দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কতটা স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক হবে?

আগের সংবাদ

শালিশ: ধর্ষণ চেষ্টার শিকার মেয়েটির 'মানহানির' দাম ২৫ হাজার টাকা

পরের সংবাদ

বাংলাদেশের শিক্ষায় নিউ নরমাল লাইফ শুরু হতে যাচ্ছে

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২১ , ১:২৮ পূর্বাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২১ , ১:২৮ পূর্বাহ্ণ

গত রবিবার বাংলাদেশে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেছে। ১৮ মাস এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের পদচিহ্ন পড়েনি, কোলাহল শোনা যায়নি, নীরবে খাঁ খাঁ করেছিল অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আবার কেজি স্কুলের মতো ব্যক্তি পর্যায়ের কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়তো চিরকালের জন্য বিদায় নিয়েছে। এত মাস ওইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারেনি। নতুন করেও আর ঘুরে দাঁড়ানো তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এই ১৮ মাস করোনার নানা উত্থানে বিশ্বব্যাপী মানুষের জীবনকে এমনভাবে পরিবর্তিত করেছে যে এখন আর আগের জীবনে ফিরে যাওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব হচ্ছে না। পৃথিবীর সর্বত্রই নিউ নরমাল লাইফের ধারণা প্রচারিত হচ্ছে। নতুন এই জীবনে স্বাস্থ্যবিধি নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ কারো শারীরিকভাবে ঘেঁষে বসতে পারবে না, চলতে পারবে না। মুখে জনসমাবেশে পরিধান করতে হবে মাস্ক নামক একটি অতিরিক্ত আবরণ, যা তাকে করোনার সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকতে সাহায্য করবে। মাস্ক পরলে আগের মতো চেনা যায় না। তবে এর একটি শারীরিক উপকার ডাক্তাররা দাবি করছেন, যা আগে লাভ করতে মানুষকে চড়া মূল্য দিতে হতো। মাস্ক পরিধান করলে নির্মল বাতাস, নানা ধরনের ভাইরাসমুক্ত শ্বাস-প্রশ্বাস মানুষ গ্রহণ করবে। যার ফলে ইনফ্লুয়েঞ্জা ও হাঁপানি রোগের প্রাদুর্ভাব কমে যেতে বাধ্য। করোনা ভাইরাসের কারণে আমরা স্বাস্থ্যবিধি মানতে মাস্ক পরিধান করেছি। ডাক্তাররা মনে করেন এটি আমাদের আগামী দিনগুলোতেও নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য ব্যবহার করতেই হবে। বিশেষত বাংলাদেশের মতো ঘন জনবসতি দেশে যেখানে বায়ুদূষণ শহরগুলোতে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। সেখানে মাস্ক আমাদের সুরক্ষা দেবেই। গত দেড়-দুই বছরের অভিজ্ঞতা থেকে ডাক্তাররা এখনই বলছেন যে ঢাকা শহরেই এখন ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগী তত বেশি নেই। ফুসফুস ও হাঁপানি রোগের রোগীও আগের মতো ব্যাপক হারে দেখা যায় না। সুতরাং অন্তত বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে করোনার সংক্রমণ চলে গেলেও স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য মাস্ক পরিধানটি আর ছেড়ে দেয়া যাবে না।
