ওকে বাজারে যুক্ত হলেন ৩০০ নারী উদ্যোক্তা

আগের সংবাদ

মিয়ানমারের অনুমোদন মেলেনি : কক্সবাজার-গুনদুম রেলপথ নির্মাণ অনিশ্চিত!

পরের সংবাদ

বর্জ্য নিয়ে বিপাকে চামড়া শিল্প

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২১ , ৮:৩৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২১ , ৮:৩৯ পূর্বাহ্ণ

উৎপাদনের তুলনায় কম পরিমাণের বর্জ্য পরিশোধনের কারণে সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরীর উচ্ছিষ্ট বর্জ্য নদী দূষণ করছে। দীর্ঘদিন ধরে ট্যানারি শিল্পের বিপুল পরিমাণ দূষিত বর্জ্যে ধলেশ্বরী নদী হুমকির মুখে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সংসদীয় কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সাভারের চামড়া শিল্পনগরী ‘কেন বন্ধ করা হবে না’, তা বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) কাছে জানতে চেয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। চিঠির জবাব দিয়ে বিসিক জানিয়েছে, সাভার চামড়া শিল্পনগরীর পরিবেশ নিয়ে চলমান সমস্যা নিরসনে কাজ চলছে। এক্ষেত্রে কোনো ট্যানারির মালিক পরিবেশ দূষণ করলে, তার বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু কোনো অবস্থায়ই সম্ভাবনাময় এ চামড়া শিল্পনগরী বন্ধ করা যাবে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ট্যানারি বন্ধ করে দেয়া কোনো সমাধান হতে পারে না। মালিকরা হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে হাজারীবাগ থেকে এখানে এসে বিনিয়োগ করেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিল্পনগরীটি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেয়া যুক্তিযুক্ত হবে কিনা সেটা যেমন ভাবনার বিষয়; তেমনি আমরা মনে করি না যে সংসদীয় কমিটির সুপারিশ অযৌক্তিক। তাদের মতে, বর্জ্য বন্ধ করার চেয়ে বেশি প্রয়োজন পরিবেশগত মানদণ্ডে সাভার শিল্পনগরী উত্তরণ এবং সেই আলোকে সামগ্রিক পরিকল্পনা দরকার।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পরিবেশ দূষণ রোধ করে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা ও রপ্তানি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাযুক্ত কমপ্লায়েন্স চামড়া শিল্পনগরী গড়ে তোলার লক্ষ্যে সাভারের হেমায়েতপুরের চামড়া শিল্পনগরী প্রকল্পটি হাতে নেয় সরকার। ছয় গুণ ব্যয় বাড়িয়ে দুই বছর মেয়াদি প্রকল্পটি ১৯ বছরে বাস্তবায়ন করলেও সাভারের চামড়া শিল্পনগরীকে এখনো ‘অসম্পূর্ণ ও পরিবেশ-অবান্ধব’ বলে মনে করছেন খোদ ট্যানারি মালিকরাই। দূষণমুক্ত ট্যানারি শিল্প গড়ে তুলে দেশীয় কাঁচামালনির্ভর রপ্তানিমুখী খাতটিতে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা কিংবা রপ্তানি বাড়ানোর মতো কোনো স্বপ্নই পূরণ হচ্ছে না। বরং চার বছর আগে ট্যানারিগুলো হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তরের পর দ্রুত কমছে রপ্তানি আয়। ইএসকিউ (এনভায়রনমেন্ট, সোশ্যাল অ্যান্ড কোয়ালিটি), আইএসও এবং অন্যান্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা জরুরি হলেও তা সম্ভব হয়নি।

