আত্মহত্যা রোধ ও আমাদের করণীয়

আগের সংবাদ

সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে এগিয়ে চলছে কমিউনিটি ব্যাংক

পরের সংবাদ

একাত্তরের বোরকাপরা নারী ও ধর্মদ্রোহের পশ্চিমা শিক্ষা

ড. এম এ মোমেন

সাবেক সরকারি চাকুরে, নন-ফিকশন ও কলাম লেখক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১১, ২০২১ , ১:১১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১১, ২০২১ , ১:১১ পূর্বাহ্ণ

একাত্তরের বোরকাপরা নারী

ঢাকা থেকে পাঠানো ডেইলি টেলিগ্রাফের প্রতিনিধি ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থের একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন ১৭ আগস্ট ১৯৭১ প্রকাশিত হয়। সংবাদটির শিরোনাম : ‘বোরকাপরা মেয়েরা সশস্ত্র গেরিলাদের সহায়তায়’।
ভারী বোরকায় আচ্ছাদিত নারীরা পূর্ব পাকিস্তানের ভেতর সক্রিয় মুক্তিফৌজের জন্য অস্ত্র চোরাচালানে ক্রমেই আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে শুরু করেছেন।
কিছু কিছু গেরিলা অপারেশনে তাদের ভূমিকা মুখ্য যেখানে মাইন, গ্রেনেড কিংবা বোমা পরিবহন করে শহরে কোনো স্থানে লুকিয়ে রাখতে হয়।
অস্ত্র পরিবহনে বোরকাপরা নারী সম্পূর্ণ নিরাপদ কারণ সেনাবাহিনী কিংবা পুলিশ তাদের স্পর্শ করার কথা ভাবতেই পারে না। এমনকি বাসে-ট্রেনে নারী তল্লাশকারীরাও তাদের ছেড়ে দেয়, যদিও ইউরোপীয় কোনো নারী পেলে অস্ত্রের সন্ধানে সারা শরীরে তালাশ করে। মর্যাদার প্রতীক হিসেবে অনেক নিম্ন মধ্যবিত্ত নারী বোরকা পরেন, তারা স্থূলদেহী, দেখেই বোঝা যায় তারা মাঠে কাজ করেন না। কালো পোশাকে আপাদমস্তক ঢাকা, মাথার দিকে হুড, মুখের সামনে ঘোমটা দেখে মনে হয় কালো কিছু ধীরে ধীরে চলছে। তাদের কেউ কেউ বহন করছে মারণাস্ত্র।

বাজার থেকে বাজারে
আগ্রহী তরুণী শিক্ষার্থী যারা মুক্তিফৌজের সঙ্গে কাজ করছে, তারাও নিরাপদ, শরীরে গোলাবারুদ বাঁধা, ঝুড়িতে মাইন, তাদের মুখমণ্ডল দূরে থাক কেউ তাদের পায়ের গোড়ালিও দেখতে পায় না।
সাধারণত সীমান্তের ওপার থেকে পুরুষরা অস্ত্র নিয়ে নিকটবর্তী কোনো গ্রাম্য বাজারে হাজির হন, সেখান থেকে ভারী বোরকায় আবৃত মেয়েরা তা পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশ্যে গমন করে।
১৯৭১ সালে বিদেশি পত্রিকায় প্রকাশিত এ ধরনের কিছু টুকরো খবর পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির একটি কোলাজচিত্র তুলে ধরে। এমন কিছু সংবাদ ভাষান্তর করে প্রয়োজনীয় টীকাসহ উপস্থাপন করা হচ্ছে।
৬ মে ১৯৭১ নিউইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত একটি সংবাদ শিরোনাম :
বিদেশি সংবাদ প্রতিবেদনের সমালোচনায় পাকিস্তান
করাচি, পাকিস্তান ৫ মে
পাকিস্তান সরকারের একজন মুখপাত্র গতকাল বলেছেন সেন্সরশিপ বহাল থাকার কারণে সাংবাদিকদের যে অসুবিধে হচ্ছে সে জন্য সরকার দুঃখ প্রকাশ করেছে। তবে পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাবলি নিয়ে বিদেশে যেসব প্রতিবেদন প্রকাশ করা হচ্ছে মুখপাত্র তার তীব্র সমালোচনা করেন।
পাকিস্তান মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের পরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আকবর খান বলেছেন তিনি মনে করেন বিদেশি সাংবাদিকদের অনেক প্রতিবেদনে প্রকৃত সত্যের বিকৃতি ঘটানো হয়েছে এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিস্ময়কর ঐতিহ্যের ওপর কালিমা লেপন করা হয়েছে।
২৬ মার্চ থেকে পূর্ব পাকিস্তানি বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং জাতীয় সেনাবাহিনীর মধ্যে তীব্র লড়াই শুরু হয়েছে। বিদেশি সাংবাদিকদের নোটবই এবং তাদের তোলা ছবির ফিল্ম ছিনিয়ে নিয়ে তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে।
এখন থেকে সাংবাদিকরা পূর্ব পাকিস্তানের ভারতীয় সীমান্তপথে ভেতরে প্রবেশ করছে। পাকিস্তান সরকারের অনুমতিপ্রাপ্ত ছয়জন সাংবাদিক আগামীকাল উড়োজাহাজে পূর্ব পাকিস্তান গমন করবেন।

