স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দেবে না

আগের সংবাদ

রেল হাসপাতাল আধুনিকায়ন হবে কখন?

পরের সংবাদ

‘আফগানিস্তান’ বুদ্ধিজীবীদের বেশ মুসিবতে ফেলেছে!

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১০, ২০২১ , ১:০৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১০, ২০২১ , ১:০৯ পূর্বাহ্ণ
ড.-রাহমান-নাসির-উদ্দিন

আফগানিস্তানের দীর্ঘ বছরের প্রচলিত রীতি হচ্ছে, যেই কাবুল দখল করবে সেই আফগানিস্তানের সরকার। ফলে মাত্র দুদিন আগে আফগানিস্তানের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হলেও তালেবানরা যেদিন কাবুল দখল করেছিল, সেদিন থেকে আফগানিস্তানের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব তালেবানের। কিন্তু তালেবানরা যখন থেকেই কাবুল দখল করে আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তখন থেকেই আমি অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে লক্ষ করছি যে, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা এবং ধর্মনিরপেক্ষতাকে কীভাবে একটা বুদ্ধিবৃত্তিক বোঝাপড়ার ভেতর দিয়ে আফগানিস্তানের রাজনৈতিক ও ক্ষমতার পট পরিবর্তন ব্যাখ্যা করা যায়, তা নিয়ে বুদ্ধিজীবীরা বেশ মুসিবতের মধ্যে আছে। সে মুসিবতের নানান রূপ আছে। তালেবানদের অন্ধ পক্ষ নিলেও বিপদ আছে কেননা সেটা উগ্র সাম্প্রদায়িকতা এবং গোঁড়া মোল্লাতন্ত্রের সমার্থক হয়ে যায়। আবার মার্কিন বাহিনীকে বিতাড়িত করে ২০ বছরের মার্কিন আধিপত্য এবং দখলদারিত্ব থেকে আফগানিস্তানকে মুক্ত করার জন্য তালেবানদের বাহাদুরির খানিকটা তারিফ না করলেও ‘বুদ্ধিজীবী বুদ্ধিজীবী’ ভাবটা আসে না। এ রকম একটি দ্বৈত চিন্তার মাঝামাঝি কীভাবে বুদ্ধিজীবীরা একটা সচেতন বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান গ্রহণ করছেন সেটা আমি অত্যন্ত সচেতনভাবে উপলব্ধির চেষ্টা করছি। তার কিছু পর্যবেক্ষণ এখানে পেশ করছি।
সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের অভিজ্ঞতা আফগানদের বহু পুরনো। ব্রিটিশ উপনিবেশ এবং দখলদারিত্বের অভিজ্ঞতা আফগানদের আছে। ১৯১৯ তৃতীয় অ্যাংলো-আফগান যুদ্ধের সূত্র ধরে ১৯২১ সালে আফগানিস্তানের ওপর ব্রিটিশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম অ্যাংলো-আফগান যুদ্ধ হয়েছিল ১৮৩৯-১৮৪২ সালে এবং দ্বিতীয় অ্যাংলো-আফগান যুদ্ধ হয় ১৮৭৮-১৮৮০ সালে। কিন্তু চূড়ান্তভাবে ভারতীয় উপমহাদেশে ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বর্ধিত অংশ হিসেবে আফগানিস্তানে ব্রিটিশ দখলদারিত্ব জায়েজ হয় ১৯২১ সালে প্রধানত রাশিয়ার কর্তৃত্ব কমানোর বাসনায়। ব্রিটিশের পর পৃথিবীর আরেক পরাশক্তি রুশ দখলদারিত্বের অভিজ্ঞতাও আফগানদের আছে। রাশিয়া আফগানিস্তান দখল করে ১৯৭৯ সালে এবং প্রায় ৯ বছর (ডিসেম্বর ১৯৭৯-ফেব্রুয়ারি ১৯৮৯) যুদ্ধ চলে আফগান মুজাহিদিনের সঙ্গে। অবশেষে মুজাহিদিনের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সোভিয়েত সৈন্যরা আফগানিস্তান ত্যাগ করে। আর সোভিয়েত আধিপত্য থেকে আফগানিস্তানকে বের করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই মুজাহিদিনদের অর্থ, অস্ত্র এবং প্রণোদনা জুগিয়েছে। এটা এজন্য নয় যে, এর মধ্যে আফগানদের জন্য মার্কিন দরদ আছে; বরঞ্চ সোভিয়েত রাশিয়াকে পরাজিত করার কূটকৌশলই ছিল মূল মতলব। এরপর অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে ক্ষমতার নানান হাত বদল হয়ে আফগান মুজাহিদিনের হাতে ক্ষমতা থাকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। তারপর তালেবানরা আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করে ২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে একটা উগ্র-ধর্মান্ধ নীতি নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করে। ওসামা বিন লাদেন ছিলেন তালেবানের মূল নেতা। এখানে আমেরিকা এবং রাশিয়ার পারস্পরিক ক্ষমতা বলয়ের দ্ব›েদ্ব আমেরিকা এবং রাশিয়াই আফগানিস্তানে নানান ধরনের মুজাহিদিন, তালেবান, মোল্লাতন্ত্র কিংবা