রাজশাহী মেডিকেলে করোনায় আরও ১৮ জনের মৃত্যু

আগের সংবাদ

বানর ধরতে গিয়ে লাঞ্ছিত গ্লোব বায়োটেকের সদস্যরা, পরে মুক্তি

পরের সংবাদ

দুর্ভোগে পোশাক শ্রমিকরা, কথা রাখেননি মালিকপক্ষ

প্রকাশিত: জুলাই ৫, ২০২১ , ৯:২৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুলাই ৫, ২০২১ , ৯:৫৭ পূর্বাহ্ণ

চাকরি যাবে না : বিজিএমইএ সভাপতি

স্বামীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ২০১৬ সালে বরগুনা থেকে ঢাকায় আসেন সুমি বেগম। সঙ্গে পাঁচ বছরের মেয়ে রুমকি। কমলাপুরের বিন্নী গার্মেন্টসে কাজ নিলেও কম টাকায় বাসা ভাড়া নেন মান্ডার এক নম্বর গলিতে। এ করোনাকালে কেমন চলছে জানতে চাইলে সুমি বলেন, ‘দিন দিন জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। আর আমাগো বেতন থিকা বিভিন্ন অজুহাতে টাকা কাটে। এখন তো ৩ মাস ধইরা বেতন পাই না। লকডাউনের কারণে গাড়ি বন্ধ থাকায় হাঁইটা হাঁইটা অফিসে আসতে হয়’। তিনি বলেন, ‘যে বেতন পাই তা দিয়া রিকশায় আইলে খামু কি, আর বাসা ভাড়া দিমু কেমনে?’

একই অবস্থা আরামবাগের কাছের ওল্যিও এপারেলসে। যাত্রাবাড়ী থেকে হেঁটে বা রিকশায় করে আসতে হয় ওল্যিও এপারেলসে হেলপার হিসেবে কর্মরত সুমনা আর তার বোন সুহানাকে। এ প্রতিবেদককে সুমনা বলেন, আগে বাসে করে কমলাপুর এসে নামতাম। সেখান থেকে একটুখানি পথ হেঁটেই আসতাম। কিন্তু লকডাউনের কারণে এখন দুই বোন একসঙ্গে রিকশায় করে আসি। মাঝে মাঝে হেঁটেও আসি। তিনি জানান, এখানে সাড়ে ৩ বছর কাজ করেন। প্রতিদিন সকাল ৮টার মধ্যে কার্ড পাঞ্জ করতে হয়। দেরি হলে লেটমার্ক হয়। এতে টাকা কাটা যায়। মালিক গাড়ির ব্যবস্থা কেন করেননি জানতে চাইলে সুমনা বলেন, ‘আমাগো সঙ্গে বেশির ভাগ আসে মুগদা-মান্ডা থেকে। মাত্র অল্প কিছু মানুষ দূরে থেকে আসি। এজন্যই গাড়ির ব্যবস্থা করা হয় নাই।’ তবে নিয়মিত ডাক্তারি চেকআপ ও যাবতীয় নিয়মকানুন মেনেই অফিসে ঢুকতে হয় বলে জানান তিনি।

