গাইবান্ধার বিভিন্ন দাবিতে নিউ ইর্য়কে প্রবাসী গাইবান্ধাবাসীর মানববন্ধন

আগের সংবাদ

দুই ডোজ টিকা নিয়েও চিকিৎসকের শরীরে দুই ধরনের করোনা

পরের সংবাদ

ঈশ্বরদীতে দুই মাসে ৩০০টি তাঁত বন্ধ

প্রকাশিত: জুলাই ১৯, ২০২১ , ৯:০৬ অপরাহ্ণ আপডেট: জুলাই ১৯, ২০২১ , ৯:০৭ অপরাহ্ণ

পাবনার ঈশ্বরদী শহরের ফতেমোহাম্মদপুরের বেনারসি পাড়ায় দুইমাসের ব্যবধানে ৩০০টি বেনারসি তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। বাকিগুলোও বন্ধের উপক্রম। করোনা ভাইরাসের প্রভাব ও বেনারসি উপকরণের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় এভাবে বন্ধ হতে চলেছে এখনকার ঐতিহ্যবাহী বেনারসি তাঁতের কারখানা। তবুও ঈদকে সামনে রেখে তাঁতিরা স্বপ্ন দেখছেন ঘুরে দাঁড়াবার।

তাঁতমালিক সূত্র জানায়, ঈশ্বরদী শহরের ফতেমোহাম্মদপুরে বেনারসিপাড়ায় পাঁচ শতাধিক তাঁত রয়েছে। এই শিল্পের সঙ্গে এখানে এক হাজার তাঁতিসহ আরও দুই হাজার নারী-পুরুষ শ্রমিক জড়িত। কিন্তু করোনার ভয়াবহ বিস্তাররোধে লকডাউনের কবলে তাঁদের বেঁচাকেনা এখন প্রায় বন্ধ। সেইসঙ্গে বেনারসি সুতা ও রঙের দাম বেড়েছে প্রচুর। এসব কারণে দুইমাস যাবৎ তাঁতিরা উৎপাদন করতে পারছেন না। ফলে এখানকার ৮০ ভাগ কারখানায় শাড়ি উৎপাদন বন্ধ। বেঁচাকেনাও শূন্যের কোঠায়।

তাঁতমালিক চাঁদ মোহাম্মদ বলেন, তাঁর দুটি কারখানায় তাঁতি ও কারচুপির শ্রমিক মিলে ৪৫ জন কর্মচারী রয়েছে। কিন্ত করোনার কারণে চাহিদা না থাকায় ২০ দিন ধরে তাঁর কারখানা পুরোপুরি বন্ধ। কোনো বেঁচাকেনা হয়নি। প্রতিদিন তাঁদের লোকসান দিয়ে কোনোমতে শ্রমিকদের রেখে দেওয়া হচ্ছে। তাঁতিরা কারখানা চালু রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা চালান। কিন্তু তা সম্ভব হয়ে উঠেনি।

ঈশ্বরদীর বিখ্যাত বেনারসি হাউস জাবেদ অ্যান্ড ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ জাবেদ জানান, দুই মাসের অধিক সময় ধরে বেনারসি সুতা ও রঙের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক। সুতা প্রতি কেজি ১০০০ টাকা বেশি দরে এবং রঙ ৬০০ টাকা বেশি দাম কিনতে হচ্ছে। দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি করোনা ও লকডাউনে প্রভাবে তাঁত কারখানাগুলো চালু রাখা সম্ভব হয়নি। গত দেড় মাসে তাঁর আটটি তাঁত বন্ধ করা হয়েছে।

সোমবার (১৯ জুলাই) সকালে সরেজমিনে দেখা গেছে, অধিকাংশ বেনারসি কারখানা বন্ধ। অল্পসংখ্যক কারখানা চালু থাকলেও তাঁতিদের তেমন কাজের চাপ নেই। বন্ধ কারখানা সামনে কিছু তাঁতি দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন কখন কারখানাগুলো চালু হবে। কিন্তু লোকসানের আশঙ্কায় তাঁত মালিকেরা কারখানাগুলো চালু করতে সাহস পাচ্ছেন না বলে জানা যায়।

ইউসুফ আলী নামে এক তাঁতি জানান, কারখানায় কাজ করে তাঁর সংসার চলত। কিন্তু এক মাস ধরে কারখানা বন্ধ থাকায় ভীষণ কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন তিনি। অনেক অপেক্ষায় আছেন তিনি আবার কখন চালু হবে কারখানা।

