কলঙ্কের ভার বইছে দুদক!

আগের সংবাদ

করোনার বিধিনিষেধ শিথিল করল দিল্লি

পরের সংবাদ

হাসপাতালে জামাই আদরে ‘বন্দি’ সম্রাট-জি কে শামীম

প্রকাশিত: জুলাই ২৫, ২০২১ , ৮:৪৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুলাই ২৫, ২০২১ , ৮:৪৫ পূর্বাহ্ণ

ব্যবসা-রাজনীতি সবই করছেন অবাধে।

কখনো বেশি মাত্রায় ডায়াবেটিস, কখনো পেটে ব্যথা, আবার কখনো হার্টের সমস্যা- এমনই সব কারণ উল্লেখ করে কারাগার থেকে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন আলোচিত কিছু কারাবন্দি। অস্ত্র মামলা, অর্থ আত্মসাৎ, ক্যাসিনোকাণ্ড বা হত্যা মামলার আসামি হয়েও প্রভাব খাটিয়ে পছন্দের হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যাপন করছেন আয়েশি জীবন। কর্তব্যরত চিকিৎসকদের ম্যানেজ করে মাসের পর মাস হাসপাতালেই দিন কাটছে তাদের। অনেককে বারবার চিঠি দিয়েও ফেরত পাচ্ছে না কারা কর্তৃপক্ষ। উল্টো নানা অসুস্থতার ছুতোয় চিকিৎসা দরকার জানিয়ে হাসপাতালের প্রিজন সেলে রেখে জামাই আদর করা হচ্ছে তাদের।

বিতর্কের মুখে কেউ কারাগারে ফিরলেও আবারো কিছু দিন পর ফিরছেন পছন্দের ঠিকানা হাসপাতালের প্রিজন সেলে। যেখান থেকে সব অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন অবাধে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, কিছু কারাবন্দি কারাগারে আছেন, নাকি নিজের বাড়িতে আছেন তা বোঝার উপায় নেই। নেতাকর্মীদের সঙ্গে দেখা করা, মোবাইল ফোন ব্যবহার করে অফিসের কার্যক্রমে অংশ নেয়া, স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে বিভিন্ন মহলে তদবির করা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করার মতো বিষয় অনেকটা ওপেন সিক্রেট। এরপরও তাদের আয়েশি জীবনে লাগাম টানার কেউ নেই।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে প্রিজন সেলে বসেই ডেসটিনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রফিকুল আমিনের জুম মিটিংয়ে অংশ নেয়ার ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হলে বিষয়টি আবারো আলোচনায় আসে। বিতর্কের মুখে রফিকুল আমিনকে ছাড়পত্র দিয়ে কারাগারে পাঠানো হলেও প্রিজন সেলে আয়েশি অবস্থায় দিন কাটছে অপর দুই আলোচিত কারাবন্দি যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা ক্যাসিনোকাণ্ডের হোতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ও বিতর্কিত ঠিকাদার এস এম গোলাম কিবরিয়া ওরফে জি কে শামীম।

এদের মধ্যে সম্রাট কিছুটা অসুস্থ বলে জানা গেলেও জি কে শামীম ডায়াবেটিসের কারণ দেখিয়ে স্থায়ী আস্তানা গেড়েছেন হাসপাতালে। ইতোমধ্যে কারা কর্তৃপক্ষ সম্রাটকে ফেরত পেতে ১৩ বার এবং জি কে শামীমকে ফেরত পেতে ৬ বার চিঠি দিলেও কর্ণপাত করেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কারাগার ও হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি চক্র মোটা টাকার বিনিময়ে অসুস্থতার অজুহাতে তাদের হাসপাতালে থাকার সুযোগ করে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ গ্রেপ্তারের আগে তারা সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে চষে বেড়িয়েছেন দেশ-বিদেশ।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের তথ্যানুযায়ী, গত ৬ জুলাই রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ২৩ জন কারাবন্দি ভর্তি ছিলেন। এর মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ৩ জন, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫ জন, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে ৩ জন, জাতীয় মানসিক হাসপাতালে ৬ জন, পঙ্গু হাসপাতালে ১ জন, জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালে ২ জন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে ৩ জন ভর্তি ছিলেন। এই ২৩ জন রোগীর মধ্যে ১৭ জন দেশের বিভিন্ন কারাগারের বন্দি। উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের মাধ্যমে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে তাদের। বাকিদের মধ্যে বিএসএমএমইউ হাসপাতালের প্রিজন সেলে ভর্তি রয়েছেন ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ও জি কে শামীম। অভিযোগ রয়েছে, চিকিৎসা নিতে যাওয়া বন্দিদের মধ্যে সামর্থ্যবানদের মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অবৈধ সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে। যাদের সামর্থ্য বেশি তারা হাসপাতালেই থেকে যাচ্ছেন মাসের পর মাস।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর গ্রেপ্তারের পর কিছু দিন কারা হাসপাতালে ছিলেন মাদক, অস্ত্র আইন ও অবৈধ সম্পদ অর্জন মামলার আসামি সম্রাট। মাসখানেকের মধ্যেই ওই বছরের ২৪ নভেম্বর তিনি বুকে ব্যথা নিয়ে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে ভর্তি হন। সে দফায় হাসপাতালের প্রিজন সেলে টানা ৮ মাস থাকেন। এ সময় ১১ বার চিঠি দিয়েও তাকে ফেরত পায়নি কারা কর্তৃপক্ষ। উল্টো কারাগারের বেডে বসে নেতাকর্মীদের সঙ্গে দেখা করার বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে সমালোচনার মুখে তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফেরত পাঠানো হয়। সেখানে গিয়েও তিনি কারা হাসপাতালেই থাকেন।

