মাউশিতে নিয়মের ছাঁচে অনিয়ম : ‘বিষয়’ পরিবর্তনে কেলেঙ্কারি

আগের সংবাদ

জার্মানির নির্বাচনে এসপিডির কাছে হারল অ্যাঙ্গেলা মার্কেলের দল

পরের সংবাদ

সুদিন ফিরছে সোনালি আঁশের

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২১ , ৮:৪২ পূর্বাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২১ , ৮:৪২ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের সোনালি আঁশখ্যাত পাটে সুদিন ফিরতে শুরু করেছে। বাজারে ভালো দাম আর চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সোনালি আঁশের সোনালি রংয়ে ভরে গেছে কৃষকের ঘর। উন্নত জাত আবিষ্কার, উচ্চ ফলন ও ভালো দাম পাওয়ায় পাট চাষে কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে। তাই বিগত বছরগুলোতে লোকসানে পড়া কৃষকদের মুখে ফুটে উঠেছে সন্তুষ্টির হাসি। সরকার বন্ধ পাটকলগুলো পুনরায় চালুর পাশাপাশি পাটের বহুমুখী ব্যবহারের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে। তাই বাজারে আবারো বেড়েছে চাহিদা। দামও মিলছে ভালো। এ কারণেই কৃষকরা পাট চাষে আগ্রহী হচ্ছেন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেড় বছর ধরে সরকারি ২৫টি পাটকল বন্ধ থাকলেও পাটের দামে এবার কৃষকের মুখের হাসি ফিরেছে। করোনা মহামারির মধ্যে আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় পাটের দাম বেশি পাচ্ছে কৃষক। এ বছর বিভিন্ন এলাকায় প্রতিমণ পাট বিক্রি হচ্ছে আড়াই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায়। কোথাও কোথাও চার থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা দামেও প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে।

এ বছর পাটের বীজবপন ও পরবর্তী সময়ে বৃষ্টিপাত হওয়ায় পাটের ভালো ফলন হয়েছে এবং পাট সহজেই জাগ দিতে পেরেছেন কৃষকরা। তবে উত্তরাঞ্চলের কোনো কোনো জায়গায় পানি না থাকায় পাটগাছ জাগ দিতে কিছুটা বিপাকে পড়তে হয়েছিল কৃষকদের। পরবর্তী সময়ে বৃষ্টি হওয়ায় সেই সমস্যা কেটে গেছে। ঠিকমতো পাট কেটে জাগ দিয়ে আঁশ ছাড়িয়ে শুকিয়ে সেই পাট এখন বাজারে বিক্রির ধুম পড়েছে।

দেশে পাটকল বন্ধ হলেও বিশ্বব্যাপী এর চাহিদা বাড়ছে। এ কারণে বাড়ছে রপ্তানিও। পাশাপাশি পাট দিয়ে এখন বহুমুখী পণ্য তৈরি হচ্ছে। ফলে দেশেও পাটপণ্য উৎপাদন হচ্ছে আগের চেয়ে অনেক বেশি। সব মিলিয়ে পাট নিয়ে এখন আর কৃষকের দুশ্চিন্তা নেই। বরং পাট বিক্রি করে কৃষক এত মুনাফা পাবে- কোনো দিন চিন্তাই করতে পারেনি। এক সময় দেশে যেখানে পাটের সর্বনিম্ন মূল্য বেঁধে দেয়ার জন্য কৃষকের পক্ষ থেকে দাবি উঠত, সেখানে এখন শিল্প মালিকদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ মূল্য বেঁধে দেয়ার দাবি উঠছে। যদিও কাঁচা পাটের দাম বেড়ে যাওয়ায় খুশি নন বেসরকারি পাটকল মালিকরা। তারা বলছেন, এত বেশি দামে পাট কিনে পণ্য উৎপাদন করে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। এতে দেশে পাট পণ্যের উৎপাদন কমে যাবে।গত কয়েক বছর ধরেই পাটের দাম ভালো যাচ্ছে। এর মধ্যে গত বছর (২০২০ সাল) পাটের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। পাটকাটা মৌসুমের শুরুতেই প্রতি মণ পাট বিক্রি হয় আড়াই হাজার থেকে ২২০০ টাকা দরে। পরে এটি ৩৫০০ এবং মৌসুমের শেষ পর্যায়ে হাটে প্রতি মণ পাটের দাম ৫ হাজার টাকা পৌঁছে। কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর প্রতি মণ পাটের গড় মূল্য হয়েছিল ৩৫০০ টাকা।

