এডিস মশার ভয়ঙ্কর থাবা

আগের সংবাদ

শাসন করা বা শাসিত হওয়ার জন্য কেউ থাকবে না

পরের সংবাদ

যে কারণে বাড়ছে ইসলামী ব্যাংকিং

প্রকাশিত: জুলাই ২৯, ২০২১ , ৮:৩৬ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুলাই ২৯, ২০২১ , ৮:৩৬ পূর্বাহ্ণ

প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ব্যাংকের নতুন কৌশল ইসলামী ব্যাংকিং। ইসলামী ব্যাংক পরিচালনায় নিজস্ব আইন না থাকা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নামমাত্র গাইডলাইন ও নিজস্ব শরিয়াহ বোর্ড না থাকাসহ বিভিন্ন দুর্বলতাকে পুঁজি করে গতানুগতিক ব্যাংক থেকে বেরিয়ে এসে ইসলামী ব্যাংকিংয়ে ঝুঁকছে ব্যাংকগুলো। দেখা গেছে, দেশের মুসলমানদের ধর্মীয় আবেগের বিষয়কে কাজে লাগিয়ে আমানত ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে ভিন্নতার কথা বলে নামমাত্র ইসলামী ব্যাংকিং পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশে ৩৭ বছর ধরে ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালিত হলেও এখন পর্যন্ত এ সংক্রান্ত আইন চালু হয়নি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, গ্রাহকদের চাহিদা ও বেশি মুনাফার সুযোগ থাকার পাশাপাশি ধর্মীয় অনুভ‚তিকে কাজে লাগাতে ব্যাংকগুলো ইসলামী ব্যাংকিংয়ে ঝুঁকছে। কেউ পূর্ণাঙ্গ, কেউ বা উইন্ডো খুলে সেবা দিচ্ছে। দেশের ব্যাংকিং খাতে আমানত ও বিনিয়োগের দিক থেকে ২৫ শতাংশই ইসলামিক ব্যাংকগুলোর দখলে। রেমিট্যান্স আহরণেও এগিয়ে রয়েছে ইসলামিক ব্যাংকগুলো। এমনকি ঋণ-আমানত ও সম্পদের বড় সূচকগুলোতে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। নতুন বছরের শুরুতে পুরোপুরি ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করেছে বেসরকারি খাতের স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক।

এছাড়া নাম বদল করে শতভাগ ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করেছে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক। ইসলামী ব্যাংকিং চালু করতে ১০টির বেশি আবেদনপত্র বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রয়েছে। তথ্য বলছে, বাংলাদেশে ৩৭ বছর ধরে ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে এলেও এখন পর্যন্ত এ সংক্রান্ত আইন চালু হয়নি।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম ভোরের কাগজকে বলেন, আমাদের দেশের মানুষের চিন্তাচেতনা হচ্ছে, ব্যাংকে টাকা রাখলেই সুদ হবে। এ চিন্তা-চেতনার সুযোগ ব্যাংকগুলো নিচ্ছে। ইসলামী ব্যাংকিং আইন চালুর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এ বিষয়ে কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকিংয়ের দিকে যেহেতু ব্যাংক ও গ্রাহক উভয়েই ঝুঁকছে, সুতরাং এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকও কাজ করছে। তিনি বলেন, শরিয়াহ বোর্ড গঠন করা হলে ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেয়ার সুযোগ থাকবে। সুতরাং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগে ইসলামী শরিয়াহ বোর্ড গঠন হলে এ ব্যবস্থার ব্যাংকগুলো বোর্ডের আদেশ-উপদেশ ও নির্দেশনা মেনে চলবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের পরিধি যেমন বাড়ছে সেই সঙ্গে বাড়ছে নানা সুবিধা-অসুবিধাও। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশে যেভাবে ইসলামী ব্যাংক পরিচালনা করা হয়ে থাকে সেটা উদ্বেগের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং এন্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের শিক্ষক তাসনিমা খান বলেন, সুদ ও মুনাফার ক্ষেত্রে রয়েছে মূল পার্থক্য। তিনি বলেন, আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষ ধর্মভীরু। প্রচলিত ধারার ব্যাংকিংয়ে সুদের বিষয় থাকে। কিন্তু ইসলামে সুদকে হারাম বলা হয়ে থাকে, তাই এটা অনেকের কাছে অনেকটা গ্যাম্বলিংয়ের মতো। তিনি বলেন, বেশির ভাগ মানুষ মনে করেন ইসলামী ব্যাংকিংয়ে টাকাটা বিনিয়োগ করা হচ্ছে এবং সেখান থেকে মুনাফা পাচ্ছেন। অর্থাৎ তারা এটাকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে বৈধ হিসেবে মনে করেন। এতে তাদের একটা স্বস্তির জায়গা তৈরি হয়। এজন্যই প্রচলিত ব্যাংকগুলো তাদের ইসলামী উইন্ডো ও শাখা রাখছে।

