নোবেলের মাদক গ্রহণের ছবি ভাইরাল

আগের সংবাদ

ধর্মীয় স্থাপনা, কবরস্থান কিংবা শ্মশান তৈরিতে লাগবে অনুমতি

পরের সংবাদ

করোনা বদলে দিয়েছে মার্কিনিদের জীবনধারা

প্রকাশিত: আগস্ট ২৯, ২০২১ , ১০:৫৯ অপরাহ্ণ আপডেট: আগস্ট ২৯, ২০২১ , ১০:৫৯ অপরাহ্ণ

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের অন্যতম একটি শহর সানফ্রান্সিসকোর কেন্দ্রবিন্দুর নাম ইউনিয়ন স্কোয়ার। ক্যালিফোর্নিয়া ধনী ও আধুনিক রাজ্যগুলোর একটি। এ রাজ্যের অন্যতম একটি নয়নাভিরাম ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত শহর সানফ্রান্সিসকো। আঠারো শতকে রেললাইন নির্মাণ করতে আসা চীনাদের একটি বিরাট জনগোষ্ঠী আছে শহরে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় চায়না টাউনটি এখানেই। কিন্তু শহরটির জিরো পয়েন্ট ইউনিয়ন স্কোয়ারের আশপাশে যদি আপনি ঢাকায় তেজগাঁও রেললাইনের আশপাশে বহাল তবিয়তে থাকা বস্তির মতো একটু উন্নত ধরনের বস্তি দেখতে পান, তাহলে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। এটি একটি নতুন বাস্তবতা। করোনার কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া দোকানগুলোর সামনে বস্তি বানিয়ে বসবাস করছে অনেকেই। রাস্তার উপরেই বালিশে হেলান দিয়ে কেউ বই পড়ছে, কেউ সিগারেট ফুঁকছে, কেউ ভিক্ষা করছে। দেখলেই বোঝা যায় এদের অধিকাংশই হয়তো মাদকাসক্ত। ডোনাল্ড ট্রাম্পের রক্ষণশীল শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে এখন মুক্ত গণতন্ত্রের চর্চা চলছে। কঠোর আইনের অনুশাসন এখন আর নেই। জো বাইডেনের নেতৃত্বে ডেমোক্র্যাটরা এখন ক্ষমতায়। এক স্বাধীন-সার্বভৌম ও এক ধরনের স্বেচ্ছাচারী ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে চলছে এখন যুক্তরাষ্ট্র।

গণতন্ত্রের পীঠস্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ব্যক্তির অধিকার এখানে সার্বভৌম। ব্যক্তিস্বাধীনতার উপরে বলার তেমন কিছুই নেই। বিশেষ করে ‘ ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনের পর এখন কেউ কাউকে কিছু বলছে না। যে যার ইচ্ছা মতো জীবনযাপন করছে। প্রশাসন নির্বিকার থাকে অনেক সময়। সানফ্রান্সিসকোর মতো অত্যন্ত পুরনো একটি ঐতিহ্যবাহী শহরের রাস্তায় রাস্তায় বস্তি কেন স্থাপিত হচ্ছে, এর কোনো জবাব কারো কাছে নেই। রাস্তার উপরে বস্তি বানিয়ে বসে প্রকাশ্যে মাদক সেবন করলেও পুলিশ কিছু বলছে না। একটু রাত হলেই মাতালদের চিৎকার মানুষকে শঙ্কিত করে তোলে। পুলিশ তেমন কোনো ব্যবস্থাও নেয় না এদের বিরুদ্ধে। ব্যক্তির স্বাধীনতা চর্চার হয়তো একটি চরম উদাহরণ এটি। নিউইয়র্ক শহরে মাস্ক পরার বালাই নেই। অথচ সিডিসি বলছে, এই শহরেই সংক্রমণ বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে।

অন্যদিকে ওয়াশিংটনে আবার মাস্কের ব্যাপারে কড়াকড়ি আইন আছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটা বিরাট জনগোষ্ঠী- এখনো পর্যন্ত যারা টিকা নিতে আগ্রহী নয়। কোনো একটি দেশে কেউ টিকা নিতে না চাইলে তাকে জোর করে আপনি তা দিতে পারবেন না। এটি তার সার্বভৌম অধিকারের অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থক গোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনো টিকার আওতায় আসেনি। গত ৫ আগস্ট ক্যালিফোর্নিয়া বাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রিক থিয়েটারের সামনে দেখলাম কয়েকশ মানুষ টিকাবিরোধী বিক্ষোভ করছেন। তারা বলছেন, ‘শরীর আমার, সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাও আমার। টিকা দিতে কাউকে বাধ্য করা যাবে না বা টিকা দেয়ার নামে ওষুধ কোম্পানিগুলোর গিনিপিগ হতে আমি রাজি নই।’

