ফকির আলমগীরের কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ

আগের সংবাদ

হাসপাতালে জামাই আদরে ‘বন্দি’ সম্রাট-জি কে শামীম

পরের সংবাদ

কলঙ্কের ভার বইছে দুদক!

প্রকাশিত: জুলাই ২৫, ২০২১ , ৮:৩৩ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুলাই ২৫, ২০২১ , ৮:৩৩ পূর্বাহ্ণ

হলমার্কের লুণ্ঠনকৃত অর্থের কী হবে, ৩৮ মামলার মধ্যে মাত্র একটির রায়।

দেশের ব্যাংকিং খাতের ভিত কাঁপিয়ে দেয়া প্রথম বৃহৎ কেলেঙ্কারির নাম হলমার্ক গ্রুপ। প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে ভুঁইফোড় গ্রুপটি রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নিয়েছিল প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। ২০১০-২০১২ সালের মধ্যে ঋণের নামে বের করে নেয়া এ অর্থ আদায়ে মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগ করছেন হলমার্ক গ্রুপের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তানভীর মাহমুদসহ প্রতারকচক্র। তবে লুণ্ঠনকৃত অর্থ আদায়ে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হলমার্কের সব সম্পত্তি বিক্রি করেও এ অর্থ আদায় অসম্ভব।

এদিকে হলমার্ক কেলেঙ্কারি উন্মোচনের জন্য আটঘাট বেঁধে মাঠে নামলেও দীর্ঘ ৯ বছরেও এর অনুসন্ধান ও তদন্ত শেষ করতে পারেনি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এখনো এ কেলেঙ্কারির অনুসন্ধান- তদন্তের ভার বয়ে চলছে সংস্থাটি।

২০১০-২০১২ সালের মার্চের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকসহ দেশি-বিদেশি ৪১টি ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে অখ্যাত ব্যবসায়ীগোষ্ঠী হলমার্ক ৩ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা তুলে নেয়। এর মধ্যে জালিয়াতির খবর প্রথম প্রকাশিত হওয়ার পর (মালিকের গ্রেপ্তারের আগে) মাত্র ৫৬৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকা আদায় হয়েছে। এরপর গত ৯ বছরে এক টাকাও আদায় হয়নি। প্রতি মাসে ১০০ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধের শর্তে ২০১৩ সালের আগস্টে জামিন পান মামলার অন্যতম আসামি হলমার্কের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম। কিন্তু তিনি ছয় বছর জামিনে বাইরে থাকলেও এক টাকাও পরিশোধ করেননি। ফলে জামিন বাতিল করে ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই তাকে ফের কারাগারে পাঠান আদালত।

সূত্রমতে, বন্ধক রাখা সম্পত্তি আদালতের মাধ্যমে বিক্রির অনুমতি পেলেও ক্রেতার অভাবে তা বিক্রি হচ্ছে না। আর সব সম্পত্তি বিক্রি করলেও কমপক্ষে ২ হাজার কোটি টাকা আদায় করা সম্ভব হবে না। এ অবস্থায় অনাদায়ী ৩ হাজার ৪৪৮ কোটি ২০ লাখ টাকা উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সোনালী ব্যাংক। এসব ঋণ আদায়ে অর্থঋণ আদালত ও সাধারণ আদালতে মামলা হয়েছে। এ বিষয়ে দুদক অনুসন্ধান শেষে পৃথক ৪০টি মামলা করে। এর মধ্যে ফান্ডেড ৩৮টি, আর নন-ফান্ডেড ২টি মামলা দায়ের করা হয়।

২০১২ সালে ফান্ডেড (সোনালী ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ) ১ হাজার ৫৬৮ কোটি ৪৯ লাখ ৩৪ হাজার ৮৭৭ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২৭ জনকে আসামি করে ১১ মামলা এবং ২০১৩ সালে ফান্ডেড প্রায় ৩৭২ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আরো ২৭ মামলা দায়ের করে দুদক। পরবর্তী সময়ে ফান্ডেড মোট ১ হাজার ৯৫৪ কোটি ৮৩ লাখ ৭১ হাজার ৭৮৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০১৪ সালের বিভিন্ন সময়ে ৩৮ মামলার চার্জশিট দেয় সংস্থাটি। যেখানে হলমার্ক গ্রুপের এমডি তানভীর মাহমুদ, তার স্ত্রী ও গ্রুপের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম, তানভীরের ভায়রা ও গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক তুষার আহমেদ এবং হলমার্ক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনকে আসামি করা হয়।