গত বছরের ২৪ নভেম্বর আবারো তিনি একই হাসপাতালে ভর্তি হন। এখন পর্যন্ত তিনি সেখানেই আছেন। ইতোমধ্যে তাকে ফেরত পেতে আবারো ১৩ বার চিঠি দেয়া হলেও কর্ণপাত করছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সম্রাটের হার্টের অবস্থা খারাপ হওয়ায় তাকে হাসপাতালের ডি-ব্লকের সিসিইউ ওয়ার্ডের ২ নম্বর বেডে ভর্তি রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে হাসপাতালের একটি সূত্র। তবে ডায়াবেটিসের কারণ দেখিয়ে একই হাসপাতালে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কেবিনে ঠিকই আয়েশি জীবন পার করছেন বিতর্কিত ঠিকাদার অস্ত্র ও মাদক মামলার আসামি জি কে শামীম। গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তারের পর হাসপাতালের বেডেই বেশির ভাগ সময় কাটছে তাদের। শেষ দফায় গত ১৫ এপ্রিল বিএসএমএমইউতে ভর্তি হন তিনি।

এরই মধ্যে তাকে ফেরত পেতে কারা কর্তৃপক্ষ ৬ বার চিঠি দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। কিন্তু তাকে ফেরত পাঠানো হয়নি। আগের দফায় গত বছরের ৪ এপ্রিল হাসপাতালে ভর্তি হলে ৭ বার চিঠি চালাচালির পর কারাগারে ফেরত পাঠানো হলেও কয়েদিদের সেলে থাকেননি তিনি। থেকেছেন কারা হাসপাতালে। অভিযোগ রয়েছে, শারীরিক তেমন কোনো সমস্যা না থাকলেও মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমে থাকছেন তিনি। নিয়মিত দেখা করছেন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। চালিয়ে যাচ্ছেন নিজের ব্যবসা-বাণিজ্যও। স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে বিভিন্ন মহলে তদবিরও চালিয়ে যাচ্ছেন।

এদিকে বিতর্কের মুখে কারাগারে ফেরত যাওয়া ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের এমডি রফিকুল আমিন ২০১২ সালের নভেম্বরে গ্রেপ্তার হওয়ার পর বেশির ভাগ সময়ই বিএসএমএমইউ হাসপাতালে আয়েশি জীবন কাটিয়েছেন। শারীরিক কোনো সমস্যা না থাকলেও কারা কর্তৃপক্ষের ২৭ বার চিঠি দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে তার বেলায়। সবশেষ প্রিজন সেলে বসে জুম মিটিংয়ে অংশ নেয়ায় বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর ছাড়পত্র দিতে বাধ্য হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন। হাসপাতাল থাকাকালে নতুন এমএলএম কোম্পানি প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও আলোড়ন সৃষ্টি করে সব মহলে।

জানতে চাইলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার সুভাষ কুমার ঘোষ ভোরের কাগজকে বলেন, কারা হাসপাতালে যতক্ষণ চিকিৎসা সম্ভব ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো কারাবন্দিকে চিকিৎসার জন্য বাইরের কোনো হাসপাতালে পাঠানো হয় না। শুধু অপারেশন ও জটিল কোনো টেস্টের দরকার হলেই বাইরের হাসপাতালে পাঠানোর অনুমতি দেয়া হয়। তাও আবার কারা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী। চিকিৎসা শেষ হলে আবার কারাগারে ফেরত আনা হয়। এর মধ্যে ১৫ দিন পর পর সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে চিঠি দিয়ে শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চেয়ে ফেরত পাঠানোর তাগিদ দেয়া হয়।

তিনি আরো বলেন, সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল যদি মনে করে রোগীর আরো চিকিৎসা দরকার, তাহলে আর আমাদের কিছু বলার থাকে না। সম্রাট ও জি কে শামীমকেও ফেরত চেয়ে বারবার চিঠি দেয়া হচ্ছে। সম্রাটের শারীরিক অবস্থা অনেক খারাপ বলে শুনেছি। এর বাইরে কিছু জানা নেই।

এক প্রশ্নের জবাবে সিনিয়র জেল সুপার আরো বলেন, কারাগারে পাঠানোর পর নিয়ম অনুযায়ী কারারক্ষীদের সঙ্গে পুলিশও দায়িত্ব পালন করে। এরপরও যদি কোনো নিয়মের ব্যত্যয় ঘটে তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করি। যেমনটা ডেসটিনির রফিকুল আমিনের ঘটনার পর ১৭ কারারক্ষীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আমাদের জায়গা থেকে বিষয়টি খুবই স্পষ্ট, কেউ অনিয়মের আশ্রয় নিলে তাকে ছাড় দেয়া হবে না।

এ বিষয়ে বিএসএমএমইউ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নজরুল ইসলাম খান মুঠোফোনে ভোরের কাগজকে বলেন, প্রিজন সেলের বন্দিদের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে আগ্রহী নই। এ বিষয়ে চেষ্টা করেও বিএসএমএমইউ হাসপাতালের অন্য কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়