ধর্মীয় জঙ্গিবাদের চাষ করেছে। পরবর্তীতে নিজেদের কাজ ফুরিয়ে গেলে তাদের ছুড়ে ফেলেছে। মাঝখান দিয়ে অবর্ণনীয় কষ্ট এবং যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে আফগানিস্তানের জনগণকে। যুদ্ধের পর যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় ধ্বংস হয়েছে আফগানিস্তান। প্রাণ দিতে হয়েছে লাখ লাখ মানুষকে। ফলে তালেবানদের জঙ্গি দখলদারিত্বও আফগানিস্তানের জনগণ হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। কিন্তু সর্বশেষ ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখে আমেরিকার টুইন টাওয়ারে হামলার হাত ধরে ‘ওয়ার অন টেররিজম’ ডক্ট্রিনের নগদ প্রতিফল হিসাবে আফগানিস্তান নতুন করে মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনীর দখলদারিত্বে চলে যায়। এরপর চলে গেছে প্রায় ২০ বছর। এ ২০ বছরের ইতিহাস নানান হত্যা, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, বোমাবাজি এবং নানান দ্ব›দ্ব-সংঘাতে পরিপূর্ণ। আফগানিস্তানের জনগণ একদিকে যেমন প্রতিরক্ষার নামে বৈদেশিক দখলদারিত্বকে মন থেকে মেনে নিতে পারছিল না, আবার অন্যদিকে ২০ বছর আগের তালেবানি শাসনের উগ্রতাকেও ভয়ের চোখে দেখছিল। এছাড়া আফগানিস্তারের ৩৪টি প্রদেশের কয়েকটিতে স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব স্থানীয় কিছু মিলিশিয়া গ্রুপ একাধারে তারা তালেবানের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে আবার মার্কিন দখলদারিত্বের বিরুদ্ধেও লড়াই। সাধারণ আফগানরা এসব স্থানীয় মিলিশিয়া গ্রুপগুলোকেই নানানভাবে সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা ও নৈতিক সমর্থন দিয়েছে। আর সাধারণ জনগণের এ নৈতিক সমর্থন ও সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতাই প্রমাণ করে যে, আফগানিস্তানের আম-জনতা মার্কিন দখলদারিত্বও চায় না; আবার তালেবানের চরমপন্থি মৌলবাদী মোল্লাতন্ত্র ও ধর্মীয় উগ্রপন্থার শাসনও চায় না। তথাপি এ রকম একটি ‘সদা-যুদ্ধ’ অবস্থায় আফগান জনগণের কাছে ‘মন্দের ভালো’ হিসেবে তালেবানদের নয়া দখলদারিত্বকে মেনে নেয়া ছাড়া তেমন কোনো বিকল্প ছিল না। যারই ধারাবাহিকতায় কাবুল আজকে তালেবান সরকার। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ তালেবান কি ২০ বছর আগের তালেবান? নাকি এর মধ্যে কিছুটা রূপান্তর ঘটেছে যার কারণে রাষ্ট্র পরিচালনায় তালেবানরা খানিকটা উদার নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবাধিকারের প্রশ্নকে সামনে এনে রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন নীতি গ্রহণ করবে? নাকি সেই পুরনো ধাঁচে ২০ বছর আগের মডেল ২০ বছর পরে নতুন করে প্রয়োগ করবে এবং আফগানিস্তানকে পুনরায় ২০ বছর পেছনে ঠেলে দেবে। এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে আরো খানিকটা সময় লাগবে। তথাপি ‘প্রভাতই দিনের চেহারা প্রতিভাত করে’- বলে একটা প্রবাদ আছে। ইতোমধ্যে তালেবানদের মুখপত্র মিডিয়ায় তালেবানের রাষ্ট্র পরিচালনায় যৎকিঞ্চিত ইশারা দিয়েছেন, তাতে মনে হচ্ছে না, গোঁড়া ও উগ্র তালেবানি চরিত্র থেকে বর্তমান ‘তালেবান’ সরকার খুব একটা সরে আসছে। কেননা ‘আকেলমানকে লিয়ে ইশারাই কাফি’। ইতোমধ্যে নারী ক্রিকেট আফগানিস্তানে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সরকার গঠনের ধরনে গোঁড়া এবং উগ্র ভাবাপন্ন লোকদেরই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে, যদিও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী একজন উদারনৈতিক নেতা হিসেবে পরিচিত। এ রকম একটি অবস্থায় আফগানিস্তানের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বাংলাদেশের তো বটেই বিশ্বের অনেক নামজাদা রাজনৈতিক বিশ্লেষকের জন্য খানিকটা মুশকিল করে তুলেছে।