অভিযোগ দাখিলের পর দীর্ঘ ৭ বছরে ৩৮ মামলার মধ্যে বিচারিক রায় এসেছে মাত্র একটি মামলায়। ২০১৬ সালে ঢাকার পাঁচ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের রায়ে সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তাসহ তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন- হলমার্ক গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান প্যারাগন নিট কম্পোজিটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম রাজা, পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন ও সোনালী ব্যাংকের হোটেল রূপসী বাংলার কর্মকর্তা সাইফুল হাসান। বাকি

৩৭টি মামলা সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে ঝুলছে। এসব মামলায় প্রায় হাজারের উপরে সাক্ষী থাকলেও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে অর্ধেকের মতো। খুব সহসাই কোনো মামলার রায় হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। এসব মামলায় হলমার্ক গ্রুপের চেয়ারম্যান, এমডি ও জিএম কারাগারে থাকলেও দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন ব্যাংকটির অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বেশির ভাগই।

এ বিষয়ে দুদকের প্রসিকিউটর মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর বলেন, মামলাগুলো কয়েকটি আদালতে বিচারাধীন। মাঝে মাঝে বিচারক পরিবর্তনের কারণে এগুলোর বিচারকাজে বিলম্ব হচ্ছে। এর মধ্যে গত দেড় বছর করোনার কারণে বিচারকাজ ঝিমিয়ে পড়ছে। মাঝে শুরু হলেও করোনার মধ্যে আসামিদের হাজির করা ও সাক্ষীদের আদালতে উপস্থিতির বিষয়ে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। ফলে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে।

সোনালী ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা মনে করেন, আদালতে যাওয়ায় হলমার্কের হাতিয়ে নেয়া অর্থের বড় অংশ ফেরত পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কারণ হাতিয়ে নেয়া অর্থের বিপরীতে হলমার্কের নামমাত্র জামানত রয়েছে। এছাড়া হলমার্ক গ্রুপের ঋণের কোনো গ্যারান্টর ছিল না। সবটাই ছিল জালিয়াতি। এর মধ্যে যারা টাকা ফেরত দেবেন, তারা এখন দুদকের মামলায় জেলে রয়েছেন। কেউ রয়েছেন পলাতক।

এ বিষয়ে ব্যাংকটির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, হলমার্কের কথা এলেই সোনালী ব্যাংকের সমালোচনা হয়। এ কারণেই ব্যাংকটির অনেক অর্জন ¤øান হয়ে যাচ্ছে। তাই যত দ্রুত সম্ভব এর সমাধান হওয়া উচিত।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হলমার্কের এমডি-চেয়ারম্যান কারাগারে আছেন। তাদের ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পত্তি আমরা পাহারা দিচ্ছি। প্রতিটি ঋণের বিপরীতে মামলা করা হয়েছে। দুদকও মামলা করেছে। হলমার্কের বিষয়টি যেহেতু বিচারাধীন, তাই তাদের কাছ থেকে পাওনা আদায়ে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। বলতে পারেন মামলার জালে আটকে আছে টাকা উদ্ধার প্রক্রিয়া।

তার মতে, মামলা না দিয়ে আগেই টাকা উদ্ধার করে নিতে পারত। কারণ মামলা দেয়া মানেই টাকা ফেরত পাওয়া দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় চলে যাওয়া। এতে উদ্ধার হতেও পারে আবার নাও হতে পারে। এ বিষয়ে কথা বলতে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আতাউর রহমান প্রধানের মোবাইল নম্বরে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

জানা যায়, দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর ধরে চলছে আলোচিত হলমার্ক কেলেঙ্কারির নন-ফান্ডেড ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা লোপাটের তদন্ত। মাঝে নন-ফান্ডেড অংশের ২টি মামলা হলেও তদন্তের খুব বেশি অগ্রগতি নেই। সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন রূপসী বাংলা শাখায় করা মাদার এলসির বিপরীতে দেয়া ঋণের যাবতীয় ভার সরকারি ওই ব্যাংকটির ওপর পড়েছে। অর্থাৎ ঋণের পুরো টাকাই এখন ফান্ডেড (সরাসরি সোনালী ব্যাংকের দায়)। যদিও কেলেঙ্কারির সঙ্গে ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে প্রায় ৪১টি দেশি-বিদেশি ব্যাংকের শতাধিক শাখার জড়িত থাকার প্রমাণ রয়েছে দুদকের হাতে। তারপরও ২০১৪ সালের ৭ এপ্রিল অজ্ঞাত কারণে হলমার্ক কেলেঙ্কারির এ অংশের দুর্নীতি অনুসন্ধান না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কমিশন। বিভিন্ন বিতর্ক ও পর্যালোচনার পর সোনালী ব্যাংকের তদন্ত রিপোর্টের সূত্র ধরে ২০১৫ সালের ১৩ আগস্ট ফের অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। সংস্থাটির পরিচালক মীর জয়নুল আবেদীন শিবলীর নেতৃত্বে আট সদস্যের টিমকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হয়। এর মধ্যে বেশ কয়েকবার টিম পুনর্গঠন হয়েছে।

