়, বাংলাদেশের ১৬ শতাংশ মানুষ বিষণ্নতায় আক্রান্ত। আর ৬ শতাংশের মধ্যে উদ্বেগ লক্ষ করা গেছে। এ বিষণ্নতা ও উদ্বেগের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের সম্পর্ক রয়েছে। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের উদ্বেগে ভোগার প্রবণতাও বেড়ে যায়। আর গ্রামের তুলনায় শহরের মানুষের ওপর এর প্রভাব পড়ে বেশি। নারীদের তুলনায় পুরুষেরা বেশি মাত্রায় উদ্বেগে ভোগেন। বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় এমনিতে যেহেতু হতাশা, উদ্বেগের মতো মানসিক সমস্যাগুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়, তাই এ বিষয়ে বাড়তি গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

৫ অক্টোবর ‘দি স্টেট অব দ্য ওয়ার্ল্ড চিলড্রেন ২০২১ অন মাই মাইন্ড : প্রমোটিং, প্রটেক্টিং এন্ড কেয়ারিং ফর চিলড্রেনস মেন্টাল হেলথ’ শীর্ষক ইউনিসেফ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তরুণদের মানসিক অসুস্থতার কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ৩৯০ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থের ক্ষতি হয়। সেই তুলনায় তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যে বৈশ্বিক ব্যয়ের পরিমাণ যেন ‘হিমশৈলের চূড়ামাত্র’। শিশু-তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর করোনার প্রভাব অনেক বছর ধরে থাকতে পারে বলে সংস্থাটি সতর্ক করেছে। বৈশ্বিকভাবে ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রতি সাতজন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে ১ জনের বেশি মানসিক সমস্যা নিয়ে জীবনযাপন করছে। প্রতি বছর প্রায় ৪৬ হাজার কিশোর-কিশোরী আত্মহত্যা করে, যাদের মৃত্যুর প্রতি পাঁচটি কারণের একটি মানসিক সমস্যা। এছাড়া মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা ও বরাদ্দ দেয়া তহবিলের মধ্যেও রয়েছে বিস্তর ফারাক। বৈশ্বিকভাবে সরকার স্বাস্থ্য খাতে যে বাজেট বরাদ্দ দেয়, তার মাত্র ২ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্যের পেছনে ব্যয় করা হয়।

বাংলাদেশসহ ২১টি দেশের শিশু-প্রাপ্তবয়স্কদের মাঝে জরিপ চালায় ইউনিসেফ ও জরিপ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান গেলাপ। ফলাফলে দেখা যায়, জরিপে অংশগ্রহণকারী ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে হতাশা ও কাজে উৎসাহহীনতায় ভুগছে ১৯ শতাংশ তরুণ-তরুণী। বাংলাদেশে এর পরিমাণ ১৪ শতাংশ। এছাড়াও বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ হতাশা ও কাজে উৎসাহহীনতায় ভোগেন।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনিস্টিটিউট ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর শতকরা ১৬ ভাগ ও শিশু-কিশোরদের শতকরা ১৮ ভাগ মানসিক সমস্যায় ভুগছে। বিপুল এ জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশ অনেক সময় প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা, কুসংস্কার ও চিকিৎসা প্রাপ্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এতে কর্মক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা জাতীয় অগ্রগতির উন্নয়নের পথে বড় বাধা পুলিশ ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের তথ্য উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে সরকারের এক হিসাবে দেখা গেছে, ২০২০ সালে ১১ হাজারের মতো মানুষ আত্মহত্যা করেছে। করোনাকালে সংখ্যাটা আরো বেড়েছে।

জানা যায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, পাবনা ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতালের প্রচেষ্টায় দেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অগ্রগতি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় পাবনা মানসিক হাসপাতালকে বিশ্বমানের ইনস্টিটিউট হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। জেলা হাসপাতালগুলোয় একজন চিকিৎসক ও দুজন নার্সকে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে পরামর্শ পেতে মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ দেয়ার বিষয়টিতে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বলা হলেও বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন নেই। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্যনীতির খসড়া মন্ত্রিসভায় উত্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সরকারের নজরদারি আগের চেয়ে বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে সুনির্দিষ্টভাবে কয়েকটি নির্দেশনাও দিয়েছেন। কয়েক বছর ধরে এ খাতে বিভিন্ন উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। স¤প্রতি এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম জানান, মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বড় বড় হাসপাতাল না বানিয়ে বিদ্যমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ আরো বাড়ানোসহ বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছেন। সেই নির্দেশনায় পাবনা মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতালকে আন্তর্জাতিক মানের ইনস্টিটিউট করার বিষয়টিও রয়েছে।

এ প্রসঙ্গ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দন আহমেদ বলেন, মানসিক সমস্যায় আক্রান্তরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার। এর প্রধান কারণ মানসিক স্বাস্থ্য রোগ ও এর চিকিৎসার প্রতি জনগণের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। মানসিক রোগ ও এর চিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সমাজে মর্যাদাবোধের অভাব লক্ষ্য করা যায়। এজন্য অনেকে মানসিক রোগের চিকিৎসা নেয়াকে সামাজিকভাবে লজ্জাকর মনে করেন, যেটি শারীরিক রোগের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। কিছু সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও অনেক সময় রোগী ও পারিবারের সদস্যরা খারাপ আচরণের শিকার হন। এজন্য পারিবারিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখা জরুরি। মানসিক স্বাস্থ্যে মর্যাদাবোধ বিষয়টি শুধু রোগ নির্ণয় থেকে শুরু করে চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও নিরাময় প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর অর্থ ব্যাপক।

করোনা মহামারিকালে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বেড়ে যাওয়ায় চলতি বছরের আগস্টের শেষের দিকে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার কৌশল চালু করে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক। দেশের কেন্দ্র থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর কাছে পর্যন্ত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানোর জন্য ব্র্যাক এ সমন্বিত কৌশলটি প্রণয়ন করেছে। এ কৌশল বাস্তবায়নের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে অর্জনের উদ্দেশ্যে চারটি কৌশলগত লক্ষ্য ও এদের আনুষঙ্গিক লক্ষ্যগুলোর রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছে।

ডি-এফবি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়