ইউনানী-আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাব্যবস্থা ও ড. হাকীম ইউছুফ হারুন ভূঁইয়া এ এম মানিক

আগের সংবাদ

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান : বিশ্ব নেতাদের গুরুত্ব দিতে হবে

পরের সংবাদ

বিবিসি লন্ডন : একাত্তরের ডেসপাচ

ড. এম এ মোমেন

সাবেক সরকারি চাকুরে, নন-ফিকশন ও কলাম লেখক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২১ , ৪:৩২ পূর্বাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২১ , ৪:৩২ পূর্বাহ্ণ

৩০ মার্চ ১৯৭১। ঢাকা থেকে কেবল লন্ডনে এসে হাজির হওয়া এখানকার একজন আইনের ছাত্র পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ঢাকা দখলের একটি বিবরণ দিয়েছেন। এটি বিবিসিতে সম্প্রচারিত হয়েছে। সাক্ষাৎকারভিত্তিক ইংরেজি প্রতিবেদনটি অনূদিত হলো।
সাক্ষাৎকারে এ কে এম শামসুল আলম চৌধুরী বলেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকার দখল নেয়ার আগেই তিনি উড়োজাহাজে লন্ডন আসার টিকেট কিনেছিলেন। গতকাল সকালে বেশ ক’জন পশ্চিম পাকিস্তানির সঙ্গে ঢাকা থেকে উড়োজাহাজ ধরার সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি যখন ঢাকা ছেড়ে এলেন তখন ঢাকার পরিস্থিতি কেমন ছিল এ প্রশ্নের জবাবে বললেন, ভয়ংকর।
যখন পাকিস্তানের শাসনতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা চলছিল এমন অবস্থায় আকস্মিক সামরিক তৎপরতার কারণ সম্পর্কে মতামত জানাতে বলা হলে তিনি বললেন, তিনি বিশ্বাস করেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে পরামর্শ দিয়েছেন পশ্চিম পাকিস্তানি নেতৃবৃন্দ, বিশেষ করে তাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য জুলফিকার আলী ভুট্টো পূর্ব পাকিস্তান প্রশ্নে শেখ মুজিবুর রহমানের শর্তাবলি প্রত্যাখ্যান করার উপদেশ দিয়েছেন। আর অস্ত্রের সাহায্যে সমাধান বের করার পরামর্শও দিয়েছেন। সেদিন সন্ধ্যার পর ঢাকা শহর জানতে পারে যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা চলে গেছেন। গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে সেনাবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়বে। স্বতঃস্ফূর্তভাবে জনগণ শহরে ব্যারিকেড স্থাপন করল। পরিকল্পিতভাবে হলেও পূর্ব পাকিস্তানি সৈনিকদের মধ্যে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বলপ্রয়োগ করে ব্যারিকেড সরিয়ে ফেলল এবং শুরু হলো ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যাকাণ্ড।
মিস্টার আলম মনে করেন শেখ জীবিত ও মুক্ত অবস্থায় আছেন। তার এই বিশ্বাসের কারণ হিসেবে শেখের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের উল্লেখ করেন। তিনি আওয়ামী লীগের পদধারী কেউ কিনা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এখন তিনি শেখ মুজিবের ব্যক্তিগত দূত। সেনা অধিগ্রহণের আগে শেখ তাকে বলেছেন, যদি অন্য কিছু ঘটে যায় তাহলে তাকে দ্রুত পূর্ব পাকিস্তান থেকে সরে গিয়ে বাঙালিদের রক্ষা করার জন্য বিশ্ববাসী বিশেষ করে ব্রিটিশ জনগণকে অনুরোধ জানাতে হবে। এরূপ পূর্ব বাংলায় কী ঘটতে যাচ্ছে এ প্রশ্নের জবাবে আলম শেখের ৭ মার্চের বিশাল জনসভার ভাষণের কথা স্মরণ করলেন, যেখানে তিনি জনগণ প্রস্তুত হতে প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে বলেছেন। আলম নিশ্চিত সামরিক বাহিনী যদি সাময়িকভাবে বিরোধিতা গুঁড়িয়েও দিয়ে থাকে, শেষ পর্যন্ত পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত সৈন্যরা এখানে পরাস্ত হবেই।
(১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬ এই সময়ের মধ্যে এ কে এম শামসুল আলম চৌধুরীও তার ফরাসি স্ত্রীর সঙ্গে নিবন্ধকারের কয়েকবার সাক্ষাৎ হয়েছে।)

