জাপান থেকে এলো অ্যাস্ট্রাজেনেকার ২ লাখ ৪৫ হাজার টিকা

আগের সংবাদ

পুলের ধারে ‘হট’ ফটোশ্যুট সুহানার, চমকে উঠলেন শাহরুখ

পরের সংবাদ

রাশেদ খান মেননের মিথ্যাচারে মর্মাহত

প্রকাশিত: জুলাই ২৪, ২০২১ , ৩:৫০ অপরাহ্ণ আপডেট: জুলাই ২৪, ২০২১ , ৩:৫৫ অপরাহ্ণ

জননেতা রাশেদ খান মেনন তার ‘এক জীবন স্বাধীনতার সূর্যোদয়’ গ্রন্থটি নিয়ে নিজেই বলেছেন কেবল আত্মজীবনী নয়, ইতিহাসের অনুদঘাটিত, অলিখিত এবং বহুলাংশে অস্বীকৃত অংশ, যা ইতিহাসবেত্তা, গবেষক, চিন্তকদের বিবেচনার বিষয় হবে নিশ্চয়ই।

ওই গ্রন্থের ১২১, ১২৬, ১২৮, ১২৯ পৃষ্ঠায় আমাকে নিয়ে তিনি যেসব মন্তব্য করেছেন, যেসব তথ্য হাজির করেছেন ‘সম্ভবত’ শব্দ প্রয়োগ করে, যেসব অভিযোগ এনেছেন রাশেদ খান মেনন; তার মধ্য দিয়ে একদিকে তিনি অহংবোধ ও উগ্রতায় চীন-রুশ দ্বন্দ্বের ষাটের দশকের সময়কালের অনাকাক্সিক্ষত অস্থিরতাকে তুলে ধরেছেন। তার এই পরিণত বয়সে সংসদ সদস্য, সাবেক মন্ত্রীর পদ-পদবিধারী সুদীর্ঘকাল রাজনীতিতে অবস্থানকারী মানুষটির নিরাসক্ত, নৈব্যক্তিক আত্মসমালোচনা করতে অপারগতা দেখে হতবাক ও মর্মাহত হয়েছি।

১. বইটির ১২১নং পৃষ্ঠায় মেনন লিখেছেন, ‘কমিটিতে আমি প্রথম সহসভাপতি নির্বাচিত হই। অন্য সহসভাপতি পদে ফরহাদ ভাই, ডা. সারোয়ার আলী ও পঙ্কজ ভট্টাচার্যকে সহসভাপতি করে দিলেন।’ মেনন নির্বাচিত হন আর ডা. সারোয়ার আলী, পঙ্কজ ভট্টাচার্যকে ‘করে দেয়া’ হয়! ১৯৬৩ সালে নির্বাচিত ছাত্র ইউনিয়নের কমিটি সম্পর্কে মেননের এই অবজ্ঞাপূর্ণ অভিমতের বিচারের ভার পাঠকের ওপর ছেড়ে দিলাম। বলা বাহুল্য, জগন্নাথ হলের ছাত্র ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়ন সম্মেলনে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও পঙ্কজ ভট্টাচার্যকে নির্বাচিত করে পাঠান।

২. দলের মধ্যে দ্ব›দ্ব তীব্র হলে ফরহাদ ভাইয়ের অনুসারীরা আমার (মেননের) বদলে সারোয়ার আলীকে প্রথম সহসভাপতি বলে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে; অবশ্য পারেনি। মেননের এই কষ্টকল্পিত বয়ান অসত্য। ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় এরূপ কোনো কথা উঠেনি কখনো।

৩. মেননের কথায় ‘এটা আগেই স্থির ছিল যে নির্বাচনে জিতলে আমিই (মেনন) ভিপি হবো। অন্যদের ইন্ধন পেয়ে জাকির আহমেদ (পরে বিচারপতি) যে আমার সহপাঠী ছিল তারও মনে ভিপি হওয়ার ইচ্ছা জাগৃত হলো। সেও এ নিয়ে সভা দাবি করে বসল। যদ্দুর মনে পড়ে, এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল পঙ্কজ ভট্টাচার্য। সে মূলত একজন খেলোয়াড় ছিল। সম্ভবত জগন্নাথ হলের ফুটবল টিমের গোল কিপার ছিল। পার্টি তথা ফরহাদ ভাই তাকে তুলে নিয়ে এসে কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি করে দেন।’ এছাড়া মেননের দম্ভোক্তি ‘আগেই স্থির ছিল আমি ভিপি হবো’ কোথায় কোন কমিটি, সাব-কমিটিতে এটা স্থির হয় মেনন সাহেব বলবেন কি?

