গ্লোবাল এসডিজিআইএ প্রোগ্রামে জয়ী ‘স্বাধীন ফিনটেক’ এবং ‘ভালো’

আগের সংবাদ

পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণে ব্যর্থ ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র ব্রহ্মস

পরের সংবাদ

দেশে দেশে টিকা যুদ্ধ

ভিসা পেতে টিকার শর্ত দুশ্চিন্তায় টিকা গ্রহীতারা

প্রকাশিত: জুলাই ১৩, ২০২১ , ৮:৩৩ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুলাই ১৩, ২০২১ , ৮:৩৪ পূর্বাহ্ণ

করোনা প্রতিরোধে এখনো বিশ্বের অনেক দেশ টিকা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত। এরই মধ্যে বাংলাদেশে এসেছে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার কোভিশিল্ড, চীনের সিনোফার্ম, যুক্তরাষ্ট্রের ফাইজার বায়োএনটেক ও মর্ডানার টিকা। কাক্সিক্ষত পরিমাণের চেয়ে কম হলেও দেশে এখনো কয়েক লাখ ডোজ টিকা মজুদ আছে। টিকার সংকট কাটিয়ে ওঠার পর এখন দেখা দিয়েছে নতুন সমস্যা। বিদেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, প্রবাসী শ্রমিক এবং চিকিৎসা, ভ্রমণ ও ব্যবসায়িক কাজে বিভিন্ন সময় যারা ভারতসহ বিদেশে যান তাদের দুঃশ্চিন্তা বেড়েছে। কারণ বিভিন্ন দেশ নির্ধারণ করে দিচ্ছে কোনো টিকা নিলে মিলবে ওই দেশের ভিসা। নতুন এই সমস্যা অনেকের দুঃশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিজের দেশের তৈরি করোনা ভাইরাসের টিকা নিলে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও পাকিস্তানসহ বেশকিছু দেশের মানুষের জন্য সীমান্তে কড়াকড়ি শিথিল করার ঘোষণা মার্চ মাসেই দিয়েছিল চীন। এছাড়া চীনা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশে আটকে পড়া শিক্ষার্থীসহ ব্যবসায়ীদের চীনে ফিরতে বা ঢুকতে হলে তাদের চীনের টিকা নিতে হবে। আবার সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কুয়েতে চীনের তৈরি টিকার সনদ গ্রহণযোগ্য হবে না। ভারত থেকে এমন কোনো বিধিনিষেধ এখনো আরোপিত না হলেও সেখানে চীনের টিকা গ্রহণযোগ্য হবে কিনা তা নিয়েও মানুষের মনে প্রশ্ন উঠছে।

ব্যবসার স্বার্থে চীনে প্রায়ই যেতে হয় জাফরুল আহমেদকে (৩৭)। করোনা কালেও চীন থেকে মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, পিপিইসহ বিভিন্ন পণ্য দেশে আমদানি করেছেন তিনি। সম্প্রতি টিকার জন্য নিবন্ধন করেছেন। জাফরুল বলেন, আমার ইচ্ছা ছিল অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা নেয়ার। কিন্তু তখন বয়সসীমার কারণে পারিনি। এরপর ভেবেছিলাম ফাইজার বা মর্ডানার টিকা নেব। কিন্তু ব্যবসার কারণে যেহেতু চীনে যেতে হয় তাই বাধ্য হয়ে চীনের টিকা নিতে হবে। কারণ চীন সরকার ঘোষণা করেছে তাদের টিকা না নিলে ওই দেশের ভিসা পাওয়া যাবে না। এখন কিছু করার নেই।

ক্যান্সার আক্রান্ত মায়ের চিকিৎসার জন্য কলকাতা-চেন্নাইয়ে কয়েকবারই যেতে হয় অরিন্দম সাহাকে (৪০)। চীনের টিকা নেয়ার পর যদি ভারতীয় ভিসা না পান সেই শঙ্কা অরিন্দমের। তিনি বলেন, কিছুটা সংশয়ে আছি। যদিও ভারত এখনো পর্যন্ত নির্দিষ্ট করে বলেনি, তাদের ভিসা পেতে কোন টিকা নিতে হবে। তবে চীনের সঙ্গে যেহেতু ভারতের সম্পর্ক মধুর নয়, তাই ভাবনায় আছি।

প্রবাসীদের টিকার বিষয়ে গত ৩০ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে কোভিড-১৯ টিকা ব্যবস্থাপনার টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক (এমএনসি এন্ড এএইচ) ডা. মো. শামসুল হক জানান, সিনোফার্মের টিকার সনদ দিয়ে যেসব দেশ প্রবাসী শ্রমিকদের ভিসা দেবে তাদের সিনোফার্মের টিকা দেয়া হবে। সৌদিআরব, কুয়েতসহ যেসব দেশে ফাইজার বা মর্ডানার টিকার সনদ ছাড়া প্রবাসী শ্রমিকদের ঢুকতে দেয়া হবে না- তাদের সেই টিকাই দেয়া হবে।

