প্রতারক রকমারি

আগের সংবাদ

শেখ হাসিনার গাড়ি বহরে হামলার পলাতক আসামি গ্রেপ্তার

পরের সংবাদ

উন্নতির সোপান

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২১ , ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২১ , ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ

আমাদের এই উন্নতির ব্যাখ্যাটা আমরা জানি। জানি এটাও যে এমনটা চলবে না। অবশ্যই বদলাবে। কিন্তু কেবল যে ভেতরের স্ববিরোধিতার ও দ্ব›েদ্বর কারণে আপনা থেকেই বদলাবে তা নয়, বাইরে থেকেও চাপ দিতে হবে, সেই চাপটা আসবে সুসংগঠিত আন্দোলন থেকে।
আন্দোলনের পথ দেখিয়েছেন মার্কস-এঙ্গেলস, তাদের পরে লেনিন এবং আরো পরে মাও সে-তুং। অন্য অনেক বিপ্লবীরও দৃষ্টান্ত রয়েছে, কিন্তু এদের কাজই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং পথপ্রদর্শক। এ বছর বিশ্বব্যাপী মার্কসের জন্মের দ্বিশতবর্ষ উদযাপিত হলো। পত্রপত্রিকায় আলোচনাসভায় অনেকেই বলতে চেয়েছেন মার্কস এখনো প্রাসঙ্গিক; হিসাব কষে কেউ কেউ দেখিয়ে দিয়েছেন যে মার্কস আবার ফেরত আসছেন। মার্কস ও মার্কসবাদ কিন্তু কোনো পাবলিক রিলেশনসের অপেক্ষা রাখে না। জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গির যে উত্তরাধিকার মার্কস রেখে গেছেন সেটি আগে ছিল, এখনো আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। কেননা মার্কসবাদ একাধারে বৈজ্ঞানিক ও মানবিক। বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সর্বদাই বিকশিত হতে থাকে, মার্কসবাদও বিকশিত হয়েছে এবং হবে। আর অন্য অনেক বৈজ্ঞানিক জ্ঞান থেকে মার্কসবাদ বিশেষভাবে স্বতন্ত্র এখানে যে এর দার্শনিকতাটা সম্পূর্ণ মানবিক। মানুষের ইতিহাস যে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালীদের হাতে দুর্বল মানুষদের অত্যাচারের ইতিহাস, এই নির্মম সত্যটা মার্কস-এঙ্গেলস পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছেন; ওই ইতিহাস এখনো চলছে এবং ভবিষ্যতের সমাজে শ্রেণির ওপর শ্রেণির অত্যাচারের যখন অবসান ঘটবে তখনো আগের অত্যাচার যে ফেরত আসতে পারে এই সতর্কবাণী উচ্চারণের জন্য মার্কসবাদ উপস্থিত থাকবে। আর মার্কস আবার ফেরত আসছেন যারা বলেন তারা খেয়াল করেন না যে মার্কস কখনোই বিদায় নেননি, তিনি কোনো অপরাধও করেননি যে পালিয়ে যাবেন, এমন কোনো ভ্রান্তিও তিনি প্রচার করেননি যে লজ্জায় লুকিয়ে থাকবেন; তিনি ছিলেন এবং থাকবেন। ফেরত আসার পিঠ-চাপড়ানোটা তাই একেবারেই অবান্তর।
