সিংগাইরে অর্ধকোটি টাকার হেরোইনসহ ২ মাদক কারবারি আটক

আগের সংবাদ

টানা দুই দিন হাসপাতালে ভর্তি শতাধিক ডেঙ্গু রোগী

পরের সংবাদ

বেসরকারি হাসপাতাল: এখনো অনিবন্ধিত পাঁচ হাজার

প্রকাশিত: জুলাই ২৬, ২০২১ , ৮:২৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুলাই ২৬, ২০২১ , ১:০৬ অপরাহ্ণ

অনুমোদনহীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে মাঠে নামার ঘোষণা মাঝে মধ্যেই বেশ জোরেশোরেই দেয় সরকার। শুরুর দিকে কিছুটা তোড়জোড় দৃশ্যমান থাকলেও কয়েকদিন পরই তা ঝিমিয়ে পড়ে। তবে স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, এটি তাদের চলমান কার্যক্রমেরই অংশ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পদ্ধতি হলো- কেউ অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেয় হয়। নিজেরা মনিটরিং করে না। আর কেউ আবেদন করেই হাসপাতাল চালু করে দিলে তারা বন্ধ করতে বলে মাত্র। আইনি অধিকার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নেই। এছাড়া হাসপাতাল পরিদর্শনের মতো জনবল নেই অধিদপ্তরের। একজন পরিচালক, দুজন উপপরিচালক, তিনজন সহকারী পরিচালক ও পাঁচজন মেডিকেল অফিসার দিয়ে হাজার হাজার হাসপাতাল দেখভাল করা কতটা সম্ভব তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।

জানা যায়, ২০১৮ সালের নভেম্বর থেকে অনলাইন পদ্ধতিতে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক ও ডায়গনস্টিক সেন্টারের নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালু হয়। নিয়ম অনুযায়ী সব বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক ও ডায়গনস্টিক সেন্টার তাদের প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন অনলাইনে বাধ্যতামূলক। কোনো একটি শর্ত পূরণ না করতে পারলে অনলাইনে নিবন্ধন হয় না। আর তাই নবায়নও হয় না। তিন বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত এর আওতায় আসেনি সবগুলো বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক ও ডায়গনস্টিক সেন্টার। বিভিন্ন সময় অবৈধ ও অনিবন্ধিত হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হলেও এর ধারাবাহিকতা খুব একটা লক্ষ করা যায়নি। ২০১৮ সালে ঢাকার ৩০টি প্রাইভেট ক্লিনিককে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়ে ১৫ দিনের মধ্যে সাময়িকভাবে বন্ধ করতে বলেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তখন ভ্রাম্যমাণ আদালতও পরিচালনা করা হয়। কিন্তু সেই হাসপাতালগুলো আবারো চালু হয়। ২০১৯ সালে এমন কোনো পদক্ষেপই দেখা যায়নি। তবে ২০২০ সালে করোনা চলাকালে রিজেন্ট হাসপাতালকাণ্ডের পর অনিবন্ধিত ও ভুয়া হাসপাতাল-ক্লিনিক, ডায়গনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে আবারো কোমড় বেঁধে মাঠ নামে স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসন।

২০২০ সালে সরকার এই খাতে শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগ নেয়। কিছু দিন সেই তোড়জোড় সবার নজরেও পড়ে। অনিবন্ধিত হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়গনস্টিক সেন্টারগুলোকে লাইসেন্স করার ও যাদের লাইসেন্স আছে তাদের তা নবায়নের তাগিদ দেয়া হয়। গত বছর ৮ নভেম্বর বিভাগীয় পরিচালকদের সঙ্গে এক ভিডিও কনফারেন্সে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশিদ আলম বিভাগীয় পরিচালক ও সিভিল সার্জনদের তিন কার্য দিবসের মধ্যে নিজ নিজ জেলার অনবিন্ধিত/অবৈধ/নিয়ম বহিভর্‚তভাবে পরিচালিত/সেবার মান খারাপ এমন বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিকে মোবাইল কোট পরিচালনা করে বিধি মোতাবেক যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রয়োজনে সিলগালা করে অধিদপ্তরে পাঠানোর নির্দেশ দেন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং পুলিশ ফোর্সসহ মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) সিভিল সার্জনদের এতে নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়। কিন্তু এরপর অনেকটাই অদৃশ্য হয়ে পড়ে সরকারের এমন কার্যক্রম।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বেশ কয়েকবারই বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের সেবার নির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণের পর মানহীন ক্লিনিক বন্ধ করে দেয়া হবে বলে সতর্ক করেছেন। দেশের আনাচে-কানাচে বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিক হচ্ছে উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সারাদেশে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক ছেয়ে গেছে। এই ক্লিনিকগুলোর কয়েকটি মানসম্পন্ন সেবা দিলেও বহুসংখ্যক ক্লিনিকে মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে না। এসব ক্লিনিকে ভালোমানের চিকিৎসা সরঞ্জামাদিও নেই।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার পরিচালক ডা. ফরিদ হোসেন মিয়া ভোরের কাগজকে বলেন, নিবন্ধনের জন্য ১৪ হাজারের বেশি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক আবেদন করেছে। সেই সব আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নয় হাজারের নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। আবেদনকৃতদের অনেকের আবেদন অসম্পূর্ণ, আবার কিছু আছে এখনো পর্যন্ত আমরা পরিদর্শন সম্পন্ন করতে পারিনি। সেগুলো পর্যায়ক্রমে পরিদর্শন করে তালিকাভুক্ত করা হবে।