রোনাল্ড রবসনের করাচি ডেসপাচ
১০ এপ্রিল ১৯৭১, করাচি।
পাকিস্তানে জারি করা একটি নতুন সামরিক বিধি অনুযায়ী সন্দেহভাজন যে কোনো ব্যক্তি গতিবিধি সীমিত করাসহ তাদের কর্ম, তাদের ব্যবহার্য কিংবা অধিকারে থাকা যে কোনো যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ, অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ, সংবাদপত্রে বা অন্য কোনো সংবাদ মাধ্যমে সংবাদ ও তথ্য সম্প্রচার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। এই বিধি লঙ্ঘনকারীকে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে- জরিমানাসহ সাত বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে বলে করাচি থেকে রোনাল্ড রবসন বিবিসিকে জানিয়েছেন।
বলা হয়েছে এই নতুন বিধি রাষ্ট্রদ্রোহ, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা ও জননিরাপত্তা বিঘœ করার অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এই বিধিতে অন্তর্ভুক্ত অপরাধগুলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সুরক্ষায় বাধা প্রদানের আওতায়ও আনা হয়েছে। অন্য কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক বিনষ্ট করতে পারে, পাকিস্তানের যে কোনো অংশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিঘœ ঘটাতে পারে, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহ ও সেবায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে এমন কর্মকাণ্ড নতুন বিধিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সন্দেহভাজন বিদেশিকে পাকিস্তান ত্যাগের নির্দেশ দেয়া হতে পারে, বিদেশ থেকে আগমন ও প্রত্যাগমন নিষিদ্ধ ঘোষিত হতে পারে, তাদের আটক বা তার চলাচল সীমিত করা হতে পারে অথবা তাদের চলাচলের প্রতিবেদন নির্ধারিত কর্তৃপক্ষকে জানাতে নির্দেশ দেয়া হতে পারে। পাকিস্তানি নাগরিকরাও এই বিধির আওতায় আসবে- তবে তাদের দেশ ত্যাগের নির্দেশ দেয়ার সুযোগ থাকবে না।
নতুন সামরিক বিধি আরোপের কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। তবে এটা স্পষ্ট এই বিধির প্রয়োগ হতে পারে সংবাদপত্র, রেডিও ও টেলিভিশনের প্রতিবেদন ও ক্যামেরাম্যানের ওপর অথবা অন্য যে কোনো দেশি ও বিদেশি সাংবাদিকের ওপর- এই বিধির ব্যাপ্তি এত বড় যে, তা সাংবাদিকতা সংশ্লিষ্ট এবং সাংবাদিকতার বাইরেরও বহু মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে।