স্বীকার করি যে আমি জগন্নাথ হলের গোলকিপার ও টিমের ক্যাপ্টেন ছিলাম, স্কুলজীবনে পূর্ব পাকিস্তান স্কুল ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে রানার্স আপ হওয়া চট্টগ্রাম মিউনিসিপাল হাইস্কুলের ফুটবল টিমেরও ক্যাপ্টেন ছিলাম, সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক পূর্ব পাকিস্তান ক্রিকেট টিমে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন, ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগের আব্দুর রাজ্জাক পূর্ব পাকিস্তান জুনিয়র কুস্তি খেলায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন, যা অগৌরবের বিষয় নিশ্চয়ই নয়। স্কুলজীবনের শেষে ও কলেজজীবনে চট্টগ্রামে ছাত্র ইউনিয়ন করতাম ইত্যাদি মেননের জানার কথা নয়, কিন্তু ‘মোহাম্মদ ফরহাদ তাকে (পঙ্কজ ভট্টাচার্য) তুলে নিয়ে এসে কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি করে দেন’ বক্তব্যটি মেননের আত্মম্ভরিতা ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য উপাদান জাত।

কথিত জাকির আহমদ (বিচারপতি) যিনি এস এম হল থেকে ডাকসু সদস্য হিসেবে মেননের সঙ্গে নির্বাচিত হয়ে এসেছিলেন, তিনি নাবালক ছিলেন না। তিনি ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সভা ডেকে ডাকসুর ভিপি মেনন হবেন না জাকির হবেন তা স্থির করার দাবি করেন। বলা বাহুল্য, দীর্ঘ আলোচনার পর কেন্দ্রীয় কমিটির সর্বসম্মত প্রস্তাবে রাশেদ খান মেনন সহসভাপতি এবং মতিয়া চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ডাকসুতে মনোনীত করেন। সভাপতি বদরুল হক (বিচারপতি) কারারুদ্ধ থাকায় পঙ্কজ ভট্টাচার্য কার্যকরী সভাপতি হিসেবে উপরোক্ত সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন- মেনন কথিত ‘জাকির আহমদ নিয়ে পঙ্কজ ভট্টাচার্যের অগ্রণী ভূমিকা’র মিথ্যা দোষারোপের ফানুস এভাবে ফেটে যায়। ‘একই সাথে কমিউনিস্ট পার্টি এমন একজনকে চাচ্ছিল যে পার্টির অনুগত হবে’ মেননের এই উক্তিটি যে যুক্তিহীন মিথ্যাচার তাও প্রমাণিত হয়।

৪. ডাকসু নির্বাচনের পরে ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির হোসেনি দালানস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সভায় ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হায়দার আকবর খান রনোর বিরুদ্ধে আমি প্রস্তাব উত্থাপন করি এই মর্মে যে, জগন্নাথ হলের সাধারণ ছাত্রদের সামনে রনো চিৎকার করে বলেন, ‘মেননকে ডাকসুর ভিপি পদে মনোনীত না করলে ছাত্র ইউনিয়ন দুটি অংশে বিভক্ত হবে যা সংগঠনের ঐতিহ্য, সম্মান, মর্যাদা ও সংহতিবিরোধী’। এহেন হুমকি সাধারণ সম্পাদক পদাধিকারীর পক্ষে একটি দণ্ডনীয় অপরাধ বিধায় তার বিরুদ্ধে বহিষ্কারাদেশের প্রস্তাব আনা হয়। তর্কবিতর্কে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল। একপর্যায়ে দলের কোষাধ্যক্ষ ওয়ালিউল ইসলাম (পরবর্তীতে সচিব) তার প্রতিক্রিয়ায় অগণতান্ত্রিক, অশ্লীল মন্তব্য করেন। দীর্ঘ আলোচনা শেষে রনোর বিরুদ্ধে উত্থাপিত বহিষ্কার প্রস্তাব প্রত্যাহার করে তাকে ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক করে নিন্দাপ্রস্তাব এবং ওয়ালিউল ইসলামের বিরুদ্ধেও নিন্দাপ্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। মেননের বয়ানে আছে ‘মেডিকেল কলেজ ছাত্র ইউনিয়ন নেতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী (গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র) ও মীর্জা সোহবান ফিমার বোন (উরুর হাড়) হাতে সভাস্থলের কাছে অবস্থান নেয় ইত্যাদি।’

