জামালপুরের নিখোঁজ তিন মাদরাসাছাত্রী উদ্ধার

আগের সংবাদ

নিয়ন্ত্রণহীন পণ্যমূল্য ক্রেতাদের নাভিশ্বাস

পরের সংবাদ

গ্রাহকদের টাকার কী হবে

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২১ , ৯:০৩ পূর্বাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২১ , ৯:১৫ পূর্বাহ্ণ

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. রাসেল এবং তার স্ত্রী শামীমা নাসরিনকে (প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান) গ্রেপ্তারের পর বিনিয়োগ করা বিশাল অঙ্কের টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে বিনিয়োগ করা হাজার হাজার গ্রাহক দাবি করছেন, গ্রেপ্তার না হলে তারা রাসেলের বাসা কিংবা অফিসে গিয়ে টাকা ফেরত চাইতে পারতেন। কিন্তু এখন আর সেই সুযোগ থাকল না।

অনেকেই আবার আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, অতীতে ডেসটিনি ও যুবকসহ কয়েকটি এমএলএম কোম্পানির কর্ণধারদের আইনের আওতায় নেয়ার পর পথে বসে গিয়েছেন লাখ লাখ গ্রাহক। দীর্ঘদিন ধরে বিচারকাজ প্রক্রিয়াধীন থাকায় এক টাকাও ফেরত পাননি তারা। ইভ্যালির সিইও রাসেল ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। সেই আশঙ্কা থেকেই রাসেলের মুক্তি চেয়ে বিক্ষোভও করেছেন শতাধিক গ্রাহক। টাকা ফেরত পেতে রাসেলকে আরো কিছুদিন সময় দেয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

বৃহস্পতিবার বিকালে মোহাম্মদপুরের স্যার সৈয়দ রোডের নিলয় কমপ্রিহেনসিভ হোল্ডিংয়ের বাসায় (হাউজ ৫/৫এ, স্যার সৈয়দ রোড) অভিযান চালিয়ে ইভ্যালির সিইও মো. রাসেল এবং তার স্ত্রী শামীমা নাসরিনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের র‌্যাব সদর দপ্তরে নেয়া হয়েছে। র‌্যাবের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রাজধানীর গুলশান থানায় এক ভুক্তভোগীর দায়ের করা মামলায় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযানে রাসেলের বাসা থেকে কিছু উদ্ধার করা হয়েছে কিনা এবং গ্রাহকদের টাকা পরিশোধের জন্য ইভ্যালির কি পরিমাণ টাকা রয়েছে সেসব বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে র‌্যাবের পক্ষ থেকে কিছু জানানো হয়নি।

এর আগে গত বুধবার রাতে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে ইভ্যালির সিইও ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে গুলশান থানায় মামলা (নম্বর-১৯) দায়ের করেন আরিফ বাকের নামে একজন গ্রাহক। গতকাল মামলাটির এজাহার গ্রহণের পর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২১ অক্টোবর দিন ধার্য করেন আদালত।

বিকাল ৪টার দিকে রাসেলের ফ্ল্যাটে র‌্যাবের অভিযান শুরুর বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রচার শুরু হতেই বাসাটির সামনে বাড়তে থাকে ইভ্যালির গ্রাহকদের ভিড়। আধা ঘণ্টার মধ্যে সেখানে অর্ধশত গ্রাহক জড়ো হন। রাসেলকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে শুনে বিক্ষোভ শুরু করেন তারা। রাসেল গ্রেপ্তার হলে আর টাকা পাওয়ার সুযোগ নেই- এসব কথা বলে ক্ষুব্ধ কিছু গ্রাহক গণমাধ্যমকর্মীদের ওপরও চড়াও হওয়ার চেষ্টা করেন। বিকাল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে রাসেল ও তার স্ত্রীকে ভবনের নিচতলায় এনে একটি সাদা মাইক্রোবাসে উঠিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায় র‌্যাব সদস্যরা। এ সময় ইভ্যালির গ্রাহকরা গাড়িটি বের হতে বাধা দিয়ে ব্যর্থ হয়ে পিছু পিছু দৌড়াতে থাকে এবং ‘রাসেলের কিছু হলে জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে’ স্লোগান দিতে থাকে।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত ইভ্যালির গ্রাহক সজীব মাহমুদ জানান, রাসেলকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে এমন খবরে তিনি ছুটে এসেছেন। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে ধার করে ও সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে জানুয়ারি মাসে তিন লাখ টাকার প্রোডাক্ট অর্ডার করেছি। খুব কষ্টের টাকা ভাই, না পেলে আমার অবস্থা খুবই খারাপ হবে। অনেক দুশ্চিন্তায় আছি। আমি আর কিছুদিনের মধ্যেই টাকাটা পেয়ে যেতাম। এখন যদি রাসেলকে কারাগারে রাখা হয়, তাহলে ডেসটিনির মতো আমরাও হয়তো আর টাকা পাব না… বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন সজীব। কিছুক্ষণ পর কান্না থামিয়ে সজীব বলেন, আমি দুই-তিন দিন আগে তার (রাসেল) কাছে গিয়েছিলাম। তিনি (রাসেল) বলেছেন দুই-তিন দিন পর টাকা পেয়ে যাব। কিন্তু সব আশা শেষ হয়ে গেল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মোহাম্মদপুরের এক বাসিন্দা বলেন, ইভ্যালিতে ২১ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছি। এখন এই টাকার কী হবে? গ্রেপ্তার না হলে রাসেলের বাসায় অথবা অফিসে যোগাযোগ করা যেত। কিন্তু এখন কার কাছে যাব? টাকা না পেলে অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে বলেও জানান তিনি। তার মতোই উপস্থিত সব গ্রাহকের মুখে ছিল এমনই উৎকণ্ঠা আর প্রশ্ন। তাদের দাবি, যে কোনোভাবেই হোক পাওনা টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করা হোক। প্রয়োজনে রাসেলকে আরো সময় দেয়া হোক। নইলে আইনি জটিলতায় টাকা ফেরত নাও পেতে পারেন তারা।