২০১৬-১৭ সালকে সরকারিভাবে ‘চামড়া বর্ষ’ ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু চামড়া শিল্পের পতন সেই সময় থেকেই শুরু। লেবার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) সনদের অভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তরের পর রপ্তানির পরিমাণ আরো কমতে থাকে। পরের বছর রপ্তানি আয়ের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থান হারিয়ে তৃতীয় স্থানে নেমে আসে চামড়া খাত। শিল্পমন্ত্রীর নেতৃত্বে টাস্কফোর্স গঠন করে এ খাতের উন্নয়নে নিয়মিত সভা করার কথা ছিল, সেটাও হয়নি। ফলে দেশে উন্নত মানের চামড়া থাকা সত্ত্বেও প্রক্রিয়াকরণ ও পণ্য উৎপাদনে পরিবেশসম্মত কমপ্লায়েন্স না থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি সাত বছর ধরে কমছে।

সাভার চামড়া শিল্পনগরী প্রসঙ্গে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. গোলাম মোয়াজ্জেম ভোরের কাগজকে বলেন, সংসদীয় কমিটি থেকে পরিবেশগত যে জায়গা থেকে বিষয়গুলোর অবতারণা করা হয়েছে, তা যৌক্তিক উদ্বেগের বিষয়। একই সঙ্গে এটাও ঠিক, সংশোধনের ক্ষেত্রে শুধু বন্ধ করে দেয়াটাই সমাধান কিনা তা-ও ভাবতে হবে। কারণ পরিবেশগতভাবে সাভার ট্যানারিকে পরিমার্জন, পরিবর্ধন বা পুনর্গঠন- যা-ই করুক না কেন, সামগ্রিকভাবে চামড়া শিল্পকে কীভাবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উত্তরণ ঘটানো যায়, তা বিবেচনা করা দরকার।

তিনি বলেন, সংসদীয় কমিটি আলোচনাসাপেক্ষে একটি খসড়া তৈরি করে এ বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়কে পরিকল্পনা বা সাজেশন দিতে পারে। শিল্প মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, চামড়া শিল্পমালিকরা যৌথভাবে বিষয়টি নিয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সংশোধন বা পরিমার্জন বা পুনর্গঠন করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ট্যানারি শিল্প বন্ধ করে দেয়া হয়তো পুরো সমস্যাটির সমাধান নিশ্চিত না-ও করতে পারে। বন্ধ করে হয়তো বর্জ্য নিষ্কাশনের পরিমাণ কম হতে পারে, তবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উত্তরণের জন্য যে পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন, সেটা অর্জন করা কখনো সম্ভব হবে না। আমরা মনে করি, পরিবেশগত মানদণ্ডে সাভার শিল্পনগরীর উত্তরণ দরকার এবং সেই আলোকে সামগ্রিক পরিকল্পনা দরকার। এ বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা সংসদীয় কমিটি করতে পারে। এবং এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সার্টিফাইড এজেন্সি লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপকে (এলওজি) আমন্ত্রণ জানাতে পারে এবং তাদের পরামর্শ নিয়ে সাভার শিল্পনগরী পুনর্গঠন করা দরকার। জামালপুরে একটি চামড়া শিল্পনগরী তৈরির কাজ চলছে। সুতরাং সেখানেও চামড়া শিল্প স্থানান্তর হওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন ড. মোয়াজ্জেম।