সুমি কিংবা সুমনার মতো বেশির ভাগ গার্মেন্ট কর্মীদের অবস্থা এমনই। করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে লকডাউনে জরুরি পরিষেবা ছাড়া সব অফিস-আদালত বন্ধ থাকলেও ‘অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে’ খোলা রয়েছে পোশাক কারখানা। লকডাউনে রিকশা ছাড়া সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ। এতে অধিকাংশ কর্মীই সকালে কারখানায় গেছেন পায়ে হেঁটে। জানতে চাইলে বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সাধারণ সম্পাদক জুলহাস নায়িন বাবু ভোরের কাগজকে বলেন, পোশাক শ্রমিকদের পরিবহন ছাড়া নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আসতে হচ্ছে। তিনি বলেন, কিছু কিছু এলাকায় টেম্পু চলাচল করছে; এসব যানবাহনে চড়েই শ্রমিকরা গাদাগাদি করে কারখানায় আসছেন। হাতেগোনা কয়েকটি বড় বড় কোম্পানি বা গ্রিন ফ্যাক্টরির নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা আছে। সেখানেও দেখা যাচ্ছে, যানবাহনগুলোতে যতগুলো আসন তার প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি শ্রমিক নিয়ে যাতায়াত করানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, আরো একটি বিষয় হচ্ছে অল্প শ্রমিক দিয়ে বেশি কাজ করানোর অভিযোগও রয়েছে। প্রতিদিন তাদের অনেক বেশি কাজ করতে হচ্ছে। এতে অনেক শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়ছে। কিন্তু শ্রমিকদের চিকিৎসার যথাযথ ব্যবস্থা নেই। অনেকেই আবার চাকরি হারানোর ভয়ে ঠাণ্ডা, জ্বর-কাশি নিয়ে অফিস করছে। তাদের ঠিকমতো আইসোলেশনের ব্যবস্থা করা বা পরীক্ষার কোনো উদ্যোগ নেই। কারখানাগুলোতে যে মেডিকেল সেন্টার আছে সেখানেও স্যালাইন, প্যারাসিটামল ছাড়া তেমন কোনো ওষুধ দেয়া হয় না। মালিকরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, শ্রমিকদের টেস্টের ব্যবস্থা করা হবে বা আইসোলেশন ব্যবস্থা করা হবে, হাসপাতাল তৈরি করবে, বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই।

লকডাউনে শিল্পোদ্যোক্তারা কারখানা খোলা রাখার দাবি জানালে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি মেনে পোশাক কারখানাকে লকডাউনের আওতামুক্ত রাখা হয়। তবে শ্রমিকদের দুর্ভোগ লাঘবে নিজস্ব পরিবহনের ব্যবস্থা করতে বলা হয়। উৎপাদন সচল রাখতে পোশাক খাতের মালিকরা সরকারের এ শর্তে সম্মতি জানায়। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, তারা সে কথা রাখেননি। সরেজমিনে দেখা গেছে, বড় বড় কিছু কারখানা ছাড়া অধিকাংশ কারখানাই শ্রমিকদের জন্য পরিবহনের ব্যবস্থা করেনি। এতে একদিকে শ্রমিকদের দুর্ভোগ, অন্যদিকে খরচ বেড়েছে।

পোশাক খাতের মালিকরা বলেছিলেন, শ্রমিকরা কারখানার আশপাশে বসবাস করেন। করোনার মধ্যে গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও সমস্যা হয় না। তারা হেঁটে কারখানায় যাতায়াত করেন। তারা আরো দাবি করেন, করোনার মধ্যে কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা হচ্ছে। বিজিএমইএর পক্ষ থেকে বলা হয়, কারখানায় ঢোকার সময় সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে দূরত্ব বজায় রেখে প্রবেশ করতে হবে। কারখানার মেশিনগুলোও দূরত্ব বজায় রেখে বসানো হয়েছে- যাতে এক শ্রমিক থেকে আরেক শ্রমিক আক্রান্ত না হতে পারে। কারখানা থেকে বের হওয়ার সময়ও দূরত্ব বজায় রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অথচ দেখা গেছে, বেশির ভাগ কারখানায় স্বাস্থ্যবিধি অনেকটাই যেন দায়সারা। এছাড়া বাসা ভাড়া কম হওয়া, কারখানার আশপাশে বাসা না পাওয়া, দীর্ঘদিন এক এলাকাতে বসবাস করা, চাকরি বদল করলেও আগের এলাকায় থেকে যাওয়া এবং নাগরিক সুবিধার কারণে বেশির ভাগ পোশাক কর্মীই কারখানা থেকে অনেকটাই দূরে থাকেন। যখন লকডাউন বা অন্য কোনো কারণে যান চলাচল বিঘ্নিত হলে এসব শ্রমিক ভোগান্তিতে পড়েন।

