শিক্ষা খাতের পরবর্তী চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে ভাবতে হবে!

আগের সংবাদ

শুদ্ধাচার, জবাবদিহিতা ও ন্যায়পাল

পরের সংবাদ

পচনের আগেই বাঁচাতে হবে স্বদেশ ও সমাজ

অজয় দাশগুপ্ত

কলাম লেখক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২১ , ৫:০৪ পূর্বাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২১ , ৫:০৪ পূর্বাহ্ণ

ইতিহাস কখনো কাউকে তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করে না। আবার যার যা প্রাপ্য তা বুঝিয়ে দিতেও বিলম্ব করে না। অনেক সময় আমরা ভাবি ইতিহাস তো অতীত। হয়তো এসব সেকালে ঘটত। যা এখন আর হয় না। এককালে আমরা বাংলার শাসক হিন্দু রাজাকে আলাউদ্দীন খিলজির মুখোমুখি হওয়ার বদলে পালানোর কথা শুনেছি। শোনা যায় ১৭ জন সৈন্যের খিলজিকে না দেখে, না জেনেই পালিয়েছিলেন সেন বাবু। আমরা এও জানি সিরাজউদৌলাও একটি বিতর্কিত চরিত্র। তিনি বাংলা বলতেনও না। অথচ বাংলা বিহার ওড়িষ্যার নবাব নামে খ্যাত তিনিই হয়ে গেলেন বাংলা নাটক ও মনোজগতের এক বিশাল দেশপ্রেমিক চরিত্র। এসব কথা বলছি এই কারণে- বোঝা মুশকিল ইতিহাস বা সময় আসলে কাকে কখন কোথায় দাঁড় করায়।
বাংলাদেশের রাজনীতি এখন মৃতপ্রায়। কোথাও কোনো রাজনৈতিক কাজকর্ম কিংবা রাজনীতির কোনো দাপট নেই। এর বিবিধ কারণ আছে। তার ভেতর আমার মতে যেটি প্রধান কারণ সেটি হচ্ছে উন্নয়ন ও বিশ্বায়ন। উন্নয়ন বা অবস্থার উন্নতি ঘটায় বাঙালি ঝুট ঝামেলায় যেতে নারাজ। আজকে তাদের খাবারের নিরাপত্তা বা থাকার বন্দোবস্ত কোনো না কোনোভাবে হয়ে যায় বলেই তাদের আগ্রহ নেই রাজনীতিতে। আর আজকের প্রজন্ম ডিজিটাল দুনিয়ার কারণে বুঝে গেছে লাইফ ইজ সামথিং ইমপোর্টেন্ট। আগের কালের মতো কথায় কথায় জীবন দানের কথা সে স্বপ্নেও ভাবে না।
কথাগুলো বললাম এই কারণে, রাজনীতি না থাকলেও হানাহানি বন্ধ হয়নি। বন্ধ হয়নি পরস্পরকে ছোট বা হেয় করার অপরাজনীতি। এসব ঘটনা ঘুরে-ফিরে শেষ বা শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের বছর একাত্তরে গিয়ে। সে সময়কার কারো ভূমিকাই আমরা অবিতর্কিত রাখতে পারিনি। বরং সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ হারিয়ে গেছে অনেক আগেই। সেটাও বলছি না, বলছি এখনকার একমুখী রাজনীতিতে সবাই মিলে স্তাবকতা আর তোষামোদিতে ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা। ইতিহাসের আসল সত্য বা তার পাঠ কেউ মনে রাখে না। তাই যখন যে দেশ শাসনে তার স্তুতিতে ঝাঁপিয়ে পড়া বাঙালির অভাব হয় না। এখন তার প্লাবন বইছে বাংলাদেশে। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের প্রতি এদের যে তথাকথিত আনুগত্য ও স্তাবকতা তাতে অতীত এসে হানা দেয় মনে। একমাত্র বঙ্গবন্ধু ও তার চার সহযোদ্ধা ছাড়া সবাইকে কাবু করেছিল এই স্তাবকতা। বঙ্গবন্ধুকে কাবু না করলেও বিভ্রান্ত করে দেশ ও তার সর্বনাশ করতে পিছপা হয়নি তারা। এরাই হত্যা করেছিল তাকে সর্বাংশে।
এরপর আমরা জিয়াউর রহমান থেকে এরশাদ, অতঃপর খালেদা জিয়া- সর্বত্র সে একই বাস্তবতা দেখেছিলাম। বিশেষত এরশাদের আমলে কত ধরনের যে ভণ্ডামি আর মোসাহেবি দেখেছি। প্রয়াত কাজী জাফর আর মওদুদ আহমদের ভেতর একটা নীরব প্রতিযোগিতা কাজ করত। সে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে না পড়ার জন্য তারা এরশাদের বুকে হাত বোলানো থেকে নকল কান্না কিছুই বাদ দিতেন না। অথচ সময়ের দেরি। এরশাদ পতনের পরপরই কাজী জাফর হয়ে উঠেছিলেন বিএনপির শরিক। আর মওদুদ সাহেব তো মন্ত্রী। এর মূল কারণ দুটি। একটা ছিল আওয়ামী বিরোধিতা আর একটা হলো যেনতেন প্রকারে গদি লাভ। এরা কারো বন্ধু ছিলেন না। আজকে আমরা তেমন নেতাদের ভিড়ে সরকার দলের নৌকা ভরে উঠতে দেখছি। যেদিকে তাকাই হাইব্রিড আওয়ামী নেতা-লীগের সমর্থক।