মার্কস ও এঙ্গেলসের বন্ধুত্ব প্রবাদপ্রতিম। তাদের প্রথম সাক্ষাতের সময় মার্কসের বয়স মাত্র ২৫, এঙ্গেলসের বয়স ২৩। দুজন যেন দুজনকে খুঁজছিলেন এবং দুজনেই নিয়োজিত ছিলেন পুঁজিবাদ মেহনতিদের ওপর অমানবিক যে নির্যাতনটা করছে তার অবসান ঘটানোর পথানুসন্ধানে। লক্ষ্য ও দৃষ্টিভঙ্গির ঐক্যই মূল কারণ, যে জন্য তাদের বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতায় কখনো কোনো বিচ্ছেদ ঘটেনি। কেবল বন্ধু তো নন, সহযোদ্ধাও ছিলেন তারা। লড়ছিলেন পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে। মার্কসের বয়স যখন ২৯ এঙ্গেলসের ২৭, তখন এই দুই সহযোদ্ধা মিলে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানানুশীলনের পুনর্ব্যবহার ঘটিয়ে রচনা করেন কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো। তাতে ডাক ছিল সারা বিশ্বের মেহনতিদের প্রতি পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক শ্রেণি সংগ্রামের। সেই ডাক বিশ্বময় ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়েছে। বিপ্লব ঘটেছে বহু দেশে। দুই বন্ধুর জীবনে দুঃসাহসিক তারুণ্যের কখনো অভাব ঘটেনি। তাদের আবেগ যুক্ত হয়েছিল লক্ষ্যের স্থিরতার সঙ্গে।
কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো রচনার পরপরই মার্কস-এঙ্গেলস দেখতে পান ইউরোপের বড় বড় কয়েকটি শহরে মেহনতি মানুষ বিপ্লবী অভ্যুত্থানের চেষ্টা করছে। তারা দুজন যোগ দিয়েছিলেন মেহনতিদের ওই মুক্তিসংগ্রামে। যোগ দিয়ে তাদের এই উপলব্ধিটা আরো স্পষ্ট হয় যে, বিশ্বজুড়ে মেহনতি মানুষের ঐক্য অত্যন্ত আবশ্যক। পুঁজিবাদ কোনো এক দেশের ব্যাপার নয়, সেটি বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠিত; তাই তাকে ভাঙার চেষ্টা পুঁজিবাদ-নিয়ন্ত্রিত সব দেশেই হওয়া চাই। মার্কস-এঙ্গেলসের উদ্যোগে ১৮৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিং মেনস এসোসিয়েশন, যার সংক্ষিপ্ত নাম হচ্ছে ইন্টারন্যাশনাল। ১৮৭১-এ প্যারিস শহরের মেহনতিরা সফল এক অভ্যুত্থান ঘটায়। তারা একটি সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাই চালু করে ফেলে। যেটি টিকে ছিল ৭২ দিন। প্যারি কমিউনের অবসান ঘটে পুঁজিপতিদের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে। হাজার হাজার মানুষ প্রাণ দেয়। মার্কস-এঙ্গেলসের ইন্টারন্যাশনালের যোগাযোগ ছিল প্যারি-কমিউনের ওই অভ্যুত্থানের সঙ্গে। অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে জ্ঞানের সম্প্রসারণ ঘটল; মার্কস-এঙ্গেলস বুঝে নিলেন যে বিপ্লবের জন্য বুর্জোয়াদের রাষ্ট্রকে ভেঙে ফেলতে হবে এবং কেবল শ্রমিকের বিদ্রোহে সে বিপ্লব সম্ভব হবে না, কৃষককেও নিতে হবে সঙ্গে, আর দরকার পড়বে সুসংগঠিত রাজনৈতিক দলের। লেনিন মার্কস-এঙ্গেলসের উপলব্ধিকে আরো এগিয়ে নিয়ে গেলেন। রাশিয়াতে শ্রমিকের তুলনায় কৃষকের সংখ্যা ছিল বেশি; লেনিন তাই গুরুত্ব দিলেন কৃষককে শ্রমিকদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ করাকে। শ্রমিকই সামনে থাকবে, কিন্তু কৃষক দূরে থাকবে না, থাকবে সঙ্গেই। বুঝলেন, সুশৃঙ্খল পার্টি হচ্ছে বিপ্লবের অপরিহার্য শর্ত। পার্টি থাকবে সম্মুখে, পার্টিতে থাকবে পেশাদার বিপ্লবীরা। এই পার্টি ব্যক্তিগত সম্পত্তিওয়ালাদের পার্টি থেকে কেবল বিচ্ছিন্নই হবে না, হবে তাদের প্রতিপক্ষও। তারা বুঝলেন যে বুর্জোয়াদের রাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠিত রেখে সামাজিক বিপ্লব সম্ভব নয়, বুর্জোয়াদের আমলাতান্ত্রিক-সামরিক রাষ্ট্র চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ক্ষমতা তুলে দিতে হবে জনগণের হাতে। এরপরে মাও সে-তুং এসেছেন; তিনি দেখেছেন তার দেশ মূলত কৃষকের, তাই কৃষকদের ভেতর চলে গেছেন তিনি, কৃষকদের নিয়ে এসেছেন বিপ্লবী বাহিনীতে এবং সফল হয়েছেন সমাজবিপ্লব সংঘটিত করার কাজে। এরা সবাই অসামান্য জ্ঞানী ছিলেন, কিন্তু এদের প্রধান পরিচয় এরা বিপ্লবী। অবকাশকালীন কিংবা মাঝে মাঝে বিপ্লবী নন, সার্বক্ষণিক বিপ্লবী। সমসাময়িক বুর্জোয়াদের তারা জ্ঞানের ক্ষেত্রে পরাভূত করেছেন এবং অনেক অনেক পেছনে ফেলে রেখেছেন নৈতিকতায়। মার্কসের সময়ে দার্শনিক চিন্তার ক্ষেত্রে তার সঙ্গে তুলনীয় দ্বিতীয় কেউ ছিলেন না; কিন্তু মার্কস তার জ্ঞানকে তাত্ত্বিক জ্ঞানের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, জ্ঞানকে কাজে লাগিয়েছেন বিপ্লবের জন্য। বিপ্লবের প্রয়োজনেই জ্ঞান আহরণ করেছেন, উল্টোটা ঘটেনি। ওদিকে লেনিনের সময়ে তার পাশে দাঁড় করানো যায় এমন বুদ্ধিজীবী সারা ইউরোপে আর কেউ ছিলেন না; কিন্তু লেনিনের পরিচয় বুদ্ধিজীবী হিসেবে নয়, পরিচয় বিপ্লবী হিসেবে।
এই বিপ্লবীদের জীবনে একটি জিনিস কখনোই দেখা যায়নি; সেটা হলো আপস। এবং আরেকটা কাজ করা থেকে তারা কখনোই বিরত থাকেননি, সেটা হলো মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা। তারা লিখেছেন, বক্তৃতা করেছেন, আদান-প্রদান করেছেন চিঠিপত্রের। মার্কস তো তার কর্মজীবন শুরুই করেন সংবাদপত্র সম্পাদনা দিয়ে। এঙ্গেলসের সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাৎ মার্কস সম্পাদিত দৈনিক পত্রিকার অফিসে। মার্কস অধ্যাপক হতে পারতেন, কিন্তু সেদিকে যাননি। যখনই পেরেছেন পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। লিখেছেনও সংবাদপত্রে। আর লেনিন তো পত্রিকাকে মনে করতেন আন্দোলনের অপরিহার্য অংশ এবং অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার। পত্রিকার ব্যাপারে তার মনোযোগের কখনো কোনো ঘাটতি ছিল না।
বিপ্লবের এই নায়করা যদি আপসকামী হতেন তাহলে বিপ্লবের সম্ভাবনা নিঃসন্দেহে সঙ্কুচিত হয়ে পড়ত। তারা আর যাই হোন উদারনীতিক ছিলেন না। উদারনীতিকরা আর যাই হোন বিপ্লবী নন। বিপ্লবীদের শিবিরে উদারনীতিকদের প্রবেশের চেষ্টা কখনো কখনো ঘটে ট্রয়ের সেই কুখ্যাত কাঠের ঘোড়াটির মতোই। বুর্জোয়ারা তাদেরকে পাঠায়, আবার তারা নিজেরাও যান; অভিসন্ধিটা থাকে অন্তর্ঘাতমূলক।
