সড়ক-মহাসড়কের যানজট দূরীকরণ ও জবাবদিহিতা

আগের সংবাদ

ই-কমার্সে আস্থা ও স্বচ্ছতা ফেরানোর উদ্যোগ নিতে হবে

পরের সংবাদ

সাংবাদিকদের ব্যাংক হিসাব তলব অনভিপ্রেত

সজীব ওয়াফি

লেখক, ঢাকা

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২১ , ১:০৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২১ , ১:০৫ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) কোন অভিযোগের ভিত্তিতে বা শুধু ব্যাংকে ১০ লাখের বেশি টাকা থাকলে এবং মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের সন্দেহ থাকলে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে নাগরিকদের ব্যাংক হিসাব তলব করতে পারে। বিশেষ করে জঙ্গি অর্থায়ন এবং অর্থ পাচার রোধে রাষ্ট্রের এই সুরক্ষা ব্যবস্থা। অভিযোগ ব্যতীত উন্নয়নশীল দেশে নির্দিষ্ট সময়ান্তে রাষ্ট্রের কর্মচারীদের বা সেবকদের রাষ্ট্র তলব করবেন এটা স্বাভাবিক। কারণ দুর্নীতি সেখানে রন্ধ্রে রন্ধ্রে। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের আয়-ব্যয় এবং সম্পদের হিসাবের গরমিল পরিলক্ষিত হয়। বিদেশে অর্থ পাচারের ঘটনাও উল্লেখযোগ্য। জনগণের অর্থের যথাযথ ব্যবহার- সে হিসেবে এমপিদের ব্যাংক হিসাব তলব বা সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব চাওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এমনকি ঝুঁকিপূর্ণ কোনো বিষয়ে অর্থায়ন হচ্ছে কিনা খতিয়ে দেখতে ইতোপূর্বে ব্যবসায়ী নেতাদের ব্যাংক হিসাবও তলব হয়েছে। তবে সম্পদ বা অর্থের এই হিসাব চাওয়া হয় কেবলমাত্র ব্যক্তির কাছে, সাংগঠনিক পরিচয়ে নয়।
সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের ওপর যে আঘাত এসেছে, এটা নতুন নয়। বারবারই আঘাত এসেছে। সব সরকারের আমলেই চেষ্টা ছিল সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণ করার। নীতিমালা করে সংবাদ প্রকাশের কৃত্রিম সীমাবদ্ধতা তৈরি করা হলো, তারপর চাপিয়ে দেয়া হলো সংবাদপত্রের নিবন্ধন জাল। অন্যদিকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ তো আছেই। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলা পরিসংখ্যানে দেখা যায়- এই মামলায় ভুক্তভোগী অধিকাংশই পেশায় সাংবাদিক। এমনকি করোনা মহামারি শুরুর পর থেকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কমপক্ষে ৮০ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, এমনটাই প্রকাশ করেছে মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর গত মে মাসের প্রতিবেদনে। অর্থাৎ সাংবাদিকদের কলম যখন থামানো যাচ্ছিল না, তখন মাথার ওপরে চাপল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খড়গ। সন্ত্রাসীদের বন্দুকের নল বারবারই মফস্বল সাংবাদিকতার সামনে উঁচিয়ে উঠেছে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে গুমের শিকার হয়েছেন কেউ কেউ। আমলারা তাদের সম্পদের হিসাব দেবেন না, সংবাদমাধ্যমেও একের পর এক নানান অনিয়ম আসছিল; এরকম সময়েই জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও সম্পাদকসহ ৪ সংগঠনের ১১ সাংবাদিক নেতার ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়েছে। সরকারের একটি সংস্থার চাহিদার প্রেক্ষিতে ব্যাংকগুলোকে এ বিষয়ে চিঠি পাঠিয়েছে বিএফআইইউ। অথচ এই বিষয়ে কিছুই জানেন না খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাহলে এই চিঠি এলো কার কথায়! দায়িত্বরত আমলাদের কথায়?
রাষ্ট্র তার প্রয়োজনে নাগরিকের হিসাব গ্রহণ করতে পারবে। অথচ ১১ সাংবাদিক নেতার ব্যাংক হিসাব তলবের ক্ষেত্রে দেখা গেল ব্যক্তির হিসাব চাওয়া হয়নি, চাওয়া হয়েছে সাংবাদিক সংগঠনের সভাপতি-সম্পাদকের হিসাব। যাকে সাংগঠনিক তলব বলে। কারণ ব্যক্তির হিসাব চাইলে কেবলমাত্র ব্যক্তির নামের শেষে তার মাতা-পিতার নাম থাকবে, ঠিকানা থাকবে। এখানে ঘটল বিপরীত- তার সাংগঠনিক পদমর্যাদা এবং সংগঠনের নাম ব্যবহার করা হয়েছে; উল্লেখ করা হয়েছে রাজনৈতিক পরিচয়। দ্বিতীয়ত স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন তলবকৃত চিঠির ব্যাপারে জানেন না বলে গণমাধ্যমে মতামত দিয়েছেন; এর অর্থ দাঁড়াল- উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে দুরভিসন্ধিমূলক ষড়যন্ত্রে একটা পক্ষ লিপ্ত হয়েছে, পূর্বে যাদের অনিয়মের খবর প্রকাশিত হয়েছে। জনসমক্ষে হেয় করাই যার একমাত্র লক্ষ্য। যেন তাদের সম্পদের হিসাব চাওয়া সাংবাদিক আন্দোলনের সঙ্গে হালকা হয়ে যায়। বিভিন্ন জনের দুর্নীতির মচ্ছব লুকিয়ে ফেলার ষড়যন্ত্র।
প্রচলিত আইনে কোনো ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত হতে পারে। এই উদ্যোগকে স্বাগত। কিন্তু ঢালাওভাবে সাংবাদিকতা পেশার ১১ জনের ব্যাংক হিসাব তলব উদ্দেশ্যমূলক। রাষ্ট্র ও সরকারের মুখোমুখি সাংবাদিকদের দাঁড় করিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা। বাকস্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের ওপরে চাপ ও হুমকি সৃষ্টির কৌশলপত্র। সুতরাং সংবাদমাধ্যমগুলোর উচিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভবিষ্যৎকে শঙ্কায় ফেলে যারা এ ধরনের হীন কাজের জোগান দিল সেসব কলকাঠিওয়ালাদের বেগমপাড়ার হিসাব বের করে আনা। যেহেতু জনগণের মুখোমুখি সাংবাদিক-সংগঠনগুলোকে নৈতিকতার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে, এমতাবস্থায় গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে জনসম্মুখে সাংগঠনিকভাবে সব হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজনীয়। বিভ্রান্তি দূরীকরণে সরকারেরও উচিত হবে তলবের পরিপ্রেক্ষিতে তারা কী বিবরণী পেল তার বিস্তারিত তুলে ধরা। নতুবা এর ব্যত্যয় ঘটলে জনগণ হয়তো পুরোপুরি বিশ্বাস নাও করতে পারে। যে সম্মান হারায় দ্বিতীয়বার তা ফিরে পাওয়া কষ্টসাধ্য। জনতার আরো গভীরে মিশে কাজ করা জরুরি। সত্যের জয় অনিবার্য।
সজীব ওয়াফি
লেখক, ঢাকা।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়