২০০৩ সালে নেয়া প্রকল্পটির মেয়াদ ১২ দফা বাড়ানোর পাশাপাশি ১৭৫ কোটি টাকার পরিবর্তে ১ হাজার ১৫ কোটি খরচ করা হলেও পরিবেশ দূষণ বন্ধে কমন ক্রোম রিকভারি ইউনিট নির্মাণ সম্পন্ন হয়নি। এছাড়া সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে রিসোর্স জেনারেশনের ব্যবস্থাও রাখা হয়নি বলে মনে করছে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন। প্রকল্পের আওতায় দুই বছরের মধ্যে সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) স্থাপন করার কথা থাকলেও চীনা ঠিকাদারি কোম্পানির খামখেয়ালিপনা ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার কারণে তা শেষ হতে লেগেছে সাত বছরের বেশি। কিন্তু সেই সিইটিপির পরিশোধন ক্ষমতা পিক সিজনে ট্যানারিগুলোর উৎপাদিত বর্জ্যরে মাত্র অর্ধেক। তাই সিইটিপিতে বর্জ্য পুরোপুরি ট্রিটমেন্ট হওয়ার আগেই তা ফেলে দেয়া হচ্ছে। আর ট্যানারির কঠিন বর্জ্য পরিশোধনের কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে দৈনিক ৪০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য উৎপাদন হয়। অথচ যেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা রয়েছে ২৫ হাজার ঘনমিটার। অর্থাৎ দৈনিক ১৫ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য পরিবেশে মিশছে। গত তিন বছরে ১ কোটি ৬৪ লাখ ঘনমিটার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বাইরে থেকে গেছে। এ অবস্থায় গত ২৩ আগস্ট পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে কার্যবিবরণীর ১৪ (ছ) নং সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে না করায় জরুরি ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট আইনের ধারা অনুযায়ী শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিসিক কর্তৃক পরিচালিত ট্যানারি কমপ্লেক্স ‘আপাতত বন্ধ রাখার’ সুপারিশ করা হয়। ভবিষ্যতে আইনের ধারা অনুযায়ী কমপ্লেক্সটি পরিচালিত হলে আবার চালু করার বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে। বন্ধের আগ পর্যন্ত জরিমানার মাধ্যমে সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ আদায়ের সুপারিশ করা হয়। সংসদীয় কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী সাভার ট্যানারি কমপ্লেক্স কেন বন্ধ করা হবে না, তা আগামী ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রেরণের জন্য বিসিক চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করা হয়। গত ৯ সেপ্টেম্বর পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে পাঠানো চিঠির জবাবে ওইদিনই বিসিকের চেয়ারম্যান পরিবেশ অধিদপ্তরে চিঠি পাঠিয়ে জানিয়েছেন, সাভার চামড়া শিল্পনগরীর পরিবেশ নিয়ে চলমান সমস্যা নিরসনে কাজ চলছে। এক্ষেত্রে কোনো ট্যানারির মালিক পরিবেশ দূষণ করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু কোনো অবস্থায়ই সম্ভাবনাময় এ চামড়া শিল্পনগরী বন্ধ করা যাবে না।

সাভারে ট্যানারি পল্লী স্থাপন প্রকল্পটি বাংলাদেশের প্রকল্প অব্যবস্থাপনার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ উল্লেখ করে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, চামড়া শিল্পনগরী করতে বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান নির্বাচনে সরকারের ভুল ছিল। চামড়া শিল্পের সঙ্গে অনেক বিশেষায়িত বিষয় জড়িত, যেগুলো সম্পর্কে বিসিকের কোনো ধারণাই নেই। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব এমন একটি দুর্বল প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়েছে, যার কোনো দক্ষতা নেই। পরবর্তীতে সরকার এ ধরনের কোনো প্রকল্প নিলে তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দক্ষ ও যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে দিতে হবে। তা না করলে এবারের মতোই ভোগান্তি পোহাতে হবে। বিসিক এ ধরনের কাজ করার যোগ্যই নয়। দরকার ছিল ইপিজেড কর্তৃপক্ষের মতো উচ্চ সক্ষমতাসম্পন্ন কোনো প্রতিষ্ঠানকে দেয়া। চামড়া শিল্প খুবই পরিবেশ সংবেদনশীল শিল্প।

শিল্পনগরীটিকে ‘অসম্পূর্ণ’ ও ‘পরিবেশ-অবান্ধব’ আখ্যা দিয়ে প্রকল্পটির মেয়াদ আরো দুই বছর বাড়াতে শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি লিখেছে ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ)। সংগঠনটির সভাপতি মো. শাহীন আহমেদ বলেন, সর্বজনীন (কমন) ক্রোম রিকভারি ইউনিট পরিপূর্ণভাবে নির্মাণ না হওয়া, সিইটিপি কমিশনিং এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রিসোর্স জেনারেশনের ব্যবস্থা না হওয়ার কারণে আমরা প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধ করেছি।

ডি-এফবি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়