আর্জেন্টিনার মেসির স্বপ্নজয়

আগের সংবাদ

রাতে ইউরোর স্বপ্নের ফাইনালে ইতালি-ইংল্যান্ড মুখোমুখি

পরের সংবাদ

কাজের সময় তালাবদ্ধ থাকেন অধিকাংশ কারখানার শ্রমিকরা

প্রকাশিত: জুলাই ১১, ২০২১ , ৮:২৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুলাই ১১, ২০২১ , ৯:১০ পূর্বাহ্ণ

প্রায় আট বছর আগে সাভারে রানা প্লাজা ধসের পর শ্রমিকদের কর্মপরিবেশের বিষয়টি সামনে আসে। বিশেষ করে গার্মেন্টস শ্রমিকদের ক্ষেত্রে। তবে ওই ঘটনার পর পোশাক কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়নে নিয়োজিত বিদেশি ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের তত্ত্বাবধানে এখন অধিকাংশ গার্মেন্টসের কর্মপরিবেশ অনেকটাই ভালো। অন্য কারখানাগুলোর কর্মপরিবেশ উপেক্ষিতই রয়েছে। এমনকি অনেক মালিক শ্রম আইনও মানছেন না। এছাড়া পোশাকসহ উৎপাদনমুখী অধিকাংশ কারখানার শ্রমিকরা কাজের সময় প্রতিটি ফ্লোরে তালাবদ্ধ থাকেন। আর এজন্যই একের পর এক ঘটছে দুর্ঘটনা। প্রাণ হারাচ্ছেন অসংখ্য শ্রমিক। রূপগঞ্জের হাসেম ফুড এন্ড বেভারেজ কারাখানায় অগ্নিকাণ্ড তারই এক জলন্ত উদাহরণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে শ্রমিকের কর্মপরিবেশ নিরাপদ করতে দেশের সব কারখানায় জরুরি তদারক করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। পোশাকের বাইরের অন্যান্য কারখানায় উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে পদক্ষেপ নেয়া হলে সহযোগিতা করবে আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটি। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশের প্রায় ২০ হাজার শিল্পকারখানার নিবন্ধনই নেই। এর মধ্যে নিবন্ধনহীন পোশাক কারখানা সহস্রাধিক। রয়েছে খাদ্য প্রস্তুতকারক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কাগজ ও কাগজের পণ্য তৈরি, বেসিক মেটাল, ফ্যাব্রিকেটেড মেটাল, ইলেকট্রিক্যাল ইক্যুইপমেন্ট, ফার্মাসিউটিক্যাল মেডিসিনাল, রিসাইক্লিং, হস্তশিল্প, কেমিক্যাল, বোটানিক্যাল এবং রাবার ও প্লাস্টিক প্রস্তুতকারী পণ্যসহ নানা ধরনের কারখানা। সংশ্লিষ্টরা জানান, তদারকির অভাবে এসব কারখানার কর্মপরিবেশের পাশাপাশি শ্রমিকদের জীবনমান নিশ্চিত হচ্ছে না। মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে অনেক শিল্পকারখানা, বহুতল বাণিজ্যিক ভবন ও অ্যাপার্টমেন্ট।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হাসেম ফুড এন্ড বেভারেজ লিমিটেডের কারখানায় গত বৃহস্পতিবার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান ৫২ জন শ্রমিক। যাদের অধিকাংশই শিশু-কিশোর। মর্মান্তিক ও অমানবিক হচ্ছে, আগুনে দগ্ধ শ্রমিকরা কারখানা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি মূল গেটটি বন্ধ ছিল বলে।

জানা গেছে, হাসেম ফুড ফ্যাক্টরির মালিকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে গত ৭ জুন নোটিস পাঠায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এর কোনো জবাব না পাওয়ায় গত ৩০ জুন মামলাও দেয়া হয় ওই মালিকের বিরুদ্ধে। তবে করোনার কারণে কোর্ট ভার্চুয়াল হওয়ায় মামলার তেমন অগ্রগতি হয়নি। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ছিল। তার মধ্যে অন্যতম হলো দুর্ঘটনাজনিত কারণে যথযাযথভাবে জরুরি বহির্গমনের ব্যবস্থা না করা এবং ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশু শ্রমিক নিয়োগ। এমনকি ওই কারখানার ভবনটিতে ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন ছিল না বলেও জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেনেন্স) দেবাশীষ বর্ধন।

মূলত, রানা প্লাজা ধসের পর পোশাক কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নত করার চাপ তৈরি হয়। সেই প্রেক্ষাপটেই তৈরি পোশাকশিল্পের কর্মপরিবেশ উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় জোর দেন দেশের সর্বোচ্চ রপ্তানি আয়ের খাতটির উদ্যোক্তারা। বর্তমানে এসব পোশাক ও বস্ত্র কারখানায় কর্মপরিবেশ অনেকটা নিরাপদ।