৫. রাশেদ খান মেননের গ্রন্থে বর্ণিত ছাত্র সম্মেলনে পল্লীকবি জসীমউদ্্দীনের সন্তান জামাল আনোয়ার বাসুকে ছুরিকাঘাত করাসহ তাণ্ডব সৃষ্টির নৈতিক দায়িত্ব রাশেদ খান মেননের গ্রন্থে নেই। আছে উল্লাস, উচ্ছ¡াস ও প্রতিপক্ষের প্রতি অবজ্ঞা। ইকবাল হলের ছাদে বিতাড়িতরা মাত্র ৮০ জন মিলে মতিয়া চৌধুরী, সাইফুদ্দিন মানিকের নেতৃত্বে ছাত্র ইউনিয়নের কমিটি গঠনের উল্লেখ করেছেন, যার জবাব দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। ছাত্র ইউনিয়ন মতিয়া গ্রুপের ’৬৬-৬৭ সনে ডাকসু সহসভাপতি মাহফুজা খানম এবং সাধারণ সম্পাদক মোর্শেদ আলী নির্বাচিত হওয়া ও ইকবাল হল, জগন্নাথ, রোকেয়া হলে মতিয়া গ্রুপের প্যানেল জয়যুক্ত এবং অধিকাংশ জেলায় সংগঠন পুনর্গঠিত হওয়া এবং ৬ দফাকে ১১ দফার অঙ্গীভূত করে জাতীয় দাবি ১১ দফায় ঐক্যবদ্ধ ছাত্র আন্দোলন গড়ে তুলে গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম রূপকার ও স্থপতির ভূমিকা পালন ইতিহাসে স্থান পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন বিশেষ গেরিলা বাহিনীর ভূমিকা দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে।

লেখার বাহুল্য বর্জন করে উপসংহারে দুটি অভিযোগ আনতে চাই রাশেদ খান মেননের বিরুদ্ধে, তার লিখিত গ্রন্থের অনুশোচনাহীন বয়ানের জন্য।

এক. ছাত্র ইউনিয়ন মতিয়া-মেনন গ্রুপে বিভক্তির খেসারত দিতে হয়েছে আমাকে- বিভক্তিপূর্ব কেন্দ্রীয় কার্যকরী সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্যকে মেননের অনুসারী একদল বিভ্রান্ত যুবক ‘মালাউন, ভারতের দালাল’ প্রভৃতি অভিধায় অভিহিত করে উত্তম মধ্যম চালিয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে; তাতে মেননের বিবেক দংশনের লক্ষণ দেখিনি- গ্রন্থেও তার চিহ্নমাত্র নেই। যদিও এহেন ঘটনা আমাকে সংখ্যালঘু মনস্তত্ত্বের শিকারে পরিণত করতে পারেনি।

দুই. ছাত্র ইউনিয়ন-৬৫ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করার অপরাধে পঙ্কজ ভট্টাচার্যের বিরুদ্ধে ‘মারপিট ও ঘড়ি চুরি’র ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন মেনন গ্রুপের অন্যতম সহসভাপতি জাফরুল্লাহ চৌধুরী (গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র), যে মামলায় প্রায় মাসখানেক হাজতবাস করতে হয়েছে আমাকে। সে বিষয় নিয়ে কখনো রাশেদ খান মেননকে দুঃখ প্রকাশ করতে দেখিনি, বিবেক দংশনের লক্ষণ প্রত্যক্ষ করিনি। (উল্লিখিত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মাধ্যমে ২৫ বছর পর ১৯৯০ সালে এরশাদ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ভাঙার অভিযোগ এনে আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। ইত্তেফাক পত্রিকায় সংবাদটির শিরোনাম ছিল ‘২৫ বছরেও শত্রæতা কমেনি’।)

মেননের গ্রন্থে কমিউনিস্ট পার্টিসহ জাতীয়-আন্তর্জাতিক বিতর্কিত বিষয়াবলি নিয়ে যারা বোদ্ধা-চিন্তক-সংশ্লিষ্ট তারা তাদের অভিমত দেবেন আশা করি।

আমি উত্থাপিত বিষয়াদির সংশোধন প্রত্যাশা করি বন্ধুবর রাশেদ খান মেননের কাছে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়