এবার আসি শিক্ষার কথায়। রবিবারে দেশের বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই খুলে দেয়া হয়েছে। কয়েকটি জেলায় বন্যা হওয়ার কারণে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা খুলতে পারেনি। সংখ্যাটি শতাধিক হবে। তবে মজার ব্যাপার হলো অনেক শিক্ষার্থীই বই-খাতা হাতে নিয়ে নৌকা বেয়ে নিজেদের স্কুলে এসেছে আগ্রহভরে। তারাও দেশব্যাপী শিক্ষা শুরুর এই উৎসবে যোগ দিতে গিয়েছে। কিন্তু তাদের স্কুলে এখনো বসার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। তাই তাদের কিছুটা মন খারাপ হলেও শিক্ষকদের সঙ্গে তারা দেখা করেছে, বন্ধুদের সঙ্গে মজা করেছে। বোঝা গেছে গোটা দেশে শিক্ষার্থীরা কতটা উন্মুখ হয়ে ছিল এই দিনটির প্রতি। ঢাকা শহর এবং গ্রামেগঞ্জেও যে দৃশ্যটি দেখা গেছে তাতে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও মনের আনন্দে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে এসেছে। অনেকে ক্লাসরুমে একসঙ্গে জাতীয় সংগীত গেয়ে উঠেছে। আবার কোথাও কোথাও নতুন স্বপ্ন জাগানিয়া গানে কণ্ঠ মিলিয়েছে। ঢাকার অনেক স্কুলে বেলুন উড়িয়েছে। ফুল দিয়ে শিক্ষকরা ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের বরণ করেছে। অভিভাবকরাও এসেছেন ছেলেমেয়েদের স্কুলে পৌঁছে দিতে। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই কমবেশি সেজেছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকে আবশ্যকীয় কাজ হিসেবে নিয়েছে, যা আগে কখনো দেশব্যাপী দেখা যায়নি। এবার শিক্ষার্থীরা শিক্ষাঙ্গনে প্রবেশ করতেই সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে হচ্ছে, রুমে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে বসতে হচ্ছে, কেউ কারো সঙ্গে উচ্ছ¡াস প্রকাশ করতে জড়িয়ে ধরছে না। দূরে দাঁড়িয়েই বন্ধুত্বের ভাব প্রকাশ করছে। তাতেই তারা উচ্ছ¡সিত। কেননা এতদিন তারা একাকিত্বে ভুগেছে, খেলার সাথি পায়নি, কথা বলার বন্ধুকেও দেখেনি। যদিও মোবাইলে নিয়মিত কথা বলেছে কিংবা অনলাইনে গেম খেলেছে। কিন্তু ১৮ মাস পর তাদের সশরীরে দেখতে, আবার শিক্ষকদের সঙ্গে কারো কারো হয়তো অনলাইনেই ক্লাস নিতে হতো। এবার সশরীরে মাস্ক পরিহিত ছাত্ররা ক্লাস করছে, একে অপরকে আগের মতো চিনছে না। নতুন করে মাস্ক পরিহিত অবস্থায় চিনে নিতে হচ্ছে। এখন ক্লাসের ধরনও হবে অন্য রকম, পঠন-পাঠনও হবে নতুনভাবে। বিধিনিষেধ যেমন একেবারেই নতুন, পরিবেশটাও অনেকটাই নতুন করে সাজাতে হচ্ছে। এই নতুনভাবে সাজানোটা স্বাস্থ্যসম্মত, বিজ্ঞানসম্মতও। হয়তো আগামী দিনগুলোতে এই নতুন সাজেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অবস্থান করতে হবে। নতুনভাবে মানিয়ে নিতে হবে এমন পরিবেশকে যা কারো কারো কাছে ‘আজব’ মনে হতে পারে কিন্তু এটিই করোনা বাস্তবতায় নতুন জীবনের নিশ্চয়তা বিধান করছে। ১৮ মাস পর শিক্ষার্থীরা এমন এক শিক্ষা জীবনে পা দিল যা তাদের জীবন ও দৃষ্টিভঙ্গিকেও দ্রুত পাল্টে দিতে পারে।
শহরের অভিজাত স্কুলগুলো তুলনামূলকভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষার কার্যক্রম ভালোভাবে শুরু করতে পারছে। গ্রামে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষেই এসব বিধিবিধান অনুসরণ করা খুব সহজ হবে না। তারপরও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও আগের মতো নয়, বর্তমান বাস্তবতায় নতুনভাবে নিজেদের পরিবর্তিত করতে হচ্ছে। এই পরিবর্তন করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বেন ওইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং পরিচালনা