পাট চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাট চাষ করে তিন মাসের মধ্যে পাট ঘরে তোলা যায়। কম সময়ে, কম পরিশ্রমের ফসল পাট। প্রতি বিঘা জমিতে পাট চাষ করতে ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। প্রতি বিঘা জমিতে ১০-১২ মণ পাট উৎপাদন হয়। তবে কোনো কোনো অঞ্চলে প্রতি বিঘায় ১৫ মণ পর্যন্ত এ বছর পাট উৎপাদন হয়েছে। এবার বাজারে পাটের মান ভেদে বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। দুয়েকটি জেলায় প্রতি মণ পাট সাড়ে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে। এত দামে বিক্রির কারণে পাট চাষের খরচ বাদ দিলে অভাবনীয় মুনাফা পাচ্ছেন পাটচাষিরা।
কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, এ বছর সারাদেশে সাত লাখ ২৬ হাজার হেক্টর জমিতে ৮২ লাখ টন পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। তবে দেশে এবার আট থেকে সাড়ে ৮ লাখ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। আর এ থেকে ৯০ লাখ বেল পাটের আঁশ উৎপন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। দেশে উৎপাদিত পাটের আঁশের প্রায় ৫১ শতাংশ পাটকলগুলোয় ব্যবহৃত হয়, ৪৪ শতাংশের মতো কাঁচা পাট বিদেশে রপ্তানি হয় এবং মাত্র ৫ শতাংশের মতো লাগে ঘর-গৃহস্থালি আর কুটির শিল্পের কাজে।

কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নব্বইয়ের দশকে পাট হতো ১২ লাখ হেক্টর জমিতে। মাঝে তা ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ হেক্টরে নেমে যায়। কিন্তু প্রাকৃতিক আঁশের চাহিদা বাড়ায় ২০১০-১৫ সাল নাগাদ চাষের এলাকা বেড়ে ৭ লাখ হেক্টরে পৌঁছায়। এরপর থেকে তা আরো বাড়ছে। আগে ১২ লাখ হেক্টর এলাকা থেকে যে পরিমাণ পাট পাওয়া যেত, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে এখন ৭-৮ লাখ হেক্টর জমি থেকেই তার চেয়ে বেশি পাওয়া যাচ্ছে বলে কৃষি কর্মকর্তারা জানান।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে সাত লাখ ৪৯ হাজার হেক্টর জমিতে পাট আবাদ হয়। সেখান থেকে ৮৫ লাখ ৭৬ হাজার টন পাট উৎপাদন হয়েছিল। কিন্তু ২০১৯-২০ অর্থবছরে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ছয় লাখ ৯৯ হাজার হেক্টর করা হয়। ধারণা করা হয়েছিল, সেখান থেকে ৮০ লাখ টন পাট পাওয়া যাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছয় লাখ ৭৯ হাজার হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়। সেখান থেকে ৮০ লাখ টন পাট উৎপাদিত হয়।

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার পাটচাষি আবু বক্কর মাতুব্বর জানান, একসময় পাটের ব্যাপক চাষাবাদ হতো। কিন্তু একের পর এক পাট কল বন্ধ হওয়ার পর বাজারে চাহিদা কমতে থাকে। ফলে তারা পাট চাষ থেকে অনেকটা মুখ ফিরিয়ে নেন। বর্তমানে বাজারে ভালো দাম হওয়ায় আবারো পাট চাষে উৎসাহ পাচ্ছে কৃষক।

পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মাসরুর আনোয়ার বলেন, দেশে পাটকল বন্ধ হলেও বিশ্বব্যাপী পাটের চাহিদা বাড়ছে। পাট পরিবেশবান্ধব হওয়ায় এর রপ্তানি চাহিদাও বাড়ছে। পাশাপাশি দেশেও পাটপণ্য উৎপাদন হচ্ছে আগের চেয়ে অনেক বেশি। তাই বলা চলে পাটের সুদিন ফিরেছে।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, এবার পাটের ভালো ফলন হয়েছে। কৃষকরা বর্তমান পাটের বাজার দর অনুযায়ী উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে ভালো লাভ পাচ্ছেন। পাটের দাম এ রকম থাকলে আগামী বছর কৃষকরা আরো ব্যাপকভাবে পাট চাষে উদ্বুদ্ধ হবেন।

ডি-এফবি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়