বামপন্থি বুদ্ধিজীবী অশোক মিত্র আট বছর ধরে ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকারের অর্থমন্ত্রী। সচিবালয়ে একবার এক কর্মকর্তাকে বলেছিলেন যে তিনি ভদ্রলোক নন, তিনি কমিউনিস্ট। উত্ত্যক্ত হয়েই বলেছিলেন কথাটা, বোঝা যায়। দাবিটা কিন্তু মিথ্যা নয়। ভদ্রলোকদের এটাও ভালো ওটাও মন্দ নয় নীতি গ্রহণ করলে কোনো কমিউনিস্টই আর কমিউনিস্ট থাকেন না; উদারপন্থি হয়ে যান। তাই বলে এটা মোটেই সত্য নয় যে, সমাজবিপ্লবীরা শিষ্টাচারবিহীন হয়ে থাকেন। মার্কসের সমাধিপাশে দাঁড়িয়ে এঙ্গেলস তার সংক্ষিপ্ত কিন্তু অবিস্মরণীয় স্মারক বক্তৃতাটি শেষ করেছিলেন মার্কসের এই বিশেষ গুণের কথাটি বলে যে, মার্কসের প্রতিপক্ষ অনেক ছিল, কিন্তু ব্যক্তিগত শত্রæ সম্ভবত একজনও ছিল না। ব্যক্তিগত আচরণে বড় বিপ্লবীরা কেউই অভদ্র ছিলেন না। ছিলেন উৎকৃষ্ট মাত্রায় সজ্জন, কিন্তু তাদের চিন্তা-চেতনায় আপসের কোনো স্থান ছিল না। ওদিকে উদারনীতিকরা কেবল যে আপস করে চলেন তা নয়, বিদ্যমান ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতেও চান; ব্যবস্থা থেকে তারা সুবিধা পেয়ে থাকেন, কেউ কেউ নিজেদের অজান্তে ব্যবস্থার দাসে পরিণত হন, কেউ-বা করেন দালালি। এমনকি নোয়াম চমস্কি ও এডওয়ার্ড সাঈদের মতো অত্যন্ত দৃঢ় মেরুদণ্ডসম্পন্ন বুদ্ধিজীবীরাও কিন্তু প্রকাশ্যে বলেন না যে তারা সমাজতন্ত্রী, যেটা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বার্নি স্যান্ডার্স বলেছেন, বলেছেন ব্রিটিশ লেবার পার্টির নতুন নেতা জর্জ কারবিন।
ব্যক্তিগত পর্যায়ে মার্কস-এঙ্গেলস শিষ্টাচার লঙ্ঘন করতেন না; কিন্তু প্রতিপক্ষের বিপ্লববিরোধী বক্তব্যকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেননি এবং পুঁজিবাদকে তারা কখনো ক্ষমা করেননি। ব্যবস্থাটির বিরুদ্ধে তাদের ছিল জ্বলন্ত ঘৃণা এবং জীবন্ত ক্রোধ। মেহনতিদের ওপর জুলুম দেখে ব্যবস্থার প্রতি তাদের বিবমিষা জাগেনি, জেগেছে ঘৃণা। ঘৃণার উল্টোপিঠে ছিল ভালোবাসা, মেহনতিদের প্রতি ভালোবাসা। ভালোবাসাহীন ঘৃণা এবং ঘৃণাহীন ভালোবাসা উভয়েই বড় জোর দ্বিমাত্রিক হয়; চেষ্টা করলেও গভীর হতে পারে না। বিপ্লবীরা মানুষকে গভীরভাবে ভালোবাসেন বলেই মনুষ্যত্বের শত্রæপক্ষকে প্রচণ্ডরূপে ঘৃণা করেন এবং তাদের থাকে ক্রোধ। যে ব্যবস্থাটা মানুষের মনুষ্যত্ব কেড়ে নেয় তার প্রতি ক্রোধ বিপ্লবীদের কখনোই কমে না, বরং বৃদ্ধি পেতে থাকে।