বাম ঘরানার রেডিক্যাল চিন্তার জন্য বিখ্যাত বাকলে বিশ্ববিদ্যালয়। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্কলারশিপে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন পড়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। দেখলাম সেই ধারাটি এখনো অব্যাহত আছে। বিভিন্ন সময়ে ১৫৪ জন নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষক ছিলেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখনো অনেক নোবেল লরিয়েট পড়ান বিভিন্ন বিভাগে। মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও চিন্তাশীল মননের জন্য বিখ্যাত এ শহরের প্রশাসন ১৯৮৪ সালে রোনাল্ড রিগ্যানের মতো একজন কাউ বয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রতিবাদে নিজেদের স্বাধীন ঘোষণা করেছিল। এ ধরনের ঘটনা বাকলে শহরে প্রায়ই ঘটে, ফলে তা নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। এই শহরে টেলিগ্রাফ এভিনিউ নামে একটি রাস্তা আছে, যেখানে খুচরো পয়সার জন্য হাত পেতে বসে আছে অনেকে। হাত দেখা থেকে শুরু করে ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য পাথর বিক্রি- কোনো কিছুই বাকি নেই এখানে। এমনকি সবুজ রঙের টিয়া পাখিও আছে, যারা বলে দিবে আগামীতে আপনার ভাগ্যে কী ঘটবে। পৃথিবীর বিখ্যাত চিন্তাশীল ব্যক্তি ও গুণীজনরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বক্তৃতা দিয়ে থাকেন।

নোয়াম চমস্কি থেকে অমর্ত্য সেন, এমনকি বাংলাদেশের স্যার ফজলে হোসেন আবেদ পর্যন্ত এখানে বিভিন্ন সময়ে বক্তব্য রেখে গেছেন। আনন্দের বিষয় হচ্ছে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়া স্টাডিজ বিভাগে বাংলাদেশের চট্টগ্রামের কৃতী সন্তান প্রখ্যাত ম্যানেজমেন্ট বিশেষজ্ঞ সুবীর চৌধুরী বাংলাদেশ সেন্টার নামে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন, যেখানে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণা করা হয়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প থেকে রোহিঙ্গা পর্যন্ত নানা বিষয়ে গবেষণার জন্য প্রতি বছর দুটি করে ফেলোশিপ দেয়া হয়। যা-ই হোক, এ বিষয়ে পরে আরো বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা আছে।

যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কাঠামোতে রাজ্যগুলো নিজস্ব আইনের দ্বারা পরিচালিত হয়, ফলে কোনো কোনো রাজ্যে আবার করোনার ব্যাপারে কঠিন নিয়ম পালনের উদাহরণও আছে। টিকা দেয়ার বিরুদ্ধে রিপাবলিকান অধ্যুষিত শহরগুলোয় নেতিবাচক মনোভাব বেশি। ফলে এক রাজ্যের পরিস্থিতির সঙ্গে অন্য রাজ্যের পরিস্থিতি মেলালে চলবে না। তবে বাস্তবতা এই যে ডেমোক্র্যাটদের উদার গণতন্ত্রের সুযোগ নিয়ে প্রায় স্বেচ্ছাচারিতার পর্যায়ে আচরণ চলছে অনেক রাজ্যে। যেহেতু ব্যক্তির স্বাধীনভাবে চলার ক্ষমতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাটি সংরক্ষিত আছে, ফলে কেউ কাউকে কিছু বলছেও না। এটাই মার্কিন গণতন্ত্রের এক উল্লেখ করার মতো সৌন্দর্য।

আবার অন্যদিকে এ নিয়ে রাজনীতিও চলছে নানাভাবে। রিপাবলিকান নেতারা বলে বেড়াচ্ছেন, বাইডেন প্রশাসনের ঢিলেঢালা নীতির কারণেই আপনার শহরে সানফ্রান্সিসকো বা নিউইয়র্কের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে; যেখানে আপনার জীবন এ ধরনের স্বেচ্ছাচারী আচরণের জন্য অনিরাপদ ও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল রাজ্যগুলোয় এ প্রচারণা চলছে জোরেশোরে। এসব কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা আবার বেড়ে গেলে অবাক হওয়ার মতো কিছু থাকবে না।

অন্যদিকে গণতন্ত্রের এ ঢিলেঢালা ব্যবস্থার কিছু নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াও আছে। করোনার এ বিপর্যয়ে মার্কিন প্রশাসন সে দেশের জনগণকে যে পরিমাণ টাকা দিয়েছে, তাতে অনেকেই কাজ ছেড়ে দিয়ে বেকার হয়ে যাচ্ছেন। কারণ বেকার হলেই অনেক বেশি সুবিধা। নিউইয়র্ক শহরে কর্মরত এক বাংলাদেশি সাংবাদিকের মতে, গত ১৯ মাসে প্রতিটি পরিবার এক লাখ থেকে দেড় লাখ ডলারের মতো সরকারি সহযোগিতা পেয়েছে। ফলে কাজ করার চেয়ে বেকার থাকা অনেক লাভজনক। কিন্তু অর্থনীতির এক আশ্চর্যজনক চিত্র হচ্ছে- বেকারত্ব বাড়লেও নিউইয়র্ক শহরে বাড়ির দাম বেড়ে গেছে। শুনলে হয়তো অবিশ্বাস্য মনে হবে যে বিপুল পরিমাণ বেকারভাতা পেয়ে অনেকেই বাড়ি কেনা শুরু করে দিয়েছেন। ফলে করোনার এ বিপর্যয়ে মার্কিন অর্থনীতি ঠিকমতো না চললেও মানুষের মধ্যে কোনো অসন্তোষ নেই। নোট ছাপিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিতরণ করা হয়েছে জনগণের মধ্যে।