এদিকে পোশাক খাত বহির্ভূত অন্য খাতের কারখানাগুলোর কর্মপরিবেশ এখনো উপেক্ষিত। পোশাকবহির্ভূত শিল্পে সবচেয়ে বড় অগ্নিকাণ্ড হিসেবে ধরা হয় টঙ্গীর ট্যাম্পাকো ফয়েলসের বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনাকে। ভয়াবহতার দিক থেকে ওই ঘটনাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে রূপগঞ্জে সেজান জুস কারখানার অগ্নিকাণ্ড। ট্যাম্পাকো বিস্ফোরণের পর তৈরি পোশাকসহ সব ধরনের কারখানার নিরাপত্তা মান ও সংখ্যা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। পোশাক কারখানার মতো অন্যান্য শিল্পকারখানাকেও নিরাপদ করতে নতুন করে পরিদর্শনের উদ্যোগ নেয়া হয়। আলোচনা ছিল, কার্যকর পরিদর্শন কৌশল নির্ধারণে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সহযোগিতা নেবে। এরপরে আর কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি।

এ প্রসঙ্গে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের সেফটি শাখার যুগ্ম মহাপরিদর্শক প্রকৌশলী ফরিদ আহাম্মদ ভোরের কাগজকে বলেন, ট্যাম্পাকো দুর্ঘটনা এবং পরবর্তী সময়ে পুরান ঢাকাসহ রাজধানীতে কয়েকটি দুর্ঘটনার ঘটে। আমরা পর্যবেক্ষণ করে দেখলাম, কেমিক্যাল ও প্লাস্টিক কারখানায় দুর্ঘটনা বেশি হচ্ছে। এরপর আমাদের কার্যালয় থেকে পরিদর্শনে গিয়ে বিপজ্জনক কিছু কেমিক্যাল এবং প্লাস্টিক কারখানা চিহ্নিত করেছি। তালিকায় প্রায় ৩০০টি প্লাস্টিক কারখানা এবং ৩০০টি কেমিক্যাল কারখানা রয়েছে। কারখানাগুলোর কর্মপরিবেশ ভালো করার কাজ চলমান আছে। এছাড়া ২০১৬ সালের পড়ে যেসব গার্মেন্টস তৈরি হয়েছে সেগুলোও এর আওতায় আছে। একটি প্রকল্পের মাধ্যমে এগুলো নিয়মিত পরিদর্শন করা হয়।

সেজান জুস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান ফরিদ আহাম্মদ বলেন, শনিবার সারা দিন ঘটনাস্থলে ছিলাম। ইতোমধ্যে একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছি। আগামী সোমবার আবার ঘটনাস্থলে গিয়ে নথিপত্রগুলো দেখব। কী কারণে এত লোক মারা গেল, খুঁজে বের করব।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পোশাক খাতে এ ধরনের সমস্যা এখন নেই। তাদের কর্মপরিবেশ অনেক ভালো। কিন্তু অন্য কারখানাগুলোর কোনো তদারকি নেই। এ বিষয়ে আমাদের অনেক দুর্বলতা আছে। কারখানাগুলো কীভাবে কমপ্লায়েন্সের আওতায় আনা যায় এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

সব কারখানায় জরুরি তদারকি প্রয়োজন : শ্রমিকের কর্মপরিবেশ নিরাপদ করতে দেশের সব কারখানায় জরুরি তদারক করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। গতকাল শনিবার এক বিবৃতিতে রূপগঞ্জের ঘটনায় নিহত ও আহত ব্যক্তিদের প্রতি গভীর শোক জানিয়ে আইএলও বলেছে, হাজার হাজার শ্রমিক দিনের বেশির ভাগ সময় কারখানায় কাটান। সেই কারখানাগুলো বিল্ডিং কোড মেনে নির্মিত হয়েছে কিনা এবং পরিচালনার ক্ষেত্রে নিয়মকানুন মানা হচ্ছে কিনা, তা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও কারখানা মালিকদের খতিয়ে দেখা দরকার। আইনকানুন মেনে ভবন নির্মাণ ও কারখানা পরিচালনা করলে অগ্নিদুর্ঘটনার মতো জরুরি মুহূর্তে শ্রমিকরা নিরাপদে বের হওয়ার সুযোগ পান।

রানা প্লাজা ধসের পর তৈরি পোশাক কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকার, মালিকপক্ষ, শ্রমিক সংগঠন ও উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে কাজ করছে আইএলও। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ঘটনার পর পোশাকের বাইরের অন্যান্য কারখানায় উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে পদক্ষেপ নেয়া হলে আইএলও সহযোগিতা করবে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে।

আইএলও মনে করে, হাসেম ফুডস লিমিটেডের কারখানায় আগুনে ৫২ জনের মৃত্যুর ঘটনার পর সারা দেশের শিল্পকারখানার নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে যেসব ঘাটতি রয়েছে, তা পূরণে সব পক্ষের জোর চেষ্টা থাকবে।

ডি-এফবি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়