রাসেল ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক লে. কর্নেল খায়রুল ইসলাম জানান, ইভ্যালির বিষয়ে গুলশান থানায় একটি মামলা হয়েছে। ওই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের র‌্যাব সদর দপ্তরে আনা হয়েছে। আর র‌্যাবের লিগ্যাল এন্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, জিজ্ঞাসাবাদ শেষে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।

এদিকে ইভ্যালির বিরুদ্ধে গুলশান থানায় দায়ের হওয়া মামলাটির এজাহার গতকাল ঢাকা মহানগর আদালতে আসে। এরপর ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর হাকিম আসাদুজ্জামান নুর মামলার এজাহার গ্রহণ করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২১ অক্টোবর দিন ধার্য করেন। ভুক্তভোগী গ্রাহক আরিফ বাকেরের দায়ের করা ওই মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ইভ্যালির চমকপ্রদ বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে অভিযোগকারী আরিফ বাকের ও তার বন্ধুরা চলতি বছরের মে ও জুন মাসে কিছু পণ্য অর্ডার করেন। অর্ডারের সময়ই বিকাশ, নগদ ও সিটি ব্যাংকের কার্ডের মাধ্যমে সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করেন তারা।

পণ্যগুলো সাত থেকে ৪৫ কার্যদিবসের মধ্যে ডেলিভারির কথা ছিল। এছাড়া নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে পণ্য সরবরাহে ব্যর্থ হলে প্রতিষ্ঠান সমপরিমাণ টাকা ফেরত দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিল। কিন্তু ওই সময়সীমার মধ্যে পণ্যগুলো ডেলিভারি না পাওয়ায় বহুবার ইভ্যালির কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধিকে ফোন করা হয়। সর্বশেষ গত ৫ সেপ্টেম্বর যোগাযোগ করে অর্ডার করা পণ্যগুলো পাওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন বাদী ও তার বন্ধুরা।

এ অবস্থায় ৯ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটির ধানমন্ডির অফিসে যান ভুক্তভোগীরা। এ সময় তারা ইভ্যালির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ রাসেলের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে সেখানে থাকা অফিসের কর্মীরা বাদী ও তার বন্ধুদের ওপর উত্তেজিত হয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করেন। একপর্যায়ে অফিসের অভ্যন্তরে থাকা ইভ্যালির সিইও রাসেল উত্তেজিত হয়ে তার কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে বাদীসহ অন্যদের ভয়ভীতি দেখিয়ে পণ্য অথবা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানান।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, গুলশান থানায় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলা দায়েরের পর রাসেল ও তার স্ত্রী গা-ঢাকা দিতে চেয়েছিলেন। গ্রেপ্তার আতঙ্কে গতকাল অফিসেও যাননি রাসেল। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না।

কী শাস্তি হতে পারে রাসেলের : সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মামলার এজাহারে রাসেল ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে তিনটি ধারায় অপরাধের কথা বলা হয়েছে। ফৌজদারি দণ্ডবিধির ধারাগুলো হচ্ছে- ৪২০, ৫০৬ ও ৪০৬। দণ্ডবিধির ৪২০ নম্বর ধারায় প্রতারণা করে সম্পত্তি বা অর্থ হাতিয়ে নেয়ার কথা বলা হয়েছে। এ অপরাধে একজন ব্যক্তির সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড ও উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া ৪০৬ নম্বর ধারায় বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধে সর্বোচ্চ তিন বছর জেল, অর্থ জরিমানা ও উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। আর ৫০৬ নম্বর ধারায় ভুক্তভোগীকে হত্যা বা আঘাত করার ভয়ভীতি দেখানোর অপরাধের কথা বলা হয়েছে। এ ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি সাত বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে যাত্রা শুরু করে মাত্র আড়াই বছরের মাথায় সরবরাহকারী কোম্পানি ও গ্রাহকদের কাছে ৫৪৩ কোটি টাকার দায়ে পড়ে ইভ্যালি। এত অল্প সময়ে এই বিপুল টাকা কোথায় গেল, তার হদিস এখনো মেলেনি। আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে গত ১৫ জুলাই দুদকের আবেদনে ইভ্যালির শীর্ষ কর্তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে আদালত। এরপর ২৫ আগস্ট তাদের সব ব্যাংক অ্যাকাউন্টের হিসাব চায় বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। চিঠিতে ইভ্যালি প্রতিষ্ঠান, চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন ও এমডি মোহাম্মদ রাসেলের ব্যাংক হিসাবের তথ্য পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে পাঠাতে বলা হয়েছিল। এর আগেই নাসরিন ও রাসেলের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দেয় বিএফআইইউ।

গত জুন মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক ইভ্যালির ওপর এক প্রতিবেদন তৈরি করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছিল, প্রতিষ্ঠানটির কাছে ৪০৪ কোটি টাকার চলতি সম্পদ থাকার কথা থাকলেও আছে ৬৫ কোটি টাকার সম্পদ। তখন বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সর্বশেষ গত ১৪ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জসহ ১০ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করে মন্ত্রণালয়ের এ সংক্রান্ত কমিটি।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়