জন ওসম্যানের বিবিসি ডেসপাচ : গণহত্যার কথা বলা নিষিদ্ধ
পাকিস্তান নিজ দেশের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে যে নির্মম বর্বরতা চালিয়েছে সে খবর জানার পর থেকে আমেরিকার পাকিস্তান নীতি কী হওয়া উচিত তা নিয়ে মতামত বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ওয়াশিংটন থেকে বিবিসি রেডিওতে পাঠানো ২৩ আগস্ট ১৯৭১-এর ডেসপাচটি জন ওসম্যানের। ‘ইউ এস অ্যাটিচিউড টু পাকিস্তান’ শিরোনামের ডেসপাচটি ভাষান্তরিত করা হলো। উল্লেখ্য, জন ওসম্যান অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় একজন ব্রিটিশ সাংবাদিক ও ব্রডকাস্টার ছিলেন।
পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানে লাগামহীন যে জাতিগত হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে তার বর্ণনা দিতে গিয়ে জেনোসাইড বা গণহত্যা শব্দটির ব্যবহার আমেরিকাতে নিষিদ্ধ। পাকিস্তান থেকে যারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে চাচ্ছে তাদের শায়েস্তা করতেই এই হত্যাকাণ্ড। ম্যাসাচুসেটস থেকে নির্বাচিত সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের অন্যতম, যিনি পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষকে গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত করেছেন। অপর একজন হচ্ছেন ভারতে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত চেস্টার বাউলেস। পূর্ব পাকিস্তানে যেসব ঘটনা ঘটে গেছে সেগুলো সম্পর্কে যাদের জ্ঞানের ঘাটতি কম তাদের অন্যতম প্রধান সিনেটর কেনেডি, যদিও এটা সত্য যে, তিনি সীমান্তের একদিক থেকেই কেবল বিষয়গুলোকে দেখেছেন। তার পাকিস্তানও সফর করার কথা ছিল, কিন্তু তার পাকিস্তান গমনের অনুমতি বাতিল করা হয়েছে কারণ তার ‘পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব’ প্রমাণিত। কেনেডির যে বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে তা পাঠ করে এটা তাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে তিনি সম্পূর্ণ খোলা মন নিয়ে সেখানে যাননি।
কেনেডি যেমন বলেছেন শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার আন্তর্জাতিক বিধিবিধানের পরিপন্থি এটা যেমন সত্য, তেমন কেনেডি যেমন মনে করছেন শেখ মুজিবের একমাত্র অপরাধ নির্বাচনে জেতা- এটাকেও বরং তার মতামত বলে মনে করা যায়। কিন্তু পাকিস্তান সরকারের কাছে তিনি এমন একজন নেতা যিনি দেশের অর্ধেকের বেশি অংশ ভেঙে নিয়ে সেখানে স্বশাসন কায়েম করতে চাচ্ছেন, যা সম্ভবত খুব উঁচু দরের রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল।
