উইকেট হারিয়ে চাপে পড়েছে অস্ট্রেলিয়া

আগের সংবাদ

জিজ্ঞাসাবাদে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিলেন হেলেনার ২ সহযোগী

পরের সংবাদ

প্রতারণা ও অন্ধকার জগতে তারকা মডেল সেলিব্রেটিরা

প্রকাশিত: আগস্ট ৩, ২০২১ , ৮:৪৫ অপরাহ্ণ আপডেট: আগস্ট ৩, ২০২১ , ৮:৪৫ অপরাহ্ণ

রাজধানীসহ পুরো দেশেই প্রতিদিন নানা অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার হচ্ছেন অনেকে। অপরাধ দমনে এসব গ্রেপ্তারের ঘটনা স্বাভাবিক। তবে সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মাদক ও প্রতারণাসহ নানা অপরাধের ঘটনায় সমাজের পরিচিত মুখদের গ্রেপ্তারের ঘটনা ‘টক অব দ্যা কান্ট্রি’তে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে যেমন আছেন ঝরে যাওয়ার তারকা, উঠতি মডেল, তেমনি আছেন চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় মুখ, চিত্রনায়িকাসহ অনেক সেলিব্রেটি। এ বিষয়টি এখন নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে সুশীল সমাজের বিশিষ্টজন, সমাজবিশ্লেষক এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও। তারা বলছেন, পরিচিত মুখগুলো যেখানে সমাজের রোল মডেল হওয়ার কথা, সেখানে তারা নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। প্রশ্ন উঠেছে- অসাধু কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে লাভবান হওয়া কি পরিচিতি লাভের মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে দাড়িয়েছে? তারা কি এখন খ্যাতিকে পুঁজি করে স্রেফ দ্রুত অর্থ-বিত্তের মালিক হতে চেয়ে মাদক, প্রতারণাসহ নানা অপরাধের অন্ধকার জগতে পা বাড়াচ্ছেন? বিত্তবানদের মতো প্রতাপ প্রতিপত্তি অর্জন এবং এর বিনিময়ে সামাজিক মর্যাদা ও স্ট্যাটাস অর্জনই কি তাদের কাছে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনের চেয়ে এখন বড় হয়ে ওঠেছে? এরই পরিণামে কি তারা পরিচিতি ও জনসাধারণের ভালোবাসা অর্জন সত্বেও সেই মর্যাদা ও ভালোবাসা জলাঞ্জলি দিয়ে অন্ধকার জগতে ছুটছেন?

মডেল ফারিয়া মাহাবুব পিয়াসার বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া মদের বোতল ও অন্যান্য মাদক দ্রব্য

গত রবিবার (১ আগস্ট) রাত ১০টার দিকে রাজধানীর বারিধারার বাসা থেকে মডেল পিয়াসা এবং মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসা থেকে মডেল মরিয়ম আক্তার মৌকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। এসময় তাদের বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, মডেল পিয়াসা ও মৌ সংঘবদ্ধ একটি চক্রের সদস্য। তারা পার্টির নামে উচ্চবিত্তদের বাসায় ডেকে মদ ও ইয়াবা খাইয়ে আপত্তিকর ছবি তুলে রাখতেন। পরে সেই ছবি দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিতেন।

দুই মডেলকে আটকের পর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে মডেল মৌয়ের বাসার নিচে সাংবাদিকদের ডিএমপির ডিবি উত্তর শাখার যুগ্মকমিশনার হারুন-অর-রশীদ বলেন, তারা দুইজন একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য। তাদের বিরুদ্ধে আমরা অনেক ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ পেয়েছি। সেসব ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে তাদের বাসায় অভিযান চালানো হয়। দুইজনের বাসায় বিদেশি মদ, ইয়াবা ও সিসা পাওয়া যায়। মৌয়ের বাড়িতে মদের বারও ছিল। তিনি আরো বলেন, আটক দুই মডেল হচ্ছেন রাতের রানী। তারা দিনের বেলায় ঘুমাতেন ও রাতে এসব কর্মকাণ্ড করতেন। উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের পার্টির নামে বাসায় ডেকে আনতেন তারা। বাসায় আসলে তারা তাদের সঙ্গে আপত্তিকর ছবি তুলতেন ও ভিডিও করে রাখতেন। পরবর্তীতে সেসব ভিডিও এবং ছবি ভিকটিমদের পরিবারকে পাঠানোর হুমকি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করতেন এবং মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিতেন।

সরকারের অনুমোদনহীন জয়যাত্রা টিভির মালিক হেলেনা জাহাঙ্গীরের বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া মদের বোতল ও অন্যান্য সরঞ্জাম