পশ্চিমের শিক্ষায় ধর্মদ্রোহিতা : পাকিস্তান আর্মি
আওয়ামী লীগের স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনকে গুঁড়িয়ে দিতে ২৫ মার্চ বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল, বিদেশি সাংবাদিকদের বহিষ্কার করল। সরকারের প্রতিনিধির সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তান সফরের জন্য ৬ জন বিদেশি সাংবাদিককে পূর্ব পাকিস্তান সফরের অনুমতি দেয়া হয়েছিল। তাদের একজন ম্যালকম ডব্লিউ ব্রাউন ১১ মে নিউইয়র্ক টাইমস-এ যে ডেসপাচটি পাঠান তা ১৩ মে প্রকাশিত হয়। সেটি অনূদিত হলো :
ঢাকা, পাকিস্তান ১১ মে : পশ্চিমা ধাঁচের শিক্ষার বিরুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যুদ্ধ ঘোষণা করেছে; তারা মনে করে এই শিক্ষাই ধর্মদ্রোহিতা ও নাস্তিকতার কারণ, এই শিক্ষার কারণেই রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে তারা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে, তাদের নৈতিক অবক্ষয় ঘটে। স্বাভাবিক অবস্থায় শিক্ষা নিয়ে সেনাবাহিনী কী ভাবল তা নিয়ে পাকিস্তানি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং ফ্যাকাল্টির উদ্বিগ্ন হবার কারণ থাকার কথা নয়। কিন্তু ২৫ মার্চ সেনাবাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দিয়েছে। যাদের সাক্ষ্য বিশ্বাসযোগ্য মনে করা যেতে পারে যাদের ভাষ্য অনুযায়ী নিহত ছাত্রের সংখ্যা একশত থেকে পাঁচশত। সৈন্যরা সরকারবিরোধী সুনির্দিষ্ট ক’জন শিক্ষক ও ছাত্রের সন্ধান করেছে; পুরো বাড়ি ধ্বংস করেছে এবং পরিবারের সব সদস্যকে গুলি করে হত্যা করেছে।
নিহত শিক্ষকের সংখ্যা বিশ্বস্ত সূত্র অনুযায়ী ১৪ জন, তাদের মধ্যে রয়েছেন ডক্টর জি সি দেব, একজন সহকর্মীর মতে তিনি হিন্দু ধর্মাবলম্বী একজন পাণ্ডিত্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, তার কাজ যুক্তরাষ্ট্রেও সমাদৃত।
আরো যেসব ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর সঙ্গে তুলনায় এই সংখ্যাটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। সম্ভবত শত-সহস্র মানুষ তারা হত্যা করেছে এবং এই হত্যা ও ধ্বংস অব্যাহত রয়েছে। যেমন আদেশ দিয়েছে রেলওয়ে ট্রাকের দু’পাশের বাড়িঘর সরিয়ে ফেলতে হবে। ঢাকা থেকে উত্তরে ময়মনসিংহ পর্যন্ত ৯০ মাইল পথের দু’ধারের ৩০ হাজার পরিবারকে বাড়িঘর ভাঙতে হয়েছে, একটার পর একটা ইট সরিয়ে নিতে হয়েছে, তারা এখন যোগ দিয়েছে বাস্তুহারার দলে।
এই সেনাবাহিনী যাদের সদস্যরা পশ্চিম পাকিস্তানি, আসলে তারা শত্রæদেশে অবরুদ্ধ, তারাও আক্রমণ ও নাশকতার শিকার হচ্ছে। তারা মনে করেছে রেললাইনের দু’পাশ থেকে ঘরবাড়ি সরিয়ে সংকট কমিয়ে ফেলেছে। কিন্তু বিশ্লেষকরা তাদের একটি ভয়ংকর সামরিক দৃষ্টিভঙ্গির আভাস দেখতে পাচ্ছেন।