জানা গেছে, বর্তমানে দেশে মোট ৬২টি তফসিলি ব্যাংক কার্যক্রমে আছে। এর মধ্যে নতুন দুটিসহ পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকিংয়ে যুক্ত আছে ১০ ব্যাংক। আর ১৭টি ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং শাখা বা উইন্ডো রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে- ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, আল-আরাফাহ, শাহ্জালাল ইসলামী, এক্সিম, এসআইবিএল, ফার্স্ট সিকিউরিটি, আইসিবি ইসলামিক, ইউনিয়ন, স্ট্যান্ডার্ড ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক। এছাড়া ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো রয়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানার সোনালী ও অগ্রণী ব্যাংকের। তালিকায় আছে বেসরকারি খাতের পূবালী, ইউসিবি, এবি, দ্য সিটি, প্রাইম, সাউথইস্ট, ঢাকা, প্রিমিয়ার, ব্যাংক এশিয়া, ট্রাস্ট, মার্কেন্টাইল ও যমুনা ব্যাংক। এছাড়া বিদেশি মালিকানার স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, আল-ফালাহ ও এইচএসবিসি ব্যাংকে ইসলামী ব্যাংকিং রয়েছে। এর বাইরে ৯টি প্রচলিত (কনভেনশনাল) ব্যাংকের ১৯টি শাখা এবং ১২টি প্রচলিত ব্যাংকের ১৫৫টি উইন্ডোর মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকিং চলছে।

গত বছরের জুন শেষে ইসলামী ব্যাংকিংয়ে ২ লাখ ৭৫ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে। যা দেশের ব্যাংকিং খাতের মোট বিনিয়োগের ২৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ। অর্থাৎ আমানত ও বিনিয়োগের দিক থেকে দেশের মোট ব্যাংকিং খাতের এক-চতুর্থাংশ স্থান ইসলামী ব্যাংকিংয়ের দখলে রয়েছে। ইসলামিক ধারার ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে দেশে বেশি রেমিট্যান্স আসে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের মাধ্যমে। যেসব কনভেনশনাল ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকিং করছে তারা ইসলামী ব্যাংকিংয়ে তাদের জনশক্তি বাড়াচ্ছে।

ব্যাংকগুলো ইসলামী ব্যাংকে রূপান্তরিত হওয়ার মূল কারণ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা মুনাফা বা আমানতের হার নিয়ে চিন্তা করে না। ফলে ব্যাংকগুলোর কস্ট অব ফান্ড কম হয়। তিনি বলেন, এ দেশের সাধারণ মানুষের ধারণা, ইসলামী ব্যাংকগুলো ইসলামী আদর্শে পরিচালিত হয়, অন্য ব্যাংকগুলোর মতো এখানে দুর্নীতি হয় না। ইসলামী ব্যাংকগুলো সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কিনা, শরিয়াহ আইন মানছে কিনা এটাই এখন দেখার বিষয়। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের পরিধি যেহেতু বাড়ছে, তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত ইসলামী ব্যাংকিং পরিচালনার জন্য আলাদা শরিয়াহ বোর্ড গঠন করা।

ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সুবিধা : ব্যাংকগুলোকে আমানতের বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিনাসুদে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ নগদ রিজার্ভ অনুপাত (সিআরআর) ও সংবিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত (এসএলআর) রাখতে হয়। প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে বর্তমানে ১৩ শতাংশ এসএলআর রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে মাত্র সাড়ে ৫ শতাংশ। অন্যদিকে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলো ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে ৮৭ টাকা ঋণ দিতে পারে। ইসলামী ব্যাংকগুলো সেখানে ৯২ টাকা দিতে পারে। সুতরাং ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকগুলোর ধারণক্ষমতা বেশি।

এছাড়া জানা যায়, পরিচালনাগত প্র্যাকটিসের অভাবে অনেকে এ ব্যবস্থায় ঝুঁকছে। সেই সঙ্গে অনেক ব্যাংক আমানতের বেশি ঋণ দিয়ে বিপাকে রয়েছে। এডিআর রেশিও সুবিধা পেতেও এ ব্যবস্থায় আসছে ব্যাংকগুলো। জানা গেছে, ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর সব ধরনের ডিপোজিটের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সঙ্গে ভয়াবহ প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি ও কাস্টমার সার্ভিস বিভাগে ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে এ সংক্রান্ত অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়