নগরীর রামপুরা, চৌধুরীপাড়া ও মালিবাগ এলাকার পোশাক কারখানাগুলোর শ্রমিকরাও জানালেন, লকডাউনের সময় তাদের জন্য আলাদা কোনো যানবাহনের ব্যবস্থা করা হয়নি। তবে কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের অধিকাংশ কর্মীই থাকেন কারখানা থেকে দুই থেকে তিন কিলোমিটারের মধ্যে। তাদের অনেকে এমনিতেই পায়ে হেঁটে যাতায়াত করেন। তাই আলাদা করে যানবাহনের ব্যবস্থা করার প্রয়োজন পড়েনি।

মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার একটি কারখানার কর্মী নিলুফা আক্তার জানান, তার বাসা বাড্ডা পোস্ট অফিস গলি থেকে আরো বেশ কিছুটা ভিতরে। সেখান থেকে কারখানায় হেঁটেই পৌঁছেছেন। বলেন, স্বাভাবিক সময় বাসে করেই কারখানায় যাওয়া-আসা করি, এখন লকডাউনে গাড়ি নাই, বাধ্য হয়ে হেঁটে আসতে হয়েছে। তবে একটু আগেভাগেই অফিসে রওয়ানা দিয়েছেন বলে জানান।

পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ৭০/৭৫ ভাগ শ্রমিক কারখানার আশপাশে থাকেন বা কারখানার স্থায়ী পরিবহন সুবিধা নিয়ে থাকেন। ২৫/৩০ শতাংশ শ্রমিকের পরিবহনের ব্যবস্থা করে মালিকরা কারখানা খোলা রাখতেই পারে। এতে শ্রমিকরা নিরাপদে কারখানায় পৌঁছাবে। উৎপাদনে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারখানা খোলা রাখলে শ্রমিকরা কারখানা যাচ্ছে। মালিকরা জানে শ্রমিকরা যে কোনোভাবেই হোক কারখানায় যাবেন।

মালিবাগে আল মুসলিম গ্রুপের ড্রেস এন্ড ডিসমেটিক (প্রা.) লিমিটেড ও হার্টি অ্যাপারেলস লিমিটেডসহ কয়েকটি কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, পোশাক কর্মীদের লাইনে দাঁড় করিয়ে শরীরের তাপমাত্রা মাপা হচ্ছে। সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বাইরে। আল মুসলিম গ্রুপের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা (প্রশাসন) মো. হারুন অর রশিদ বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনেই কর্মীদের ভেতরে প্রবেশ করানো হয়। কেউ অসুস্থ থাকলে তাকে ছুটি দিয়ে বাসায় ফেরত পাঠিয়ে দিই। তিনি বলেন, কারো জ্বর-সর্দি হলে কারখানায় না আসার জন্য বলে দিচ্ছি। যানবাহনের ব্যবস্থা না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, বেশির ভাগ পোশাক কর্মীই আশপাশে থাকেন। কর্মী সংখ্যা এক সময় সাতশর বেশি ছিল, এখন কমিয়ে পাঁচশ করা হয়েছে। যারা একটু দূরে ছিল, তারাও এখন কাছাকাছি থাকছে।

চাকরি যাবে না- বিজিএমইএ সভাপতি : দিকে যেসব পোশাককর্মী দূরে থাকেন কর্মস্থলে আসতে তাদের জোর করা হচ্ছে না দাবি করে বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান বলেছেন, দূরত্বের কারণে কোনো কর্মী আসতে না পারলেও চাকরি যাবে না- এই নিশ্চয়তা দিচ্ছি। তিনি আরো বলেন, নিজস্ব ব্যবস্থাপনা বলতে দূরের সবাইকে আনতে হবে এমন কথা বলিনি। কারখানায় যদি ৫ বা ৭ শতাংশ লোক কম থাকে তাতেও সমস্যা নেই।

এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, যারা কাছে আছেন, তাদের শতভাগ উপস্থিতি থাকতে হবে। তবে যারা দূরে থেকে আসতে পারছে না বা কারাখানা কর্তৃপক্ষও আনার ব্যবস্থা করতে পারছে না তাদের কারো চাকরি যাবে না। ফারুক হাসান আরো বলেন, অনেক কারখানা অনেক খারাপ অবস্থায় আছে। অর্থনীতি সচল রাখতে, কর্মীদের বেতন-বোনাস ঠিকমতো দিতেই আমরা কারখানা চালু রেখেছি।

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়