পড়াশোনার ভবিষ্যৎ নেই
একজন অধ্যাপক বললেন, ‘পাকিস্তানে পড়াশোনা ও শিক্ষার কোনো ভবিষ্যৎ নেই। সেনাবাহিনী যে দণ্ড হাতে নিয়েছে তাতে পিটিয়ে শিক্ষাকেই হত্যা করবে। আমার নিজের ব্যাপারে বলছি, আমার পাকিস্তান ছেড়ে যাওয়াই ভালো।’
সেনাবাহিনীর একজন মেজর বললেন, ‘আমাদের এটা বিবেচনা করতে হবে এক প্রজন্মের ছাত্রদের সকলেই নষ্ট হয়ে গেছে, ঢিলেঢালা শাসন এবং বাবা-মার প্রশ্রয়ে তারা বখে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে মদ্যপানের কথা আর ধর্ষণের কথা কখনো শুনেছেন- মুসলমান সমাজে এমন কখনো ঘটতে পারে না। তিনি বললেন, ‘এ ধরনের মানুষের পর্যন্ত দুর্বৃত্ত হওয়া অনিবার্য। তারা হাতে অস্ত্র নেয় এবং আমাদের গুলিতে নিহত হয়।’
‘পুরনো পদ্ধতিতে ফিরে গিয়ে নতুন প্রজন্মকে কঠোর ইসলামি কানুনে লালন করতে হয়। অনেকে ভুলে গেছে যে, পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টিই হয়েছে মুসলমানদের হোমল্যান্ড হিসেবে। আমরা যখন এই ধারণা থেকে সরে যাই আমরা দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে পড়ি।’ ক’জন মুসলমান সেনাকর্মকর্তা জোর দিয়ে বললেন, পাকিস্তানি মহিলাদের অবশ্যই হিজাব পরতে হবে এবং ব্যাংকের সুদ নিষিদ্ধ করতে হবে।

মূল্যবোধের প্রশ্ন
মার্চের সহিংস ঘটনার বিরোধিতা করে সেনা প্রতিরোধে অংশ নেয়নি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন একজন রক্ষণশীল ছাত্র বলল, এটা মানতে হবে সেনাবাহিনীর একটি কথা ঠিক- ‘এটা অবশ্যই সত্য পাকিস্তান একটি ধর্মভিত্তিক দেশ। ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ নয়, আধ্যাত্মিক মূল্যবোধই প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।’ কিন্তু ট্র্যাজেডি হচ্ছে সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা অফিসাররা বুদ্ধিবৃত্তিবিরোধী প্রবক্তা হয়ে উঠেন। অধঃপতিত এই দেশের গৌরব ফিরিয়ে আনতে না পারলে তাদের দমানো যাবে না। পাকিস্তান মহাকাব্যের কবিদের জন্য চমৎকার, কিন্তু প্রকৌশলী ও আমার মতো বাস্তববাদী মানুষের জন্য এটা নরক। সেনাবাহিনীর বুদ্ধিবৃত্তিবিরোধী অবস্থান অর্থনীতি পর্যন্ত বিস্তৃত- সেখানে বাস্তবতা হচ্ছে পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে দেওলিয়া হয়ে পড়লেও সেখানে জাতির গর্ব হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে সংযুক্ত ইসলামিক জাতি।
একজন ব্যবসায়ী বললেন, আমাদের অর্থনৈতিক সমস্যা বাড়তেই থাকবে- এক সময় আমাদের জেনারেলরা আবিষ্কার করবেন যে আমাদের মানুষ না খেয়ে আছে এবং আমাদের টাকা দেশের বাইরে কোথাও চলছে না। সেই জায়গায় পৌঁছলে আমরা যুদ্ধ ঘোষণা করব সম্ভবত ভারতের বিরুদ্ধে আমরা সেখানে পৌঁছে গেছি; এবং আমাদের মহান আত্মিক আলো আমাদের দারিদ্র্য ও পশ্চাৎপদতাকে ডুবিয়ে দিতে পারবে না। তিনি বললেন, যাই ঘটুক তা দেখার জন্য আমি আর অপেক্ষা করতে চাই না।