দীর্ঘ ছয় বছর বিরতির পর এ ঘটনায় নন-ফান্ডেড অংশের মানিলন্ডারিং আইনে প্রথম মামলা দায়ের হয় ২০১৮ সালের ১১ ডিসেম্বর। মামলায় ঢাকা ব্যাংকের ১৪টি ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকের একটি হিসাবে সন্দেহজনকভাবে ১৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা হস্তান্তর এবং স্থানান্তর করার দায়ে হলমার্ক গ্রুপের এমডি তানভীরের ভায়রা ও গ্রুপের সাবেক জেনারেল ম্যানেজার (জিএম-কমার্শিয়াল) তুষার আহমেদ, এক সময়ের জিএম মোহাম্মদ আসলাম উদ্দিন ও তুষার আহমেদের আত্মীয় সুমন ভূঁইয়ার নামে মামলা করা হয়। এছাড়া নন-ফান্ডেড দ্বিতীয় মামলাটি হয় ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি। মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ১ কোটি ৯ লাখ ৬৬ হাজার ৭৬১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। মামলায় আসামি করা হয় সোনালী ব্যাংকের বরখাস্ত হওয়া এজিএম সাইফুল হাসান, ভেনারেবল এক্সপোর্ট ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান আশরাফ উদ্দীন সেলিম, এমডি সঞ্জীবন রায়, ড্রেস মি ফ্যাশনের চেয়ারম্যান জিনাত ফাতেমা, এমডি তাওহীদ হোসেন ও পরিচালক তসলিম হাসানকে।

এ বিষয়ে অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মকর্তা বলেন, হলমার্কের নন-ফান্ডেড অংশের অনুসন্ধান-তদন্ত ২টিই চলছে। কমিশন এ অংশের ওপরে ইতোপূর্বে ২টি মামলাও করেছে। অনুসন্ধান শেষে খুব শিগগিরই কমিশনে প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে। হতে পারে আরো মামলা। এছাড়া ইতোপূর্বে যে ২টি মামলা করা হয়েছে, তদন্ত শেষে এ ২টি মামলারও চার্জশিট দাখিল করা হবে।

জানা যায়, হলমার্ক গ্রুপের মোট কারখানার সংখ্যা প্রায় ৪৩টি। এর মধ্যে ২১টিকে ঘিরেই সোনালী ব্যাংকের সব পাওনা রয়েছে। এগুলো হলো- হলমার্ক ফ্যাশন, হলমার্ক ডিজাইন ওয়্যার, ওয়াল মাট ফ্যাশন, ইসলাম ফ্যাশন, ডন অ্যাপারেল, ফারহান ফ্যাশন, মাহমুদ অ্যাপারেল, হলমার্ক স্পিনিং, ববি ফ্যাশন, হলমার্ক ডেনিম কম্পোজিট, ববি ফ্ল্যাট বেড প্রিন্টিং, হলমার্ক এক্সেসরিজ, হলমার্ক নিট কম্পোজিট, ববি ডেনিম কম্পোজিট, হলমার্ক স্টাইল, পারফেক্ট এমব্রয়ডারি, হলমার্ক প্যাকেজিং, জিসান নিট কম্পোজিট, হলমার্ক নিটিং এন্ড ডায়িং, আনোয়ার স্পিনিং ও ম্যাক্স স্পিনিং। শেষের ২টি কারখানা মূলত হলমার্কের সৃষ্টি করা বেনামি প্রতিষ্ঠান। ওই ২টি কারখানার বিপরীতে প্রাপ্ত দেনা আদায়ে দেওয়ানি আদালতে মানিস্যুট (অর্থঋণ) মামলা করা হয়েছে।

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়