টিকা নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে হাহাকার অবস্থা- এরই মধ্যে কেনো এত শর্ত বা বিভেদ? এ প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকার রাজনীতিতে রাষ্ট্রের জাতীয়তাবাদী অহম ও গরিমা প্রতিষ্ঠার প্রকাশ দেখা যাচ্ছে। এছাড়া টিকার গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও ভারত করোনা মহামারিকে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের একটি ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। দ্রুত টিকা আবিষ্কার ক্ষমতার রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান সংহত করার জন্য বিশ্ব মোড়লরা ব্যবহার করছে। অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের জন্যও টিকা আবিষ্কার জরুরি হয়ে পড়েছে। টিকা জাতীয়বাদের বৈশিষ্ট্য পরিষ্কার। প্রথমত, নিজের দেশের জন্য টিকা মুজত করা। এরপর কে টিকা পাবে, কোথা থেকে পাবে সেটিও ঠিক করে দিচ্ছে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো। সোয়াইন ফ্লুর মহামারির পর অনুন্নত দেশগুলো রোগব্যাধি ও এর নমুনাকে সার্বভৌম বলে ঘোষণা করেছিল। এ কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১২ সালের ফ্র্রেমওয়ার্কে এ রকম একটি ধারণা যুক্তও করা হয়েছিল। কিন্তু টিকা জাতীয়বাদের কাছে এই সার্বভৌমত্ব ম্লান হয়ে গেছে।

বিষয়টিকে ‘লুম্পেন’ মানসিকতা বলে আখ্যা দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকাল রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক ও ঔষধ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আ ব ম ফারুক। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, এসব সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ীদের কারসাজি। বড় দেশ হলেও তারা বড় মনের ও মানসিকতার পরিচয় দিতে পারেনি। টিকা জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী এই দেশগুলোর অবস্থান বিশ্ব মানবতার বিরুদ্ধে। এর আগে এত বড় জৈবিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েন বিশ্ব। করোনা ভাইরাস হচ্ছে একটি জীবাণু বোমা। বৈশ্চিক মহামারির এই সময়েও যারা এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তারা অবৈজ্ঞানিক, গোঁড়ামি, মানবিক বিবেচনাবিরোধী।

গণস্বাস্থ্য গবেষক, বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. মোহাম্মদ সারোয়ার হোসেন মনে করেন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে আস্থা, সন্দেহ ও রাজনীতির কারণে টিকা নিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, টিকা কোন দেশে তৈরি হয়েছে এবং এর কার্যকারিতা অন্য টিকার তুলনায় কম বা বেশি- এই বিষয়টি মানুষের মনোজগতে বড় প্রভাব ফেলছে। তাই অনেকে ইউরোপ-আমেরিকার তথা বেশি কার্যকরি টিকা নিতে চাইছে। কিন্তু আমাদের মতো দেশে সেটি তো সম্ভব নয়। এছাড়া বিভিন্ন পর্যায়ে টিকা প্রয়োগের পর যে সমস্যাগুলো তৈরি হয়েছে সেগুলো সব টিকা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান স্বচ্ছভাবে তুলে ধরেনি বা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেয়নি। চীনের সিনোভ্যাক্স দেশটির কিছু মানুষের ওপর জোর করে প্রয়োগ করা হয়েছে, এমন অভিযোগ মিডিয়াতে এসেছে- যার কারণে হয়ত নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পর্যাপ্ত তথ্য এবং স্বচ্ছতার অভাবে চীনের টিকার প্রতি মানুষের আস্থায় কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে। তাছাড়া ইউরোপ-আমেরিকায় চীনের পণ্যের ওপর আস্থা কম। তবে এই মহামারি চলাকালে টিকা নিয়ে যা হচ্ছে তা কাম্য নয়।

যেসব দেশ বলছে পছন্দমতো টিকা না নিলে তাদের ভ‚খণ্ডে ঢুকতে দেয়া হবে না সেসব দেশের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে আলোচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জমির। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, রাষ্ট্রদূতদের ডেকে পুরো প্রেক্ষাপটটা জানানো দরকার। সেইসঙ্গে এও বলা দরকার, টিকা নিয়ে কোনোভাবেই রাজনীতি করা উচিত নয়। তিনি টিকার সুবিধা-অসুবিধার কথা উল্লেখ করে বলেন, এখন পর্যন্ত যেসব টিকা পাওয়া গেছে সেগুলোর যাতে সঠিক ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। নতুবা হিতে বিপরীত হতে পারে।

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়