ট্যাংক যখন কথা কেড়ে নেয়
২৭ মার্চ যখন ৩৫ জন সাংবাদিককে ঢাকা থেকে বহিষ্কার করা হয় তাদের একজন ছিলেন হাওয়ার্ড হুইটেন। তিনি এএপি-রয়টারের সংবাদদাতা। প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তার দাখিল করা একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন ২৯ মার্চ ১৯৭১ অস্ট্রেলিয়ার ‘দ্য এজ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
গত রাতে আধঘণ্টার নোটিসে পশ্চিমের অন্য সাংবাদিকদের সঙ্গে আর্মি ট্রাকে উঠিয়ে ঢাকা থেকে বের করে দেয়া হয়। আমরা বৃহস্পতিবার (২৫ মার্চ) থেকেই হোটেলে আবদ্ধ অবস্থায় আছি, সেদিন আর্মি নামল পূর্ব পাকিস্তানি নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের রাষ্ট্র ভাঙার প্রচেষ্টা গুঁড়িয়ে দেবে। আমাদের অবলম্বন যা কিছু ছিল স্যুটকেসে ভরে আমাদের সেনা কনভয়ে তুলে জনশূন্য এয়ারপোর্ট রোড ধরে আগুনে জ¦লতে থাকা দোকান এবং সাধারণ মানুষের বানানো ব্যারিকেড ভেঙে এগোলো।
প্রত্যেককেই এয়ারপোর্টে তন্নতন্ন করে তল্লাশি করা হলো, সৈন্যরা আমাদের ফিল্ম, টেপ এবং নোট বইগুলোও ছিনিয়ে নিল। ঢাকায় সম্পূর্ণ সেন্সরশিপ থাকার কারণে আমি এখন পর্যন্ত ক্র্যাকডাউন সম্পর্কে কিছু বলতে পারছি না। শেখ মুজিবের অসহযোগ আন্দোলন তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সরকার শিক্ষা এবং ব্যবসা-বাণিজ্য অচল করে দিয়েছে।
শুক্রবার ঢাকার আকাশ কালো ধোঁয়ার কুণ্ডুলিতে ছেয়ে ছিল, শেখ মুজিবের অনুসারীদের ওপর আচমকা আক্রমণ চালানোর ১৮ ঘণ্টা পরও ক্ষণে ক্ষণে অটোমেটিক রাইফেলের গুলির শব্দ রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে দিচ্ছে।
পাকিস্তানি সেনা শাসকরা যে দরকষাকষি করা রাজনীতিবিদদের নিয়ে অধৈর্য হয়ে পড়েছে তার প্রথম প্রমাণ হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের ভেতর আকস্মিক সেনা সমারোহ, এখানেই বিদেশি সাংবাদিকরা অবস্থান করছিলেন।
একজন ক্যাপ্টেন আদেশ করলেন, কেউ বেরোতে পারবে না, বেরোলে গুলি করা হবে। সৈন্যরা জমায়েত হয়ে বাংলাদেশের একটি অতিকায় পতাকাতে আগুন ধরিয়ে দিল। হোটেলের কর্মচারীরা ১২ ঘণ্টা আগে পতাকাটি উঠিয়েছিল। ততক্ষণে গুজব রটে গেল, ১১ দিন এখানে থেকে সংকট মেটাবার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকা ছেড়ে চলে গেছেন। তার বাড়িতে (প্রেসিডেন্টস হাউস) ফোন করা হলে তা নিরুত্তর বয়ে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে সব ফোন এবং টেলিগ্রাম ডেড হয়ে যায়। হোটেলের সামনে দিয়ে অল্প আলোতে সেনা কনভয় চলতে দেখা যায়। রাত একটার দিকে শেখ মুজিবের বাড়িতে ফোন করা হলে তিনি সেখানে আছেন বলে জানা যায়, কিন্তু এক ঘণ্টা পর বোঝা যায় লাইন ডেড হয়ে গেছে। রিকয়েললেস রাইফেলের গুলির সঙ্গে সঙ্গে বিচ্ছিন্ন পিস্তলের গুলির শব্দ শোনা যায়।
আগুন দিগন্ত আলোকিত করে তোলে। হোটেলের কাছে জঙ্গি বাঙালিদের জাতীয়তাবাদী পত্রিকা ‘দ্য পিপল’ অফিস আগুনে জ¦লতে থাকে। এমনকি তার চেয়ে অনেক বড় আগুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলের দিকে, আলোতে এয়ারপোর্টও দেখা যায়। ট্রাকভর্তি সৈন্য যখন এদিক-ওদিক যাচ্ছে প্যাটন ট্যাংকের শব্দ তখন রাস্তার ওপর, বুলেটের আগুনের বিচ্ছুরণ আকাশে মিলিয়ে যায়।