এর আগে ২৯ জুলাই রাতে রাজধানীর গুলশান-২ এলাকার ৩৬ নম্বর রোডের ৫ নম্বর বাড়ি জেনেটিক রিচমন্ডে অভিযান চালিয়ে হেলেনা জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার বাসা থেকে ১৯ বোতল বিদেশি মদ, ২টি ওয়াকিটকি সেট ও জুয়া (ক্যাসিনো) খেলার সরঞ্জাম উদ্ধার করে র‌্যাব। পরবর্তী সময়ে মধ্যরাতে তার জয়যাত্রা টেলিভিশন স্টেশনেও অভিযান পরিচালনা করা হয়। ফেসবুক, ইউটিউব ও তার আইপি চ্যানেল জয়যাত্রা ব্যবহার করে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেন এ নারী। তবে গৃহবধূ থেকে ব্যবসায়ী হয়ে সিআইপির (কমার্শিয়ালি ইমপর্টেন্ট পারসন) স্বীকৃতি পাওয়া এ নারী সম্প্রতি তুমুল সমাালোচিত হয়ে ওঠেন আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ নামে একটি সংগঠনের প্রচার চালাতে গিয়ে। পরে উঠে আসে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন ও বিভিন্ন সুবিধা হাসিলই ছিল তার পরিচিতি মুখ হয়ে ওঠার অন্যতম উদ্দেশ্য। যদিও আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক কেন্দ্রীয় উপকমিটির সদস্যপদ ছাড়াও কুমিল্লা উত্তর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টার পদ থেকে এসব কর্মকাণ্ডের জন্য অব্যাহতি দেয়া হয় তাকে।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক ভোরের কাগজকে বলেন, অপরাধ জগতের যাওয়ার শুরুটাই হচ্ছে মাদক। শুধু দরিদ্র বা অসচ্ছল লোকজন মাদক ব্যবসা করছেন তা নয়। বরং রাতারাতি কোটিপতি হতে ধনী, ভদ্র পরিবার ও সমাজের পরিচিত মুখদেরও দেখছি তারা এসব কাজে জড়াচ্ছেন। মিডিয়ার উঠতি বয়সিরা মাদকজগতে জড়ানোর বিষয়েও বহুবার খবর প্রকাশিত হয়েছে। মাদক ব্যবসার সঙ্গে তারা বিবাহবহির্ভূত পাশ্চাত্য ধাঁচের একাধিক যৌনসঙ্গীর প্রতিও আসক্ত হচ্ছেন। এতে করে ধীরে ধীরে পারিবারিক কাঠামো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এটি উদ্বেগজনক।

এদিকে গৃহকর্মীকে মারধরের ঘটনায় গত ৩১ জুলাই শনিবার এককালের জনপ্রিয় চিত্র নায়িকা একাকে গ্রেপ্তার করে হাতিরঝিল থানা পুলিশ। এরপর বেরিয়ে আসে, এ নায়িকার জীবনের আরেক গল্প। এ যেন অচেনা এক একা। নিয়মিত মাদক সেবন করায় স্বাভাবিক জীবন তার প্রায় তছনছ। পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের এডিসি হাফিজ আল ফারুক জানান, একার বাসায় অভিযান চালিয়ে পাঁচ পিস ইয়াবা, ৫০ গ্রাম গাঁজা এবং অর্ধেক বোতল মদ পাওয়া গেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি প্রায় নিয়মিত ইয়াবা সেবনের কথা স্বীকার করেন। এ কারণেই তার এই অবস্থা।

বুটক্লাবের ঘটনার কিছুদিন পর নায়িকা পরীমনির বাসায়ও পাওয়া যায় মদের অনেক খালি বোতল

২০১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর মধ্যরাতে কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেল থেকে পরিচালক ও চিত্রপ্রযোজক জিএম সারওয়ার, মিউজিক ডিরেক্টর হাজী জামাল, দেলোয়ার হোসেন ও চিত্রনায়িকা সিলভিয়া আজমীকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তখন তাদের কাছ থেকে ইয়াবা ট্যাবলেট, ব্যবহৃত কনডম ও মদের খালি ক্যানসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়। গত ২০১৩ সালে ইয়াবা, মদ ও বিয়ারসহ সঙ্গীতশিল্পী পারুল মাহবুব ও এলিজাসহ চারজন আটক হওয়ার পর বেরিয়ে আসতে শুরু করে তাদের নানা অপকর্মের লোমহর্ষক তথ্য। হালে জনপ্রিয় নায়িকা পরিমণির বিরুদ্ধেও মাদক সংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে। ঢাকাই সিনেমার উঠতি নায়িকাদের অনেকেই এখন ছবির লগ্নিকারী। মাত্র ২-৪টি সিনেমায় অভিনয় করে তারা এখন প্রযোজক বনেছেন। সেসব নায়িকা লেবাসধারী অর্থলগ্নিকারীরা নাকি নায়ক বা নির্মাতাকেও ভাড়া করছেন অর্থের জোরে। এমন অভিযোগ রয়েছে অনেকের বিরুদ্ধে। তবে উঠতি বয়সি র‌্যাম্প মডেল ও মডেল-অভিনেত্রীরাই মাদক ও অনৈতিক উপায়কেই অর্থ উপার্জনের অবলম্বন করছেন বলে জানা গেছে। আরো জানা গেছে রাজধানীর শোবিজ জগতের অনেকেই মাদক সেবন ও ব্যবসার পাশাপাশি আপন করেছেন অন্ধকার জগৎকে। তাদের ব্যক্তিগত জীবনের এসব অপরাধ ও সঙ্কট সমাজে প্রতিনিয়ত বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এদের পাল্লায় পড়ে রাজধানীর অভিজাত এলাকার ধনী পরিবারের ছেলে-মেয়েরা যেমনি বিপথগামী হচ্ছে, একইভাবে পিছিয়ে নেই মধ্যবিত্ত-নিন্মমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরাও।

র‌্যাব লিগ্যাল এন্ড মিডিয় উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন ভোরের কাগজকে বলেন, টেলিভিশন ছাড়াও ফেসবুক, টিকটক ও ইউটিবসহ বিভিন্ন অনলাইন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মসহ মডেলিংয়ের কল্যাণে অনেকেই পরিচিত মুখ হয়ে উঠছেন। তবে আমরা দেখছি এ পরিচিতি অনেকেই প্রতারণা ও অনৈতিক কাজে ব্যবহার করছেন। তবে আপরাধ করলে কাউকে ছাড় নয়। যেই অপরাধ করবে তাকেই শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। পরিচিতি এখানে মূখ্য নয়।

ডি-আরআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়