জেগে উঠেছে পর্যটনশিল্প

আগের সংবাদ

বাংলাদেশের শিক্ষায় নিউ নরমাল লাইফ শুরু হতে যাচ্ছে

পরের সংবাদ

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কতটা স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক হবে?

ড. ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ

কলাম লেখক ও গবেষক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২১ , ১:২৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২১ , ১:২৭ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশে নির্বাচনী সংস্থা হলো নির্বাচন কমিশন। বিভিন্ন ধরনের নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচন কমিশনকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার বিদ্যমান। তাই সরকার গঠনে নির্দিষ্ট সময় পর পর জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। সংবিধানে নির্বাচন কমিশন গঠনের নির্দেশনা রয়েছে। নির্বাচন কমিশন জাতীয় ও স্থানীয় উভয় ধরনের নির্বাচনই পরিচালনা করে থাকে। বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে সাংবিধানিকভাবে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। সংবিধানের সপ্তম ভাগে ১১৮ থেকে ১২৬নং অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশনের গঠন, কার্যাবলি সম্পর্কে নির্দেশনা রয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে স্থানীয় ও জাতীয় মিলে অনেক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তার মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচনের নজির অনেক। কিন্তু নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচনের ধারাকে মøান করে দিচ্ছে। এ ব্যাপারে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাই বেশি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের চর্চাকে শক্তিশালী করতে নির্বাচন ব্যবস্থা সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা অপরিহার্য। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন রয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ১১ বার জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ অনেক স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়েছে। তবে সবসময় নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে সমস্যাটি নির্বাচন ব্যবস্থার মনে হলেও বিশেষজ্ঞরা মূলত সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছার অভাবকেই এজন্য দায়ী করেন। জনগণ তাদের রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন হলে এবং সরকার আন্তরিক হলে এ অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব বলেও তারা মনে করেন।
সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যতীত নির্বাচন কমিশন অন্যকিছু কল্পনা করতে পারে না। অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ নিশ্চিতে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতাকে খর্ব করে ফেলে এমন কোনো আইন প্রণয়ন সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তি এখন যাই হোক না কেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি নতুন নির্বাচন কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশনে দায়িত্বপ্রাপ্ত নতুন নির্বাচন কমিশনাররা কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৩ জাতিকে উপহার দিতে পারবেন বলে সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা। এই কমিশনের গঠন কী হবে জনগণ সেদিকে তাকিয়ে আছে। তবে কমিশনে অন্ততপক্ষে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিনিধিত্ব থাকা বাঞ্ছনীয়। তা না হলে কমিশন গঠন বিষয়ে জনগণের নানা প্রশ্নের উদ্রেক হবে। অন্যদিকে সরকারও নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কথাই বলছে। নির্বাচন কমিশন স্বাধীন এবং অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দায়িত্ব তাদেরই। নির্বাচন কমিশনের কাজ যে একটি অংশগ্রহণমূলক এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন, তা নিয়ে সরকার, বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং ভোটার কারো মধ্যেই দ্বিমত নেই। তবে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা, দক্ষতা ও যোগ্যতা নিয়ে নানান বিতর্ক আছে। বর্তমান সরকারের মেয়াদে দুটি কমিশনই গঠন হয়েছে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সার্চ কমিটির মাধ্যমে। তবে সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে ‘আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে’ রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নির্বাচন কমিশনে কমিশনার নিয়োগ দেয়ার নির্দেশনা রয়েছে। ২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বে ৫ সদস্যের বর্তমান নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণ করে। তাদের ৫ বছর মেয়াদ আগামী বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি শেষ হবে। আইনানুযায়ী ১৫ ফেব্রুয়ারির আগে রাষ্ট্রপতি নতুন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া শেষ করবেন। কোন পদ্ধতিতে কমিশন গঠিত হবে, তা নিয়ে এখনো রাজনৈতিক মতভেদ রয়েছে। নিরপেক্ষ ও সর্বজন গ্রহণযোগ্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও সদস্যদের নির্বাচন কমিশনে অন্তর্ভুক্তি না হলে এবারো অতীতের মতো রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয়ার আশঙ্কা করছেন পর্যবেক্ষকরা।