সেখানকার ঘটনা নিয়ে কেনেডির মূল্যায়নের পরিমাণ করতে গিয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, যদিও তারা নিজেরাই সমস্যা মোকাবিলা কেমন করবেন তা নিয়ে দ্বিধান্বিত। এর মধ্যে (ভারতে সাবেক রাষ্ট্রদূত) চেস্টার বাউলেসের চিন্তাভাবনাকে ভারতপন্থি আখ্যা দিয়ে খারিজ করে দেয়া হয়েছে।
কাজেই জনপ্রিয় এবং ওজনদার অনেক সমালোচনা বাদ দেয়ার পর পাকিস্তানের প্রশাসনের আর থাকল কী? ওয়াশিংটন পোস্ট কার্যকরী যে নীতির কথা বলেছে তাতে রয়েছে ত্রাণ সহায়তা, পক্ষসমূহের প্রতিশোধ স্পৃহা সংবরণ এবং পরস্পরকে ধারণ করা। প্রথমত, হোয়াইট হাউস ও স্টেট ডিপার্টমেন্ট ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্ভাব্য যুদ্ধ প্রতিহত করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় এবং শরণার্থী সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র ৩ লাখ টন খাদ্যশস্য ও ৩ মিলিয়ন ডলার মূল্যের সামগ্রী এর মধ্যেই জাহাজে পাঠিয়ে দিয়েছে। তৃতীয়ত, আমেরিকা ভারতীয় উপমহাদেশে ভারত ও চীনের সঙ্গে একটি ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক রাখতে চাচ্ছে।
এখন সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি উঠে এসেছে তা হচ্ছে ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি (৯ আগস্ট ১৯৭১ সম্পাদিত) তাহলে মার্কিন নীতিকে কেমন করে প্রভাবিত করছে? ওয়াশিংটনে নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত আগা হিলালী বলেছেন, এতে ভারতের জোট নিরপেক্ষতার নীতির দিন শেষ হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ভারতীয়দের কাছে এই চুক্তি কারো বিরুদ্ধে আগ্রাসী ভূমিকা গ্রহণের জন্য পরিচালিত নয়, যদি ভারতের বামপন্থি গণমাধ্যম আসন্ন শরতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর যুক্তরাষ্ট্র সফরের বিরোধিতা তুঙ্গে উঠিয়েছে।
ভারতীয়রা যুক্তরাষ্ট্রকে পাকিস্তানে অস্ত্র সরবরাহকারী বিবেচনা করছেন আর আমেরিকানরা ভারতকে বিবেচনা করছেন পূর্ব পাকিস্তানে সংকট প্ররোচিত করার অপরাধের দায় দিয়ে। সব মিলিয়ে ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির সম্পর্কের পারদ একেবারে তলানিতে, ইসলামাবাদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক সহানুভূতির- পূর্ব পাকিস্তানের ট্র্যাজেডি নিয়ে স্টেট ডিপার্টমেন্ট প্রশাসন বলছে তারা ব্যথিত, একই সঙ্গে সংক্ষিপ্ত বিচারের মাধ্যমে শেখ মুজিবের কিছু করা হলে তাতে পাকিস্তানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের ইতি ঘটবে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিক্সনের উঁচু ধারণার কথা জানা গেছে- এই মুহূর্তে আমেরিকার পররাষ্ট্র নীতির মূল লক্ষ্য যে কোনো মূল্যে পাকিস্তানের ঐক্য ধরে রেখে অখণ্ড পাকিস্তান বজায় রাখা।

৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ সংবাদ পর্যালোচনা
বিবিসির জন্য ইভান চার্লটনের প্রতিবেদন :
ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ আজকের ব্রিটিশ সংবাদপত্রের অনেকটা জায়গাই দখল করে নিয়েছে। প্রধান সংবাদপত্রগুলো এ নিয়ে সম্পাদকীয় রচনা করেছে।
ভারতের ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’কে স্বীকৃতি দেয়া নিয়ে ডেইলি টেলিগ্রাফ বলেছে, মিসেস গান্ধীর এর চেয়ে সহজভাবে করার আর কিছু ছিল না। তিনি তার পার্লামেন্ট সদস্যদের বলেছেন, যুদ্ধ এসে পড়েছে, শান্তিপূর্ণ সমাধানের উদ্যোগ বা কোনো হস্তক্ষেপের দ্বিধা গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। ভারতের নীতি এবং সেই সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তান যে অবস্থায় পৌঁছেছে, আমাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবিকই যৌক্তিক। মিসেস গান্ধীর প্রশংসা প্রাপ্য। গত মার্চ থেকে ভারতের ঘাড়ে পড়া শরণার্থীর ভার সত্ত্বেও তিনি কোনো প্রতিশোধমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা থেকে নিজেকে বিরত রেখেছেন।
ভারতের উদাহরণ অনুসরণ করে এগিয়ে আসা সবচেয়ে অগ্রগামী দেশ সোভিয়েত ইউনিয়ন, তারপর কিছু পূর্ব ইউরোপীয় দেশ। চীন পাকিস্তানকে সমর্থন করলেও একটি স্বাধীন বাংলার অভ্যুদ্বয় ঘটলে সেখানে তার উপস্থিতি প্রত্যাশা করবে। ওয়াশিংটন তার ভারতবিরোধী অভিব্যক্তির কারণে ভারতের দেয়া স্বীকৃতির বিরোধিতা করবে। টেলিগ্রাফ মনে করছে, সবচেয়ে বড় শক্তি যুক্তরাষ্ট্র লাগামহীনভাবে ভারতের ওপর দোষ স্তূপীকৃত করছে, সহযোগিতা বন্ধের হুমকি দিচ্ছে, কমাস ধরে তারা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। স্পষ্টত, তাদের ভূমিকা শান্তির জন্য হুমকি স্বরূপ।
গার্ডিয়ানের সম্পাদকীয় শিরোনাম ‘সম্পূর্ণ বিজয়ের বিপদ’- নিক্সন সাহেব এটা পছন্দ করবেন না। চীন এটাকে ঘৃণা করবে। কিন্তু একটি সত্য তো স্পষ্টভাবেই উঠে এসেছে, রক্ত ও মরিয়া হয়ে ওঠা থেকে সৃষ্ট বাংলাদেশ তো আর চলে যাচ্ছে না।
গার্ডিয়ান বলছে, যুদ্ধের প্রথম বড় ট্রফি ভারত পেয়েছে, কিন্তু সব মিলিয়ে ভারতের বিজয় যত না প্রশ্নের সমাধান করবে, তার চেয়ে বেশি প্রশ্ন জাগিয়ে তুলবে।
বাংলার স্বায়ত্তশাসন ন্যায্যত বাংলার প্রাপ্য, যথার্থ কারণেই প্রাপ্য, কিন্তু পাকিস্তানের কোনো জাতশত্রæ বাইরে থেকে তো আর এটা বাংলাকে দিতে পারে না। গার্ডিয়ান বলেছে, পুতুল রাষ্ট্রের মতো বাংলাকে খোলসাবৃত করে রাখা যাবে না। বাংলা সমস্যার সমাধান তার নেতৃত্বকেই খুঁজে বের করতে হবে।
টাইমস লিখেছে, পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক সমস্যার সামরিক সমাধান ভারত চাচ্ছে। ফলে সমঝোতার আর কোনো পথ খোলা রইল না। এটা ভারতের কাছে স্পষ্ট এবং সম্ভবত তারা সঠিক যে, পাকিস্তানের আর পূর্ব বাংলার মানুষদের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার সক্ষমতা একেবারেই নেই। একটি জমজমাট প্রচারণার মধ্য দিয়ে তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে, সে ক্ষেত্রে ভারতের স্বীকৃতিটি বরং আগেভাগে হয়ে গেছে।
টাইমস মনে করে, যদি তাড়াতাড়ি ক্ষমতা হস্তান্তর করা যায়, তাহলে ১৯৬২-তে চীন যেমন তড়িঘড়ি করে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছিল, যে যুদ্ধ তখনো হয়নি, তাই শেষ হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল ভারতকে, সেটাই অনুসরণ করতে হবে। যতক্ষণ না সেই সমাধানে পৌঁছা যায়, সোভিয়েত ইউনিয়ন নিরাপত্তা পরিষদে বাধা হয়ে পাথরের দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে যাবে। টাইমস বলেছে, সে রকম কিছু নাও হতে পারে- এমনকি পূর্ব পাকিস্তানে তারা পরাস্ত হলেও পশ্চিমে তাদের তৎপরতা কোনোভাবেই থামিয়ে রাখবে না।
ভয়টা সেখানেই, সে কারণেই তাদের বিচ্ছিন্ন করা এবং যুদ্ধ শেষ করে আনা কঠিন কাজ হয়ে উঠবে। জাতিসংঘ বড়জোর যুদ্ধ পূর্ব পাকিস্তানের জন্য কোনো সমাধানের পথ খুলে দেয় কিনা- তা পর্যবেক্ষণ করতে পারে; পাকিস্তান ও ভারতের যুদ্ধ শেষ করার জন্য আর একটি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়াতে কোনো সমাধানের আশা নেই।
ড. এম এ মোমেন : সাবেক সরকারি চাকুরে, নন-ফিকশন ও কলাম লেখক।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়