এটার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে, মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারকে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা বেশ ইতিবাচক হিসেবে দেখছে, কেননা এর মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানের মার্কিন দখলদারিত্বের সমাপ্তি ঘটল। এসব বুদ্ধিজীবীর একটি অন্যতম প্রধান বৌদ্ধিক অবস্থান হচ্ছে ‘মার্কিন বিরোধিতা’। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদি নীতির বিরোধিতা করার দার্শনিক জায়গা থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর যে কোনো ধরনের পিছু হটা, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চিন্তার জন্য ইতিবাচক খবর নিঃসন্দেহে। সেই রাজনৈতিক ও দার্শনিক জায়গা থেকে বুদ্ধিজীবীরা মার্কিন সৈন্যের কাবুল ত্যাগের রাজনৈতিক ফল নিজেদের বুদ্ধিজীবীতার গোলায় নিচ্ছে। কিন্তু তালেবানের কাবুল দখলকে কী সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মুক্তিকামী মানুষের আন্দোলনের প্রতিফল হিসেবে সমর্থন করা যায় কিনা, তা নিয়ে বুদ্ধিজীবীরা পড়েছে বিরাট বিপদে! কেননা তালেবানদের মুক্তি সংগ্রামী বলা এবং মানুষের জন্য মুক্তির আশা নিয়ে আসছে এটা বলা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এর কারণ হচ্ছে, তালেবানদের যে রাষ্ট্রদর্শন, সমাজনীতি, শিক্ষা-দর্শন, সমাজের নারী-পুরুষের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এবং রাজনীতির ভিত্তিমূল এর সবই কোনো না কোনোভাবে মানুষকে আরেক ধরনের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করার শামিল। সুতরাং ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক এবং একটি গণতান্ত্রিক আফগানিস্তানের চিন্তা তালেবানি দর্শনের সঙ্গে যায় না। ফলে বুদ্ধিজীবীরা তালেবানের ক্ষমতা দখলকে মার্কিন দখলদারিত্বের পতন হিসেবে দেখছেন ঠিকই কিন্তু তালেবানকে মনে-প্রাণে সমর্থন করতে পারছেন না। ২০০১ সালের আগের তালেবানকে তো সমর্থন করার প্রশ্নই আসে না কেননা সে তালেবানকে সমর্থন করলে আর গণমুখী বৃদ্ধিজীবীতার কোনো কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। তাই আফগানিস্তান ইস্যুতে কথা বলা, স্বাধীন মত প্রকাশ করা এবং কোনো বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ দাঁড় করানো একটা বিরাট ঝুঁকির ব্যাপার। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, তালেবানরা যে ২০০১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত নানান ধরনের জুলুম, অত্যাচার ও নির্যাতন সহ্য করে মার্কিন দলখদারিত্বকে পদে পদে চ্যালেঞ্জ করেছে, সেজন্য তালেবানদের ত্যাগ এবং লড়াইকেও অস্বীকার করা যাবে না। ফলে বুদ্ধিজীবীরা পড়েছেন মহাবিপদে!
তবে আমি মনে করি মার্কিন দখলদারিত্বের ইতি টানাটা যতটা না তালেবানের প্রতিরোধের প্রতিফল হিসেবে এসেছে ততোধিক এসেছে আমেরিকার সমরনীতির আফগানকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তের কারণে, কেননা এটা নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সিদ্ধান্তের ফসল। যে কারণে তালেবানরা বিনা রক্তপাতে কাবুল দখল করতে পেরেছে। তাই তালেবানদের একেবারে বীরের সমতুল্য করার কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে আফগানিস্তান কারা শাসন করবে সেটা নির্ধারণের দায়িত্ব আফগানিস্তানের জনগণকে দিতে হবে। তাই সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার নামে তালেবানদের সমর্থন করা আমার কাছে একটি বিপজ্জনক চিন্তা বলে মনে হয়। তালেবানরা আফগানিস্তানে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করেছে। এখন আমাদের দেখার বিষয় হচ্ছে, এ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি নিয়ে একটি সাংবিধানিক সরকার গঠন করে রাষ্ট্র পরিচালনার চিন্তা করে কিনা। এরপর জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই নির্ধারণ করবে আফগানিস্তানের সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রনীতি কী হবে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং দলখদারিত্বের বিরোধী করতে গিয়ে আমরা যেন উগ্র-ধর্মীয় চরমপন্থা ও মোল্লাতন্ত্রকে সমর্থন না করি।
ড. রাহমান নাসির উদ্দিন : নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়