আসলাম হোসেন নামে আরেক তাঁতি বলেন, তাঁত কারখানা বন্ধ থাকায় অধিকাংশ তাঁতি এখন বেকার। লকডাউনের মধ্যে অনেক কর্মহীন মানুষ সরকারি সাহায্য সহযোগিতা পেয়েছেন। কিন্ত কাজ হারালেও তাদের কারো ভাগ্যেই জুটেনি সরকারি সহযোগিতা। এ পরিস্থিতিতে কখন পুরোপুরি খুলবে বেনারসি কারখানা সেই অপেক্ষায় দিন কাটছে তাদের সময়।

তাঁতি আবদুল করিম বলেন, কারখানায় একটি বেনারসি শাড়ি তৈরি করতে তাঁদের পাঁচ থেকে সাত দিন সময় লাগে। এ জন্য ১ হাজার ৫০০ টাকা মজুরি পান তাঁরা। কিন্তু দুই সপ্তাহ ধরে তাঁর মজুরি বন্ধ থাকায় তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে কষ্টের মধ্যে রয়েছেন।

সাত-আটজন তাঁতমালিকের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, ভারতীয় শাড়ি কাপড়ের অবাধ আমদানির কারণে এখানকার বেনারসি শিল্পে দুরবস্থা বিরাজ করছিল। এরইমধ্যে বেড়ে যায় সুতা ও রঙের দাম। এভাবে দাম বাড়তে না বাড়তেই শুরু হয় করোনা ও লকডাউনের প্রভাব। গতবছর লকডাউনের কারণে কারখানা বন্ধ থাকায় তারা ভীষণ লোকসানে মধ্যে পড়েন। সেই লোকসান কাটিয়ে উঠতে এবার ঈদে লাভের নতুন আশায় ব্যবসা করার স্বপ্ন দেখলেও এরইমধ্যে আরেক দফা বেনারসি উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়া চরম সংকটের মধ্যে পড়েছেন তারা। ঈদের সময়ে উৎপাদিত বেনারসি কিছু শাড়ি এখনও মজুত রয়েছে। কিন্তু কোনো বেচাকেনা নেই। বর্তমানে উৎপাদনও প্রায় বন্ধ। কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকায় গত একমাসে এখানকার ৩০০টি বেনারসি তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। তাঁতিরা জানান, সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে তারা এখন সবগুলো কারখানা চালুর অপেক্ষায় স্বপ্ন দেখছেন।

জানা গেছে, ঈশ্বরদী শহরের মোহাম্মদপুরে এলাকায় রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বেনারসি পল্লি। ভারতীয় নামীদামী ব্রান্ডের শাড়ির তুলনায় মানের দিক থেকে ঈশ্বরদী বেনারসি পল্লিতে উৎপাদিত বেনারসি কাতান শাড়ির মান অনেক উন্নত। একটু বেশি দাম হলেও এসব শাড়ি অনেক টেকসই। একারণে ফতেমোহাম্মদপুর এলাকায় গড়ে উঠেছে বেশ কিছু বেনারসি কাতান শাড়ি-কাপড়ের বিপনীবিতান। এখানকার আলমগীর বেনারসি শাড়িঘর, সোহেল বেনারসি, শামিম বেনারসি, জাবেদ বেনারসি, নাদিম বেনারসি, মহিউদ্দিন বেনারসি শাড়ি হাউজ, জাবেদ বেনারসি অ্যান্ড সিল্ক হাউজ’ নামে বেনারসি বিপনিবিতানের অবস্থাও শোচনীয়।

এসব বিপনিবিতানের মালিকরা বলেন, ঈশ্বরদীর ৮০ ভাগ বেনারসি কারখানা বন্ধ। ফলে তাদের শোরুমও বন্ধ রয়েছে। অন্যান্যবারের মতো এবার ঈদ মৌসুমে চাহিদা অনুযায়ী বিপণিবিতানে শাড়ি সরবরাহ করতে পারবেন না তাঁত মালিকরা। ফলে ঈদ মৌসুমে তারাও বেচাকেনা নিয়ে ভীষণ চিন্তিত।

ঈশ্বরদী বেনারসি তাঁতী সমিতির সহসভাপতি তরিকুল সাড্ডান বলেন, এমনিতেই নতুন করে কেউ আর এই পেশায় আসছে না। তার ওপর আবার করোনার সংকটে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প এখন অস্তিত্ব সংকটে। বেনারসিপল্লির তাঁতশিল্পকে বাঁচাতে সরকারিভাবে তাঁতিদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ না নেওয়া হলে এখানকার সব তাঁত বন্ধ হয়ে যাবে, তাঁতিরা পেশা পাল্টাবে। বেনারসিপল্লির এ শিল্প ঐতিহ্য হারাবে।

এসএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়