তবে নতুন যে কমিশন গঠন করা হবে এর গ্রহণযোগ্যতা এবং নিরপেক্ষতার বিষয়ে অন্যান্য বিরোধী দলকেও পাশে চায় বিএনপি। ইতোমধ্যে দলের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এছাড়া নতুন ইসির বিষয়ে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছে। বিএনপির এই প্রক্রিয়ায় কয়েকটি দল ইতোমধ্যে সাড়া দিয়েছে বলে জানা গেছে। সরকার নিজে নিজে সার্চ কমিটি করলে সেটা মানা হবে না বলে বিএনপির অভিমত পাওয়া যায়। স্বাধীন একটি নির্বাচন কমিশন গঠন এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০২৩ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন দাবি আদায়ের লক্ষ্যে কোনো ছাড় দেবে না বিএনপি। ফেব্রুয়ারিতে শেষ হওয়া নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে সামনে রেখে উদ্যোগী হয়েছে দলটি। সার্চ কমিটি গঠনেও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় রাখার চেষ্টা চলছে। এ ইস্যুতে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কীভাবে মতৈক্যে পৌঁছে আন্দোলন করা যায় সে চিন্তা ও প্রস্তুতি চলছে বলে জানা যায়।
আগামী ২০২৩ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটারদের নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছা নিশ্চিত করতে হবে। ভোট দেয়ার পরও ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেন্দ্রের ভেতরে-বাইরে এবং আশপাশে থাকতে হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সম্মিলিতভাবে। প্রয়োজনে সেনাবাহিনীকে নির্বাহী ক্ষমতা দিয়ে ভোটকেন্দ্রে নিয়োজিত করা যেতে পারে। কারণ সেনাবাহিনীর প্রতি জনগণসহ সব দলের যথেষ্ট আস্থা ও বিশ্বাস রয়েছে। ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের কারণে ভোট বঞ্চিতরা তাদের কেন্দ্র ও ভোটার নম্বর উল্লেখসহ জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি আলাদাভাবে যেন অভিযোগ জানাতে পারে সে বিষয়ে জেলা প্রশাসক (রিটার্নিং অফিসার) আলাদা একটি শক্তিশালী নির্বাচনী অভিযোগ সেল গঠন করা যেতে পারে। অভিযোগ সেল অভিযোগের সত্যতা পেলে তাৎক্ষণিকভাবে নির্বাচন কেন্দ্র বাতিল ঘোষণা করে পুনরায় নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে। প্রয়োজনে অভিযোগ নিষ্পত্তিতে বিচার বিভাগকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। গণতান্ত্রিক দেশে জনগণই সব ক্ষমতা উৎস। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাস্তবে রূপদানের জন্য একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পুরো ভোটগ্রহণ ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) সম্পন্ন করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ বছরই কেনা হচ্ছে আরো প্রায় ৩৫ হাজার ইভিএম মেশিন। ইসির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানান, আগামীতে সব নির্বাচনেই ইভিএম ব্যবহারের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। বর্তমানে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এই যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। ইভিএম পরিচালনা ও প্রশিক্ষণ বিরাট একটি কৌশলগত কারিগরি বিষয়। এটি পরিচালনার জন্য নির্বাচন কমিশনের দক্ষ টিমের অভাব রয়েছে। নেই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষকও। এক্ষেত্রে কমিশনের পরিকল্পনা হচ্ছে স্কুল, কলেজের দক্ষ কারিগরি শিক্ষকদের প্রশিক্ষক হিসেবে গড়ে তোলার। তারাই যাতে নির্বাচনের আগে মাঠ পর্যায়ে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দিতে পারে।
ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দলীয় কার্যনির্বাহী সভায় সব নেতাকর্মীকে নির্বাচনী প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। অন্যান্য দলের অবস্থা অনেকটা দৃশ্যপটের অন্তরালে আছে। তবে নির্বাচন কমিশন কতটা সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে, সরকারের প্রশাসনের ভূমিকা কেমন হবে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মহল কী ভূমিকা পালন করবেন সর্বোপরি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সুষ্ঠু ও সুন্দর ভোটের পরিবেশ থাকবে কি-না তা মূলত অনেকখানি নির্ভর করে সরকারের আন্তরিকতা এবং সব রাজনৈতিক দলের সদিচ্ছার ওপর। পরিশেষে আমরা সাধারণ জনগণ প্রত্যাশা করি সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশনের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে ২০২৩ সালে উৎসবমুখর পরিবেশে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। জনগণের রায়ের প্রতিফলন ঘটবে এবং সর্বোপরি বাংলাদেশে গণতন্ত্রের জয়যাত্রা অব্যাহত থাকবে।

ড. ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ : কলাম লেখক ও গবেষক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়