বাংলায় গণহত্যা
এক্সপ্রেসেন স্টকহোম ১ এপ্রিল ১৯৭১
শেখ মুজিবুর রহমানকে যে বন্দি করা হয়েছে তা প্রমাণ করতে পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষ একটি আলোকচিত্র অবমুক্ত করেছে। তাঁর বন্দিদশার ছবিটি দেখিয়ে সামরিক সরকার পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মনোবল ভেঙে দিতে চায়। প্রশ্ন, ছবিটি আগে ছাড়া হলো না কেন? কোন তারিখের ছবি তা-ই বা উল্লেখ করা হয়নি কেন? তারা শেখ মুজিবুর রহমানকে কেন দেখাচ্ছে না?
তবে এটা স্পষ্ট, ইয়াহিয়া খানের শাসন যে কোনো মূল্যে তাঁর (শেখ মুজিব) শহীদ হওয়ার সুযোগ প্রতিহত করতে চাইবে। প্রশ্ন হচ্ছে কারাবন্দি শেখ মুজিবকে দেখার যে অনুভূতি পূর্ব পাকিস্তানে জন্মাবে, তা কি পরিস্থিতি পাল্টে দেবে? তাঁকে নিয়ে কিংবা তাঁকে ছাড়া (বন্দিদশায় রেখে) যে অবস্থায়ই হোক না কেন, পূর্ব পাকিস্তানের আর পিছু হটার পথ নেই।
সত্য গোপন করার জন্য সামরিক সরকারের সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আমরা এখন জানি পূর্ব পাকিস্তানে কী ঘটছে। শরণার্থীরা ব্যাপক গোলাবর্ষণ, বেপরোয়া ধ্বংসযজ্ঞ এবং গণহত্যার সাক্ষ্য দিয়েছে।
শত-সহস্র মানুষ তাদের ঘর ছেড়ে পালাচ্ছে। ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষ হানা দিয়েছে। পাকিস্তানের ঐক্য অটুট রাখতেই হবে- এই প্রণোদনার নামে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রতি শক্রতার অস্ত্র প্রয়োগ করা হচ্ছে। দেশের প্রথম সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফল ভণ্ডুল করে দেয়ার পর জন্য সামরিকজান্তা সহিংস শক্তি প্রয়োগ করে চলেছে। সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল হজম করার প্রস্তুতি পাকিস্তানি শাসকদের ছিল না- উল্টো সামরিক বাহিনী লেলিয়ে দিয়েছে। এটা স্পষ্ট, এই পদ্ধতিতে কখনোই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের পুনর্মিলন ঘটানো সম্ভব হবে না। নির্মমভাবে অধিকার প্রতিষ্ঠা অথবা যুদ্ধ- এছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। এই নীতি অনুসরণের জন্য অবশ্যই নিন্দা জ্ঞাপন করতে হবে।
ড. এম এ মোমেন : সাবেক সরকারি চাকুরে, নন-ফিকশন ও কলাম লেখক।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়