কত সংখ্যক হাসপাতালে বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন- এ প্রসঙ্গে হাসপাতাল পরিচালক বলেন, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। এ সংখ্যা সঠিক করে বলা যাবে না। অধিদপ্তরের পাশাপাশি বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়েও সিভিল সার্জনের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. নাসরিন সুলতানা বলেন, সরকারের যে জনবল কম তা সবাই জানে। কিন্তু সীমিত জনবল দিয়েই যাতে কাজটা সঠিকভাবে করা যায় সেই ব্যবস্থা সরকারকেই নিতে হবে। নিয়মিত পরিদর্শন ও তদারকি না করলে, হাজার হাজার হাসপাতালকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা যাবে না।

২৪ জুলাই অনুষ্ঠিত এক ভার্চুয়াল সভায় বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল এসোসিয়েশনের সদস্যরা হাসপাতাল-ক্লিনিকের নিবন্ধনের মেয়াদ এক বছরের পরিবর্তে তা বাড়িয়ে দুই বছর করার সুপারিশ করেন। অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি আমি চাইলেই হবে না। এখানে অর্ডিন্যান্স ও অ্যাক্ট জড়িত। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। তবে সেবার মান ঠিক রাখতে হবে। বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের মান ও মনিটরিং করতে তিনি একটি ডেস্ক গঠন করে সেখানে একজন পরিচালক নিয়োগের কথাও বলেন তিনি।

লাইসেন্স কীভাবে পাওয়া যায়: লাইসেন্স পাওয়ার জন্য হাসপাতালের ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন শর্ত থাকে। সেগুলো পূরণ করলে তবেই মিলবে লাইসেন্স। লাইসেন্স দেয়া হয় ১০ বেডের হাসপাতাল বা ক্লিনিক হিসেবে এক বছরের জন্য। প্রতি বছর লাইসেন্স নবায়ন করতে হয়। ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে একই নিয়ম। হাসপাতালের লাইসেন্স পেতে হলে কমপক্ষে তিনজন এমবিবিএস ডাক্তার, ছয়জন নার্স ও দুজন ক্লিনার থাকতে হবে। প্রত্যেকটি বেডের জন্য ৮০ বর্গফুট জায়গা থাকতে হবে। অপারেশন থিয়েটার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হতে হবে। আর সেখানে কী কী আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকতে হবে তাও বলা আছে। এরসঙ্গে ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন নম্বার, বিআইএন নম্বার, পরিবেশ এবং নারকোটিকসের লাইসেন্স থাকতে হবে। অপারেশন থিয়েটারের জন্য নারকোটিকসের লাইসেন্স বাধ্যতামূলক। তবে আউটডোর, ইমার্জেন্সি এবং অপারেশন থিয়েটার বাধ্যতামূলক নয়। আবেদনের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন উপপরিচালকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের টিম সরেজমিন পরিদর্শন করে লাইসেন্স দেয়। লাইসেন্স নিতে ঢাকায় ৫০ হাজার এবং জেলা উপজেলায় ৪০ হাজার টাকা লাগে। ১০ বেডই প্রাইভেট হাসপাতালের ইউনিট। এরপর বেড বেশি হলে আনুপাতিক হারে জনবল বাড়ে।

লাইসেন্স দেয় অধিদপ্তর; বাতিলের ক্ষমতা মন্ত্রণালয়ের: শর্ত পূরণ না করলে অধিদপ্তর থেকে লাইসেন্স দেয়া হয় না। আর লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করলে তাদের কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠানো হয়। লাইসেন্স বাতিলসহ নানা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করে অধিদপ্তর। লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করলে বা নবায়ন না করলে লাইসেন্স বাতিল করার বিধান থাকলেও অধিদপ্তর লাইসেন্স বাতিল করতে পারে না। পারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। অধিদপ্তর মৌখিক এবং লিখিতভাবে তাদের সতর্ক করতে পারে। ১৫ দিন সময় দিয়ে হাসপাতাল সাময়িক বন্ধের জন্য নোটিস দিতে পারে। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে শাস্তি দিতে পারে।

নিবন্ধনে অনাগ্রহের কারণ: লাইসেন্স নবায়নের ফি পাঁচ হাজার টাকার পরিবর্তে যখন ৫০ হাজার টাকা করা হলো তখন থেকেই লাইসেন্সবিহীন হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সংখ্যা বাড়তে থাকল। কারণ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের মধ্যে অধিকাংশই ছোট। যাদের অনেকেই সব খরচ মিটিয়ে আয় করতে পারে না। তাদের পক্ষে ৫০ হাজার টাকা ফি দিয়ে লাইসেন্স নবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া অনলাইনে নিবন্ধন ও নবায়ন করার ক্ষেত্রে যেসব শর্ত দেয়া আছে পূরণ করতে পারে না অনেক হাসপাতাল। তথ্যগুলো নির্দিষ্ট ফরমেটে পূরণ করতে হয়। কোনো তথ্য বাদ থাকলে সফটওয়্যার তা নেয় না। এমন আরো কিছু কারিগরি ঘাটতির কারণে অনেকেই ওই ফরমেট পূরণ করতে পারে না। তাছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে আবাসিক এলাকায় বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক না রাখার যে নির্দেশনা আছে সেটিও নবায়নের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ অনেক হাসপাতাল ও ক্লিনিক এখনো আবাসিক এলাকায় রয়ে গেছে। ফরম পূরণের ক্ষেত্রে ঠিকানার জায়গায় গিয়ে অনেকে আটকে যাচ্ছে। ফলে তারাও নিবন্ধন বা নবায়ন এড়িয়ে যাচ্ছে।

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়