পরিষদ। তাদেরই আগে নিউ নরমাল লাইফ বুঝে শিক্ষার ধরন-ধারণ ঠিক করতে হবে। আগামী কয়েকদিন যদি তারা নিয়মগুলোকে যথাযথভাবে অনুসরণ করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিয়ে পাঠদান করাতে পারে তাহলে চ্যালেঞ্জের প্রথম ধাপটি অতিক্রম করা যেতে পারে। যদি তাতে ব্যত্যয় ঘটে তাহলে কোনো কোনো না কোনো সমস্যা বা বিপদও ঘটতে পারে। সেটি যাতে না ঘটতে পারে তার জন্য এখন থেকেই সতর্কতা অবলম্বন করে চলতে হবে। এর পরপরই আসবে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় প্রস্তুত করা। গত দেড় বছর এই শিক্ষার্থীরা নিয়মিত পঠন-পাঠন থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্নতায় ছিল। কোথাও কোথাও একেবারেই বিচ্ছিন্ন ছিল। সুতরাং এদের সাহস ও প্রস্তুত করার মাধ্যমে গড়ে তুলতে হবে আগামী তথা পরবর্তী শ্রেণির জন্য। তবে যে বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে মনে রাখতে হবে তা হচ্ছে সামনে একটা যেনতেন পরীক্ষা নিয়ে নয়, মোটামুটি গ্রহণযোগ্য শিখনফল অর্জনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ওপরে তুলে আনা। কারণ আমাদের এই শিক্ষার্থীরাই নিকট ভবিষ্যতে যে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব তৈরি হতে যাচ্ছে তাতে বড় ধরনের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেই হবে। কারণ সামনে নিউ নরমাল লাইফটা আগের বিদ্যা-বুদ্ধিতে চলবে না। চলবে সম্মুখের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি জ্ঞানের বহুমুখী জ্ঞান ও উৎপাদনশীলতার বিদ্যাচর্চায়। সেই বিদ্যাচর্চার ভিত্তি মোটেও দুর্বল হলে চলবে না, আবার জ্ঞান দক্ষতাবিহীন কোনো সনদ লাভের শিক্ষা দিয়েও সেটি অর্জন করা যাবে না। গত দুই বছর আমরা পৃথিবীতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের গবেষণা, টিকা উদ্ভাবন, করোনার চিকিৎসা পদ্ধতি, নানা ধরনের ভাইরাস নিয়ে গবেষণা ও জ্ঞানচর্চা, অণুজীব, কীটতত্ত্ব, জিনতত্ত্ব, উচ্চ প্রযুক্তিগত শিক্ষা, গবেষণা, জ্ঞান ইত্যাদিকে আত্মস্থ করার যে প্রতিযোগিতা উন্নত দুনিয়ায় চলছে তা আমরা মিডিয়ার কল্যাণে বাংলাদেশে বসেও দেখতে পেয়েছি। আমরা তাকিয়ে আছি উন্নত পৃথিবীতে কখন কোন টিকা বের হচ্ছে তার দিকে, যে টিকা আগে ১৫-২০ বছরেও আবিষ্কার করা যেত না। এখন তা এক বছরের কমেই আবিষ্কৃত হচ্ছে। জেনোম সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে ভাইরাসের রূপান্তরের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নানা ধরনের ল্যাব টেস্ট, ল্যাব তৈরি দুনিয়ার অন্য দেশগুলো করছে। আমাদের দেশের অনেক মেধাবী তরুণ-তরুণী বিদেশের ল্যাবে অংশ নিচ্ছে। কিন্তু দেশে আমরা তেমন কিছুই করতে পারছি না। কারণ আমাদের যে পুরনো জীবন ব্যবস্থা, চিন্তাধারা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং শিক্ষা প্রশাসন তা দিয়ে এসব হবে না। হবে না বলেই তো ১২ তারিখ দেশব্যাপী নতুন সাজে নিউ নরমাল লাইফে পদার্পণ করতে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা বাহ্যিকভাবে পরিচ্ছন্নতার অভিযান পরিচালনা করেছিলাম। এখন প্রয়োজন হচ্ছে নিউ নরমাল লাইফের শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তন। সেটিই আমাদের করতে হবে।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়