আমাদের দেশে বিপ্লবীরা আছেন, বিপ্লবী তৎপরতাও ঘটেছে, আত্মত্যাগেরও অভাব দেখা যায়নি। কিন্তু বিপ্লব ঘটেনি। বিপ্লব না ঘটার তার অনেক কারণ আছে। মূল কারণ সম্ভবত বিপ্লবী আন্দোলনের পক্ষে তার পেটি বুর্জোয়াত্বের সীমানা পার হতে না পারা। পেটি বুর্জোয়াদের অস্থিরতা, একদিকে তাদের উগ্রতা ও আপসকামিতা এবং অপরদিকে অন্যের ওপর নির্ভরপ্রবণতা, আত্মসন্তোষ ও আত্মম্ভরিতা, এগুলো প্রতিবন্ধক হয়ে দেখা দিয়েছে। এই শ্রেণি, যাকে আমরা মধ্যবিত্ত বলে ডাকতে পছন্দ করি, সেটি তৈরি হয়েছে ইংরেজ-শাসনের সময়ে ইংরেজদের আনুকূল্যে। এবং ঔপনিবেশিক শাসকদের ভেতর ইংরেজরা ছিল সবচেয়ে বেশি ধূর্ত, তারা ওই মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে কেবল যে তাদের ওপর নির্ভরশীল করেছে তা নয়, শ্রেণিটির মস্তিষ্কে উন্নতির পুঁজিবাদী আদর্শ এমনভাবে গেঁথে দিতে সক্ষম হয়েছে যে, শ্রেণিটি যতই যা করুক না কেন তার পক্ষে উন্নতির ওই আদর্শকে এবং ইংরেজকে অনুকরণ করার মোহকে ত্যাগ করাটা বড়ই কঠিন। চরম দৃষ্টান্ত ও প্রতিভূ অবশ্য নকল-সাহেব নীরদ সি চৌধুরীরা; কিন্তু বিভিন্ন মাত্রায় ওরকম সাহেব এখনো অনেক আছেন। নইলে দুই দুইবার স্বাধীন হওয়ার পরও আমরা কেন ইংরেজি মাধ্যমে ছেলেমেয়েদের পড়াতে পারলে আহ্লাদিত হই, না পারলে ধরে নিই যে হেরে গেলাম।
এর কবল থেকে মুক্তি পেতে হলে চাই বস্তুগত অবস্থাতে পরিবর্তন আনা। তার জন্য সামাজিক বিপ্লবের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেটা তো ঘটেনি। এর মধ্যেও বিপ্লবীরা এসেছেন। তবে তাদের সবার যে সব শ্রেণিচ্যুতি ঘটেছে তা নয়। শ্রেণিচ্যুতির আদর্শ দৃষ্টান্তও পাওয়া যাবে মার্কসের কাছেই। মার্কসের জন্ম বুর্জোয়া পরিবারে, কিন্তু সেখানে তিনি থাকেননি। তার কর্মজীবন কাটে অমানবিক অর্থকষ্টের ভেতরে। বুর্জোয়া জীবনযাপনের সব সুযোগ তার হাতের মুঠোতেই ছিল, কিন্তু সে জীবনকে মেনে নেয়ার পাত্র তিনি ছিলেন না। বিপ্লব তাকে ডেকেছিল। সেই ডাকে ঘর ছেড়েছেন, দেশ ছেড়েছেন। নির্বাসিত হয়েছেন জার্মানি থেকে, টিকতে পারেননি প্যারিস ও ব্রাসলসে, পুলিশের লোকেরা তাড়া করেছে; শরণার্থী হিসেবে জীবন কাটিয়েছেন লন্ডনে। তা অর্থকষ্টে তো অনেকেই থাকেন; মার্কস যা করেছেন সেটা হলো যে ব্যবস্থা মানুষকে অর্থকষ্টে ফেলে তাকে ভাঙার লক্ষ্যে নিজের মেধা, শ্রম ও সময় নিয়োগ করা। বঞ্চিত মানুষকে তিনি ভিক্ষুক হিসেবে দেখতে চাননি, দেখতে চেয়েছেন বিপ্লবী হিসেবে, সেভাবেই তাদের তিনি শ্রেণিসচেতন করে বিপ্লবী আন্দোলনে নিয়ে আসার চেষ্টায় ছিলেন। তার শ্রেণিচ্যুতিটা সন্ন্যাসীর নয়, সার্বক্ষণিক বিপ্লবীর। তিনি জানতেন যে বিপ্লবে নেতৃত্ব দিতে হবে নিপীড়িত মেহনতিদেরই। পারবে তারাই; কারণ একদিকে তারা নিপীড়িত, অন্যদিকে সংখ্যায় তারা অধিক এবং তাদের জন্য হারাবার কিছু নেই, শৃঙ্খল ছাড়া।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়