এক সময় মিছিল-মিটিং করা, সভা-সমাবেশ করাও ছিল অসম্ভব। সে দুঃসময়ে যারা কাছে ছিল তারা আজ পরিত্যক্ত। কিন্তু ভয়ের মূল জায়গাটা অন্যত্র। একদা বাম কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কবি, সাংবাদিক, লেখকরা দেখলাম সম্পূর্ণ ভোল পাল্টে লীগ তো বটেই বঙ্গবন্ধু পরিবার নিয়েও তোষামোদিতে নেমেছেন। ইতোমধ্যে পুরস্কারও জুটে গেছে কারো কারো। কিন্তু খায়েশের শেষ নেই। শেষ নেই চাওয়া-পাওয়ার। যত পায় তত চাই-এর এই সমাজে তারা আরো চায়। তা তারা চাইতেই পারে। ডান, বাম, জামায়াত, হেফাজত সবাই চায়। আর সরকারি দল দিতেও কসুর করে না। অথচ যে সর্বনাশ বাসা বাঁধছে তার দিকে খেয়াল নেই কারো। এরশাদ যখন যেখানে যেতেন কাউকে না কাউকে কিছু না কিছু দিতেন। তেমনি এক ভদ্রলোক যিনি নাকি এরশাদের ভাগ্য গণনার নামে হঠাৎ নেতা হয়ে গিয়েছিলেন, সে জ্যোতিষীর দাপট দেখে যেমনি অবাক হতাম তেমনি বিস্মিত হয়েছি এরশাদ পতনের পর তাদের ভূমিকায়। অবশ্য এ আর নতুন কি? এই দেশেই মোশতাকের জন্ম হয়েছিল। এ দেশের মানুষ ছিল মীরজাফর।
দম বন্ধ করা পরিবেশে দালালরা কথা বলবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের প্রত্যাশা ছিল ভিন্ন। ইতিহাসের পাঠ থেকে কিছু শিখবে এটাই ভেবেছিলাম আমরা। ওই যে বললাম এরশাদ আমলে তার প্রেমে পড়া নারীদের তালিকা দেখলে বিশ্বসেরা প্রেমিকেরও মাথা খারাপ হওয়ার কথা। রমণীমোহন এরশাদের পতনের পর বা তার মৃত্যুর পর এদের কাউকে আহাজারি করতে শুনেছেন? দেখেছেন কাউকে বাইরে এসে কিছু বলতে? যে দুই বিবির লড়াই তাও কিন্তু ভোগ দখল নিয়ে। কী করে এসব দেখার পরও চোখ বন্ধ করে ভাবি আমরা নিরাপদ? আমরা বলছি এই কারণে আওয়ামী লীগের পরাজয় বা তাদের সর্বনাশে বড়-মাঝারি নেতাদের কখনো কিছু হয়নি। হয়ও না। তারা ম্যানেজ করতে জানেন। ম্যানেজ করাও আছে সবকিছু। হয় সাধারণ প্রগতিশীল আর সংখ্যালঘুদের। তাদের ঘরবাড়ি যায়। সম্পত্তি যায়। তাদের মেয়েরা ইজ্জত হারায়। আর বড় নেতারা তখন থাকেন কানাডা-আমেরিকার মতো দেশে। যে পরিবারের সর্বস্ব এক রাতে উজাড় হয়ে যায়। যাদের জীবনে মা-বাবা, ভাই বা আত্মীয়দের চলে যাওয়ার আলাদা দিন থাকে না, তাদের পাশে তখন কেউই দাঁড়ায় না। কারণ এরা সুখের পাখি। বসন্তের কোকিল।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিবেশ এমনই, এখানে সাদা-কালো, ভালো-মন্দ সব মিলেমিশে একাকার। এই ডিজিটাল যুগে রাস্তায় তো বটেই বাড়িতে পাশে থাকারও কেউ নেই। সবাই যার যার ধান্দা আর মস্তিতে মশগুল। মাঝে মাঝে মনে হয় কী লাভ এসব লিখে? যারা টাকা বানানোর তারা তা বানিয়ে নিয়েছে। এখন কবে ভাগবেন সে আশায় দিন গুনছেন। বাকি যে সাধারণ মানুষ তাদের কাছে এও যা সেও তা। তবু আশা-ভরসা আর সম্ভাবনার দেশ ও মানুষের জন্য মায়া হয়। সমাজে এত মোশতাক, এত হিন্দু রাজাকার, এত দালাল আর সুবিধাবাদী মানুষের প্রতি বিশ্বাস রাখাও যেন ভয়ের ব্যাপার।
বারবার ঘুরে দাঁড়ানো এই দেশের সর্বনাশ করেছে অপরাজনীতি। এবার যদি কিছু ঘটে তা করবে নো রাজনীতি। এই নো রাজনীতি আর স্তাবকতার উদ্দেশ্য দু-একটা পদক পুরস্কার আর টাকা। নেপথ্যে ভোগ। নারীর অর্থ-সম্পদের প্রতি এমন লোভ- না আগে কেউ দেখেছে না দেখবে। এর সঙ্গে উন্নয়নের নামে চলছে পোশাক শ্রমিক আর রেমিট্যান্স পাঠানো মানুষ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা। বাকি যে নলেজ বা বুদ্ধিবৃত্তি সে আজ রসাতলে।
কে দেখাবেন পথ? কোথায় দেশের উদ্ধার?
অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়