এর আগে জনগণকে নগদ অর্থ সহযোগিতা দেয়ার জন্য যে বিল পাস হয়েছে, তাতে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিশ্চিন্ত। অনেকেই আশা করছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাইডেন প্রশাসনকে হয়তো আরো এক বছর জনগণকে আর্থিক সহযোগিতার ধারাটি অব্যাহত রাখতে হবে। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহের কয়েক দিন ছিলাম নিউইয়র্ক শহরে। বিশ্বের এমন কোনো দেশ নেই, যে দেশের একজন নাগরিকও এ শহরে নেই। ফলে অনেকেই এটিকে বিশ্ব রাজধানী বলে উল্লেখ করে থাকেন। করোনার এই বিপর্যস্ত সময়ে শহরটি এখন প্রাণহীন। আলোকোজ্জ্বল ম্যানহাটন আগের মতো আলো ছড়ায় না। অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ। টাইমস স্কোয়ারে লোকের ভিড় নেই। হাজারখানেক হোটেলের শহর ম্যানহাটনে অধিকাংশ হোটেলে কোনো অতিথি নেই। আমি যে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে ছিলাম, সেটা খুলেছে মাত্র এক মাস আগে। অতিথি নেই বললেই চলে। হোটেলের সার্ভিসও সীমিত। আপনি চাইলেই প্রতিদিন হাউজকিপিং করবে, অন্যথায় নয়। রুম সার্ভিস বন্ধ। অনেক হোটেলে খাবারের ব্যবস্থাপনা এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। খাবার চাইলে ওয়ানটাইম প্লেট বা প্যাকেটে করে অর্ডার দেয়া খাবার আপনার দরজার সামনে রেখে যাবে। অল্পসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে চলছে হোটেল। সবাই অপেক্ষায় আছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার। নিউইয়র্ক শহরে প্রতিদিন কোনো না কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলন চলত। এখন সেগুলো একেবারেই বন্ধ। পৃথিবীর ব্যস্ততম বিমানবন্দরগুলোর একটি নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দর। প্রতি মিনিটে কয়েকটি প্লেন উঠত আর নামত। কিন্তু এখন চিত্রটি একেবারেই ভিন্ন। ইমিগ্রেশনে আমাদের বিমান থেকে নেমে আসা যাত্রী ছাড়া অন্য কেউ নেই। করোনার কারণে অনেক দেশ থেকে বিমান আসতে দেয়া হচ্ছে না এখানে। ফলে সবকিছুই এখন ঢিলেঢালা। এই ঢিলেঢালার মাত্রাটি এখন এমন চরমে, এর অনেক দুর্ভোগও রয়েছে মানুষের জীবনে।

ফ্লোরিডার মায়ামিতে বসবাসকারী এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ী লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে রওনা দিয়ে ১২ ঘণ্টায়ও গন্তব্যে পৌঁছতে পারেননি। মায়ামিতে আবহাওয়া খারাপ ছিল ফলে ৪ ঘণ্টা দেরিতে ছাড়বে বিমান। পাইলট ২ ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর যাত্রীদের জানালেন, তার ৮ ঘণ্টা ডিউটি শেষ হয়ে গেছে। তিনি আর বিমান চালাতে পারবেন না। বিমানযাত্রীদের অরক্ষিত ফেলেই তিনি চলে গেলেন। ফলে অন্য পাইলট না আসা পর্যন্ত বিমানযাত্রাই শুরু করল না। অন্যদিকে রি-ফুয়েলিংয়ের লোক না আসায় বিমান ছাড়তে দেরি হলো আরো কয়েক ঘণ্টা। যুক্তরাষ্ট্রে এক সময় এগুলো কল্পনাও করা যায়নি।

করোনা মহামারির এ বিপর্যস্ত অবস্থা একসময় কেটে যাবে। কিন্তু মানুষের জীবনটা আগের জায়গায় কতটা ফিরে আসবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। মানুষের জীবনধারা পাল্টে যাচ্ছে। মানুষ এখন অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে তার ছায়া দেখতে পাওয়া যায়। মানুষ এখন কেনাকাটা করতে আর সুপার মলে যান না। অনলাইনেই কেনাকাটা সেরে ফেলেন। এখন অধিকাংশ অফিসেই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হোম অফিস করছেন। ফলে শহরগুলোয় অফিস স্পেসের ভাড়া কমে গেছে।

করোনা পরিস্থিতি কিছুটা সামলে নেয়ার পর নিউ নরমালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, সমাজ এবং রাষ্ট্র কী চেহারা নেবে বা মার্কিন সমাজে নতুন পরিবর্তিত পরিস্থিতির কী প্রভাব পড়বে, সেটা দেখার জন্য হয়তো আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।

ডি-এসএইচ/ আরআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়